Select Page

খেলতে না পারা ‘সাপলুডু’

খেলতে না পারা ‘সাপলুডু’

আমাদের বাণিজ্যিক ছবি এখন এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে খুব আশায় বুক বেঁধে থাকি একটা পরিবর্তনের। ছোটপর্দা থেকে বড়পর্দায় আসা নির্মাতাদের মধ্যেই একটা পরিবর্তন এসেছিল। অমিতাভ রেজা, তৌকীর আহমেদ, শিহাব শাহীন-রা এর মধ্যে আছেন। এবার গোলাম সোহরাব দোদুল চলচ্চিত্রে পা রাখলেন ‘সাপলুডু’ (২০১৯) ছবি দিয়ে। সঙ্গত কারণেই তাঁর কাছে প্রত্যাশা অনেক। হয়তো তিনিও ঐ নির্মাতাদের মতো ছোটপর্দা থেকে চলচ্চিত্রে এসে নিজের সিগনেচার রাখবেন। ‘কিন্তু’ জাতীয় অব্যয়ে দোদুল আটকে গেলেন এবং কেন আটকে গেলেন সেটাই পরিষ্কার হতে যাচ্ছে এ লেখায়।

‘সাপলুডু’ ছবির ট্রেলার মুক্তির পরে দর্শক এক্সাইটেড ছিল। থ্রিলারের প্রধান যে শর্ত রহস্য ট্রেলারে ছিল। অনেকগুলো চরিত্র দেখানো হয়েছে কিন্তু কারো কোনো গল্প দেখানো হয় নি। ট্রেলারের আকর্ষণ হিসেবে তা শতভাগ ঠিক ছিল কিন্তু ছবি দেখতে বসে ট্রেলার থেকে বেরিয়ে থ্রিলারের স্টোরি টেলিং-এ রহস্যের দিকে দর্শককে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া, জট পাকানো, জট খোলা, চরিত্রের একে অপরের দ্বন্দ, ক্লাইমেক্সে গিয়ে দর্শককে বড়োসড়ো ধাক্কা দেয়া গুরুত্বপূর্ণ এ কাজগুলোকে অলস ভঙ্গিতে তুলে ধরা হলো। থ্রিলারের সবচেয়ে বড় যে বৈশিষ্ট্য টুইস্ট সেটাকে স্ট্রং করে দেখাতে পারল না। বরং এক্সপেক্টেড ফিনিশিং-এ ‘টুইস্ট’ শব্দটার মিনিংই বদলে গেল ক্লাইমেক্সে। এখন গোলাম সোহরাব দোদুল-কে নাটকের মধ্যে যে নামে বা কাজে এতদিন চিনে আসা বা যে দর্শকগুলো তাঁকে ভালোমতো জানে তাদের কনফিডেন্স কমে গেল।

ছবির শ্লোগান ছিল ‘খেলতে হবে সবাইকে।’ খেলাটা কেমন হবার কথা? ‘সাপলুডু’-র নিয়ম হচ্ছে সাপের মুখে গুটি পড়বে সাপ গিলবে তারপর সোজা লেজ বরাবর গিয়ে উত্থান থেকে পতন তারপর আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। ট্রেলারে বলা হয়েছিল ‘তারপরেও ঘুরে দাঁড়ায় কেউ কেউ’ কিন্তু গল্পে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পে নেই শক্তিশালী কোনো ইলিমেন্ট। ‘সাপলুডু’ নাম অনুযায়ী ‘খেলা’ জমল না। নির্মাতার আরো সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।

ছবি মাল্টিস্টারার। এ ধরণের ছবিতে ক্যারেক্টার বিল্ডআপ করার জন্য সময় লাগে। ছবির ফার্স্ট হাফ সেজন্য সময় নিয়েছে বা স্লো স্টোরি টেলিং করেছে। সমস্যা নেই এটা হতেই পারে। কিন্তু সেকেন্ড হাফেরও অর্ধেক পর্যন্ত ক্যারেক্টার ইন্ট্রোডাকশনই যদি চলতে থাকে তাহলে থ্রিলারের জট পাকবে কখন! একের পর এক ক্যারেক্টার আসছে, দর্শক হাততালিও দিচ্ছে তাদের পছন্দের আর্টিস্টের জন্য কিন্তু তাদের দিয়ে বেটার কিছু পাচ্ছে না গল্প যত এগোচ্ছে। আরিফিন শুভ, মীম, তারিক আনাম, জাহিদ হাসান, সালাহউদ্দিন লাভলু তাদেরকে ছবির প্রথম থেকে দর্শক যদি দেখে থাকে তাহলে শতাব্দী ওয়াদুদ, মারজুক রাসেল, রুনা খান-দের কাছে নিশ্চয়ই বিশেষ কিছু আশা করবে তাহলেই না জমবে ছবি। টুইস্টের জায়গা তৈরি করতে না করতেই সে সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাচ্ছে।

আরিফিন শুভ ছবির নায়ক। নায়কের চরিত্রের প্রভাব কেমন থাকে ছবিতে। বাণিজ্যিক ছবিতে থ্রিলারে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার ‘ঢাকা অ্যাটাক’-এও আছে। কমপেয়ার করেই যদি বলা হয় তাহলে ‘সাপলুডু’-তে বিরতির আগ পর্যন্ত শুভকে যে সিচুয়েশনে দেখানো হয়েছে বিরতির পরে তার চরিত্রে অবশ্যই ডেপথ বেশি থাকার কথা, নায়কোচিত কিছু একটা করার কথা, রহস্য উন্মোচন করার কথা। কিন্তু নায়ককে অপচয় করানো হলো। নায়িকার ভূমিকা আরো হতাশাজনক। শতাব্দী ওয়াদুদকে নিয়েও দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ হওয়া কঠিন। জাহিদ হাসানের অভিনয় নিয়ে কথা নেই কিন্তু তাকে দিয়ে ছবির গুরুত্বপূর্ণ অংশকেই দুর্বল করা হয়েছে। একটা নির্দিষ্ট উপাদান যেটাকে ঘিরে ছবির গল্পে থ্রিলার বিল্ডআপ, টুইস্ট তৈরির চেষ্টা ও ক্লাইমেক্স দেখানো হয়েছে তার পোট্রে ছিল টিপিক্যাল।

পুরো ছবিতে দর্শককে এন্টারটেইন করার মতো চরিত্র ছিল সালাহউদ্দিন লাভলু। স্বভাবসুলভ হাস্যরসের চরিত্রই তাকে দেয়া হয়েছে এবং তিনি ঠিকঠাক পেরেছেন। রুনা খান অল্প সময়ে নিজের অভিনয়শক্তি দেখিয়েছেন। আরো দু’একজন চরিত্র যাদেরকে ট্রেলারে দেখানো হয় নি তারা চমক ছিল। ছবির সিনেমাটোগ্রাফি দারুণ, ড্রোন শটে দেখানো জঙ্গল দেখতে চমৎকার লেগেছে। চরিত্রগুলোর কস্টিউম ঠিকঠাক, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও ভালো। কিন্তু স্টোরি টেলিং ও ক্লাইমেক্সে মার খেয়েছে। এমনকি ছবির ‘পার্ট টু’ করার চিন্তাও যদি নির্মাতার থাকে তবে তা কতটুকু যৌক্তিক হবে ভাবার বিষয়।

ছবি জমতে পারত কিভাবে সে নিয়ে বলা যাক :
* ট্রেলারে দেখানো ঘটনাটিকে ঘিরে স্ট্রং কোনো ক্লু থাকতে পারত ছবিকে আকর্ষণীয় করার জন্য।
* মাল্টিস্টারার বিষয়টাকে পুঁজি করে প্রত্যেকটা চরিত্রের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি করা যেত তাহলে জমত।
* নায়কের সাথে ছবির বাকিসব চরিত্রকে বিপরীতমুখী করা যেত তাহলে একটা টান টান উত্তেজনা থাকত।
* ‘সাপলুডু’ নামকরণের যে অর্থ তার উপর ভিত্তি করে ছবির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোকে উত্থান-পতনে দেখানো যেত।
* একটা হাইপ তৈরি করা টাইটেল সং করা যেত।
* ক্লাইমেক্স এমনভাবে করা হতে পারত যেখানে ছবি শেষ করেও দর্শক আরো কোনো রহস্যের গন্ধ পেত।

ডিজিটাল ছবির প্রথমদিকে যথেষ্ট ছাড় দেয়া হত দর্শক-সমালেচকের পক্ষ থেকে। ভাবা হত ইন্ডাস্ট্রির নতুন আমল শুরু হয়েছে একটু প্রস্তুত হবার জন্য সময় দেয়া যায় সময়ের চাহিদা মিটিয়ে ছবি করার জন্য। কিন্তু ইতোমধ্যে অর্ধযুগ পার হয়ে গেছে এ আমলের তাই এখন অন্য ইন্ডাস্ট্রি থেকে পিছিয়ে পড়া বা প্রত্যাশা দেখিয়ে হতাশ করা ছবিকে জোর করে ভালো বলার দিন নেই। ওভারঅল ভালো বা মানসম্পন্ন ছবি দিতে হবে এটাই শেষ কথা। ‘সাপলুডু’ গোলাম সোহরাব দোদুল নির্মিত দুর্বল থ্রিলার যে ছবিতে ‘খেলা’-টা সাপলুডু-র বৈশিষ্ট্যে দেখাতে পারে নি। তাঁর পরবর্তী ছবির জন্য প্রথম ছবিটি ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার পার্ট হয়ে থাক।

রেটিং – ৪.৫/১০


মন্তব্য করুন