Select Page

সোনালী অতীতের করুণ গোধূলি: ঢালিউডের কক্ষচ্যুত দুই নক্ষত্র

সোনালী অতীতের করুণ গোধূলি: ঢালিউডের কক্ষচ্যুত দুই নক্ষত্র

বেঁচে থাকলে চলতি মাসে অঞ্জনার ক্যারিয়ারের বয়স ৫০ বছর পূর্ণ হত। ১৯৭৬ সালের ৩০ জুলাই ‘দস্যু বনহুর’ ছবিতে প্রথম দর্শকহৃদয় হরণ করেন এই চিত্রনায়িকা। একই বছর আরেক চিত্রনায়িকা রোজিনাও পা রাখেন সিনেমায়। তার অভিনয়ের ৫০ বছর পূর্তি হল চলমান বছর। স্বাধীন বাংলাদেশের পায়ে-পায়ে বেড়ে উঠেছেন এই অভিনেত্রীরা। ধীরে-ধীরে দেশ সমৃদ্ধ ও উন্নত হয়েছে। তারাও সমান তালে জনপ্রিয় ও জনন্দিত হয়েছেন। চলচ্চিত্রের অগ্রযাত্রায় অগ্রণী সৈনিকের মতো মার্চ পোস্ট করে এগিয়ে গেছেন। কিন্তু আজ তারা কোথায় দাঁড়িয়ে?

মারা যাওয়ার আগে অঞ্জনাকে অনেক গঞ্জনা সইতে হয়েছে। তার চালচলনে ব্যক্তিত্বের অভাব ছিল। তার কথাবার্তায় ছিল অপরিণত মনস্কতার ছাপ। তার চলাফেরা ছিল না কিংবদন্তির মতো। তাকে দেখে লোকে আমোদিত হতো। তার সমালোচনায় হতো মুখর। তিনি উদ্ভট সাজপোশাকে হাজির হতেন বিভিন্ন ইভেন্টে। হাস্যকর বিজ্ঞাপনে তার উপস্থিতির লোকের হাস্যরসের কারণ হতো।

অথচ আশির দশকে অঞ্জনা ছিলেন প্রথম সারির নায়িকা। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। অভিনয় করেছেন ৫/৬টি দেশের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত কয়েকটি ছবিতে। নৃত্যশিল্পী হিসেবে দেশে তার খ্যাতি ছিল, নাচের জন্য ভ্রমণ করেছেন বহু দেশ। একগুচ্ছ সুপারহিট ছবির দাবিদার এই অভিনেত্রী। অঞ্জনার স্বর্ণখচিত শিল্পীজীবন কেন শেষ বেলায় কৌতুকের শিকার হল? কোন রাহুর গ্রাসে এমন নক্ষত্রপতন?

সম্প্রতি শিল্পী সমিতির নির্বাচনে দাঁড়িয়ে গো-হারা হেরেছেন রোজিনা। পরাজিত হয়ে তিনি আচলে মুখ ঢাকেননি। একগাদা অভিযোগ তুলে মিডিয়ার মনোরঞ্জন করেছেন। জুনিয়র নায়কের দিকে আঙ্গুল তুলেছেন। নিজেকে প্রতারিত হিসেবে তুলে ধরেছেন। মৃত্যুর পর তার লাশটি যেন আঁতুড়ঘর এফডিসিতে না আনা হয়—এমন অনুরোধও উচ্চারিত হয়েছে মিঠুন চক্রবর্তীর নায়িকার মুখে। সেলুলয়েডের সুপারস্টারের এমন অসহায়ত্বে বুক ভেঙে গেছে ভক্তদের। যার ছবির টিকেট বেচে প্রযোজকরা কোটি-কোটি টাকা কামিয়েছেন, যার ছবি দেখতে ছবিঘরে দর্শক ভেঙে পড়েছে, পুরস্কারে-পুরস্কারে যাকে অলঙ্কৃত করেছে রাষ্ট্র—তার এমন করুণ পরিণতি? কিন্তু কেন?

এর রহস্যমোচন শুরু করতে হবে সত্তর দশক থেকে…। অঞ্জনা-রোজিনারা যখন আত্মপ্রকাশ করেন, তখন সিনেমার সৌরজগতে নক্ষত্র ছিলেন মূলত নির্মাতারা। তারাই ইন্ডাস্ট্রির কলকাঠি নাড়তেন। তারকাদের জন্ম দিতেন। তাদের কোষ্ঠী নির্ধারণ করতেন। তারকাদের কক্ষপথ নির্দেশ করতেন নির্মাতারাই। যে তারকা যে নির্মাতাগোষ্ঠীর হাত ধরে আবির্ভূত হতেন, তার অভিভাবকত্ব থাকত সে নির্মাতাগোষ্ঠার হাতেই।

রোজিনা পথ চলতেন এফ কবির চৌধুরী, ফখরুল হাসান বৈরাগী, আজিজুর রহমান, দীলিপ সোমদের ইশারায়। তার অর্থনৈতিক ভিত্তির নেপথ্যে ছিল মাসুদ কথাচিত্র, জুপিটার ফিল্মস, আলমগীর পিকচার্সের মতো বাঘা-বাঘা সব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। সৃজনশীল ও প্রভাবশালী কয়েকজন মানুষের ছত্রছায়ায় বড় হয়েছেন রোজিনা। তিনি একজন জুনিয়র শিল্পী থেকে লেডি সুপারস্টার হয়েছেন। তিনি যে বখে যাননি, বিপথে যাননি—তার কৃতিত্ব এই প্রযোজক-পরিচালকদের।

অঞ্জনার বিকাশও একই রাস্তায়। দিলীপ বিশ্বাস, মাসুদ পারভেজ, রাজ্জাক, আজিজুর রহমান, শেখ নজরুলের নির্দেশিত পথেই তার তারকাখ্যাতি লাভ। তিনি কী বলবেন, তিনি কী পরবেন, তিনি কার সঙ্গে চলবেন—এই বিষয়গুলো ঠিক করে দিতেন আজিজুর রহমান বুলি, অশোক ঘোষ, আহমদ জামান চৌধুরীর মতো প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা। তারা অঞ্জনার জন্য চরিত্র সৃষ্টি করতেন। তার ওপরে পুঁজি ঢালতেন। তার ভেতর থেকে অভিনয় বের করে নিয়ে আসতেন। ফলে প্রেসের কাছে তিনি কোন ব্যাপারে মুখ খুলবেন আর কোন ব্যাপারে মুখে কুলুপ আটবেন—তার সিদ্ধান্ত এই সৃষ্টিশীল মানুষরাই নিতেন।

এই দেশের চলচ্চিত্র শিল্প প্রতিষ্ঠার আগেই স্টুডিও সিস্টেম বন্ধ হয়ে যায়। তারকারা আর সিনেমার প্রাথমিক যুগের মতো স্টুডিওর বেতনভুক্ত কর্মচারি থাকেননি। তবুও তারকাদের পৃষ্ঠপোষকতার রীতি হারিয়ে যায়নি তখনও। নির্বাক যুগে স্টুডিওগুলো যেভাবে তারকাদের পাঠশালার ভূমিকা পালন করেছে, সেভাবেই স্টুডিওপ্রথা বিলুপ্তির পরও প্রযোজক-পরিচালকরা তারকা তৈরির কাজটি করে গেছেন।

স্বাধীনতার আগে জহির রায়হান ও তার সমমনারা গঠন করেছিলেন সিনে ওয়ার্কশপ গোষ্ঠী। স্বাধীনতার পরও এই রকম অনেকগুলো শিল্পীগোষ্ঠীকে সক্রিয় দেখা গেছে। তবে এগুলো ছিল অঘোষিত। পরিচালক, তারকা, চিত্রনাট্যকার, সুরকার, সম্পাদকসহ সমচিন্তার টেকনিশিয়ানরা মিলে অদৃশ্য শিবির বানাতেন। শিবিরে-শিবিরে দ্বন্দ্ব নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এগুলোতে নায়িকারা নিরাপত্তার আচ্ছাদনে থাকার অনুভূতি পেতেন। অশিল্পীসুলভ আচরণ থেকে নায়িকাদের বিরত রাখতে অভিভাবকের কাজ করত এই ক্যাম্পগুলো।

রোজিনা-অঞ্জনা কেন, সব নায়িকার বেলায়ই এ-কথা খাটে। আর কেবল নির্মাতারা নন, নায়করাও নায়িকাদের হাত ধরে পথ চিনিয়ে নিয়ে গেছেন। রাজ্জাক, সোহেল রানা, উজ্জ্বল, আলমগীর, জসীম, ফারুক একটা পর্যায়ে ডাকসাইটে তারকা বনে যান। প্রযোজক হিসেবেও তারা প্রতিপত্তির অধিকারী হন। সেই সময় তারা নায়িকাদের গাইড করেছেন, গার্ডিয়ানের ভূমিকা পালন করেছেন। নায়িকারা যখন শীর্ষ নায়কের কিংবা শীর্ষ প্রযোজকের ঘরণী হয়েছেন, তখন ঘর থেকেও তারা দিকনির্দেশনা পেয়েছেন।

রোজিনার মাথায় ছাতার মতো ছিলেন তার স্বামী প্রযোজক ফজলুর রশিদ ঢালী। স্বামী ও প্রযোজক আজিজুর রহমান বুলির হাতটি মাথায় ছিল বলে পথচলা সহজ হয়েছে অঞ্জনার। নূতন মাইলেজ পেয়েছেন তার স্বামী রুহুল আমিন বাবুল প্রযোজক হওয়ায়। সুচরিতা স্বামী কাম প্রযোজক জসীমের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন। সুচন্দার ক্ষেত্রে বর জহির রায়হানের যে ভূমিকা, একই ভূমিকা শাবানার জন্য বর ওয়াহিদ সাদিকের। কাজী জহির আর চিত্রা জহির—স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের পরিপূরক। অলিভিয়া নামক কবিতাটির কবি তার বর এসএম শফি!

ঢালিউড বরাবর শাসন করেছেন পরিচালকরা। নায়িকারা পরিচালকদের হাতের পুতুল ছিলেন মাত্র। এই সমর্পণ নায়িকাদের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত। কেননা এই দেশে কোনো ফিল্ম ইন্সটিটিউট ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই অভিনয় গুরুমুখী বিদ্যায় পরিণত হয়েছিল। সুভাষ দত্তের কাছেই অভিনয়ের পাঠ নিয়েছেন কবরী, সুচন্দা, ববিতার মতো কিংবদন্তি নায়িকারা। এহতেশামের ছাত্রী শবনম, শাবানার মতো পুরো পাকিস্তানকাঁপানো নায়িকারা। তারা খান আতার কাছে শেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতেন। আমজাদ হোসেন আর চাষী নজরুল বলতে তারা ছিলেন অজ্ঞান!

আর পরিচালকরাও নায়িকাদের হাত কখনও ছাড়তেন না। এই গ্ল্যামারের দুনিয়া অত্যন্ত পিচ্ছিল। এখানে পথ হড়কাতে খুব বেশি সময় লাগে না। যারাই একলা পথ চলতে চেয়েছেন, স্বেচ্ছাচারিতা করেছেন, তারাই কালের গভীরে হারিয়ে গেছেন। টিকতে পেরেছেন তারাই, যারা নির্মাতাদের আশীর্বাদ পেয়েছেন। ওস্তাদের দরদ ও দোয়াই নায়িকাদের আপন দীপ্তিতে জ্বলে উঠতে পথ দেখিয়েছে। যখনই নায়িকাদের পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তখনই নির্মাতারা দিশা দেখিয়েছেন। তাদের নির্দেশনায় ছিলেন বলেই তারকারা কখনো কক্ষচ্যুত ও পথভ্রষ্ট হননি।

আমাদের নায়িকাদের মধ্যে খুব সামান্যই শিক্ষিত ছিলেন। সিংহভাগ পড়াশোনার পাঠ চুকানোর আগে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে গেছেন। তাদেরকে রঙিন দুনিয়ার দীক্ষা দিয়েছেন নির্মাতারা। তাদেরকে নিজেদের ছত্রছায়ায় রেখেছেন। কখনোই ছাত্রীদের হাত ছেড়ে দেননি নির্মাতারা। তাদেরকে বেফাঁস কথা বলে কাগজ গরম করতে দেননি। উদ্ভট কাণ্ড করে ইমেজের বারোটা বাজাতে দেননি। আজগুবি সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্যারিয়ারের সর্বনাশ করতে দেননি। নায়িকাদের প্রতিটি পদক্ষেপে নির্মাতারা লক্ষ্য রেখেছেন, তাদেরকে লক্ষ্যচ্যুত হতে দেননি।

আজ সালাহউদ্দিন, মোস্তাফিজ, আলমগীর কুমকুম, শফি বিক্রমপুরী—কেউ নেই। কোনো নায়িকা ৭০-৮০ বছর বয়সে টিকটক করলে কে তাদেরকে ধমক দিয়ে ঠেকাবেন? কিম্ভুতকিমাকার বেশে পাবলিক প্ল্যাটফর্মে এলে কারা তাদেরকে স্নেহের সুরে বোঝাবেন? বয়স ভুলে, ব্যক্তিত্ব ভুলে কাণ্ডকীর্তি করলে ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থে কারা তাদেরকে শাসন করবেন? নায়িকাদের সেই অভিভাবকরা আর নেই। তাই কিংবদন্তি হলেও কোনো-কোনো নায়িকার মধ্যে দেখা যায় বুদ্ধিদীপ্ত আচরণের অভাব। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চতা হতাশ করার মতো।

মৃত্যুর আগে অঞ্জনাকে মনে হয়েছে নির্ধারিত কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত। তিনি নতুনদের জন্য ধ্রুবতারা হতে পারেননি। পর্দায় তার পারফর্মেন্স প্রশ্নাতীত। বক্স অফিসে তার দখল ষোলো আনা। শিল্পী হিসেবে তার পদচিহৃ জ্বলজ্বলে। কিন্তু শেষ বয়সে তিনি ছিলেন লক্ষ্যহীন। একইভাবে ক্যারিয়ারে হাফ সেঞ্চুরিয়ান রোজিনা চলচ্চিত্র সংগঠনে গিয়ে মার খাচ্ছেন। শক্তিমান অভিনেত্রী এখন করুণার পাত্রী। নতুনদের জন্য তিনি বাতিঘর হতে পারেননি। সত্তর বছর বয়সী চাঁদের মতো উজ্জ্বল ঢালিউডের গায়ে এ যেন একটুকরো দাগ।


About The Author

মাহফুজুর রহমান

চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক

Leave a reply

সাম্প্রতিক খবরাখবর