Select Page

হলিউডের রাজত্ব বনাম দেশি সিনেমার খরা: মাল্টিপ্লেক্সে দর্শক ফেরাচ্ছে কারা?

হলিউডের রাজত্ব বনাম দেশি সিনেমার খরা: মাল্টিপ্লেক্সে দর্শক ফেরাচ্ছে কারা?

সাম্প্রতিক বক্স অফিস পরিসংখ্যান বাংলা সিনেমার বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং দর্শকের পছন্দের চরম বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছে। মাল্টিপ্লেক্সগুলোয় হলিউড ব্লকব্লাস্টার সিনেমাগুলোর টিকিটের জন্য হাহাকার থাকলেও, বেশ কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া দেশি সিনেমাগুলো সেই দর্শক আগ্রহ ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। বনলতা এক্সপ্রেস, তুফান বা বরবাদ এখন বাংলা কনটেন্টের শক্তি দেখিয়ে দিচ্ছে। সেদিক থেকে মাল্টিপ্লেক্সে দেশি সিনেমার সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ তোলা যায়।

বাংলা মুভি রিভিউ তথা বিএমআরের দেয়া তথ্য অনুসারে দেখা যাচ্ছে সিনেপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ হলিউড সিনেমা এনে ভালোই ব্যবসা করছে, যা দেশের গুটিকয়েক মাল্টিপ্লেক্সের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আবারো তুলে ধরেছে।


সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তি পাওয়া বিদেশি সিনেমাগুলোর ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুক্তির বহু দিন পরও মাল্টিপ্লেক্সে সেগুলোর টিকিট পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে:

  • স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে: মুক্তির ১৭তম দিনে অর্থাৎ ১৫ আগস্ট ৬২টি শোয়ের মধ্যে ২৬টি পুরোপুরি হাউজফুল এবং ৬টি প্রায় পূর্ণ ছিল (গড় অকুপেন্সি ৭৬%)। মাত্র ১৭ দিনে দেশের ই-টিকেটিং থিয়েটারগুলো থেকে ১০.৩৩ কোটি টাকা আয় করে এ বছরের দ্বিতীয় সিনেমা হিসেবে ১০ কোটির ক্লাবে প্রবেশ করেছে এটি।
  • দ্য অডিসি: মুক্তির ৩০তম দিনেও ১৬টি শোয়ের মধ্যে ৬টি হাউজফুল এবং গড় অকুপেন্সি ছিল ৬৩%। চার সপ্তাহে এর মোট মাল্টিপ্লেক্স গ্রস দাঁড়িয়েছে ৪.৯৩ কোটি টাকা।
  • মাইকেল: দীর্ঘ ১৩ সপ্তাহের প্রদর্শনী শেষে এই সিনেমাটি একাই আয় করে নিয়ে গেছে ৫.৬৩ কোটি টাকা।

এছাড়া ‘মোয়ানা’র মতো অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রগুলোও সন্তোষজনক ব্যবসা করেছে, যা প্রমাণ করে নির্দিষ্ট দর্শকমহল ইংরেজি সিনেমার জন্য প্রস্তুত।

আরে আয়ের ৯৫ শতাংশ এসেছে দেশের সবচেয়ে বড় মাল্টিপ্লেক্স চেইন স্টার সিনেপ্লেক্স থেকে। এখানে প্রতিদিন ৮০টির বেশি প্রদর্শনী হয়। কিন্তু দর্শক চাহিদা থাকায় খুব ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগ শো থাকে হলিউড সিনেমার দখলে।

ধারণস করা হচ্ছে শিগগিরই দেশের মাল্টিপ্লেক্স সর্বোচ্চ আয়ের সিনেমা হতে যাচ্ছে ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’। এর আগে বাংলাদেশের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ১৭ কোটি টাকারও বেশি টিকিট বিক্রি করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। তানিম নূর পরিচালিত এই সিনেমাটি প্রমাণ করেছে যে গল্প ও নির্মাণ ভালো হলে দেশি সিনেমা দেখার জন্য দর্শক প্রেক্ষাগৃহে বাঁধভাঙা ভিড় জমায়।

তবে সমস্যা হলো, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর মতো সাফল্য হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র। বিশেষ করে চলতি বছর অন্য কোন বাংলা ছবি উল্লেখযোগ্য ব্যবসা করতে পারেনি। বেশিরভাগ দেশি সিনেমাই স্টার সিনেপ্লেক্স বা অন্যান্য মাল্টিপ্লেক্সে কাঙ্ক্ষিত অকুপেন্সি ধরে রাখতে পারছে না। অথচ টিকিট বিক্রির ৯০ শতাংশের বেশি আয় আসছে স্টার সিনেপ্লেক্সের মতো আধুনিক থিয়েটারগুলো থেকে।
ব্যর্থতা নাকি কনটেন্টের ঘাটতি?

চলচ্চিত্রপ্রেমীদের দীর্ঘ অপেক্ষা সত্ত্বেও স্পাইডার-ম্যান বা দ্য অডিসির টিকিট না পাওয়া কিংবা বাংলা সিনেমার টিকে থাকতে না পারা—পুরো বিষয়টি মূলত নির্দেশ করে কনটেন্টের মানকে।

উপভোগ্য গল্পের অভাব: দর্শক হলে গিয়ে ভালো অভিজ্ঞতা চায়। আন্তর্জাতিক মানের ভিএফএক্স, টানটান প্লট এবং পেশাদার নির্মাণের কাছে দুর্বল গল্প বা নির্মাণ শৈলী টিকতে পারছে না।

প্রযুক্তি ও মার্কেটিংয়ের দুর্বলতা: হলিউড সিনেমাগুলোর প্রাক-প্রচারণা এবং ব্র্যান্ড ভ্যালু দর্শকের কাছে আগেই পৌঁছে যায়, যেখানে দেশি সিনেমাগুলো আধুনিক প্রচারণায় পিছিয়ে।

দর্শক চাহিদার পরিবর্তন: আধুনিক মাল্টিপ্লেক্সের দর্শকরা উন্নতমানের সিনেমা দেখতে অভ্যস্ত। তারা অর্থ ও সময় ব্যয় করে শুধুমাত্র দেশি ট্যাগ দেখে হলে যাবেন—এমন আশা করা ভুল।

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ যদি ১৭ কোটি টাকা ব্যবসা করতে পারে, তবে পথটা পরিষ্কার: “উপভোগ্য ও মানসম্মত ছবি হলে মানুষ আজও প্রেক্ষাগৃহে দৌড়ায়।” হলিউডের আধিপত্য বাংলা সিনেমার জন্য কোনো হুমকি নয়, বরং একটি বড় সতর্কবার্তা। দর্শক বিমুখতার দায়ভার সিনেমার বাজারের ওপর না চাপিয়ে, নিজেদের নির্মাণের মান উন্নত করাই এখন দেশি নির্মাতাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।


Leave a reply