Select Page

প্রাইম টাইমে মাহিয়া মাহি : কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল

প্রাইম টাইমে মাহিয়া মাহি : কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল

শুধু বাংলাদেশ না বরং ভারতীয় উপমহাদেশেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে রাজত্ব চলে নায়কদেরই বেশি। নায়কসর্বস্ব আধিপত্যের ইন্ডাস্ট্রিই মানুষের মুখে মুখে বেশি চর্চিত হয় এবং এটাকেই অধিকাংশ দর্শক বেঞ্চমার্ক মনে করে। এরপরেও সব ইন্ডাস্ট্রিতে নায়িকাদের রাজত্ব কিছুটা হলেও থাকে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দারুণভাবেই থাকে।

আমাদের দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কথা বললে নায়ক আধিপত্যের পাশাপাশি নায়িকাদের আধিপত্যও একটা সময় রমরমা অবস্থায় ছিল। শাবানা, ববিতা, কবরী, রোজিনা, দিতি, চম্পা, মৌসুমী, শাবনূর-রা তাদের প্রাইম টাইমে আধিপত্য দেখিয়েছিল। কিন্তু ২০১০ পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল ছবির যাত্রায় নায়িকাকেন্দ্রিক আধিপত্যের কোনো সুযোগই যেন আর ছিল না এমন একটা পরিস্থিতি ছিল। শাকিব খানকেন্দ্রিক একক নায়কসর্বস্ব আধিপত্যের বাজারে ২০১৩ সালে জাজ মাল্টিমিডিয়ার আবিষ্কার হিসেবে মাহিয়া মাহি নামের নতুন নায়িকার আগমন ঘটে। আর তার মাধ্যমেই নায়িকাকেন্দ্রিক একটা ক্রেজ তৈরি হলো যেটা ছিল ইউনিক ব্যাপার।

মাহী কেন গুরুত্বপূর্ণ তার প্রাইম টাইমে?


যে সময়ে ইন্ডাস্ট্রির রমরমা অবস্থা ছিল ৩৫ মিলিমিটারের সময় তখন প্রতিযোগিতা ছিল মারাত্মক। ডিজিটাল সময়ে ৩৫ মিলিমিটারের তারকাদের মধ্যে শাকিব খান বাদে আর কেউ সেভাবে থাকল না যার জন্য সবটাই নায়ককেন্দ্রিক হয়ে গিয়েছিল। দেখা যেত ঈদে শাকিবেরই ৩/৪টা ছবি মুক্তি পাচ্ছে মান যেমনই হোক না কেন, নায়িকাদের যেন কিছুই করার নেই। সেই পরিস্থিতিতে মাহী নতুন একটা উদাহরণ তৈরি করল। মাহীর নামে ছবি চলা শুরু হলো। আলাদা ক্রেজ তৈরি হলো। শাকিব খান বহাল তবিয়তে থাকার পরেও সেটি ঘটেছে। মাহীর জন্য এটা ছিল স্পেশাল কিছু।

মাহীর প্রাইম টাইমকে ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বলা যায়। এ সময় মুক্তিপ্রাপ্ত মাহীর ছবিগুলোতে বেশিরভাগ ছবিতেই মাহীর ক্রেজ ছিল বেশি। নায়ক থাকার পরেও মাহী বেশি আলোচিত হয়েছিল।
এ সময়ে তার উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো ছিল :
ভালোবাসার রং, অন্যরকম ভালোবাসা, পোড়ামন, ভালোবাসা আজকাল, তবুও ভালোবাসি, অগ্নি, দবির সাহেবের সংসার, অনেক সাধের ময়না, দেশা দ্য লিডার, রোমিও বনাম জুলিয়েট, ওয়ার্নিং, অনেক দামে কেনা, হানিমুন, ঢাকা অ্যাটাক।

ছবিগুলোর মধ্যে লেডি অ্যাকশন ছবি হিসেবে ‘অগ্নি’ ছিল সেরা। মাহীর নামই দর্শকের কাছে ‘অগ্নিকন্যা’ হয়ে গিয়েছিল। ছবিতে মাহীর অপারেশনের সিনগুলো একজন নিউকামার নায়িকা হিসেবে অসাধারণ কিছু ছিল। গ্ল্যামার ও রিভেঞ্জ’-এর ধামাকাদার পারফরম্যান্স ছিল। প্রথম ছবি ‘ভালোবাসার রং’ ছবির গানগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এ ছবির অসংখ্য বিলবোর্ডে মাহীর লুক ছিল দেখার মতো। ‘পোড়ামন’ ছিল মাহীর ওয়ার্ড অফ মাউথ ছবি। এ ছবির ক্রেজও ছিল দেখার মতো। ছবিতে মাহীর প্রেম ও করুণ পরিণতির জন্য দর্শকের মনে ছবিটি জায়গা করেছিল। শাকিব খানের বিপরীতে ‘ভালোবাসা আজকাল’ ছবির স্মার্ট লুকের মাহী ছিল গ্ল্যামারাস। শাকিব খানের বিপরীতে নিজেকে প্রমাণ করেছিল এ ছবিতে। ‘অন্যরকম ভালোবাসা, দবির সাহেবের সংসার’ ছবিগুলোতে কমেডির মাধ্যমে কাজের ভেরিয়েশন আনতে পেরেছিল। ‘দেশা দ্য লিডার’ ছিল উল্লেখযোগ্য ছবি। যৌথ প্রযোজনার ‘রোমিও বনাম জুলিয়েট’ ছবিতে মাহীর গ্ল্যামারাস উপস্থিতি ছিল, অঙ্কু্শের বিপরীতে মাহীর পারফরম্যান্স ছিল দারুণ। ‘ঢাকা অ্যাটাক’ মাহীর প্রাইম টাইমের শেষের দিকের ছবি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

মাহীর ক্রেজের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল গান। মাহী গানের মধ্যে গ্ল্যামারের পাশাপাশি অভিনয়েও ভালো করেছিল তাই হিট গান ছিল বেশ। ‘ভালোবাসার রং’ ছবির ‘ভালো লাগার চেয়ে একটু বেশি, গভীরে আরও গভীরে’; ‘পোড়ামন’ ছবির ‘জ্বলে জ্বলে জোনাকি দিয়ে যায় আলো, পোড়ামন পোড়ামন তোর প্রেমে পোড়ামন, বিধাতা জানে’; ‘অন্যরকম ভালোবাসা’ ছবির ‘আকাশ বাতাস সাক্ষী রেখে’; ‘তবুও ভালোবাসি’ ছবির ‘সোনালী কাবিন’; ‘ভালোবাসা আজকাল’ ছবির ‘এই প্রথম একটি মুখ, আজকাল অথবা পরশু নয়, স্বপ্ন দেখি’; ‘অগ্নি’ ছবির ‘আমি অগ্নি আমি ধ্বংস, তুমি দেখো শ্রাবণের মেঘ’; ‘দবির সাহেবের সংসার’ ছবির ‘লজ্জাবতীরে ছুঁইলে, ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’; ‘ওয়ার্নিং’ ছবির ‘ফেসবুক, শোনো তুমি, এক্সকিউজ মি’, ‘হানিমুন’ ছবির ‘ভালো না বাসলে বোঝা কি যায়’, ‘ঢাকা অ্যাটাক’ ছবির ‘টুপটাপ’; ‘রোমিও বনাম জুলিয়েট’ ছবির ‘বেখেয়ালি মনে, মাহিয়া মাহী’ গানগুলো মাহীর প্রাইম টাইমের জনপ্রিয় গান। ‘তুই আমার মাহিয়া মাহী মাহিয়া’ এ গানটির কথা যদি বলা যায় তবে নায়িকাদের নাম নিয়ে আমাদের চলচ্চিত্রে গান সেভাবে নেই, মাহীরই হয়েছিল। মাহীর ক্রেজের একটা দিক ছিল এটাও।

কম সময়ের মধ্যে পুরস্কারও পেয়েছিল।
বাচসাস পুরস্কার :
ভালোবাসা আজকাল (২০১৩)
দেশা দ্য লিডার (২০১৪)
মেরিল প্রথম আলো :
অগ্নি (২০১৪)

মাহীর অভিনয় নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু মাহীর মধ্যে সেই কোয়ালিটি ছিল যেখানে অভিনয়ে কিছু দুর্বলতা থাকার পরেও গ্ল্যামার ও পর্দায় নায়িকাসুলভ অ্যাটিটিউড শতভাগ দিয়েই নিজেকে কাভার করতে পারত। এ গুণের জন্যই ডিজিটাল ছবির প্রথম সফল নায়িকা হতে পেরেছে। নায়ককেন্দ্রিক চেনা-পরিচিত আধিপত্যের বাইরে মাহী যে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে পেরেছিল এটাই তার ক্যারিয়ারের অর্জন হয়ে থাকবে।


About The Author

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গত শতকে যেভাবে সমৃদ্ধ ছিল সেই সমৃদ্ধির দিকে আবারও যেতে প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখি। সেকালের সিনেমা থেকে গ্রহণ বর্জন করে আগামী দিনের চলচ্চিত্রের প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠুক। আমি প্রথমত একজন চলচ্চিত্র দর্শক তারপর সমালোচক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখি। দেশের সিনেমার সোনালি দিনের উৎকর্ষ জানাতে গবেষণামূলক কাজ করে আগামী প্রজন্মকে দেশের সিনেমাপ্রেমী করার সাধনা করে যেতে চাই।

Leave a reply