পরিপূর্ণ ঈদ চলচ্চিত্র মনে হতেই পারে ‘রাক্ষস’
ঈদের দিন সন্ধ্যার শো তে হাউজফুল অডিয়েন্সের সাথে দেখা হলো ‘বরবাদ’খ্যাত পরিচালক মেহেদী হাসান হৃদয় এর ২য় সিনেমা ‘রাক্ষস’। যেখানে আমরা সিয়ামকে মুখ্য ভুমিকায় দেখতে পাই। সিয়াম এমন একজন নায়ক যার এতোদুর আসার পেছনের জার্নিটা আমরা খুব ভালো করেই জানি। ইউটিউবে জিরো বাজেট শর্টফিল্ম যখন করতেন তিনি, তখন থেকে তাকে আমি চিনি। পরে তিনি করলেন ভিকি জাহেদের ডিরেকশনে বাজেটওয়ালা শর্টফিল্ম, তারপর নাটক, অবশেষে জাজের হাত ধরে বড়পর্দায়। জাজ মাল্টিমিডিয়ার সবশেষ সফল আবিষ্কার তাকে বলা যেতেই পারে। কারণ এর পরে আর কেউ এই ঢালিউডের গরিবি দস্তরখানায় টিকে থাকতে পারেনি।

সিয়াম টিকে গিয়েছেন। রোম্যান্টিক ইমেজে নিজেকে আটকে রাখেননি, নিজের সুবিশাল নারী দর্শক বা ফ্যামিলি দর্শকের মাঝেও নিজেকে আর সীমাবদ্ধ রাখেননি। ধীরে ধীরে মুভ করেছেন মাস অডিয়েন্স ধরার দিকে। এই মাস অডিয়েন্স ধরার আরেকটি নতুন প্রচেষ্টা বলা যায় ‘রাক্ষস’কে। যেই নায়ককে আগে আমরা ভার্সিটির স্টুডেন্ট হিসেবে পেতাম, সে এই ছবিতে এখন ভার্সিটির প্রফেসর। ব্যাপক মাথাগরম লোক, যার শরীরে বয়ে বেড়ায় যোদ্ধাদের বৈশিষ্ট্য। আছে ‘দিয়া’ (সুস্মিতা চ্যাটার্জি) নামের এক ভালোবাসার মানুষ। যাকে জীবনসঙ্গী করতে গিয়েই শুরু হয় রুশোর (সিয়াম) লাইফে যত অশান্তি। জড়িয়ে পড়েন বড় এক মাফিয়াচক্রের আক্রোশে।
রুশো চরিত্রে সিয়ামের পারফরম্যান্স তাহলে কেমন ছিল? আচ্ছা, সিয়াম অনেক এফোর্ট দিয়েছেন। বরাবরের মতোই তার মধ্যে প্রচুর ডেডিকেশন লক্ষ্য করা গিয়েছে। তবে সত্যি কথা যদি বলি, ভালো লাউড এ্যাকটিং করতে পারাও এখনকার যুগে বলা যায় একটা আর্ট। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ একশোতে একশো, কিন্তু ডায়লগ ডেলিভারি করতে গেলে গলা ভেঙে যাচ্ছে, এরকম পারফরম্যান্স দেখতে একটু খাপছাড়াই লাগে। ‘রাক্ষস’-এ সিয়ামের পারফরম্যান্স দেখলে আরো বেশি করে ফিল হয় ‘বরবাদ’ এ শাকিব খানের পারফরম্যান্সের কথা। লোকটা একা কাঁধেই পুরো সিনেমা টেনেছিল। এরকম পরিণত পারফরম্যান্স সিয়ামের কাছ থেকে পেতে হলে আমাদের হয়তো আরো সময় অপেক্ষা করতে হবে।
সিয়ামের বিপরীতে নায়িকা হিসেবে ঢালিউড অভিষেক হলো ভারতীয় নায়িকা সুস্মিতা চ্যাটার্জির। জিতের বিপরীতে ‘চেঙ্গিজ’, ‘মানুষ’ এ তাকে দেখেছিলাম। এখানে তার স্পেস খুব বেশি ছিল না। কোলকাতার একসেন্ট যদি ইগনোর করি তাহলে তার পারফরম্যান্স মোটামুটি ভালো ছিল।সাদনিমা বিনতে নোমান অনেকটা অতিথি চরিত্রে বড়পর্দায় অভিষেক করলেন। সোহেল মণ্ডলকে প্রথমবার শতভাগ ভিলেনরূপে দেখতে পেলাম, তার স্ক্রিনপ্রেজেন্স পুরোই ঝাঁকানাকা, কিন্তু লাউড একটিং যেখানে লাগবে সেখানে তার পারফরম্যান্স আপ-ডাউন করেছে। আরেক ভারতীয় অভিনেতা শাতাফ ফিগার ছিলেন প্রধান ভিলেন চরিত্রে। ‘বরবাদ’ এর মতো এখানেও খলচরিত্রের স্ক্রিনটাইম কম ছিল, তবে এখানে শাতাফ ফিগারকে উদ্ভট কোনোকিছু করতে দেখা যায়নি এটাই সর্বোচ্চ স্বস্তির ব্যাপার।

অন্যান্য চরিত্রের মধ্যে আলীরাজ ও সুজাতাকে অনেকদিন পর একটু মনে রাখার মতো কোনো চরিত্রে দেখা গেলো৷ পরিচালক মেহেদী হাসান হৃদয় ‘বরবাদ’ ও ‘রাক্ষস’ এর মাঝে কিছু বিশেষ কারসাজিতে কানেকশন তৈরি করেছেন, যার ফলে এটি একটি ভায়োলেন্স ইউনিভার্স হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ‘জিল্লু’ চরিত্রে অভিনয় করা ভারতের শ্যাম ভট্টাচার্য হলেন এই ইউনিভার্সের অন্যতম সেতুবন্ধন। কানেক্ট করাটা জোরপূর্বক লাগেনি, তবে খুব যে জবরদস্ত হয়েছে সেটাও বলতে পারছি না। মোটামুটি ঠিকঠাক ছিল।
সিয়ামের অন্যান্য চলচ্চিত্রের তুলনায় ‘রাক্ষস’ এর আয়োজন যে বেশ বড়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রিয়েল এনার্জি প্রডাকশন আমাদের যা প্রমিজ করেছিল, সেটাই পর্দায় দেখতে পাওয়া গিয়েছে। আয়োজনের দিক থেকে ‘বরবাদ’ অপেক্ষা কোনো অংশে কম মনে হয়নি ‘রাক্ষস’কে। তবে ক্যামেরার কাজ বা এডিটিং বেশ সাধারণ ঘরানার মনে হয়েছে। আরেকটু ক্রিয়েটিভিটি দেখানো যেতো। এরূপ সমালোচনা আমার হৃদয়ের ডিরেকশন নিয়েও আছে। চাইলে স্ক্রিনপ্লেতে আরেকটু ডিটেইলিং বাড়িয়ে আরো জোরালো করা যেতো, আরো বেশি ইমপ্যাক্টফুল হতো। সংলাপ রচনা সেদিক থেকে বেশ ভালোই হয়েছে। মাস অডিয়েন্সের ভালো লাগবে এরকম ভালো কিছু পাঞ্চলাইন ছিল। তবে টেকনিক্যাল সাইডে একরাশ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন এ চলচ্চিত্রের বিজিএম দেয়া আরাফাত মহসিন নীধি। খুবই প্রাণহীন মিউজিক, ম্যাক্সিমাম সিকোয়েন্স সমতলভাবে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় থাকে এই প্রাণহীন একঘেয়েমিতে ভরা মিউজিকের জন্য।
সিনেমার শেষদিকে ছোটখাটো কিছু টুইস্ট রাখা হয়েছে, যা এই ইউনিভার্সের ভবিষ্যৎ বিল্ডাপের দিকে ইঙ্গিত দেয়। ভালো দিক মন্দ দিক সবকিছু মিলিয়ে চলচ্চিত্রটি একটি পরিপূর্ণ ঈদ উৎসবের চলচ্চিত্র মনে হতেই পারে, একবার আরাম-আয়েশ করে দেখা যায়। আবার যারা রেগুলার এ ধরনের চলচ্চিত্র দেখে অভ্যস্ত তাদের কাছে লাগতে পারে ক্রিঞ্জ। সবকিছু নির্ভর করছে কার কি ভালোলাগে, তার ওপর!






