Select Page

‘রইদ’-এর দুটি দৃশ্যের মিনিং ও সাদুর বউয়ের নাম

‘রইদ’-এর দুটি দৃশ্যের মিনিং ও সাদুর বউয়ের নাম

রইদ সিনেমার রিভিউ লেখার ক্ষমতা আমার নাই। সিনেমাটা দেখে আমার মনে হয়েছে নির্মাতা একটা দৃশ্যও অনর্থক তৈরি করেন নাই। তবে বেশিরভাগ দৃশ্যের অর্থ ধরার ক্ষমতা আমাদের নাই কিংবা আমাদের হাতে পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা আমাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে যেভাবে ব্যাখ্যা করব সিনেমাটা সেরকমই।

আমি কেবল দুইটা দৃশ্য নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছি। দুইটা দৃশ্যের মিনিং বের করতে পেরেছি। অবশ্য আমার বের করা মিনিংয়ের সাথে নির্মাতার মিনিং নাও মিলতে পারে। তবুও ব্যাখ্যা করছি, একান্ত আমার মতো করে।

রইদে সাদুর বউ সাদুর ঘরে আসার সময় কুলছুম নামের একটা ছাগল নিয়ে আসে। সাদুর বউয়ের কোনো নাম নেই কিন্তু ছাগলের নাম আছে। কুলছুম। কুলছুম মূলত সাদুর বউয়েরই নাম।

আমরা একটা পর্যায় দেখি সাদুর বউ হারিয়ে যাওয়ার পর সাদু অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যায়। একটা পর্যায় ছাগল মারা গেলে সাদু সেই ছাগলের মাংস রান্না করে পুরো মাংসটা খেয়ে ফেলে। সিনেমা হলে বসে অনেক দর্শক বুঝতে পারেন নাই মৃত ছাগলের মাংস কেন রান্না করে খেল সাদু।

আমি যেই শোটা দেখেছিলাম সেটা ছিল স্পেশাল শো। সাংবাদিক ও সংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল সেই শোয়ের। অথচ সাংবাদিক ও সংস্কৃতিক বেশিরভাগ মানুষ ভেবেছেন, পাগল হয়ে সাদু ছাগলের মাংস খেয়েছে।

আজ সকালে হঠাৎ করে কুলছুমের মাংস খাওয়ার একটা অর্থ মাথায় এলো। সেটাই লিখছি।

বউয়ের প্রিয় ছাগলের মাংস রান্না করে খাওয়া সাধারণ কোনো দৃশ্য না। এর পেছনে আছে গভীর তাৎপর্য।

আমরা যদি মাংস খাই, আমাদের শরীরে কী ঘটে? খালি চোখে দেখলে, মাংসের একটা অংশ হজম হয়ে যায়। আরেকটা অংশ বের হয়ে যায়। পরের বেলায় আবার আমাদের খেতে হয় ভেবে আমরা ভাবি যা খাইছি বের হয়ে গেছে। আসলেই কি সব বের হয়ে যায়?

আমরা মাংস খেলে একটা অংশ হজম হয়ে বের হয়ে যায় এটা সত্য। কিন্তু যে অংশটা বের হয়ে যায় সেটা খুবই অল্প। মাংসের বেশিরভাগ অংশ আমাদের পেশি গঠন, শারীরিক শক্তির যোগান, রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরি, মস্তিষ্কের সেল তৈরি, হাড় ও দাঁত মজবুত এবং হাড়ের জয়েন্টকে শক্তিশালী করে।

তারমানে মাংসের পুষ্টি উপাদানগুলো আমাদের শরীরে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়। আমরা যতদিন বাঁচব ততদিনই হয়তো এই পুষ্টি উপাদানগুলো আমাদের শরীরে থেকে যাবে।

সাদু চায় বউটা তার কাছে ফিরে আসুক। থেকে যাক। সে কুলছুমের স্মৃতি ধরে রাখতে চায়। কুলছুমের অস্তিত্ব নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে চায়।

এই চাওয়া থেকে পাগলীর প্রিয় ছাগল যার নাম কিনা পাগলীর নামে, কুলছুমের মাংস খায়। পুতে রাখতে পারত। বিলে ফেলে দিতে পারত। কিন্তু এতে পচে গিয়ে কুলছুম মাটিতে, পানিতে মিশে যেত। সাদুর সাথে আর মিশে থাকত না। নিজের অস্তিত্বে ধারণ করার জন্য পাগলীর সফরসঙ্গী কুলছুমের মাংস রান্না করে খেয়ে তাকে মস্তিষ্কে, হাড়ে, দাঁতে, পেশিতে এবং স্মৃতিতে ধারণ করে সাদু। সাদুর প্রতিটা নিঃশ্বাসে কুলছুম থেকে যায়। যতদিন সে বাঁচবে, কুলছুমকে সাথে নিয়ে বাঁচবে।

আমরা যাকে ভালোবাসি, সে চলে গেলে আমরা তাকে স্মৃতিতে রাখি। সাদু রাখল কোষে কোষে। নিউরনে।

দ্বিতীয় যে দৃশ্য নিয়ে আলোচনা করবে সেটা একেবারে শেষে দেখানো হয়। সাদু পাগলীকে পাগলের মতো খুঁজছে। কোথাও পাচ্ছে না। খুঁজতে খুঁজতে সে আখ খেতের দিকে আগাতে থাকে। আখ খেতের ভেতরেই তাল গাছ। একটা তাল পড়ে। সাদু গিয়ে তালটা নেয়। এরপর একের পর এক তাল পড়তেই থাকে। তাল পড়তে পড়তে সাদু তালের সাগরে ঢেকে যায়। তালের ওপর উঠে যায়। ক্লান্ত সাদু তালের ওপর গা এলিয়ে দেয়। তখন দেখা যায় অন্য প্রান্ত থেকে আরেকটা তাল বাড়িয়ে দিচ্ছে। হাতটা পাগলীর।

এই দৃশ্যের ব্যাখ্যা ধরতে পারি সিনেমা হল থেকে বের হওয়ার ১০ মিনিট পর। 

সিনেমায় দুইবার সাদু তার বউকে রেখে আসে। দুইবার সে ফিরে আসে। আর দুইবার ফিরে আসে ঠিক তখন যখন সাদু তাল পড়ার শব্দ পেয়ে গাছের নিচে গিয়ে তালটা কুড়িয়ে আনে তখন।

শেষবার যখন সাদু বউ হারিয়ে যায়, তাকে হন্য হয়ে খুঁজতে থাকে সাদু। খুঁজতে খুঁজতে আখ খেতের ভেতর গিয়ে তাল পড়ার শব্দ পায়। সে এগিয়ে গিয়ে তালটা কুড়িয়ে আনে। এরপর তাল পড়তে থাকে। পড়তেই থাকে। বৃষ্টির মতো তাল পড়ে। তালের পালা হয়ে যায়।

আসলে ওই সময় একটা তালও পড়েনি। তাল পড়া ও তা কুড়ানোটা সাদুর মনোজগতে সৃষ্ট একটা দৃশ্য। যেহেতু প্রতিবার তাল পড়ার পর সাদু তার বউকে খুঁজে পায়, সেহেতু ওই সময় সাদু চায় তাল পড়ুক। তার মন জানে, তাল পড়লেই পাগলী ফিরে আসবে।

তার মনে ইলিউশন সৃষ্টি হয়। প্রতিটি তাল পড়া মূলত সাদুর একবার করে চাওয়া। একটা করে উইশ। পাগলীর ফিরে আসার প্রার্থনা। শেষে এসে পাগল সাদু এত বেশি করে প্রার্থনা করতে থাকে, এত বেশি করে ফিরে আনতে চায় যে তার মাথায় কেবল পাগলীকে ফিরিয়ে আনার প্রার্থনাই ঘুরতে থাকে। প্রতিটি চাওয়া, প্রাতিটি প্রার্থনা একটা করে তাল। এক সময় সাদুর মাথায় পাগলীর ফিরে আসার প্রার্থনা বৃষ্টির মতো ঝড়তে থাকে। তার মাথায় আর কোনো চিন্তা তৈরি হয় না। কেবল ‘পাগলী ফিরে আসুক’ এই একটা চিন্তাই, একটা প্রত্যাশাই, একটা প্রার্থনাই তার মস্তিষ্ক তৈরি করতে থাকে।

পাগলীকে নিয়ে চিন্তার আবেশ তৈরি করে সাদু। যেই আবেশে আর কারো উপস্থিতি নেই। আর কেউ বুঝতেও পারে না। সেই আবেশে একটাই চাওয়া, পাগলী ফিরে আসুক। 

সিনেমার শেষ দৃশ্যে সে আসলে তালের উপর হেলান দেয় না, সে হেলান দেয় তার নিজের চিন্তা ও আবেশের ওপর। প্রত্যাশা কিংবা প্রার্থনার ওপর। প্রতিটি তাল, একবার করে ‘ফিরে আসকু’ চাওয়া। এই চাওয়ার সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে থাকে সাদু।

আমি কোনো এককালে লিখেছিলাম- তোমাকে মনে পড়লেই যদি তোমার হেচকি উঠত, জীবনে একটা দানাও গিলতে পারতে না।

ওই লেখার সাথে মিলিয়ে আমার মনে হয়েছে তালগুলো তাল না, জাস্ট সাদুর ইচ্ছা।

জানি না কতটুকু বোঝাতে পারলাম কিংবা নির্মাতার চিন্তার কত কাছে যেতে পারলাম। নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন ভাইয়ের সাথে এ নিয়ে কথা বলতে পারলে ভালো হতো। 

আরো দুটি ভাবনা

প্রথম ভাবনা:ছাগলের নাম কেন কুলছুম আর পাগলীর কেন নাই নেই?

আসলে কুলছুম সাদুর বউয়ের নাম। কিন্তু তাকে কেউ নাম ধরে ডাকে না। সবাই ডাকে পাগলী বলে। আমরা প্রত্যেকেই চাই আমাদের নাম বেঁচে থাকুক। পাগলীও চায়। তার নামে কেউ না ডাকলেও ছাগলকে ঠিকই কারো ডাকার প্রয়োজন হলে কুলছুম নামে ডাকে। ডাকটা সে শুনতে পায়। তার নামে কেউ কাউকে ডাকছে এই ভাবনাটাই তাকে শান্তি দেয়।

দ্বিতীয় ভাবনা:সাদু ছাগলের মাংস খাওয়ার সময় এমন এক্সপ্রেশন দেয় যেন সে জীবনের প্রথম অসাধারণ কোনো স্বাদের স্বাদ নিচ্ছে। তার চেহারা মোহাচ্ছন্ন হয়ে যায়। তার গা ঘেমে যায়। এজন্য খেতে খেতে একবার বমি হয়ে যায় কিন্তু উঠে এসে আবার খাওয়া শুরু করে।

সাদুর বউ পাগলী। পাগলীর থেকে তার মিলনের স্বাদ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে পায় না। মিলনের স্বাদটা মানসিক, শারীরিক তৃপ্তি দেয়। ছাগলের মাংসই পাগলীর থেকে পাওয়া একমাত্র বস্তু যার থেকে সে শারীরিক ও মানসিক স্বাদ পায়। তৃপ্তি পায়। সাদুর অধরা কাঙ্খিত বাসনা পাগলী মেটাতে না পারলেও পাগলীর ছাগল তা মেটায়। অন্যভাবে।

সিনেমাটা যারা দেখেছেন তাদের মনে আছে, ছাগলের মাংস খাওয়ার এক পর্যায়ে সাদুর বমি হয়ে যায়। বমিকে ইজাকুলেশন ভেবে কিছুক্ষণের মধ্যে আবার খেতে বসার বিষয়টা যদি আপনার প্রথম জীবনের কোনো ঘটনার সাথে মেলান, মিলে যাবে।


About The Author

লেখক ও সাংবাদিক

Leave a reply