Select Page

গিয়াস উদ্দিন সেলিম ও কাল্ট ক্লাসিক ‘মনপুরা’

গিয়াস উদ্দিন সেলিম ও কাল্ট ক্লাসিক ‘মনপুরা’

সালটা ২০০৯। টিভি চ্যানেলে অনেক আগ থেকেই শুরু হয়েছিল বিজ্ঞাপনটি-‘আসছে সোনাই-পরী যুগলের আবহমান প্রেমের ছবি গিয়াসউদ্দিন সেলিমের মনপুরা।’ মুক্তি পেয়েছিল সে বছরের ভ্যালেন্টাইন উপলক্ষে। তারিখটা ১৩ ফেব্রুয়ারি। প্রথম সপ্তাহে অল্প কিছু হলে মুক্তি পেলেও জনে জনে ছড়িয়ে গেল ছবির নাম। পরের সপ্তাহে অনেকগুলো হলে ছড়িয়ে পড়ল। তারপর একজন দর্শক একাধিকবার করে দেখেছে।

এমনি করে ‘মনপুরা’ হয়ে গেল দেশের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ব্যবসাসফল ছবি। ছবির জুটি সোনাই-পরী একটা ক্লাসিক আবেদনে সর্বমহলের দর্শকের মনে ঠাঁই পেল। মনে আছে অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু-র গাওয়া ‘নিথুয়া পাথারে’ গানটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক সবার মুখে মুখে ছিল। বাবুর গায়কীতে মুগ্ধ ছিল সবাই চূড়ান্ত রকমের হাইপ ছিল। চন্দনা মজুমদার আর কৃষ্ণকলির ‘যাও পাখি বলো তারে’ গানটির জনপ্রিয়তা ছিল আলাদা করে। তখন গ্রামের বিয়ের বাড়িতেও গানটি বাজাতে দেখেছি। রুট লেভেলের দর্শকের কাছেও গানের আবেদনটা পৌঁছে গিয়েছিল। অর্ণবের ‘আমার সোনার ময়না পাখি’ এ গানটি জনপ্রিয় ছিল তরুণ প্রজন্মের কাছে এমনকি ‘সোনাই হায় হায়রে’ চঞ্চল চৌধুরীর গাওয়া গানটিও। ছবি এবং গান সম্পূর্ণ আলাদা আবেদনে সর্বমহলের দর্শকের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। এমন ঘটনা খুব কম ঘটে। ছবির প্রচারণায় বড় বড় বিলবোর্ড ছিল ঢাকা এবং ঢাকার বাইরেও। মনপুরা’ ছবির ব্লকবাস্টার সাফল্যের পেছনে এর প্রচারণা একটা ভূমিকা রেখেছিল। প্রচারণাই ছবিকে সফল করতে পারে এটা সবসময়ের জন্যই সত্য। ‘মনপুরা’-র বিলবোর্ড প্রচারণার পাশাপাশি টিভিতে বিজ্ঞাপন, গান, ক্লিপ প্রচার হয়েছিল। এছাড়া ‘মনপুরা’ নাম সংলগ্ন টি-শার্ট বের হয়েছিল। ছবিতে পরিচালক গিয়াস উদ্দিন সেলিম-কে টি-শার্টটি পরতে দেখা গেছে। আজকাল নতুন ছবির প্রচারণা দেখা যায় না সেভাবে তাই সাফল্যও সেভাবে হয় না

টি-শার্টে ‘মনপুরা’ লেখা থাকত সেগুলোও প্রচারণার কাজে ব্যবহার হত। একটা টোটাল কমার্শিয়াল ভঙ্গিতে ছবিটির সবকিছু হয়েছে আর এভাবেই ‘মনপুরা’ ক্লাসিক হয়ে গেছে আজ।


টিভিতেও ‘মনপুরা’-র বিজ্ঞাপন যেত। সিনেমাহল গুলো শো-এর পর শো হাউজফুল ছিল। তখন সময়টা এমন ছিল এ ধরনের গ্রাম-বাংলার সহজ সরল গল্পের প্রেমের ছবি কম হত। চঞ্চল চৌধুরীর সাথে ফারহানা মিলির মতো নতুন মুখ তখন পরিচালককে দুশ্চিন্তাতেই ফেলেছিল অনেকটা। কিন্তু ছবি মুক্তির পরে পরীর প্রেমে খোদ দর্শকই পড়েছিল। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সবখানে বাজত। ছবির নির্মাণ, গান, অভিনয়, মানবিক আবেদন সবকিছু ছিল ভারসাম্যপূর্ণ তাই দর্শক চোখ বুজে গ্রহণ করেছিল। ঠিক এরকম গ্রাম-বাংলার বিশুদ্ধ প্রেমের ছবি অনেকদিন হয় না।

১৯৯৭ সালে ছবির গল্পটা লেখা হয়েছিল। প্রধান নারী চরিত্রের জন্য অফার দেন অভিনেত্রী আফসানা মিমি-কে। মিমি বলেছিল-‘এটা নাটকের গল্প, সিনেমার গল্প না, সিনেমা বানাও।’ তারপর পরিচালক সিদ্ধান্ত নেন সিনেমার জন্য। প্রথমবার ২০০৩ সালে উদ্যোগ নেন ছবিটি বানানোর কিন্তু হয়ে ওঠেনি তারপর বেশ কয়েক বছর অপেক্ষায় নির্মাণের পর ২০০৯ এ মুক্তি দেয়া হয়।

চঞ্চল চৌধুরীকে সোনাই চরিত্রের জন্য আগেই নেয়া ছিল। নায়িকা নিয়ে বিপাকে পড়েন পরিচালক। একদিন তাঁর অফিসের সামনে শাড়ি পরা ফারহানা মিলি-কে দেখে মুগ্ধ হয়ে মনে করেছিলেন পরী-কে পেয়ে গেছেন। তারপর কথা বলে রাজি করানো হয় মিলিকে। ছবিটি চলবে কিনা এ নিয়ে প্রযোজক-পরিচালক চিন্তায় ছিলেন। তারপর তো ব্লকবাস্টার হয়ে যায়। মাসের পর মাস চলেছিল।

পরিচালকের ইন্টারভিউ সূত্রে জানা যায়, সিনেমাহলে ছবিটি দেখার পরে প্রেমিক-প্রেমিকার জুটির মধ্যে অনেকেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কারণ তাদের যুক্তি ছিল ভালোবাসার মানুষকে তারা হারাতে চায় না। পরিচালক এরকম অনেককে চিনতেন যারা নিজে থেকে জানিয়েছেন যে ছবিটি দেখে তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়।

ছবির গল্পে সোনাই নামের চঞ্চল চৌধুরীকে খুনের দায় মাথায় নিয়ে মনপুরা নামের অজানা দ্বীপে থাকতে হয়। সেখানেই পরী নামের ফারহানা মিলির সাথে তার দেখা ও প্রেম হয়। তাদের দুজনের প্রথম দেখার সেই সংলাপ-‘অবলারে ঘর থেকে টাইনা নামাইলা পাথারে রাইতভর দু’চোখখের পাতা এক হয় না’ মানুষের মুখে মুখে ছিল। প্রেমের পর পারিবারিক বাধা ও পরীর অন্যের সাথে বিয়ের পর মৃত্যু এবং সোনাইর আর্তনাদ। এটাই ছিল ছবির গল্প। সাধারণ গল্পের অসাধারণ উপস্থাপনাতেই ছবিটি মানুষের মন জয় করেছিল।

‘মনপুরা’-র সাফল্য দেখে মাঝে মাঝে মনে হয় আজকের ইন্ডাস্ট্রির গতিপথ পরিবর্তন হতে পারে গ্রামীণ ছবি দিয়েই যদি এ ছবির মতো প্রেজেন্টেশন হয়। গিয়াস উদ্দিন সেলিমের মতো পরিচালকদেরই তা করতে হবে।


About The Author

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গত শতকে যেভাবে সমৃদ্ধ ছিল সেই সমৃদ্ধির দিকে আবারও যেতে প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখি। সেকালের সিনেমা থেকে গ্রহণ বর্জন করে আগামী দিনের চলচ্চিত্রের প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠুক। আমি প্রথমত একজন চলচ্চিত্র দর্শক তারপর সমালোচক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখি। দেশের সিনেমার সোনালি দিনের উৎকর্ষ জানাতে গবেষণামূলক কাজ করে আগামী প্রজন্মকে দেশের সিনেমাপ্রেমী করার সাধনা করে যেতে চাই।

Leave a reply