Select Page

এবং বিশ্বজিৎ…

এবং বিশ্বজিৎ…

আমি সাধারণত অস্থির টাইপের মানুষ। একসাথে একটা বই টানা পড়ছি এটা এখন হয়ই না বলা চলে। আমাকে যদি এই মুহূর্তে -কী বই পড়ছি? জাতীয় প্রশ্ন করা হয় তাহলে অন্তত ২৫টা বইয়ের নাম বলতে হবে যার হয়ত কয়েক পাতা থেকে কয়েকশ পাতা পর্যন্ত হবে পড়া হয়েছে। ব্যাপারটা আরও ভয়াবহ লাগতে পারে যে এর আগে আরও ২৫টা বইও হয়ত অসমাপ্ত পড়া হিসাবেই থেকে গেছে। তো অসুস্থতার ফজিলতে কয়েকদিনের মধ্যে দুইটা বই অন্তত টানা পড়ে ফেলা গেল এইটা ভেবেও ভাল্লাগছে। প্রথম বইটির গল্প পরে বলা যাবে, তবে এরমধ্যে দ্বিতীয় বইটির নাম ‘এবং বিশ্বজিৎ’

সংগীত নিয়ে আমি পড়তে ও লিখতে ভালোবাসি। যদিও বাংলাদেশে সংগীত বিষয়ক বইয়ের আকাল আছে সব সময়। বিশেষত সংগীতজনদের জীবন ও কর্ম নিয়ে বই প্রকাশ প্রায় হয়ই না বলা চলে। এই আকালের বাজারে ‘আজব প্রকাশ’ নামের প্রকাশনী থেকে নিয়মিত বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজন ও তাঁদের কর্ম নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে বই প্রকাশ করে যাচ্ছে, এটা দারুণ আনন্দের। অন্তত আমার জন্য। আর এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব গীতিকার, সুরকার, শিল্পী ও প্রকাশক জয় শাহরিয়ারের।

কুমার বিশ্বজিৎ হলেন সেই শিল্পী যিনি আমার কৈশোর থেকে এখনও পর্যন্ত জীবন্ত প্রিয় শিল্পীর তালিকায় জ্বলজ্বল করেন। জীবন্ত এই অর্থে যে অসংখ্য প্রিয় শিল্পী হয়ত অল্প কিছু গান গেয়েই প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন এবং তারপর তার যাত্রা থেমে গেছে। অথচ বিস্ময়কর ব্যাপার হলো বাংলাদেশের অডিও ইন্ড্রাস্টির একদম শুরু থেকে চার দশক পেরিয়ে এসেও কুমার বিশ্বজিৎ আজও সজীব এবং এবং জনপ্রিয়।

কুমার বিশ্বজিতের প্রথম এ্যালবাম মূলত বাংলাদেশের অডিও ইন্ড্রাস্টিরই দ্বিতীয় এ্যালবাম। প্রথম এ্যালবামেই বাংলাগানের বিশাল অংশের শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন তিনি। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত সেই এ্যালবামের অনেক গানই আমার আজও প্রিয়— আমি সাম্পানে বাঁধিব ঘর, চতুর্দোলাতে চড়ে দেখো ওই বধু যায়, এ কেমন স্বপ্ন আমার রাত ফুরোলেই শেষ হয়, না যাইও নাগো যাইও না উজানে বাইয়া, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, তোর প্রেমের কাঁটা বিঁধবে বুকে যদি জানতাম ইত্যাদি।

সেই এ্যালবামের পর থেকে আরও ৪৩ বছর কেটে গেছে কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে এমন মনে করার কারণ তৈরি হয়নি এখনো। এরপরেও একের পর এক শ্রোতাপ্রিয় অজস্র গান উপহার দিয়েছেন তিনি।

প্রথম এ্যালবামের পুর্বে ১৯৮০ সালের দিকে টেলিভিশনের প্রযোজক আল মনসুর বিশ্বজিতের প্রথম রেকর্ডিং করা কয়েকটি গান শুনেই বলেছিলেন – তোমাকে আমি ব্রেক দিবো না। ব্রেক দিলে তো থেমে যাবে। আমি তোমাকে এক্সিলেটর দেবো। তাহলে থামতে হবে না – সেই থেকে আসলেই আর থামতে হয়নি একজন কুমার বিশ্বজিৎকে।

তাঁর জনপ্রিয় গানের কথা বলে বোধ হয় শেষ করা যাবে না। ‘যেখানে সীমান্ত তোমার, সেখানেই বসন্ত আমার’ তো কালোত্তীর্ণ গানের তালিকায় ইতোমধ্যেই ঠাঁই পেয়ে গেছে। এ ছাড়াও সমানতালে জনপ্রিয়- তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে, তুমি রোজ বিকেলে আমার বাগানে, চন্দনা গো রাগ কোরো না, যারে ঘর দিলা সংসার দিলা রে, দরদীয়া তুই যে আমার অন্তরের অন্তর, তোমরা একতারা বাজাইও না, ও ডাক্তার, একদিন কান্নার রোল উঠবে আমার বাড়িতে, একটা চাঁদ ছাড়া রাত আঁধার কালো, ছোট ছোট আশা খুঁজে পেল ভাষা, যে শিকারী চোখে দেখে না, ইত্যাদি ইত্যাদি।

দুই

বইটি মূলত সাক্ষাৎকার ভিত্তিক। জয় শাহরিয়ার প্রশ্ন নয় যেন চমৎকারভাবে সূত্রধরের কাজ করে গেছেন পুরোটা সময়জুড়ে। জয় নিজে শিল্পী হওয়ার কারণে কুমার বিশ্বজিৎ সম্পর্কে অনেক গল্প ও তথ্য তাঁর সামনে তুলে এনে যেন খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে না-বলা নানান গল্প বের করে এনেছেন দক্ষতার সাথে। পড়তে গিয়ে বাংলাগানের অনেক লেজেন্ড সংগীতজনের নাম ও গল্প আপনার সামনে চলে আসবে। গল্পে গল্পেই জানা হবে কখনো আইয়ুব বাচ্চু, তপন চৌধুরী, লাকি আখন্দ, নকীব খান, শেখ ইশতিয়াকদের। আবার কখনো আহমদ ইমতিয়াজ বুলবুল, লিটন অধিকারী রিন্টু, শেখ সাদী খান, সত্য সাহা, সুবল দাস, মানাম আহমদদের মতো পেছনের মানুষের গল্প। বিশেষ করে এই ভাইরালের যুগে যেসব শিল্পীরা জনপ্রিয়তা বা দ্রুত প্রতিষ্ঠা পাবার অস্থিরতায় ভোগেন তারা অন্তত জানতে পারবেন কুমার বিশ্বজিৎ আইয়ুব বাচ্চুদের মতো শিল্পীদের সংগ্রাম, অধ্যাবসায় আর সংগীতের প্রতি কী তীব্র অনুরাগের দহনে পুড়ে পুড়ে একজন কুমার বিশ্বজিৎ হতে হয়।

বইটির চমৎকারিত্ব এই যে একজন শিল্পী সম্পর্কে পড়তে গিয়ে অনেক শিল্পী ও সংগীতমানুষকে যেমন জানা যায়, একইভাবে জানা যায় আমাদের সংগীত কারখানার গড়ে ওঠার ইতিহাসও। তবে পড়তে পড়তে অনেক সময় মনে হয়েছে কোনো কোনো বিষয়ের আরও কিছুটা বিস্তারে যাওয়া যেত, যেন একটি বিষয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই অন্য একটি বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে।

ভালো হতো যদি শিল্পীর গান ও এ্যালবামের একটি ধারাবাহিক তালিকা বইয়ের শেষে থাকত। সোহেল আহমেদ এর প্রচ্ছদ ভালো লেগেছে। কাগজের মান ভালো। তবে বাঁধাইয়ের মান আশানুরূপ নয়। অন্তত আমার সংগৃহীত বইটির বাঁধাই একবার পড়ার পরেই খুলে খুলে আসছে। বইয়ের শেষে অনেক ছবি যুক্ত করা হয়েছে, যা অনেকে শ্রোতাকেই হয়ত স্মৃতিকাতর করে তুলবে।

পরিশেষে বলি – যারা প্রকৃত সংগীত রসিক আছেন, যারা শুধু একটি গান শুনেই তৃপ্ত হন না, জানতে চান গানের শিল্পী, নির্মাতা, গানের পেছনের ইতিহাস ও গল্প, তারা বইটি পড়ে দেখতে পারেন। আর যারা কুমার বিশ্বজিতের অনুরাগী আছেন তাঁদের তো অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত। এমন একটি বই প্রকাশের জন্য জয় শাহরিয়ার ও আজব প্রকাশের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা রইল।


Leave a reply