Select Page

শাবানাকে নিয়ে ববিতার স্মৃতিচারণ, আলো–ছায়ার আড়ালে বন্ধুত্ব

শাবানাকে নিয়ে ববিতার স্মৃতিচারণ, আলো–ছায়ার আড়ালে বন্ধুত্ব

বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের কথা উঠলেই দুটো নাম অবধারিতভাবে চলে আসে—শাবানা ববিতা। পর্দায় তারা ছিলন দর্শকের আবেগ, জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা দুই নায়িকা। কিন্তু আলোচিত প্রতিযোগিতার আড়ালে তাদের সম্পর্ক ছিল একেবারেই অন্যরকম। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর আন্তরিকতায় ভরা।

সময়ের দূরত্ব পেরিয়ে আজও সেই স্মৃতিগুলো বয়ে বেড়ান ববিতা। তার ভাষায়, শাবানাকে ছাড়া তার চলচ্চিত্রজীবনের গল্প কখনও পূর্ণ হয় না।

শুরুটা ছিল আলাদা, পথটা এক

শাবানা চলচ্চিত্রে এসেছিলেন অনেক আগে। ১৯৬৭ সালে এহতেশাম পরিচালিত চকোরী সিনেমার মাধ্যমে নায়িকা হিসেবে অভিষেক হয় তাঁর। অন্যদিকে ববিতার যাত্রা শুরু ১৯৬৯ সালে জহির রায়হান পরিচালিত শেষ পর্যন্ত সিনেমা দিয়ে।

ক্যারিয়ারের শুরুতে খুব একটা দেখা হয়নি তাদের। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন–এ প্রথম ঘনিষ্ঠ পরিচয়। তখন ববিতা দেশে ফিরেছেন সত্যজিৎ রায়ের অশনি সংকেতে অভিনয় করে। এফডিসিতে দেওয়া সংবর্ধনায় শাবানা এগিয়ে এসে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন তাকে।

প্রথম দেখাতেই ববিতা অনুভব করেছিলেন এক অদ্ভুত আন্তরিকতা। চলচ্চিত্রের প্রতিযোগিতাময় জগতে যেখানে দুই জনপ্রিয় নায়িকার সম্পর্ক নিয়ে নানা গল্প তৈরি হয়, সেখানে তাদের সম্পর্ক ছিল সম্মান আর সহমর্মিতায় ভরা।

ক্যামেরার সামনে সহশিল্পী, বাইরে বন্ধু

এফডিসিতে আলাদা আলাদা শুটিং করতে গিয়েই সম্পর্কের গভীরতা বাড়তে থাকে। একসঙ্গে প্রথম অভিনয় সাইফুল আজম কাশেম পরিচালিত সোহাগ সিনেমায়। এরপর একে একে কাপুরুষ, ফকির মজনু শাহ, বারুদ ও সোনার হরিণ–এও একসঙ্গে কাজ করেন তাঁরা।

পর্দার বাইরে সেই সম্পর্ক আরও উষ্ণ ছিল। যদিও সে সময়ের কিছু পত্রিকা তাঁদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প ছাপত, ববিতা বলছেন—বাস্তবে এমন কিছুই ছিল না। বরং দুজনই একে অপরের কাজের প্রশংসা করতেন, সাফল্যে আনন্দ পেতেন।

শুটিং ফ্লোরে শাবানার পেশাদারিত্ব তাকে মুগ্ধ করত বারবার। সময়মতো উপস্থিত থাকা, সংলাপ মুখস্থ, চরিত্র নিয়ে গভীর প্রস্তুতি—সবকিছুতেই ছিলেন নিখুঁত। কঠিন দৃশ্যের আগে এক কোণে বসে চরিত্র নিয়ে ভাবতেন। ক্যামেরা চালু হতেই যেন বদলে যেতেন অন্য এক মানুষে। বিশেষ করে আবেগঘন দৃশ্যে তাঁর অভিনয় ছিল অনবদ্য।

ববিতার মতে, শাবানার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার চোখের ভাষা। সংলাপ ছাড়াই দৃষ্টির মাধ্যমে আবেগ প্রকাশের অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার। ভাত দে সিনেমায় তার অভিনয় এখনও ববিতাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।

তারকার আড়ালে একজন সহজ মানুষ

অগাধ জনপ্রিয়তার পরও শাবানার মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। ইউনিটের কর্মী থেকে পরিচালক—সবাইকে সমান সম্মান দিতেন। হাসিমুখে কথা বলতেন, সবার খোঁজখবর নিতেন।

শুটিংয়ের ফাঁকে জমত আড্ডা। তখনকার দিনে শিল্পীরা টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার নিয়ে আসতেন। সবাই মিলে ভাগাভাগি করে খাওয়া, গল্প করা—এসব ছোট ছোট মুহূর্তই হয়ে উঠেছিল বড় স্মৃতি।

ইউনিটের অন্য মেয়েদের সঙ্গেও গল্প করতেন শাবানা। সংসারের খোঁজ নিতেন, পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করতেন। বড় তারকা হয়েও জীবনযাপন ছিল খুব সাধারণ।

কক্সবাজারের সেই মজার ঘটনা

একবার কক্সবাজার–এ শুটিং করতে গিয়ে ঘটেছিল মজার এক ঘটনা। তারা ছিলেন হোটেল শৈবালে।

একদিন দরজায় নক শুনে খুলতেই ববিতা দেখেন, দাঁড়িয়ে আছেন শাবানা। হেসে বললেন,

—‘তোমার কাছে একটা জিনিস চাইতে এসেছি।’

একটি গানের দৃশ্যে আধুনিক পোশাক পরতে হবে তার। কিন্তু এ ধরনের পোশাক খুব একটা পরতেন না বলে ববিতার কাছে ম্যাক্সি চাইতে এসেছিলেন। ববিতা মজা করে বলেছিলেন, ‘আমার পোশাক তো আপনার গায়ে হবে না।’

শাবানার উত্তর ছিল আরো মজার—

—‘সেলাই খুলে ঠিক করে নেব!’

শুধু পোশাক নয়, ববিতার সংগ্রহে থাকা আধুনিক স্টাইলের পরচুলাও নিয়েছিলেন তিনি।

এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই তাঁদের সম্পর্কের উষ্ণতার প্রমাণ হয়ে আছে আজও।

সম্পর্কের উজ্জ্বল স্মৃতি

শাবানার প্রথম সন্তান হওয়ার পর তাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন ববিতা। একদিন শাবানা বলেছিলেন, কলকাতার শাড়ি তার খুব পছন্দ। পরে ভারত থেকে ফেরার সময় ববিতা তার জন্য শাড়ি উপহার এনেছিলেন।

ববিতার প্রশ্ন, সম্পর্ক ভালো না হলে কি এমন হয়?

সোনালি দিনের সেই সংগ্রাম

তখনকার চলচ্চিত্রজগৎ আজকের মতো প্রযুক্তিনির্ভর ছিল না। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শুটিং চলত। প্রচণ্ড গরম, বৃষ্টি—সবকিছুর মধ্যেই কাজ করতে হতো। কষ্ট ছিল, কিন্তু আনন্দও ছিল। কারণ তাঁরা সিনেমাকে ভালোবাসতেন।

আর সেই দীর্ঘ পথচলায় শাবানা ছিলেন ববিতার অন্যতম সেরা সহযাত্রী।

শেষ দেখা, ভেজা চোখ

একসময় ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যান শাবানা। পরে অভিনয় কমিয়ে দেন ববিতাও।

বহুদিন পর কলকাতার একটি দোকানে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় তাদের। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়ায় চোখ ভিজে উঠেছিল দুজনেরই।

সেই মুহূর্ত আজও ভুলতে পারেন না ববিতা।

প্রতিযোগিতার বাইরে যে সম্পর্ক

মানুষ ভাবে, নায়িকাদের মধ্যে শুধু প্রতিযোগিতা থাকে। কিন্তু ববিতার ভাষায়, তাদের সম্পর্ক ছিল ঠিক উল্টো।

ক্যামেরার সামনে হয়তো ছিল সুস্থ প্রতিযোগিতা—কে ভালো অভিনয় করবেন, কে দর্শকের মন জয় করবেন। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে ছিল শুধু সম্মান, ভালোবাসা আর আন্তরিকতা।

ববিতার মতে, আজকের প্রজন্ম হয়তো তাঁদের সময়ের সংগ্রাম পুরোপুরি বুঝবে না। কিন্তু তাদের কাজ দেখলেই বোঝা যায়, কতটা নিষ্ঠা আর ভালোবাসা দিয়ে তারা সিনেমা করেছেন।

ববিতার কাছে শাবানা শুধু একজন কিংবদন্তি অভিনেত্রী নন, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু কিছু স্মৃতি কখনও পুরোনো হয় না।

শাবানার সঙ্গে কাটানো দিনগুলোও ঠিক তেমনই—আজও উজ্জ্বল, আজও হৃদয়ের খুব কাছের।

[সমকালে প্রকাশিত ববিতার স্মৃতিচারণ অবলম্বনে]


Leave a reply