নব্বই দশকের ঈদের সিনেমা
নব্বই দশকে এসে ঢাকাই সিনেমার ঈদ বিশেষ মহত্ত্ব অর্জন করে। ঈদের ছবির প্রতি দর্শক, নির্মাতা, হল মালিক, সকল পক্ষেরই আগ্রহের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে। ঈদের জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকতে শুরু করে ইন্ডাস্ট্রি। ঈদের ছবিতে ঘটবে সেরা তারকা, সেরা পরিচালক আর সেরা প্রযোজকের সম্মেলন, এই প্রত্যাশায় দিন গুনতে থাকেন দর্শকও। ফলে ঈদের ছবি নিয়ে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতার সূত্রপাত হয়। প্রযোজকরা নিজেদের ছবি নিয়ে ঈদে আসার জন্য যেকোনও কিছু করতে প্রস্তুত হয়ে ওঠেন। এ কারণে ঈদের ছবি নিয়ে প্রযোজকদের মধ্যে বিরোধের মতো ঘটনা ঘটে। কখনও প্রশাসনকে হস্তক্ষেপ করতে হয়, কখনোবা সরকারের ওপর মহল থেকে চাপ প্রয়োগ করতে দেখা যায়। কয়েকটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তো রীতিমতো ঈদকে নিজেদের সম্পত্তি বলেই ভাবতে শুরু করে!

প্রথমে বলতে হয় এসএস প্রডাকশন্স আর আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেডের কথা। এমন কোনও বছর নেই যে বছর তারা ঈদে ছবি মুক্তি দেয়নি। নব্বই দশকের প্রত্যেক বছরেই তাদের সফল পদচিহ্ন রয়েছে। এই দুটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে ছাড়া নব্বই দশকের সিনেমার ঈদ ভাবাই যায়নি। নব্বই দশকে এসএস প্রডাকশন্স থেকে আসে ‘রাজার মেয়ে বেদেনী’, ‘অবুঝ সন্তান’, ‘দুঃসাহস’, ‘কন্যাদান’, ‘ঘাত-প্রতিঘাত’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘মেয়েরাও মানুষ’ এবং ‘স্বপ্নের পুরুষ’। আনন্দমেলা থেকে আসে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘স্বজন’, ‘জনতার বাদশা’, ‘অগ্নিসাক্ষী’ এবং ‘বিয়ের ফুল’।
এসএস প্রডাকশন্স ও আনন্দমেলা সিনেমা ছাড়াও একাধিক ব্যানারের দাপুটে উপস্থিতি ছিল নব্বই দশকে। এদের মধ্যে গীতি চিত্রকথা, জ্যাম্বস প্রডাকশন, মেরিনা মুভিজ, সনি কথাচিত্রের নাম বলতেই হয়। এর বাইরে দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর মধ্য থেকে কয়েকটি প্রযোজনা সংস্থা নিয়মিত ছবি নিয়ে আসতো ঈদে।
পরিচালকদের ঈদে সবচেয়ে তৎপর দেখা যেত দেলোয়ার জাহান ঝন্টুকে। তিনি প্রায় প্রতি ঈদেই ছবি নিয়ে আসতেন। ‘রূপসী নাগিন’, ‘জজ ব্যারিস্টার’, ‘কন্যাদান’, ‘বুকের ধন’, ‘হারানো প্রেম’, ‘প্রেম’ তার ঈদে মুক্তি পাওয়া ছবি। যে ঈদে তিনি নিজে আসতে পারতেন না, সেই ঈদে ভাই-ব্রাদার কাউকে নিয়ে আসতেন। হয় ইফতেখার জাহান আসতেন, নয়তো ইস্পাহানি আরিফ জাহান আসতেন। তাকে ছাড়া ঢালিউডের ঈদ প্রায় অসম্ভব ছিল।

ঝন্টুর পরেই আসবে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম। ‘উল্কা’, ‘তপস্যা’, ‘ক্ষুধা’, ‘সমর’ ইত্যাদি তার ঈদে মুক্তি পাওয়া ছবি। তরুণদের মধ্যে মনোয়ার খোকন নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে প্রতি বছর অন্তত একটি ছবি নিয়ে এসেছেন ঈদে। ‘সংসারের সুখ-দুঃখ’, ‘ঘাত-প্রতিঘাত’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘মেয়েরাও মানুষ’, ‘স্বপ্নের পুরুষ’ তার ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি। এর বাইরে সোহানুর রহমান সোহান, শহীদুল ইসলাম খোকন আর মোতালেব হোসেনও ঈদে নিজেদের ছবি নিয়ে দর্শকদের তৃপ্ত করতে এগিয়ে আসেন।
তারকাদের মধ্যে শাবানা নব্বই দশকে এসেও ঈদের প্রধান তারকা বলে বিবেচিত হন। প্রতি বছরই ঈদে তার উপস্থিতি নিশ্চিত। দুয়েকটি ঈদ ছাড়া প্রতি ঈদেই তার ছবি মুক্তি পেয়েছে। ১৯৯৬ সালে এক ঈদে তার চারটি ছবি মুক্তি পেয়ে রেকর্ড তৈরি করে। ‘তপস্যা’, ‘স্ত্রী হত্যা’, ‘বিদ্রোহী কন্যা’ আর ‘বিশ্বনেত্রী’ মুক্তিপ্রাপ্ত চারটি ছবিই ছিল সুপারহিট। এই রেকর্ড আজ অবধি কেউ ভাঙতে পারেনি। আলমগীর অনেক ছবিতেই তাকে সঙ্গ দিয়েছেন। কিছু ছবিতে জসীম ছিলেন। ঈদে জসীম-শাবানা জুটির ছবি দর্শক-প্রদর্শকদের কাছে আগ্রহের তুঙ্গে থাকতো।
পরের প্রজন্মের মধ্যে রুবেলের একাধিক ছবি ঈদে মুক্তি পেয়ে সাফল্য পায়। ইলিয়াস কাঞ্চনও নিয়মিত আসেন ঈদে। কিছু ছবিতে মান্নাকে দেখা যায়। দিতি-চম্পাও ঈদে ছবি নিয়ে আসেন। তবে নব্বই দশক মূলত তরুণ তারকাদের উপস্থিতিতে উজ্জ্বল। ঈদে অমর নায়ক সালমান শাহর কাছ থেকে আমরা পেয়েছি ‘তুমি আমার’, ‘দেনমোহর’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’র মতো সুপার-ডুপারহিট ছবি। ওমর সানী, মৌসুমী, শাবনূর, শাহনাজ, শাবনাজ- এই তরুণ তুর্কিরা নব্বই দশকের ঈদগুলো মাতিয়ে রাখেন। পুরনো আর নতুন তারকারা মিলে প্রচুর হিট-সুপারহিট ছবি বক্স অফিসে উপহার দিয়েছেন।

‘আজকের হাঙ্গামা’, ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘জজ ব্যারিস্টার’, ‘কালিয়া’, ‘বাংলার বধূ’, ‘হিংসা’, ‘স্বজন’, ‘ঘাত-প্রতিঘাত’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘বিয়ের ফুল’, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’, ‘জিদ্দি’, ‘রানী কেন ডাকাত’-এর মতো সুপারহিট সব ছবি খোদাই করা আছে নব্বই দশকের বক্স অফিসের ইতিহাসে।
এই ছবিগুলোর মধ্যে কিছু ছবি ২০-২৫টি সিনেমা মুক্তি পায়। কিছু ছবি ৪০-৫০টি হলেও মুক্তি পায়। অন্য সময় ২৫-৩০টি প্রেক্ষাগৃহে ছবি চললেও ঈদের সময় চাহিদা অনুসারে কোনও ছবি ৪০টি, কোনও কোনও ছবি অর্ধশতাধিক সিনেমা হলেও মুক্তি পাওয়ার রেকর্ড তৈরি করে। ঈদের বাইরে এত অধিকসংখ্যক প্রেক্ষাগৃহে ছবি মুক্তির রেকর্ড নেই।
নব্বই দশকের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলোর মধ্যে ফোক ছবির একেবারেই প্রাধান্য নেই। পোশাকি সিনেমার যুগ শেষ হয়ে যায় নব্বইয়ের শুরুতেই। বেশিরভাগ ব্লকবাস্টার ছবি সামাজিক ধারার। কিছু ছবি রোমান্টিক ঘরানার। সামাজিক অ্যাকশন ছবির হিট হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। আদ্যোপান্ত অ্যাকশন ছবি প্রচুর মুক্তি পেলেও বড় সাফল্য কম। তবে গড়সাফল্য মন্দ নয়। সুনির্মিত যেকোনও ধারার ছবিকেই দর্শকরা অভিনন্দিত করেছেন নব্বই দশকজুড়ে।






