Select Page

বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি, নাকি অতিরিক্ত আবেগ— কেন আলোচনায় ছিল ‘এটা আমাদেরই গল্প’

বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি, নাকি অতিরিক্ত আবেগ— কেন আলোচনায় ছিল ‘এটা আমাদেরই গল্প’

ইউটিউবভিত্তিক বাংলা নাটকে গত কয়েক মাসে সবচেয়ে বেশি আলোচিত কাজগুলোর অন্যতম ছিল এটা আমাদেরই গল্প। যদিও এটি টিভি চ্যানেলেও প্রচার হয়েছে, দর্শক আলোচনায় সেটির চেয়ে ইউটিউব উপস্থিতিই বেশি জায়গা দখল করে নেয়। পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ নির্মিত ধারাবাহিকটি শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা তৈরি করে। দর্শকদের একাংশ একে ‘অনেক দিন পর পরিবারের সবাই মিলে দেখা যায় এমন সিরিজ’ বলেছেন, আবার শেষ পর্বের পর একই দর্শকদের অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন।

সংবাদমাধ্যম, ইউটিউব রিভিউ ও ফেসবুকভিত্তিক দর্শক প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিরিজটির জনপ্রিয়তার পেছনে যেমন কিছু নির্দিষ্ট কারণ ছিল, তেমনি শেষ পর্ব নিয়ে অসন্তোষের কারণও ছিল স্পষ্ট।

পাকিস্তানি গল্পের ছায়া, কিন্তু স্থানীয় আবেগ

সিরিজটি নিয়ে আলোচনার আরেকটি বড় বিষয় ছিল; এটি পাকিস্তানি জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘কাভি ম্যায় কাভি তুম’ থেকে অনুপ্রাণিত কি-না। হ্যাঁ, নাম স্বীকার না করেই অনুপ্রেরণার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছিলেন নির্মাতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক দর্শক দুই সিরিজের সম্পর্ক, চরিত্রের আবেগ ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের মিল নিয়ে আলোচনা করেছেন।

যদিও নির্মাতা সরাসরি ‘রিমেক’ শব্দটি ব্যবহার করেননি, দর্শকদের বড় একটি অংশ মনে করেছে, পাকিস্তানি ধারাবাহিকটির আবহ ও সম্পর্কনির্ভর গল্প বলার ধরন থেকে প্রভাব স্পষ্ট। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের আবেগ, দাম্পত্য টানাপোড়েন এবং সম্পর্কের ধীরে ধীরে বদলে যাওয়ার বিষয়গুলোতে মিল খুঁজে পেয়েছেন অনেকে।

তবে দর্শকদের আরেক অংশের মত ছিল, গল্পের অনুপ্রেরণা থাকলেও ‘এটা আমাদেরই গল্প’ পুরোপুরি বাংলাদেশি বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে গেছে। সংলাপ, পারিবারিক আচরণ, শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের উপস্থাপন এবং স্থানীয় সংস্কৃতির কারণে সিরিজটি আলাদা পরিচয় তৈরি করতে পেরেছে।

পরিবারকেন্দ্রিক গল্পের ফিরে আসা

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও বিশেষ করে প্রযোজনা সংস্থার প্রচার উপকরণে সিরিজটিকে ‘পরিবারভিত্তিক গল্পের হারানো সুদিন ফিরিয়ে আনা’ কাজ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

একসময় বাংলাদেশি টিভি নাটকে যৌথ পরিবার, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ভাই-বোন বা বন্ধুদের আবেগী সম্পর্ক খুব পরিচিত বিষয় ছিল। কিন্তু পরে ওয়েব কনটেন্টে থ্রিলার, অপরাধ আর ডার্ক কনটেন্টের ভিড়ে সেই জায়গা অনেকটাই কমে যায়। এ সিরিজে অনেকদিন পর নায়ক-নায়িকার পর পার্শ্বচরিত্রগুলোও বড় পরিসরে এসেছে; যা দর্শক সাদরে গ্রহণ করেছেন।

বলা যায়, ‘এটা আমাদেরই গল্প’ সেই পুরোনো আবেগকে নতুন প্রজন্মের ভাষায় ফিরিয়ে আনে। দর্শকেরা নিজেদের পরিবার, প্রেম, বন্ধুত্ব, অভিমান আর বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গল্পকে মিলিয়ে নিতে পেরেছেন।

এটা আমাদেরই গল্প মনে হওয়ার কারণ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি যে মন্তব্যগুলো দেখা গেছে, তার মধ্যে একটি ছিল—‘চরিত্রগুলো খুব চেনা লাগে।’

সিরিজের চরিত্ররা অতিরিক্ত নায়কোচিত নয়। তারা ভুল করে, সম্পর্ক নষ্ট করে, আবার মিলেও যায়। সংলাপেও ছিল অনেকটা বাস্তব জীবনের স্বাভাবিকতা। ফলে দর্শকের মনে হয়েছে, এটা দূরের কোনো গল্প নয়; বরং ‘আমাদের আশপাশের মানুষের গল্প’।

যারা অভিনয়ে দর্শকের মন জয় করেন

সিরিজটির জনপ্রিয়তায় অভিনয়শিল্পীদের অবদানও বড়। বিশেষ করে খায়রুল বাসার এবং কেয়া পায়েল জুটির রসায়ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা পায়। এছাড়া ইরফান সাজ্জাদ নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে তার দীর্ঘ অভিনয় জীবনে অন্তত এক দশক তো বটেই; সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত ও স্মরণীয় হয়েছেন। নজর কেড়েছেন সুনেরাহ বিনতে কামাল। তবে বর্ষীয়ান অভিনেতা নাদের চৌধুরী, মনিরা মিঠু, দীপা খন্দকার ও ইন্তেখাব দিনার নিজ নিজ চরিত্রের গুরুত্ব পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে পারিবারিক দৃশ্যগুলোতে অভিনেতাদের স্বাভাবিক অভিনয় এবং সংলাপ বলার ধরনকে দর্শকেরা সিরিজটির বড় শক্তি হিসেবে দেখেছেন।

ইউটিউবভিত্তিক ধারাবাহিক হিসেবে আলাদা সাফল্য

সিরিজটি নিয়মিতভাবে ইউটিউবে মুক্তি পেয়েছে এবং ধীরে ধীরে ‘প্রতীক্ষিত কনটেন্টে’ পরিণত হয়। প্রতি সপ্তাহে নতুন পর্ব আসার আগে দর্শকদের মধ্যে আলোচনা চলত কী কী হতে যাচ্ছে। এ আলোচনার পুরোটাই গল্পনির্ভর। কারণ ইউটিউব কনটেন্ট নিয়ে যে নেতিবাচকতা শোনা যায়, তার রেশ ছিল না সিরিজে।

আর নির্মাণশৈলীতেও ছিল পরিচিত শহুরে আবহ, ধীরগতির আবেগী দৃশ্য এবং গাননির্ভর আবহসঙ্গীত। ফলে সিরিজটি তরুণ দর্শকের পাশাপাশি পরিবারভিত্তিক দর্শকদের কাছে পরিবার নিয়ে একসঙ্গে দেখার সিরিজে পরিণত হয়।

শেষ পর্বকে ঘিরে বিশাল প্রত্যাশা

সিরিজটির জনপ্রিয়তার কারণে শেষ পর্ব নিয়েও আগ্রহ ছিল ব্যাপক। শেষ পর্বটি সাধারণ পর্বের চেয়ে অনেক বড় আকারে মুক্তি পায়, যেটিকে ‘মেগা এপিসোড’ হিসেবেও প্রচার করা হয়েছিল।

এই ঘোষণার পর দর্শকদের প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায়। অনেকে ভেবেছিলেন, দীর্ঘ সময় নিয়ে সব চরিত্রের গল্প সুন্দরভাবে গুছিয়ে শেষ করা হবে।

তাহলে শেষ পর্ব নিয়ে আপত্তি কেন?

শেষ পর্ব প্রকাশের পর ফেসবুক, ইউটিউব কমেন্ট ও বিভিন্ন আলোচনা গ্রুপে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগগুলো দেখা গেছে, সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি ছিল প্রায় একই ধরনের।

অনেক দর্শকের মতে, পুরো সিরিজ ধীরগতিতে সম্পর্ক তৈরি করলেও শেষ পর্বে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত খুব দ্রুত দেখানো হয়েছে।

বিশেষ করে কিছু চরিত্রের সম্পর্কের পরিণতি দর্শকদের কাছে যথেষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া এগিয়ে গেছে বলে মনে হয়েছে। ফলে আবেগের যে প্রস্তুতি তৈরি হয়েছিল, শেষটা তার সমান ওজন পায়নি।

দীর্ঘ সিরিজজুড়ে দর্শক চরিত্রগুলোর সঙ্গে আবেগ বিনিময় করেছিল। কিন্তু শেষ পর্বে কিছু সম্পর্ক খোলা রেখেই গল্প শেষ হয়—যেটা একদল দর্শকের কাছে বাস্তবসম্মত লাগলেও আরেকদল এটাকে ‘অসম্পূর্ণ’ বলেছেন। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই লিখেছেন, ‘শেষটা দেখে মনে হয়েছে আরও একটা পর্ব দরকার ছিল’।

আরেকটি বড় বিতর্ক ছিল আবেগের মাত্রা নিয়ে। দর্শকদের একাংশ মনে করেছেন, সিরিজটি বাস্তব সম্পর্কের গল্প বললেও শেষ দিকে আবেগকে অতিরিক্ত টেনে নেওয়া হয়েছে।

আবার অন্যরা বলেছেন, জীবনের সব গল্প নিখুঁতভাবে শেষ হয় না—সিরিজ সেটাই দেখিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল এটা আমাদেরই গল্প?

অনলাইন নাটকের ভিড়ে ‘এটা আমাদেরই গল্প’ আলাদা হয়ে উঠেছে মূলত তার আবেগ, সম্পর্কের পরিচিত বাস্তবতা এবং ধারাবাহিক দর্শক-সংযোগের কারণে। বিদেশি ধারাবাহিকের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সিরিজটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশি দর্শকের নিজস্ব অভিজ্ঞতার জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছে। এটি হয়তো নিখুঁত সিরিজ নয়। শেষ পর্ব নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট—এই সিরিজ মানুষকে চরিত্রগুলোর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলতে পেরেছিল।

[লেখাটি সংবাদ ও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত মন্তব্যের সংকলন। কোনো আনুষ্ঠানিক রিভিউ নয়।]


Leave a reply