নায়িকা না হয়েও এখনো দর্শকের স্মরণে আছেন সুলতানা
ষাট, সত্তর ও আশির দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রের এমনই এক দীপ্তিময়ী ও জনপ্রিয় নাম চাঁদ সুলতানা, যাকে সবাই চেনেন শুধু ‘সুলতানা’ নামে। নায়িকা হিসেবে খুব বেশি সুযোগ না পেলেও পাশের বাড়ির মেয়ের অবতার, মিষ্টি হাসি, অনবদ্য অভিনয় দিয়ে তিনি দর্শকের হৃদয়ে পাকাপাকি আসন গেড়ে নিয়েছিলেন।

চলচ্চিত্রের মূল স্রোতের আড়ালে থেকে যাওয়া এই প্রতিভাবান অভিনেত্রীকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার চলচ্চিত্রভিত্তিক গ্রুপগুলোতে প্রায়ই নস্টালজিক পোস্ট ও আলোচনা দেখা যায়। চলুন, সোনালি যুগের এই জনপ্রিয় অভিনেত্রীর বর্ণাঢ্য জীবন ও ক্যারিয়ারের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।
জন্ম ও রূপালি ভুবনে প্রবেশ
পাবনা জেলার জন্ম নেয়া সুলতানা ছিলেন ৭ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। তার মা কলকাতা থেকে আসা এবং বাবা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের। বাবা ভালোবেসে তাকে ডাকতেন ‘চাঁদ সুলতানা’ আর ডাকনাম ছিল ‘শিলু’।
শৈশবে পড়াশোনার পাশাপাশি স্কুলজীবনেই তিনি নিয়মিত নাচ-গান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। স্কুলের এক অনুষ্ঠানে তার চমৎকার পারফরম্যান্স দেখে মুগ্ধ হন গুণী অভিনেত্রী রানী সরকার। তিনিই সুলতানাকে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময়ই কিংবদন্তি রানী সরকারের হাত ধরে ১৯৬৬ সালে ‘অপরিচিতা’ ছবির মাধ্যমে শিশুশিল্পী হিসেবে রূপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে তার। ওই ছবিতে তিনি শওকত আকবরের মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

‘রক্তাক্ত বাংলা’ ও লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া অমর গান
১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মমতাজ আলী নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘রক্তাক্ত বাংলা’। এই ছবির একটি দৃশ্য আজও দর্শকদের মনে শিহরণ জাগায়, যেখানে টালিউডের জনপ্রিয় নায়ক বিশ্বজিৎ (যিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ভাস্করের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন) তার বোনের চরিত্রে থাকা সুলতানার সামনে দাঁড়িয়ে মূর্তি গড়ছেন।
সে সময় সলিল চৌধুরীর লেখা ও সুরে এবং উপমহাদেশের প্রবাদপ্রতিম কণ্ঠশিল্পী লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া সেই বিখ্যাত গানটি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে:
‘ও দাদা ভাই, দাদা ভাই মূর্তি বানাও, নাক মুখ চোখ সবই বানাও; হাত বানাও পা-ও বানাও, বোন বানাতে পারো কি একটা ছোট বোন…’
চলচ্চিত্রে সুলতানার মিষ্টি উপস্থিতি এবং এই গানটির আবেদন আজও শ্রোতা-দর্শকদের নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত করে।

নায়িকা, সহ–অভিনেত্রী ও খলচরিত্রে সুলতানা
বলা হয়ে থাকে, চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্মাতাদের অবহেলার কারণে রূপ, গুণ ও গ্ল্যামার থাকা সত্ত্বেও সুলতানা কখনো নায়িকা হিসেবে বড় পরিসরে প্রতিষ্ঠা পাননি। তবে নায়িকা হিসেবে তাকে বেশ কিছু চলচ্চিত্রে দেখা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে উর্দু ‘চাঁদ আউর চাঁদনী’, বাংলায় ‘আঁকাবাঁকা’, ‘মিশরকুমারী’, ‘রাঙা বউ’ ও ‘সপ্তডিঙা’। তার নায়কদের মধ্যে ছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক। এসব চলচ্চিত্রের একাধিক নায়িকার সঙ্গে তাকে পর্দা ভাগাভাগি করতে হয়েছে।
অনেকে মনে করেন, নায়িকা হওয়ার সব গুণ থাকলেও অবহেলার শিকার হয়েছেন সুলতানা।
প্রধান নায়িকা হতে না পারলেও সুলতানা দমে যাননি। সত্তর ও আশির দশকে তিনি হয়ে ওঠেন কমার্শিয়াল ছবির অপরিহার্য মুখ। কখনো নায়িকার বান্ধবী, কখনো নায়ক বা নায়িকার ছোট বোন, কখনো ভাবীর চরিত্র, আবার কখনো খলনায়িকা—সব চরিত্রেই তিনি ছিলেন সমান সাবলীল। তখনকার তুমুল জনপ্রিয় রাজ্জাকের সঙ্গে তিনি প্রায় ৩০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। বাণিজ্যিক ছবির নির্মাতাদের কাছে সুলতানাকে ছাড়া যেন ছবি নির্মাণের কথা ভাবাই যেত না। দীর্ঘ চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে তিনি চার শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।
সাধারণত পজিটিভ চরিত্র দেখা গেল অল্প কিছু ছবিতে খলনায়িকায় ভূমিকাও ছিলেন সুলতানা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শাবানা অভিনীত ও রায়হান মুজিব পরিচালিত ‘কাজের বেটি রহিমা’। এছাড়া খান তার রহমান পরিচালিত ‘আবার তোরা মানুষ হ’ সিনেমার তার মৃত্যুর দৃশ্যটি এখন অনেকে দর্শক মনে রেখেছেন। সুলতানাকে সর্বশেষ দেখা গেছে দেড় দশক আগের ‘দিল তো পাগল’ ছবিতে। ওই সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা ছিলেন। দেশে বেড়াতে এসে নির্মাতাদের অনুরোধে ছোট্ট একটি চরিত্র অভিনয় করেন।
অবশ্য বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন সুলতানা, মাঝেমধ্যে বেড়াতে যান যুক্তরাষ্ট্রে। চার ছেলের মা এই অভিনেত্রী। তাদের নিয়ে তার এখনকার ব্যস্ততা।

উল্লেখযোগ্য ও ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র
সুলতানার অভিনয় সমৃদ্ধ ছবির তালিকাটি বেশ দীর্ঘ। তাঁর অভিনীত কিছু স্মরণীয় ও ব্যবসা সফল ছবি হলো: পিচ ঢালা পথ, ছদ্মবেশী, সন্তান, আঁকাবাঁকা, আবার তোরা মানুষ হ, নাচের পুতুল, কি যে করি, মাসুদ রানা, নয়ন মনি, যাদুর বাশী, নিশান, অনুভব, রাজকুমারী চন্দ্রবান, তৃষ্ণা, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, সুয়োরানী দুয়োরাণী, অগ্নিশিখা, বেহুলা, সেতু বন্ধন, ব্যথার দান, কুচ বরণ কন্যা, এতটুকু আশা, আবির্ভাব, সংসার, দুই ভাই, নীল আকাশের নিচে, বড় ভালো লোক ছিলেন, ইনসাফ, রঙিন সাত ভাই চম্পা, ভরসা, হিসাব চাই, অশান্তি প্রভৃতি।
পুরস্কার ও দর্শকদের চিরন্তন ভালোবাসা
চলচ্চিত্র জীবনে সুলতানা মর্যাদাপূর্ণ বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা মূলধারার নায়িকার তকমা হয়তো তার নামের পাশে সেঁটে দেওয়া হয়নি, কিন্তু সাধারণ দর্শকের অন্তরে তিনি যে আসনটি গেড়েছিলেন, তা অমলিন।






