Select Page

হতে পারতো পুরস্কারের মতো শত শত সিনেমা

হতে পারতো পুরস্কারের মতো শত শত সিনেমা

আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। ১৭ মার্চ ১৯৮৬ ‘অশান্তি’ দেখার মাধ্যমে শুরু হয় আমার সিনেমা দেখার অভিযান। আমি বেশিরভাগ ছবি দেখতাম টাইগারপাস নেভাল অডিটোরিয়ামে। কারণ মাত্র তিন টাকা দিয়ে সিনেমা দেখতে পারতাম।

নেভাল অডিটোরিয়ামে ‘পুরস্কার’ চলছিল। আমি টিকেট নিয়ে হলে প্রবেশ করলাম। শো সাড়ে এগারোটা থেকে শুরু হবে। সেই সময় আমবাগান-টাইগারপাস রোডটি নির্জন এলাকা ছিল। তাই সাড়ে এগারো থেকে সাড়ে আটটা পর্যন্ত তিন শো চলতো।

আমি এর আগে যেসব ছবি দেখেছি তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কাহিনী ছিল ‘পুরস্কার’-এর।

বাদশা ও রতন নামে দুই কিশোর অপরাধীর কাহিনী। বাদশা চরিত্রে অভিনয় করে মাস্টার শাকিল এবং রতন চরিত্রে মাস্টার সুমন। আর তাদের দুই বন্ধুর এক বন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নব্বই দশকের আলোড়িত গান ‘হ্যালো হ্যালো লাইনটা কেটে গেলো’ (রং নাম্বার) গানের শিল্পী আদনান বাবু। আদনান বাবু এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন বাবুল (অথবা বাচ্চু আমি এতদিনে ভুলে গেছি আদনান বাবু কোন চরিত্রের নাম বলেছিলেন) চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

কিশোর সংশোধনী স্কুল যা জেল স্কুল নামে পরিচিত সবার কাছে। আমি স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে, প্রি-প্রাইমারি পড়তে চাইতাম না। বাল্যশিক্ষা, অক্ষর পরিচয়, ছোটদের ধারাপাত এইসব বই অনেক ছিঁড়েছি। পড়ায় আমার মন বসতো না। সারাদিন দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা নিয়ে থাকতাম। তখন আমার অভিভাবক হুমকি দিতো- এভাবে বই ছিঁড়লে জেল স্কুলে দিয়ে আসবে। আর সেই জেল স্কুল কুমিরা বা সীতাকুন্ডে ছিল।

রতন মূলত অপরাধী না। সৎমা-এর ভাই এটিএম শামসুজ্জামান মিথ্যা অভিযোগে কিশোর আদালতে নিয়ে যায়। কিশোর আদালত তাদের নিয়ন্ত্রিত সংশোধনী স্কুলে রতনকে পাঠায়।

মিথ্যা অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত রতন ছিল শান্ত ও ভদ্র। তবে প্রয়োজনে কাউকে উচিত শিক্ষা দিতে ভুল করে না। যেমন; সেই স্কুলের সিনিয়র টিচার। তিনি দুর্নীতিপরায়ণ ও দুষ্ট প্রকৃতির। কথায় কথায় আরেক টিচার জয়শ্রী কবিরকে অপমান করতো। জয়শ্রী কবির সাজাপ্রাপ্ত কিশোরদের প্রিয় ছিল। বিশেষ করে রতনের। রতন সেই টিচারকে ইঁদুর মারার কল দিয়ে উচিত শিক্ষা দেয়। পরে ভূতের ভয় দেখিয়ে জেল স্কুল থেকে তাড়ায়। সেই টিচারের পরিবর্তে আসে বুলবুল আহমেদ

বুলবুল আহমেদ ও জয়শ্রী একই চিন্তাধারার লোক। তারা কিশোর অপরাধীদের ভালোবাসা দিয়ে সংশোধন করতে চায়। কঠোর শাসন দিয়ে না।

রতন আসার আগে থেকেই বাদশা বন্দি জেল স্কুলে। বাদশা খুব দুষ্টু কিশোর। তার সীমাহীন দুষ্টামির কারণে সে বন্দি। সে তার দুষ্টামি জেল স্কুলেও বহাল রাখে। বিড়ি-সিগারেট খায়। ভেতরে-বাহিরে সোর্স আছে বাদশার। বাদশার বাবা বাদশাকে মদদ দিতো, যা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। একজন অভিভাবকের মদদ তার সন্তানকে বিপথগামী গড়ে তোলে।

বাদশা দুষ্টু-বখাটে হলেও প্রতিভাবান। খেলাধূলায় বাদশা সবসময় প্রথম হতো। তার শক্ত কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো না। রতন তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায়।

রতনকে বাদশা মোটেই সহ্য করতে পারে না। তার সাফল্য ও জনপ্রিয়তা (অন্য ছাত্র বা কয়েদী এবং বুলবুল আহমেদ ও জয়শ্রীর কাছে) বাদশার চক্ষুশূল। বাদশা রতনের পতন চাইতো, রতন বাদশার সংশোধন চাইতো। বাদশা রতনের ধ্বংস চাইতো, রতন বাদশার ভালো চাইতো। বাদশা রতনকে শত্রু ভাবতো, রতন বাদশাকে বন্ধু বানাতে চাইতো। বাদশা চাইতো রতনকে সবার সামনে ছোট করতে, নীচু দেখাতে। পুরোপুরি বিপরীতমুখী দুটি চরিত্র।

একবার বুলবুল আহমেদ সবাইকে নিয়ে বনভোজন যাবার আয়োজন করে। কিশোর সংশোধনী স্কুল প্রধান শওকত আকবর বিরোধীতা করে। বুলবুল আহমেদ সবার দায় দায়িত্ব নেন। বনভোজন থেকে বাদশা সুযোগ বুঝে পালায়। রতন দেখতে পেয়ে বাদশাকে বাধা দিতে চায়। বাদশাকে ধাওয়া করতে করতে গ্রুপ থেকে রতনও চলে যায়। সবাই ভাবে রতন-বাদশা পালিয়েছে।

বুলবুল আহমেদ অপদস্থ হোন প্রধানের কাছে। পরে পুলিশ স্টেশন থেকে খবর আসে, রতন বাদশাকে ধরে এনেছে। রতন আরো প্রিয় হয়ে যায় সবার কাছে। আর বাদশার কাছে জানের দুশমন। কিন্তু রতন যা করেছে ভালোর জন্য করেছে। বাদশা তা বুঝতে চায় না।

বাদশা আর রতন সেখানে মোটর মেকানিক এর কাজ করতো। এক সময় উভয় একটি করে মোটরবাইক মেরামত করে। তাদের মোটরবাইক ঠিক হয়। তারা উভয়ে একসাথে মোটরবাইক ঠিক করে তোলে।

একই দিন একই সময় বাদশা আর রতনের মোটরবাইক ট্রায়াল করবে। মোটরবাইক দুটো দেখতে একই রকম। বাদশা গোপনে রতনের মোটরবাইকের ব্রেক নষ্ট করে রাখে। কিন্তু ট্রায়ালের সময় মোটরবাইক বদল হয়ে যায়। বাদশা নিজের হাতে ব্রেক নষ্ট করা মোটরবাইক ট্রায়াল করে। মোটরবাইক থামাতে পারে না। তখন রতন নিজের জীবন বাজী রেখে বাদশাকে বাঁচায়। রতনের একটি পা কেটে ফেলে দিতে হয়।

বাদশা অনুতপ্তে জ্বলতে জ্বলতে কয়লা হয়ে খাঁটি সোনা হয়। বাদশা আর রতনের মাঝে বন্ধুত্ব হয়।

এই হলো পুরস্কার ছবির সংক্ষিপ্ত কাহিনী। তবে অনেকদিনের স্মৃতি থেকে বলা, কাহিনী একটু এদিক-সেদিক হতে পারে।

পুরস্কার ছায়াছবি থেকে আমরা কী কী শিখলাম… কঠোর শাসন নয়, ভালোবাসা দিয়ে সংশোধন করতে হয়। যেমন; বুলবুল আহমেদ ও জয়শ্রী কবির কিশোর অপরাধীদের ভালোবাসা দিয়ে সংশোধন করার চেষ্টা করে। তারা সফলও হয়।

হিংসা হলো এমন এক আগুন, যা দিয়ে কাউকে পোড়ালে নিজেও পুড়তে হয়। বাদশা সবসময় রতনকে হিংসা করতো কিন্তু সেই হিংসায় বাদশা নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতো বেশি।

রাগলে হারতে হয়। বাদশার বারবার হেরে যাওয়ার কারণ ছিল তার রাগ। সে রতনের ভালো কিছু দেখলেও রাগ করতো।

পরের জন্য গর্ত করলে, সেই গর্তে নিজে পড়তে হয়। বাদশা মোটরবাইকের ব্রেক নষ্ট করেছিল যাতে রতন এক্সিডেন্ট হয়। যাতে রতন শিক্ষা পায় কিন্তু বাদশা নিজের তৈরী ফাঁদে নিজেই পড়ে যায়।

কে প্রথম আর কে দ্বিতীয় হবো, তা না ভেবে। এগিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। রতন এগিয়ে যাওয়াকে সাফল্য মনে করতো, প্রথম হওয়াকে না। সে একা প্রথম হতে চাইতো না, সবাই মিলে প্রথম হতে চাইতো।

সত্যিকারের অনুতাপ ভেতরের পশুকে হত্যা করে। যখন নিজের তৈরি ফাঁদে বাদশা নিজেই পড়ে যায় তখন রতন জীবনবাজি রেখে বাদশাকে উদ্ধার করে আর রতন একটি পা হারায়। তখন বাদশা অনুতপ্ত হয়। অনুতাপে সে নিজের মাঝে নিজে জ্বলতে থাকে। নিজের প্রতি নিজের ঘৃণা এসে যায়। সে কারো চোখাচোখি হতে পারছিলো না। রতনের তো নয়ই।

প্রতিহিংসা দিয়ে ধ্বংস করা যায়, কিন্তু কিছু নির্মাণ করা যায় না। বাদশা প্রতিহিংসা দিয়ে সকলে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ধ্বংস করেই যাচ্ছিল আর রতন ভালোবাসা দিয়ে বন্ধুত্বের সেতু নির্মাণ করে যাচ্ছিল।

তুমি মন্দ তাই বলে আমি ভালো হবো না কেন! আমার আলো দিয়ে তোমায় ভালো পথে আনবো। বাদশা মন্দ তাই রতন ভালো হয়ে আলো দিয়ে বাদশাকেও ভালোর পথে আনতে চায় এবং সফল হয়।

আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থানে বন্দি পাখি। আমাদের ঝগড়া করা উচিৎ না। মিলেমিশে বন্দিশালা ভাঙা উচিত।

সত্যকারের ভালোবাসা দিয়ে চরম শত্রুকেও বন্ধু করা যায়। যেমন রতন বাদশাকে বন্ধু করেছে।

শত্রুও যদি বিপদে পড়ে, তখন তাকে শত্রুতার দৃষ্টিতে না। মানবতার দৃষ্টিতে দেখতে হয়। রতন তাই দেখেছে, রতন একটি পা হারিয়েও বিজয়ের হাসি হেসেছে, কারণ একজন শত্রু বন্ধু হয়েছে। শত্রুর সাথে শত্রুতা করে সারাজীবন শত্রুতা রাখা বিজয় না, বন্ধুত্বের মাঝে শত্রুতার দাফন করাই বিজয়।

জীবনে বিরাট কিছু হারালে হতাশ হতে নাই। সে হারানোর বদলে তার চেয়েও দামী পুরস্কার মিলে। রতন পা হারিয়েছে কিন্তু বন্ধু হিসাবে বাদশাকে পেয়েছে।

এই ধরনের শিক্ষামুলক ছায়াছবি আরো তৈরী হওয়া প্রয়োজন ছিল। তা না হয়ে বরং এই ছায়াছবির বার্তার বিপরীত ছবিই তৈরী হয় আজকাল। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে হিংসা প্রতিহিংসার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। আমরা আজ অন্যকে ধাক্কা মেরে নিজে এগিয়ে যেতে চাই। সমাজ আজ অস্থির তারচেয়ে আমরা অস্থির!

‘পুরস্কার’ ছবিতে ‘হারজিত চিরদিন থাকবে তবুও এগিয়ে যেতে হবে,বাধাবিঘ্ন না পেরিয়ে বড় হয়েছে কে কবে’ গানটি যেন একটি আদর্শলিপি। গানের প্রতিটি লাইন যেন সবক। আমি প্রতিদিন অন্তত একবার গানটি শুনি। গানটি শুনলে জীবনের হতাশ দূর হয়, হাজার বাধাবিঘ্ন জয় করে, এগিয়ে যাবার প্রেরণা পাই।

আমি যদি অস্কার কমিটির সদস্য হতাম, ‘পুরস্কার’ চলচ্চিত্রকে অস্কার পুরস্কার দেওয়ার চেষ্টা করতাম।

এই সিনেমায় নাই গ্ল্যামারের প্রদর্শন, নাই আইটেম সং। নাই বস্তাপচা প্রেম কাহিনী। এমন কাহিনী দিয়েও যে একটি সুন্দর সিনেমা তৈরি করা যায় তা সিবি জামান আমাদের দেখিয়েছেন। কিন্তু আমরা কি সে পথ ধরে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে গেছি? মা-বাবার হত্যার প্রতিশোধ আর ধনী-গরীবের প্রেম কাহিনী নিয়ে বছরের পর বছর ছবি তৈরি হয়েছে।

অথচ এই সমাজে বছরের পর বছর কত ঘটনা ঘটে যা থেকে শিক্ষামুলক সিনেমা তৈরি হতে পারতো হাজার হাজার। ছুটির ঘণ্টা, অশিক্ষিত, পুরস্কারের মতো শত শত সিনেমা তৈরি হতে পারবো। কিন্তু গ্ল্যামার প্রদর্শন করতে করতে আজ গ্ল্যামারই সাংস্কৃতি অঙ্গনে কলঙ্ক নিয়ে এসেছে। গ্ল্যামারের কাছে প্রতিভা বড় অসহায়!


অামাদের সুপারিশ

মন্তব্য করুন

ই-বুক ডাউনলোড করুন

BMDb ebook 2017

Shares