বাংলাদেশ নিয়ে আপত্তি কলকাতার টেকনিশিয়ানদেরকলকাতায় প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, তিনগুণ পারিশ্রমিক দিতে হয় ‘প্রিন্স’-এর প্রযোজককে
কলকাতায় শুটিং করতে গিয়ে টেকনিশিয়ানদের নির্ধারিত পারিশ্রমিকের তিন গুণ বেশি অর্থ দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ‘প্রিন্স: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা’ ছবির প্রযোজক শিরিন সুলতানা। তার দাবি, শুরুতে কম পারিশ্রমিকে কাজের আশ্বাস দিলেও শুটিং শুরুর পর অবস্থান বদলে ফেলেন টলিউড ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস। খবর আনন্দবাজার পত্রিকা।
বিজেপির ক্ষমতা আরোহণের পর ভারতীয় এ রাজ্যে টলিউডেও এসেছে পরিবর্তন। ফেডারেশনের সভাপতির পদে এখন আর নেই স্বরূপ বিশ্বাস। মেয়াদ গত বছর শেষ হয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন তিনি। আর তার পদ ছাড়ার পরই মুখ খুলেছেন প্রযোজক শিরিন সুলতানা।
শিরিনের অভিযোগ, ফেডারেশনের নিয়ম অনুযায়ী কলকাতায় কাজ করলে টেকনিশিয়ানদের আড়াই গুণ বেশি পারিশ্রমিক দিতে হয়। তবে শুরুতে স্বরূপ বিশ্বাস তাদের আশ্বস্ত করেছিলেন, দেড় গুণ পারিশ্রমিক দিলেই শুটিং করা যাবে।

প্রযোজকের ভাষ্য, “স্বরূপবাবু বলেছিলেন, ‘চিন্তা করবেন না। দেড় গুণ পারিশ্রমিক দিলেই আপনারা এখানে কাজ করতে পারবেন। আমরা চাই দুই দেশের মধ্যে আরও কাজ হোক।’ আমরা ভারত সরকারের কাছ থেকে উত্তরপ্রদেশের লখনউসহ বিভিন্ন জায়গায় শুটিংয়ের অনুমতিও পেয়েছিলাম। কিন্তু উনি বলেন, কোথাও যেতে হবে না, কলকাতাতেই স্বচ্ছন্দে কাজ করা যাবে।”
শিরিন জানান, সে সময় স্বরূপ বিশ্বাসের আচরণে তারা অভিভূত হয়েছিলেন। এমনকি তিনি শাকিব খান–কে সুরুচি সংঘে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে বিশেষ বৈঠকের মাধ্যমে দুই বাংলার যৌথ কাজের সম্ভাবনা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছিল।
প্রযোজকের দাবি, নির্ধারিত দিনে শাকিব খানকে নিয়ে সুরুচি সংঘে পৌঁছানোর পর লোক মারফত জানানো হয়, স্বরূপ বিশ্বাস জরুরি বৈঠকে ব্যস্ত। ফলে শাকিব খানকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
সুরুচি সংঘ হলো কলকাতার অন্যতম পরিচিত একটি ক্লাব ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। বিশেষ করে তাদের দুর্গাপূজা আয়োজন খুবই বিখ্যাত।
এটি মূলত দক্ষিণ কলকাতার নিউ আলিপুর এলাকায় অবস্থিত। বহু বছর ধরে থিমভিত্তিক দুর্গাপূজার জন্য সুরুচি সংঘ আলোচনায় থাকে। বিভিন্ন সময় ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
টলিউড-রাজনীতির পরিচিত মুখ স্বরূপ বিশ্বাস দীর্ঘদিন সুরুচি সংঘের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং সংগঠনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে পরিচিত। তাই চলচ্চিত্র বা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বৈঠক, আড্ডা বা অনুষ্ঠান নিয়েও মাঝে মাঝে সুরুচি সংঘের নাম সামনে আসে।
এতেই শেষ হয়নি অভিযোগ। শিরিন সুলতানার ভাষ্য, শুটিংয়ের ১০ দিন পার হওয়ার পর হঠাৎ ফোন করে স্বরূপ বিশ্বাস জানান, টেকনিশিয়ানদের তিন গুণ বেশি পারিশ্রমিক দিতে হবে, না হলে কাজ বন্ধ হয়ে যাবে।
এ ঘটনায় ছবির কলকাতার এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার অরিন্দম দাসকে নিয়ে স্বরূপ বিশ্বাসের অফিসে যান শিরিন। সেখানে আড়াই গুণ পারিশ্রমিকের নিয়মের কথা উল্লেখ করলে, অরিন্দমের অভিযোগ, তাকে হুমকি দেওয়া হয়।
অরিন্দম দাসের ভাষ্য, “স্বরূপদা আমাকে বলেন, ‘তুমি তো কলকাতাতেও অন্য ছবির কাজ করবে। চুপচাপ থাকো। না হলে ব্যান হয়ে যাবে।’”
শেষ পর্যন্ত তিন গুণ পারিশ্রমিক দিয়েই শুটিং শেষ করতে হয়েছে বলে দাবি প্রযোজকের। তার কথায়, “খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে বলে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু উনি কিছুই শুনলেন না।”
এ ঘটনায় নতুন সরকারের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও ভাবছেন শিরিন সুলতানা। ইতোমধ্যে বিষয়টি জানানো হয়েছে টলিউডের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্তদের একজন রুদ্রনীল ঘোষ–কে।
নতুন সরকারের কাছে তার আবেদন, “এমন পরিবেশ তৈরি করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও মজবুত হয়। স্বরূপবাবুর মতো মানুষ আসলে দুই বাংলার শত্রু। আমরা আরও বেশি করে ভারতে এসে কাজ করতে চাই।”
এ বিষয়ে রুদ্রনীল ঘোষ বলেন, “একটা সময় ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় প্রচুর ছবি হয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক ভালো হোক, আমরা সবাই চাই। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে অস্থিরতার সময় কিছু ব্যক্তি ভারত সম্পর্কে উস্কানিমূলক মন্তব্য করেছিলেন। এতে পদ্মাপারের শিল্পীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত। ভারতে কাজ করার সিদ্ধান্ত দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গে শুটিং নিয়ে তাঁর মত, “এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সরাসরি কথা বললে ভালো হবে। তিনি সঠিক দিশা দেখাতে পারবেন।”
অন্যদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্বরূপ বিশ্বাস। তার দাবি, “ওঁরা তিন গুণ নয়, আড়াই গুণ বেশি পারিশ্রমিক দিয়েছেন, যা কলকাতার টেকনিশিয়ানদের জন্য ধার্য। কোনও অতিরিক্ত পারিশ্রমিক নেওয়া হয়নি। আমিও কোনও দিন শুটিং আটকাইনি।”
এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার অরিন্দম দাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ওঁকে চিনি। অরিন্দম খুব কথা বদলে দেন। ওঁর কথার উত্তর না দেওয়াই ভালো।”
তবে শাকিব খানের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনার বিষয়টি স্বীকার করেছেন তিনি। স্বরূপের ভাষ্য, বৈঠকটি সুরুচি সংঘে নয়, ফেডারেশনের অফিসে হওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশের আরও বেশি ছবির শুটিং কলকাতায় আনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েই ওই বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, “শাকিব খান আসবেন বলেও জানিয়েছিলেন। কিন্তু বৈঠকের আগেই তিনি পেটের সংক্রমণে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিন দিন শুটিংও করতে পারেননি। ফলে বৈঠকটি আর হয়নি।”
এদিকে বুধবার টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় টলিউড টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে বৈঠক করেন রুদ্রনীল ঘোষ। সেখানে শিল্প নির্দেশনা বিভাগের এক টেকনিশিয়ান অভিযোগ করেন, বাংলাদেশি অভিনেতা ও নির্মাতারা কলকাতায় এসে কাজ করলেও স্থানীয় টেকনিশিয়ানরা যথাযথ পারিশ্রমিক পান না।
ওই টেকনিশিয়ানের দাবি, “বাংলাদেশের প্রযোজকেরা এখানে এসে লাভবান হচ্ছেন। এটা কেন হতে দেওয়া হবে?” তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের শিল্পীরা কলকাতার নানা খুঁটিনাটি তথ্য জেনে যাচ্ছেন, যা ‘মঙ্গলজনক নয়’।
এ প্রসঙ্গে রুদ্রনীল ঘোষ বলেন, “এটি আন্তর্জাতিক একটি বিষয়। কোনও ঘরোয়া বৈঠকে এর সমাধান সম্ভব নয়। আমরা কেউ এককভাবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তও নিতে পারি না। বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত এবং কেন্দ্রীয় সরকারই এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”
এদিকে সংবাদ প্রতিদিনের খবর অনুযায়ী, বুধবার বিকালে টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওতে বৈঠক ডেকেছিলেন শিবপুরের বিধায়ক তথা অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ। নবর্নিবাচিত তারকা বিধায়কের ডাকে এদিন বৈঠকে হাজির হয়েছিলেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, অশোক ধানুকা, সৌরভ দাস, জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, শ্রীজিৎ রায়-সহ আরও অনেকে। মূলত টলিউডের অন্দরের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে এদিন খোলাখুলি আলোচনা হয়। বৈঠকে বিভিন্ন টেকনিশিয়ান্স গিল্ডের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
টেকনিশিয়ানদের মনে এতদিনের যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত ছিল, রুদ্রনীলকে সামনে পেয়ে স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সেসব ক্ষোভই উগরে দেন অনেকে। বিভিন্ন টেকনিশিয়ান উপস্থিত হয়ে তাঁদের উপর হওয়া অত্যাচারের বর্ণনা শোনান রুদ্রনীলকে। ঘরের ছেলেকে কাছে পেয়ে চোখের জলে দীর্ঘ ১৪ বছরের যন্ত্রণার কথা জানিয়েছেন ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘ দিন ‘ব্রাত্য’ থাকা শিল্পীরা। সেই সঙ্গে উঠে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এক জনৈক টকনিশিয়ানের অনুযোগ, বাংলাদেশে গিয়ে অপমানিত হয়েছেন অথচ ওপার বাংলার শিল্পীদের এখানে অবাধ যাতায়াত। এই বিষয়টা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। তার ভাবনাকে সম্মান জানিয়ে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেছেন রুদ্রনীল ঘোষ। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালকে অভিনেতা-বিধায়ক জানান, “আমাকে কয়েকজন জানিয়েছেন যখন তাঁরা বাংলাদেশে কাজ করতে গিয়েছিলেন তাঁরা অসম্মানিত হয়েছেন। যা ভারতীয় হিসেবে তাঁদের কাছে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। যখন তাঁরা তাঁদের যন্ত্রণার কথা জানিয়েছেন আমি সুযোগ পেলেই সেটা সরকারকে জানাব। পুরো বিষয়টাতো আমার হাতে নেই।”
এইরকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শিল্পীরা ভারতে এসে কাজ করতে পারবেন? সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালের তরফে এই প্রশ্নে বিধায়ক-অভিনেতা জানান, “সেটা সম্পূর্ণ সরকারের নির্ণয়। তবে বাংলাদেশের এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা ভারতকে অন্তর থেকে ভালোবাসেন। আবার এমন কিছু উগ্র মৌলবাদী শক্তিরও নজির রয়েছে যাঁরা দীপু দাসের মতো মানুষকে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেয়। স্বল্প সংখ্যক মানুষ আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে তো পুরো দেশকে বিচার করা উচিত নয়। তবে বিষয়টা গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে সেটুকু নিশ্চিত।”
ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর গৈরিক বঙ্গে রুদ্রনীলের সঙ্গে টেকনিশিয়ানদের এটাই ছিল প্রথম বৈঠক। যেখানে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিকেরাও। বৈঠকে যেমন একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে তেমনই রুদ্রনীলেক কথায় অশ্বস্তও হয়েছে টলিপাড়া সে কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। বাংলাদেশের শিল্পীদের ভারতে কাজের ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় সেই দিতে তাকিয়ে সিনেপাড়া।






