প্রেমের তরে সইব বুকে লক্ষ কাঁটারও জ্বালা
দেওয়ান খসরু গীতিকার। প্রকৃতিতে বসে গান লিখতে সে ভালোবাসে। গান লেখার জন্য যেন তার অন্য কোনোদিকে আর মন থাকে না। দেওয়ানগঞ্জ যাবার সব আয়োজন পাকা। বন্ধু ভাবনা বলে-“দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি বেলা দ্বিপ্রহর”, খসরুর উত্তর-“সময় কোথায় বালিকা সময় নষ্ট করিবার।”

দেওয়ানগঞ্জে এসে গীতিকার খসরুর গান লেখা যেন সহজ হয়ে গেল। প্রকৃতিতে বসেই লাইনগুলো মাথায় আসছিলো আর লিখছিলো-“তুমি মোর জীবনের ভাবনা/হৃদয়ে সুখের দোলা/নিজেকে আমি ভুলতে পারি/তোমাকে যাবে না ভোলা।” হঠাৎ খসরু লক্ষ করে তার গানের পৃষ্ঠাগুলো কে যেন লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। খপ করে ধরে ফেলে হাত। সেই হাতটি ছিল খসরুর জীবনে আসা প্রেম দোলার।
খসরুর রাজসিক চেহারা একদিকে আর একদিকে দোলার সাধারণ গড়নের চিরায়ত রূপ, একদিকে বংশের গৌরব আরেকদিকে গৌরবহীনতা। প্রেম তো চিরকাল অসমই শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেছে, এখানেও তাই।
একদিন দোলাকে সাপে কাটে। লোকে বলাবলি করছিলো কি হয় কে জানে। খসরু সোজা চলে যায় অজ্ঞান দোলাকে বাঁচাতে। বিষ চুষে ফেলে দিলে দোলার জ্ঞান ফেরে আর সে বুঝতে পারে খসরুই তার বেঁচে থাকার কারণ, দোলা আর দেরি করে না তাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। উঠোন ভর্তি মানুষের লোকলজ্জা তাকে আটকাতে পারেনি, সমাজ-সংসারও না। কিন্তু সমাজের রক্তচক্ষু তো থাকেই তাই খসরুকে পাগল বানানোর আয়োজন পাকাপোক্ত করা হয়। দোলা তার প্রেমকে রক্ষা করতে পারে না তাই তো গানে গানে তাকে বলতে হয় তার ভালোবাসার অধিকার নেই কারণ তার প্রেমের আদালতে কোনো উকিল-বারিস্টার নেই।
দেওয়ান খসরুর পাগলামি বাড়তে থাকে। ওদিকে ভাবনাও কিছু বুঝে উঠতে পারে না কি থেকে কি হয়ে গেল। ছেলে পাগল এ দৃশ্য খসরুর বাবার জন্যও যেন লোকলজ্জা হয়ে উঠল।
তারপর খসরু দেখতে দেখতে পাগলের হাসপাতালে এলো একেবারে বদ্ধ পাগল হয়ে। সবার সাথে হাসতে হাসতে চলে সে। ভাগ্যের পরিহাসে ততদিনে দোলাও সেবিকা হয়ে আসে খসরুর। আড়াল থেকে খসরুর পাগলামি দেখতে দেখতে তার চোখে নদী বয়ে যায়।
তুমি আমার এমনই একজন
যারে এক জনমে ভালোবেসে ভরবে না এমন
এক জনমের ভালোবাসা
এক জনমের কাছে আসা
একটি চোখের পলক পড়তে লাগে যতক্ষণ..
এক গানে খসরু, ভাবনা ও দোলার ত্রিভুজ প্রেমের আবহে দর্শকের চোখজোড়াও ভিজে যায়।
তারপর আসে সেই চূড়ান্ত দিনটি। যে দিনে খসরু বুঝতে পারে তার হৃদয়ে সুখের দোলা কে। গানে গানে তার চেতনা আসতে থাকে কিন্তু বিধাতা তো অন্য কিছু চান। সমাজের রক্তচক্ষু সেখানে শেষ ছোবল মারতে হাজির হয়। বুলেট জোড়া আঘাতে আঘাতে শেষ করে খসরুকে তারপর দোলাকে। দুজনকে একই মৃত্যুশয্যায় দেখে ভাবনার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে মর্মস্পর্শী সেই কথা-“বলিসনি কেন হতভাগী, তুই খসরুর দোলা!” বললে কি আর দুজন এক মোহনায় মিশতে পারত?
গীতিকার খসরু গানে গানে বলেছিল-“প্রেমের তরে সইব বুকে লক্ষ কাঁটারও জ্বালা।” সে জ্বালা খসরুরূপী সালমান শাহ-র জাদুকরী অভিনয়ে দর্শকের বুকেও লক্ষ কাঁটার জ্বালা হয়ে আজও রয়ে গেছে।






