Select Page

‘রইদ’ আইলা গা জুড়াইতে, কিন্তু জুড়ালো তো?

‘রইদ’ আইলা গা জুড়াইতে, কিন্তু জুড়ালো তো?

ইসলাম, খ্রিস্টান এবং ইহুদি ধর্মতে শয়তানের প্ররোচনায় দুনিয়ার প্রথম মানব, মানবীর স্রষ্টার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ এবং তার শাস্তিস্বরূপ পৃথিবীতে আগমনের কথা উল্লেখ আছে। কোনখানেই নিষিদ্ধ সেই ফলের নাম উল্লেখ না থাকলেও ফলটি মানুষের কাছে গন্ধম নামে পরিচিতি পায়। ‘গন্ধম ফল’কে প্রায় সময়ই দেখা হয়- নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষা, প্রলোভন ও মানবিক দুর্বলতা বা ভুলের পর অনুতাপের প্রতীক হিসেবে। রূপালি পর্দায় এবার গন্ধম আসলো কিসের প্রতীক হিসেবে?

প্রথমেই ব্ল্যাক ইন, তারপর পর্দা আলোকিত হলে দেখা মেলে একটা বৃষ্টির দিনের এক্সটেরিয়র শট মিডিয়ান ক্লোজ শটে আমরা দেখি সাদুকে কিছু গরুর সাথে। প্রথম সিনেই একটা প্রধান চরিত্র স্ট্যাবলিশড। দুই দৃশ্য পর আমরা দেখা পাই আরেক প্রধান চরিত্র সাদুর বউকে। ওই দৃশ্যেই স্থানীয় ছেলেপিলেদের সাথে তার কথাবার্তার অসংলগ্নতার মাধ্যমে পরিচালক প্রতিষ্ঠা করেছেন সাদুর বউ পাগল। এই সিনটার জন্য এক লাইন না লিখলেই নয়, একদিকে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন যাচ্ছে, অন্যদিকে সাদু বাড়ি যাচ্ছে তার বউ নিয়ে। অসাধারণ এক শটের পরিকল্পনা!! সাদুর বউয়ের পাগলামিতে অতিষ্ঠ সাদু একরাতে বউকে ফেলে রেখে আসে এক অজানা প্রান্তরে। দুইজনের আদিম জীবনে সমাজের নাক গলানো নিয়ে আসে অনেকগুলো প্রশ্নবোধক। তারপর? দুবর্লতা, অনুতাপ না বাস্তবতা কি তাড়া করে সাদুকে তার উত্তর সিনেমার পর্দায়।

রইদের গল্প সাদু আর তার বউকে ঘিরে। এই দুটো চরিত্রকে দাঁড় করাতে পরিচালক এতো সময় নিয়েছেন যে কখনো সখনো তা পরিমিতিবোধকে ছাপিয়ে গিয়েছে। মূলত চরিত্র দুটোকে স্পেস দিতে গিয়ে সিনেমার মূল ‘থট’-টাই প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। থ্রি অ্যাক্ট সিনেমাতে প্রতি অ্যাক্টেই গল্পে একটা উত্থান ও পতন থাকে, প্রতি অ্যাক্টেই গল্পের হাইট আগেরটাকে ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু রইদে তা হয় নি, প্রথম অ্যাক্টেই ইনসাইটিং ইভেন্ট ক্লিক করেছে। গল্পের গতি এক জায়গায় থেমে থাকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় অ্যাক্টের ইনসাইটিং ইভেন্টগুলো আর আগ্রহ জাগায়নি।

মেটাফরিক সিনেমা পরিচালক বানাতেই পারেন, কিন্তু পরিচালকে সেই মেটাফোর যদি সাধারণ দর্শক বুঝতে না পারেন তবেই বিপত্তি। এই প্রসঙ্গে একটু ‘হাওয়া’র কথা বলি। হাওয়াতেও মেটাফোর ছিল, কিন্তু সেই মেটাফোর মানুষের আওতার মধ্যে ছিল, একটা দৃশ্যমান কনফ্লিক্ট, হাসার স্পেস ছিল, সার্ভাইভাল লড়াই ছিল। ‘রইদ’-এর ক্লাইম্যাক্স দুর্বোধ্য, হাস্যরসের এলিমেন্টগুলো কাজ দেয়নি, কনফ্লিক্টগুলো থেকে গিয়েছে আবছা শেইপে।

রইদের পজেটিভ দিক এর অভিনয় ও কস্টিউম ডিজাইনিং। মোস্তাফিজুর নূর ইমরানকে এক্ষেত্রে আমি কিঞ্চিৎ এগিয়ে রাখবো অন্যদের থেকে। দ্বিতীয়ত নাজিফা তুষির কস্টিউম ও মেকাপের কাজ অসাধারণ। নিজের প্রাইম টাইমে নিজেকে এভাবে ভাঙার সাহস যে অভিনেত্রী নেন, তার জন্য টুপি খোলা অভিবাদন।

ছবির আর একটি উজ্জ্বল দিক হতে পারতো এর ভিজ্যুয়াল। এতো সব আল্ট্রা ওয়াইড শট চোখের জন্য প্রশস্তির হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা পুরোপুরি হতে পারেনি দুটো কারণে। প্রথমত ক্যামেরার কাঁপাকাপি ও দ্বিতীয়ত ছবিজুড়ে ডার্ক কালারটোনের অতিব্যবহার। কি লাইটের বাইরে, ফিল লাইট বা ব্যাক লাইট খুব সম্ভবত ব্যবহার করা হয়নি। তাই পর্দায় কন্ট্রাস্ট রেশিও ছিল খুব হাই। দুই একটা সিনে মনে হলো মোটিভেটেড লাইটিং আরো একটু ভালো হতে পারতো। ক্যামেরার ফ্রেমিংয়ের ক্ষেত্রে একটা ডাচ অ্যাঙ্গেল ফ্রেমিং ছাড়া ইউনিক কিছু চোখে পড়েনি। নাজিফা তুষির একটা ট্র‍্যাকিং শট নেওয়ার চেষ্টা ছিল, তবে তার এক্সিকিউশন ঠিকঠাক হয়নি৷

আসলে ‘হাওয়া’র পর ‘রইদ’ নিয়ে ছিল আলাদা প্রত্যাশা। আমি নিজেও হলে গিয়ে নিয়মিত বাংলা সিনেমা দেখার হাতেখড়ি ‘হাওয়া’ দিয়ে। ‘রইদ’ ঠিক মন জুড়াতে পারেনি, তবে কান ঠিকই জুড়িয়েছে ‘মন ছাড়া কি মনের মানুষ রয়’ গানটি। আপনি হয়তো ভিন্নধর্মী সিনেমা বলে রইদকে পাশ মার্ক দিতেই পারেন, কিন্তু পর্দায় পরিচালকের গল্পকে স্পষ্ট করে তুলতে না পারার দায় তাতে আড়াল হবে না।


About The Author

Leave a reply