Select Page

কবরীর হাসি ভোলাতে পারেনি কেউ

কবরীর হাসি ভোলাতে পারেনি কেউ

কবরীর প্রথম ছবি ‘সুতরাং’-এর ‘নদী বাঁকা জানি’, ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবির ‘গান হয়ে এলে’ বা পরবর্তীকালে বিখ্যাত ‘সুজন সখী’র ‘গুন গুন গান গাহিয়া’— এমন অসংখ্য গানের কথা বলা যায় যাদের ঝিরঝিরে ভিডিও এখনো দেখা যায় অন্তত একটি কারণে, কবরীর হাসির জন্যই।

বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয়, ‘সারেং বৌ’ সিনেমার অবিস্মরণীয় ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানটির শেষদিকে ঘুমন্ত কবরীর হাসি। এত অবিমিশ্র অভিব্যক্তি হয়তো বাংলা সিনেমায় কমই আছে। এটাও ঠিক যে, কবরীর হাসি দেখে মাত হয়েছিলেন তার প্রথম ছবির পরিচালক ও নায়ক সুভাষ দত্ত। তাও কি-না সেই হাসি দেখেছেন ফটোগ্রাফে। এরপরই কবরীকে ঢাকায় আসতে বলেন তিনি। আর চট্টগ্রামের কিশোরী মিনা পাল ঢাকায় এসে হয়ে যান কবরী।

এ শুধু একঝলক দেখার কথাই হলো। হাতে একটু সময় থাকলে কবরীর যেকোনো ছবিই দেখা যায়, তার সহজ অভিনয় প্রতিভার এমনই গুন। সমসাময়িক নায়িকা শাবানার সঙ্গে পর্দা ভাগাভাগি করেছিলেন ‘বধূ বিদায়’ সিনেমায়। বিয়োগান্ত চরিত্রে দেখা দিলেও দর্শক তার দুঃখটাকেই আপন করে নিয়েছেন। তিনি যে আমাদের ‘দেবদাস’-এর পার্বতী অথবা ‘ময়নামতি’র ময়না। ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রির প্রথম অ্যাকশন সিনেমা ‘রংবাজ’-এর ফুলের মালা হাতে নেওয়া অভিমানী মেয়েটিকে, যে গাইছে ‘সে যে কেন এলো না’।

হাসি ও সহজ অভিনয়ের জন্য কবরীর খ্যাত হয়েছিলেন ‘মিষ্টি মেয়ে’ পরিচয়ে। ‘পাশের বাড়ির মেয়ে’ ইমেজও রয়েছে। সেই ১৯৬৪ সালে কবরীর প্রথম সিনেমা মুক্তি পায়। ১৯৮০ এর দশকে তিনি নায়িকা চরিত্র থেকে অবসর নেন। এর মাঝে কত নায়িকা-অভিনেত্রী এসেছেন ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রিতে। দেশ ও দেশের বাইরে পেয়েছেন খ্যাতি। কিন্তু মিষ্টি মেয়ে একজনই— কবরী। কেউ তার হাসি ভোলাতে পারেননি। আইকনিক হাসি তাকে দর্শকের মাথার মুকুটে রেখেছে, দিয়েছে স্বতন্ত্রতা। হয়তো ঢালিউডের ইতিহাসে এমন কেউ আসবেন না।

অভিনয় প্রতিভার দিক থেকে যেকোনো চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল কবরীর। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শহুরে মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তরাও কবরীকে যতটা নিজেদের মানুষ হিসেবে ভাবতে পেরেছিলেন, হয়তো অন্য কোনো অভিনেত্রীর ক্ষেত্রে পারেননি।

তার সিনেমা গ্রাফে আছে নানান ধরনের চরিত্র। গ্রামীণ ও ফোক-ফ্যান্টাসিতে যতটা সাবলীল, ঠিক তেমন শহুরে তরুণী চরিত্রে মানানসই। আর এ কারণে নানা প্রজন্মের দর্শকের ভালোবাসা সব সময় তার পাশে ছিল।

এই যেমন তার সহকর্মী সোহেল রানা একই সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, “কবরীকে মানুষ মনে করতো, এই শিল্পীটা আমার শিল্পী। আমার কাছের মানুষ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কবরীর মতো মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি প্রিয় শিল্পী আর কেউ নেই।”

সোহেল রানার সঙ্গে তার অভিষেক সিনেমা ‘মাসুদ রানা’য় অভিনয় করেছিলেন কবরী। স্পাই থ্রিলার ধাঁচের ওই ছবিতে কবরীর চরিত্র সহজ-সরল তরুণীর। ছবির মেজাজের সঙ্গে বিপরীত একটা চরিত্রে ভীষণ নজর কাড়েন তিনি। তার ঠোঁটে ছিল বিখ্যাত গান ‘মনের রঙে রাঙাবো’। আর অলিভিয়া হাজির হয়েছিলেন সেনসেশনাল ‘ও রানা’ নিয়ে।

২০১১ সালে এক সাক্ষাৎকার থেকে কবরীর মুখে মিষ্টি হাসির কদরের সাক্ষ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন, “এখনো দেখা হলে কেউ কেউ বলে, ‘আপনি ঠিক আগের মতোই আছেন।’ কিন্তু কেউ কি কখনো একরকম থাকতে পারে! তখন আমি তাকে বলি যে আপনি আমাকে ভীষণ ভালোবাসেন বলেই এ রকম মনে হয়।”

ঠিক এ কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কবরীর মৃত্যুর খবরে মাঝরাতে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তার হাসি, সহজ ও পড়শিসুলভ অভিব্যক্তি ও অভিনয়ের কথা টানছেন তারা।

কবরীর সম্পর্কে চিত্র সাংবাদিক মাহমুদা চৌধুরী বলছিলেন, “মিষ্টি মেয়ে’ ছাড়া তিনি ‘পাশের বাড়ির মেয়ে’ হিসেবেও খ্যাত ছিলেন। কারণ তার চেহারায়, আচরণে, অভিনয়ে সেই বিষয়টা ছিল। খুব বেশি মেক আপ করতো না, এমনকি চুলটাও একদম সাধারণ একটা মেয়ের মতো রাখতো। যার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে খুব আপন হয়ে ধরা দিতো।”

সিনেমার সাবলীলতার সূত্র অনেকে ব্যক্তি কবরীর মাঝেও খুঁজে পেয়েছেন। তাকে নিয়ে এ প্রজন্মের নির্মাতা তাসমিয়াহ আফরিন মৌ ফেসবুকে বলছিলেন, “কবরী আপার সঙ্গে কাজের সূত্রে পরিচয়। তার বাসায় দুইবার শুটিং করেছি। আমার আগের অফিসের কাছেই তার বাসা ছিল। মাঝে মাঝেই বাসায় ডেকে নিতেন। খুব নিঃসঙ্গ ছিলেন, তার তরুণ মনটি সব সময় একজন সঙ্গী খুঁজত। এমনিতে বেশ মেজাজ দেখালেও তার সঙ্গে একটু বেশি মিশলেই ভেতরের নরম আর রোমান্টিক মনটাকে কিছুটা ধরা যেতো।”

১৯৫০ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামে জন্ম হয় কবরীর। আগেই বলা হয়েছে, তার আসল নাম ছিল মিনা পাল। ১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ ছবির মধ্যে দিয়ে সিনেমায় অভিষেক, সেসময়ই নতুন নাম হয় কবরী। সংসদ সদস্য নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাহ বেগম কবরী এ নামটি সামনে আসে।

সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সুতরাং’ কিশোরী কবরীকে রাতারাতি তারকা বানিয়ে দেয়। এরপর রংবাজ, নীল আকাশের নীচে, দ্বীপ নেভে নাই, দর্পচূর্ণ, সাত ভাই চম্পা, অরুণ বরুণ কিরণমালা, তিতাস একটি নদীর নাম, সুজন সখী, আরাধনা, ময়নামতি, সারেং বৌ, বধূ বিদায়, দেবদাস-সহ অসংখ্য ব্যবসাসফল ও ক্ল্যাসিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন। শেষবার নিজের পরিচালনায় ‘এই তুমি সেই তুমি’ ছবিতে অভিনয় করেছেন, কবরীর মৃত্যুতে সেই ছবি আপাতত অসমাপ্ত।

/লেখাটি দেশ রূপান্তরে পূর্ব প্রকাশিত


মন্তব্য করুন