ফারুক-প্রবীর মিত্র: উৎসমুখ এক হলেও বয়ে গেছেন দুই ধারায়
বাংলা বর্ণমালায় ‘প’-এর পরে আসে ‘ফ’। কিন্ত বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের ধারাপাতে প্রবীর ও ফারুক আসেন একসঙ্গে। দুজনেরই অভিষেক ‘জলছবি’-তে। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের উত্তাল দিনে মুক্তি পায় ছবিটি। এই অঞ্চলের সিনেমার দুই শক্ত খুঁটি আকবর পাঠান ফারুক ও প্রবীর মিত্রের জন্মদিনটিও এক—১৮ আগস্ট।
দুজনের উৎসমুখ এক হলেও দুজন বয়ে গেছেন দুই ধারায়। দুই তারকাই ক্যারিয়ার শুরু করেন ‘নায়ক’ হিসেবে। ফারুক ধীরে-ধীরে প্রথাগত অর্থে সুপারস্টার বনে গেলেও প্রবীর চরিত্রাভিনেতা হিসেবে অন্য স্তরে উঠে যান। তাকে ‘তারকা’ বলতে বাঁধলেও তিনি ছিলেন তারকার তারকা। কেননা, তথাকথিত তারকারা যখন ছবি টানতে ব্যর্থ হতেন, তখন নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে গল্পের ভেতর দর্শকদের ধরে রাখতেন প্রবীর মিত্র। তারকাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চিত্রনাট্যের দাবি পূরণে ব্যস্ত থাকতেন এই অভিনেতা।

অথচ তিনিও হতে পারতেন পোস্টার বয়। ‘পারতেন’ বললে ইতিহাসের বিকৃতি হয়। তিনি পেরেছিলেনও বটে। চলার বেগে তার গতিপথ বদলে গেলেও সূচনায় নায়িকার কোমর জড়িয়ে তাকেও দেখা গেছে রঙিন পোস্টারে। প্রেক্ষাগৃহের সামনে বিলবোর্ডে মস্ত ছবি ঝুলেছে তারও।
‘জলছবি’ তার করার কথা ছিল না। হুট করে এই ছবির পরিচালক এইচ কবিরের অনুরোধে প্রবীর এতে যুক্ত হোন। ছবিটির নায়ক মূলত রাজনীতির ময়দান থেকে চুপিসারে এফডিসিতে আসা ফারুক। ‘জীবনতৃষ্ণা’ ছবিতে এইচ কবির প্রবীরের চরিত্র বাড়িয়ে সমান্তরাল নায়কের চরিত্র করে দেন। ছবির প্রধান নায়ক রাজ্জাক।
‘জীবনতৃষ্ণা’ মুক্তির বছরই—১৯৭৩ সালে পূর্ণাঙ্গ নায়ক হন প্রবীর। বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ তাকে অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ফলে এইচ আকবরের ‘জালিয়াত’ ও ফখরুল হাসান বৈরাগীর ‘সেয়ানা’ ছবিতে শাবানা ও অলিভিয়ার নায়ক হওয়ার পরও সুপারস্টার তকমা প্রবীরের হাত থেকে ফসকে যায়।

অন্যদিকে ফারুক দ্রুতগতিতে প্রথম সারির নায়কের কাতারে চলে আসেন। ১৯৭৫ সালে খান আতাউর রহমানের ‘সুজনসখী’ ও ১৯৭৬ সালে আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমনি’ সুপারহিট হওয়ার পর অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন তিনি। বিশেষত প্রতিবাদী নায়কের চরিত্রে অভূতপূর্ব অবস্থান তৈরি হয় তার। বঞ্চিত বাঙালির প্রাণের নায়ক হয়ে ওঠেন ফারুক। সেলুলয়েডে শোষিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তার মুখটি জ্বলজ্বল করতে শুরু করে।
স্বাধীনতার পর হতবিহ্বল তারুণ্যের প্রতিনিধি হিসেবেও দেখা যায় ফারুককেই। খান আতার ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবিতে ফারুক উঠে আসেন কলিজার মতো ধরফর করতে থাকা জীবন থেকে। সেই একই ফারুক এ জে মিন্টুর ‘প্রতিজ্ঞা’ ছবিতে পথভ্রষ্ট হলেও অনেক বেশি গ্ল্যামারে পূর্ণ। এই ছবির পোস্টার বয় ফারুক, কিন্তু প্রকৃত নায়ক প্রবীর মিত্র। কেননা শুভ-অশুভের দ্বন্দ্বে ইতিবাচকতার ঝান্ডাটি থাকে প্রবীরের হাতে। ফারুকের ট্র্যাজিক সমাপ্তিও ‘প্রতিজ্ঞা’র তুমুল ব্যবসাকে ঠেকাতে পারেনি। এ জে মিন্টুর প্রথম দিককার প্রায় প্রত্যেকটি ছবিতে প্রবীর ‘গল্পের নায়ক’। ‘মিন্টু আমার নাম’-এ সোহেল রানা নাম ভূমিকায় থাকলেও পোস্টারে বিরাট আকারে দেখা যায় প্রবীরকে।
সেই সময় সিনেমার নায়ক ফারুক, রাজ্জাক, সোহেল রানা, ওয়াসীম, উজ্জ্বল—যে-ই থাকুন না কেন, ছবিকে আড়াই ঘণ্টা কাঁধে করে বইতেন প্রবীর। গোলাম মুস্তাফা, আনোয়ার হোসেন, এটিএম শামসুজ্জামান, রোজী, আনোয়ারা, প্রবীর—এই মুখগুলোকে ছাড়া তখন সিনেমার কথা ভাবা যেত না।
প্রবীর মিত্র তো ১৯৮৪ সালে ‘বড় ভাল লোক ছিল’ ছবির জন্য পার্শ্ব-অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও নায়ক হিসেবে ডাক পেয়েছেন। ‘রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবির নাম ভূমিকায় আর কাউকে ভাবা যায়নি।
অবাক করার মতো ঘটনা হচ্ছে, ফারুক তার প্রথম জাতীয় পুরস্কারটি পেয়েছেন পার্শ্ব-অভিনেতা ক্যাটাগরিতে। ১৯৭৫ সালে ‘লাঠিয়াল’ ছবির জন্য এই পুরস্কার তিনি পান। অথচ তিনি নায়ক হিসেবেই সিনেমা থেকে বিদায় নিয়েছেন। নায়কদের মধ্যে অনেকে শেষ জীবনে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে ব্যস্ত সময় কাটান। ফারুক নায়ক হিসেবে ব্যস্ত থাকতে থাকতেই অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ান।

প্রবীর ও ফারক দুজনেই কয়েক বছর আগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। কিন্তু তারা দুজনেই তাদের শ্রেষ্ঠ ছবিগুলোর জন্য পুরস্কার পাননি। ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সারেং বউ’, ‘কথা দিলাম’, ‘চিৎকার’, ‘সীমার’, ‘দিন যায় কথা থাকে’ ছবিতে ফারুকের অভিনয় দর্শকহৃদয়ে ছাপ রেখে গেছে, কিন্তু জুরিদের মনে দাগ কাটতে পারেনি।
আর প্রবীরের কোনটা রেখে কোনটার কথা বলব। প্রায় ৪০০ ছবিতে অভিনয় করেছেন এই গুণী শিল্পী। গোটা জীবন লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন শুনতে শুনতে কাটিয়েছেন। ফারুক ও প্রবীর মিত্র আসলেই বাংলা সিনেমার বন্ধু। এই আঙিনায় জলছবির মতো ফুটে আছেন। এই দুজনকে ছাড়া বাংলা ছবির কথা ভাবাই যায় না!






