স্কুলে বাদ পড়া নামে সুপারস্টার, পরের প্রজন্মেও সালমান ভক্তের ভাটা পড়েনি
সিলেটের দাড়িাপাড়ার ঐতিহ্যবাহী নানাবাড়িতে ১৯৭১ সালের এক দিনে জন্ম নিয়েছিল একটি শিশু। আদর করে মা-বাবা তার নাম রেখেছিলেন চৌধুরী মোহাম্মদ সালমান শাহরিয়ার, আর ডাকনাম দিয়েছিল ইমন। কিন্তু শৈশবে স্কুলে ভর্তি হতে গিয়ে বাদ পড়ে গিয়েছিল তার নামের ‘সালমান’ অংশটি। কে জানত, স্কুলে খাতা থেকে মুছে দেওয়া সেই নামটিই একদিন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হয়ে ফুটবে? ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে রূপালি পর্দায় পদার্পণ করে রাতারাতি খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে যাওয়া সেই ইমনই আমাদের ঢালিউড রাজপুত্র সালমান শাহ।

চার বছরের এক সংক্ষিপ্ত এবং ধূমকেতুর মতো আলোকোজ্জ্বল ক্যারিয়ারে তিনি অভিনয় করেছিলেন ২৭টি চলচ্চিত্রে। নব্বইয়ের দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্রকে নতুন জীবন দেওয়া এই নায়কের প্রস্থান ঘটেছিল অকালেই। কিন্তু মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও তার জনপ্রিয়তায় সামান্যতম চির ধরেনি। তিনি আজও রয়ে গেছেন নতুন প্রজন্মের স্টাইল আইকন এবং দর্শকের হৃদয়ের রাজা হিসেবে।
স্কুলে বাদ পড়েছিল যে নাম
সালমান শাহের শৈশব শুরু হয়েছিল এক দূরন্ত পথচলার মধ্য দিয়ে। বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় ইমনের শৈশবেই তাদের পরিবারকে চলে যেতে হয় কুমিল্লায়। সেখানেই একটি স্কুলে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। কিন্তু বিপত্তি ঘটে ভর্তি ফরম পূরণের সময়। স্কুলের শিক্ষকেরা সাফ জানিয়ে দিলেন—শিশুর নাম অনেক লম্বা, এটা ছোট করতে হবে।
শিক্ষকদের কথামতো পরিবার বাধ্য হয়ে তার নাম থেকে ‘সালমান’ অংশটি বাদ দিয়ে দেয়। থেকে যায় ‘চৌধুরী মোহাম্মদ সালমান শাহরিয়ার’-এর বাকি অংশ। তখন ইমনের মা-বাবা কিংবা শিক্ষকেরা ঘূণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, যে নামটি তারা বাদ দিচ্ছেন, সেই নামেই একদিন কোটি কোটি মানুষ তাকে ভালোবাসবে ও চিনবে।
সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও শোবিজে হাতেখড়ি
ছোটবেলা থেকেই একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় বেড়ে উঠেছেন সালমান শাহ। তার পরিবারে শিল্পের চর্চা ছিল পুরোনো। তার নানা কামরুজ্জামান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর একজন অভিনেতা। অন্যদিকে তার মা নীলা চৌধুরী নিয়মিত রেডিও ও টেলিভিশনে গান গাইতেন।
মায়ের হাত ধরেই আশির দশকের শুরুতে টেলিভিশনের পর্দায় আবির্ভাব ঘটে পুচকে ইমনের। বিটিভির জনপ্রিয় একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে গান ও নাটকের মডেলে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি বিটিভির তালিকাভুক্ত শিল্পী হন এবং একাধিক একক ও ধারাবাহিক নাটকে চমৎকার অভিনয় দিয়ে নজর কাড়েন। কিছু জনপ্রিয় বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবেও তিনি দর্শকমনে জায়গা তৈরি করতে শুরু করেছিলেন।
‘ইমন’ থেকে যেভাবে হলেন ‘সালমান শাহ’
শোবিজে সালমান শাহর শুরুটা হয়েছিল শখের বশে। তবে তার মাঝে লুকানো প্রতিভা চিনে নিতে ভুল করেননি খ্যাতনামা চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির। তিনি সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ সিনেমায় সালমানকে সুযোগ দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৯৮৯ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় আলমগীর কবির মারা যান এবং চলচ্চিত্রটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
এর কিছুদিন পর, বলিউডের সাড়াজাগানো ছবি ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’-এর অফিশিয়াল বাংলা রিমেক তৈরির উদ্যোগ নেয় আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেড। ছবির নাম রাখা হয় ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান এক নতুন মুখের সন্ধানে ছিলেন। ১৯৯২ সালে তিনি সালমানকে নায়ক হিসেবে বেছে নেন।
কিন্তু এই সিনেমায় সালমানের নাম কী হবে, তা নিয়ে তৈরি হয় নতুন অধ্যায়। পরিচালক চান নাম বদলে ‘সালমান খান’ রাখতে। মা নীলা চৌধুরী তাতে আপত্তি জানান, কারণ বলিউডে ইতোমধ্যেই একজন সালমান খান ছিলেন। তিনি প্রস্তাব দেন ‘সালমান চৌধুরী’ রাখার, কিন্তু পরিচালক সোহান সেই প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না।
অবশেষে মায়ের মাথায় আসে এক অভিনব বুদ্ধি। তিনি ছিলেন ভারতীয় অভিনেতা নাসিরুদ্দীন শাহর অনুরাগী। আবার ইমনের আসল নাম ‘শাহরিয়ার’-এর মধ্যেও ‘শাহ’ শব্দটি ছিল। মায়ের ভালোবাসার অভিনেতা আর নিজের নামের শাহরিয়ার থেকে ‘শাহ’ ধার করে ‘রিয়ার’ বাদ দেওয়া হলো। এভাবেই জন্ম হলো ঢাকাই সিনেমার অমর নাম—সালমান শাহ।

ঢালিউড বক্স অফিসে ইতিহাস ও স্বপ্নের ক্যারিয়ার
১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে মুক্তি পায় ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। সিনেমাটি সিনেমা হলে মুক্তি পাওয়া মাত্রই তৈরি হয় এক অভাবনীয় উদ্দীপনা। তরুণদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিয়ে রাতারাতি সুপারস্টার বনে যান সালমান শাহ। তার অভিনয়, চোখের ভাষা, হাসির জাদু আর রোমান্টিক ভঙ্গি এক নিমেষে পুরো দেশকে বুঁদ করে ফেলে।
প্রথম সিনেমার অভূতপূর্ব সাফল্যের পর সালমানকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরের মাত্র চার বছরে তিনি একে একে অভিনয় করেছিলেন ২৭টি চলচ্চিত্রে। যার প্রায় প্রতিটিই ছিল সুপারহিট ও ব্যবসাসফল। ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘তুমি আমার’, ‘বুকের ভেতরে আগুন’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’—তার প্রতিটি সিনেমাই ছিল রাজকীয় সাফল্যের স্বাক্ষর।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে থাকা নক্ষত্র
সাধারণত অনেক তারকার আলো সময়ের সাথে সাথে ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু সালমান শাহর ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক উল্টোটা। ১৯৯৬ সালে এক রহস্যজনক ঘটনার মধ্য দিয়ে অকালে তিনি বিদায় নিলেও, তার স্থান রয়ে গেছে অটুট।
আজকের প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণী, যারা সালমানের মৃত্যুর অনেক পরে জন্মেছেন, তারাও তার অন্ধ ভক্ত। সালমান শাহকে ভালো লাগার কারণ হিসেবে তাদের মুখে বারবার শোনা যায় একই কথা—তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে দুই ধাপ এগিয়ে থাকা একজন আইকন।
- পোশাক ও ফ্যাশন সেন্স: মাথায় এক রঙা ব্যান্ডানা বাঁধা, কানে দুল, চশমার ডিজাইন বা পরনের জিন্স—নব্বই দশকেই সালমান যে আধুনিক ফ্যাশন চর্চা করেছেন, তা আজকেও তরুণদের জন্য অনুসরণীয়।
- সাবলীল অভিনয়: বাংলা সিনেমার প্রচলিত মেলোড্রামা বা নাটকীয় অভিনয়ের বাইরে গিয়ে সালমান হাজির করেছিলেন একেবারেই স্বাভাবিক, প্রাণবন্ত ও বাস্তবসম্মত এক অভিনয়ধারা।
চলচ্চিত্র গবেষক ও সমালোচকদের মতে, বাংলা চলচ্চিত্রে সালমান শাহর মতো আবেগ ও পাগলামি ভরা ভক্তশ্রেণি আর দ্বিতীয় কোনো নায়কের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। তার ফ্যাশন ও জীবনধারা দর্শকেরা আজও নিজেদের মধ্যে ধারণ করেন।
অমর ভালোবাসায় সিক্ত সমাধি
সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.)-এর দরগাহ সংলগ্ন কবরস্থানে শুয়ে আছেন সালমান শাহ। আজও সেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা আসেন শুধুই প্রিয় নায়ককে একনজর স্মরণ করতে ও তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করতে। শত শত মাইল দূর থেকে ছুটে আসা এই ভক্তদের ভালোবাসা প্রমাণ করে—সালমান কোনো ক্ষণস্থায়ী তারকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন ঢালিউডের এক চিরন্তন ধ্রুবতারা।
স্কুলের খাতা থেকে যে নাম মুছে ফেলা হয়েছিল, কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে সেই নাম স্থায়ীভাবে খোদাই হয়ে গেছে। আজ তিন দশক পরেও সালমান শাহ কেবল অতীত কোনো স্মৃতির নাম নয়, তিনি বর্তমানের ভালোবাসার প্রতীক ও ভবিষ্যতের অনুপ্রেরণা।






