ঈদুল আজহা ১৯৯৬এক ঈদে শাবানার চার হিট, তুরুপের তাস ছিলেন নির্মাতারা
ঢালিউডের সমৃদ্ধ অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে নব্বই দশক। এই দশকের মাঝামাঝি সমৃদ্ধির চূড়ায় পৌঁছে যায় ঢাকাই সিনেমা। একদিকে তরুণ তারকাদের উত্থান, আরেক দিকে পুরনো তারকাদের শক্তিশালী অবস্থান;একদিকে প্রতিষ্ঠিত পরিচালকদের দাপট, আরেক দিকে নতুন পরিচালকদের সাফল্য—সব মিলিয়ে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির আকাশে ঝকঝকে রোদ।
সেই আকাশের সবচেয়ে বড় নক্ষত্র শাবানা। তিন দশক পেরিয়েও তার উজ্জ্বলতায় ঢালিউড আলোকিত। প্রতিবছরই তার অভিনীত ছবি মুক্তি পায় ঈদে। ওই বছর একটা রেকর্ড তৈরি করেন শাবানা। এক ঈদে চার-চারটি ছবি মুক্তি পাওয়ার বিরল ঘটনা ঘটান এই জনগণনন্দিত নায়িকা।

ফিরে যাওয়া যাক ৩০ বছর আগের ঈদুল আজহায়। ১৯৯৬ সালের ৪ এপ্রিল ঈদের দিন। ঢাকায় ৫টি আর আর ঢাকার বাইরে মুক্তি পায় ১টি ছবি। ঢাকার ৫টি ছবির মধ্যে ৪টিতেই দেখা যায় শাবানাকে। ‘বিদ্রোহী কন্যা’, ‘তপস্যা’, ‘স্ত্রী হত্যা’ ও ‘বিশ্বনেত্রী’—এই ৪টি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি।
বিস্ময়কর ঘটনা হচ্ছে, এই ৪টি ছবির একটিও ফ্লপ হয়নি এবং প্রত্যেকটি ছবি হিট হয়েছে। ‘তপস্যা’ ছাড়া বাকি ৩টাই সুপারহিট। এই রকম ঘটনা সিনেমার ইতিহাসে খুব কম। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, শাকিব খানের এক ঈদে ৪টি ছবি রিলিজ হয়েছে এবং একাধিক ছবি সুপারহিট হয়েছে। কিন্তু মুক্তিপ্রাপ্ত সবগুলো ছবি হিট হওয়ার রেকর্ড তারও নেই।
শাকিবের সঙ্গে শাবানার তফাৎ হচ্ছে, এই অভিনেত্রী একচেটিয়া ইন্ডাস্ট্রি শাসন করেননি। শাবানা নক্ষত্র হলে তার চারপাশে ছিল তারকার ছড়াছড়ি। ‘বিদ্রোহী’ ছবিতে ছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন, রুবেল ও আলমগীর। ‘বিশ্বনেত্রী’ ছবিতে ছিলেন জসীম, শাহনাজ ও আমিন খান। ‘স্ত্রী হত্যা’ ছবিতে ছিলেন জসীম, শাবনূর ও অমিত হাসান। ‘তপস্যা’ ছবিতে ছিলেন আলমগীর, শাবনাজ ও বাপ্পারাজ।
নাই বনে খাটাসই বাঘ—শাবানার বেলায় কিন্তু এই কথা খাটে না। তিনি প্রতিযোগিতা করেই টিকে ছিলেন। সেবারের ঈদে আলমগীরের ৩টা ছবি ছিল। জসীমের ছবি ছিল ২টা। রাজিব ছিলেন। ফরীদি ছিলেন। আহমেদ শরীফ ছিলেন। নূতন, সুবর্ণা মুস্তাফা, ড্যানি সিডাক, লিমা, সোনিয়া—তারায় তারায় পূর্ণ আকাশ।
সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে চার-চারটা হিট ছবি দেওয়া কোনো ছেলেখেলা নয়। আমি বরং এই পয়েন্টটাকে সরিয়ে রেখে আসল কথায় আসি। তারকার দৌরাত্ম্য দিয়ে ইন্ডাস্ট্রির সক্ষমতা প্রমাণ হয় না। কোনো একজন তারকার জনপ্রিয়তা দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিকে মাপতে গেলে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শাবানা নয়, ঢালিউডের আসল তুরুপের তাস ছিলেন নির্মাতারা।
‘স্ত্রী হত্যা’ মোতালেব হোসেনের ছবি। ‘তপস্যা’ গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ছবি। দুজনেরই প্রতিষ্ঠা আশির দশকে। ‘রাক্ষস’-এর পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন তার চাহিদা তৈরি করেন আশির দশকের শেষের দিকে। নব্বই দশকে ‘বিদ্রোহী’র পরিচালক সোহনার রহমান সোহানের বিকাশ। ‘বিশ্বনেত্রী’র পরিচালক বাদল খন্দকারও নব্বই দশকের সৃষ্টি। এদিকে ‘বাঘা বাঘিনী’র পরিচালক অদ্বিতীয় দেলোয়ার জাহান ঝন্টু সত্তর দশক থেকেই দাপটের সঙ্গে বিরাজমান…।
এবার আসি প্রকৃতই যারা ইন্ডাস্ট্রির চালিকাশক্তি তাদের কথায়। ইন্ডাস্ট্রি চলে প্রযোজকদের পুঁজিতে। প্রযোজনা সংস্থার জ্বালানি ছাড়া ইন্ডাস্ট্রি অচল।
এবারের ঈদে মুক্তি পাচ্ছে ৯টি ছবি। এরমধ্যে কয়টি ছবির প্রযোজকের বক্স অফিসে হিট ছবি দেওয়ার ক্ষমতা আছে? হিট তো দূরে থাক, ছবি মুক্তি দেওয়ার সামর্থ্য আছে কয়জন বিনিয়োগকারীর? ছবি মুক্তি দিতে গেলে এখনকার প্রযোজকরা লেজেগোবরে মাখামাখি করে ফেলেন। আদর্শ প্রযোজকদের দৌড় ও দৌরাত্ম্য বুঝতে চলুন আবার ‘৯৬ সালের ঈদ থেকে ঘুরে আসি।
‘স্ত্রী হত্যা’র ব্যানার মেরিনা মুভিজ থেকে এর আগে নির্মিত হয়েছে ‘হিংসা’র মতো সুপারহিট ছবি। ‘তপস্যা’র ব্যানার দেশ চিত্রকথা থেকে এর আগে বানানো হয়েছে ‘স্বাধীন’-এর মতো ব্লকবাস্টার ছবি। ‘বিদ্রোহী’র ব্যানার সাজ ফিল্মস থেকে এর আগে তৈরি হয়েছে ‘বেনাম বাদশা’র মতো বাম্পারহিট ছবি। ‘বিশ্বনেত্রী’র ব্যানারও নতুন নয়। এসপি প্রডাকশন এর আগে বাদল খন্দকারকে দিয়েই বক্স অফিসে উপহার দিয়েছে ‘দুনিয়ার বাদশা’র মতো হিট ছবি। ‘রাক্ষস’-এর ব্যানার সাথী ফিল্মসও এর আগে শহীদুল ইসলাম খোকনের কাছ থেকে পেয়েছে ‘ঘাতক’-এর মতো হিট ছবি। প্রত্যেকটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান পরীক্ষিত ও প্রমাণিত।
ঈদ তখন কোনো ছেলেখেলা ছিল না। মন চাইলেই ছবি নিয়ে চলে আসা যেত না । প্রযোজক-পরিচালক পছন্দ না হলে প্রদর্শকরা ছবিই চালাতেন না। আর যাদের ছবি চালাবেন বলে ঠিক করতেন, শুটিং চলমান অবস্থায় সেসব ছবির টাকা জোগান দিতেন হল মালিকরাই। জ্বি, ঠিকই শুনছেন। হল মালিকরাও ছিলেন ছবির অপরিহার্য অংশীদার।
অনেক ঘাট পেরিয়ে, কষ্টিপাথরে যাচাই হয়ে ঈদের ছবি আসত। আর যখন একযোগে ৩০/৪০টি সিনেমা হলে ছবি মুক্তি পেত, ঈদের কয়েকদিন টানা হাউজফুল যেত। দুই সপ্তাহ পর গিয়ে ছবির মেরিট অনুযায়ী হিট-ফ্ল্প নির্ধারিত হত।
আহারে সিনেমা, আহারে সুদিন। সেলুলয়েডের সেই স্বর্ণযুগ কি আর আসবে?






