‘প্রেশার কুকার’ প্রত্যাশার আয়নায় দেখা রায়হান রাফীর মুখ
‘প্রেশার কুকার’ হয়তো দুর্দান্ত সিনেমা না, তবে বেশ ভালো। টানা বাণিজ্যিক সাফল্য ও দর্শক-প্রযোজকের প্রত্যাশাজনিত চাপে থাকা রায়হান রাফীর জন্য এমন একটা কিছু দরকার ছিল—যেখানে নিজের নির্মাণভাষা, গল্প বলার কাঠামো ও সীমাবদ্ধতাকে নতুন করে যাচাই করতে পারেন। অবশ্য ‘প্রেশার কুকার’ খুব একটা ব্যতিক্রম নয়, এ ধারার গল্প তিনি আগে ওটিটি প্লাটফর্মে দেখিয়েছেন; এবার বড়পর্দায়।
সাধারণত আমরা যা করি; রাফীর সিনেমাকেও ভালো-মন্দ বা আলাদা আলাদা যেসব শব্দ আছে তা দিয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে। যে ব্যাপারটাও মনে রাখা যায়, নিমার্তার নামে বাংলাদেশে ‘সিনেমা চলার’ পুরোনো সেই দিন নাই। সেখানে প্রায় না থাকা ব্যতিক্রমের একজন রায়হান রাফী। ফলে, রাফীর প্রতি দর্শকের আগ্রহের পাশাপাশি সমালোচকরা যে মনোযোগ দেবেন; সেটা আর নতুন কী! এমন পরিসরে যথার্থ কারণ— রাফীর ভেতরে নিজেকে উৎরে যাওয়ার, পরখ করার বিষয় আছে সেটা আমরা দেখতে চাই। নইলে একজন নির্মাতা কীভাবে সমসাময়িক থাকেন। যেটা আগে বলেছি ‘সম্ভাবনা’ অর্থে। রাফী সব সময় সমসাময়িক থাকার চেষ্টা করেছেন। সেটা প্রপাগান্ডা হোক, সমাজকে একান্তভাবে দেখেন অথবা করপোরেট স্টুডিওর লেন্সে।

চার নারী চরিত্রকে ‘প্রধান’ করে নির্মিত ‘প্রেশার কুকার’। (রিজভী রাজু বাদ দিলে) পুরুষ চরিত্রগুলো তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক ও সহযোগী বা কমিক রিলিফ। প্রচারণায় যেভাবে নারী চরিত্রগুলোর গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল, পর্দায় তাদের চরিত্রভেদে তাদের উপস্থিতিতে ফাঁক তৈরি দেখা যায়। দর্শক এখানে কিছুটা বিভ্রান্ত হন। নাজিফা তুষি তার চরিত্রায়নে পাওয়া সুযোগ পুরোটাই ব্যবহার করলেন। প্রশ্ন থেকে যায়—চরিত্র বিনির্মাণে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার এ ব্যবধান কি নির্মাতার দায় থেকে পুরোপুরি মুক্ত? এটি বিশ্বস্ততা ও গল্প-পরিকল্পনার প্রশ্নও।
যেহেতু গল্পের প্রসঙ্গ; রায়হান রাফী ও তার সঙ্গীদের কিছু প্রশংসা করা যাক। টানটান গল্প, চোখা সংলাপ, পরিমিত হিউমার, সংগীতের চমৎকার ব্যবহার ও অভিনয়ের নানা স্তর মিলিয়ে ‘প্রেশার কুকার’ বিশ্বাসযোগ্য গল্প হয়ে থাকে। বিশেষ করে নাটকীয় আবহের মধ্যে ইমোশনাল দৃশ্যগুলো বাকি সব খামতির আবছা করে দেয়। এছাড়া পারভার্ট চরিত্র উপস্থাপন এবং দর্শককে পারভারসনে প্রলুব্ধির যে সুক্ষ ফাঁক আছে, তা অনেকটা রক্ষা করা গেছে মনে হলো।
‘প্রেশার কুকার’ তারেক মাসুদকে উৎসর্গ করেছেন রায়হান রাফী। সম্ভবত আলাদা দুই প্রজন্মের এ নির্মাতাদের বেড়ে ওঠার একটা মিল আছে। দুজনই মাদ্রাসায় পড়েছেন, কিন্তু তাদের বিলং করা শ্রেণীর সঙ্গে এর তফাৎও রয়েছে। তারেক মাসুদের মতো বেড়ে ওঠার ছাপ রাফীর কাজের মধ্যে রয়েছে। যদি সমালোচনা আকারে বলি, এ দেখায় সুক্ষতা ও তীক্ষ্ণতা বিবর্জিত। রাফী ধর্মকে সামাজিক কাঠামোর বাইরে এনে একধরনের ব্যক্তিগত অনুভব হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। কিন্তু ব্যক্তিগত খোদা কতটা ইতিহাস-সংলগ্ন? এ ব্যক্তিকরণ অনেক সময় ধর্মের সামষ্টিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে সংকুচিত করে ফেলে। অন্তত প্রচলিত ফর্মের সিনেমা আর (ইসলাম) ধর্মের সামাজিক যে দূরত্ব এবং অবশ্য আধুনিকতার সঙ্গে দূরত্ব সেখানে ধর্মের কালেক্টিভ জায়গাটা বোধহয় অস্বস্তিকর। এ ভয়ের হেতু যে নাই এমন না। ফলে রাফীর চলচ্চিত্রে ধর্ম একদিকে যেমন ব্যক্তিগত সত্য হয়ে ওঠে, অন্যদিকে তা খণ্ডিতও মনে হয়। কিন্তু সমাজ ও ধর্মচর্চার পচন যদি একইসঙ্গে ঘটে তাকে আমরা এড়িয়ে যায় কীভাবে? সেই অর্থে ধর্ম ব্যক্তি পরিসরে সংকুচিত হয়-ই।

রাফীর প্রথম সিনেমা ‘পোড়ামন ২’ সালমান শাহকে ট্রিবিউট দেয়া। ওই সিনেমায় সালমান যেভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তা ট্রিবিউট আকারে চমকে দেয়। কিন্তু আমরা যে বাংলা সিনেমাকে বড় পরিসরে ভাবতে পারি না; তার উদাহরণ রাফীর আরেক সিনেমা ‘তুফান’। যৌথ প্রযোজনার ওই সিনেমায় ট্রিবিউট পেয়েছেন রজনীকান্ত।
যাই হোক, প্রসঙ্গ তো ‘প্রেশার কুকার’। সে বিষয়ে বলি। এ সিনেমায় তারেক মাসুদের পাশাপাশি আরেকটা ট্রিবিউট ছিল। একদম খাঁটি বাংলা সিনেমা বলতে যা বোঝায় তা। মোটামুটি কাল্ট মর্যাদা পাওয়া ‘পালাবি কোথায়’-এর একটা দৃশ্য রেফারেন্স আকারে হাজির করেছেন রায়হান রাফী। আর ‘পালাবি কোথায়’ ব্যবসাসফল না হলেও বাংলায় প্রতিনিধিত্বকারী সিনেমাগুলো কিন্তু নারীপ্রধান। ফলে ব্যবসায়িক অর্থে সফল না হয়েও বোধহয় অনুপ্রেরণা জোগাতে পেরেছে। এটি শুধু নস্টালজিক শ্রদ্ধা নয়, বরং একটি ঝুঁকিপূর্ণ পুনর্ব্যাখ্যা। বিশেষত শেষ ভাগে সেই দৃশ্যের ট্র্যাজিক পুনর্গঠন মূল সিনেমায় উপস্থাপিত কমেডির বাইরে নিয়ে গিয়ে একধরনের নির্মম পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়—যা নির্মাণগতভাবে শক্তিশালী সিদ্ধান্ত।
নির্মাতা হিসেবে রাফীর বাস্তবতা আর সামাজিক যে গল্প সেখানে ‘মাটির ময়না’র আনুর হাতে থাকা মাটির ময়না হয়ে যায় প্লাস্টিক। এটিও সুচিন্তিত পুনর্নিমাণ। কিন্তু এই যে পুনর্ব্যাখ্যা ঘটছে, সেই পরিবর্তন আসলে আমরা কতটা এস্তেমাল করি?
‘পালাবি কোথায়’ শব্দটা আরেকটু ধার নিতে পারি। রাফীর ধর্মপ্রশ্ন আর ধর্মভাব নিয়ে। যেখান থেকে তিনি পালাতে পারেন না। তার গল্পগুলো প্রায়শ নিয়তবাদী। ধর্ম মানুষের যে সম্ভাবনাকে জারি রাখে তার বিপরীতে ধর্মকে আমরা প্রায়শ সংকীর্ণ পরিণতি অর্থেই দেখি। আমাদের সমাজে কর্তৃত্ব অর্থে ধর্ম প্রায়শ বেহেশত-দোজগের ফেরি করে। রাফী তার সিনেমায় ধর্মকে ব্যক্তিগত পরিসরে যথাযথ অর্থে দেখালেও গল্প বিন্যাস ও পরিণতি প্রায়ই সেদিকে আগায়। এটা অদ্ভুত নয়, বরং দেখার সীমাবদ্ধতা বলে মনে হয়। ‘প্রেশার কুকার’-এর গল্প রাফী অন্যান্য কাজ থেকে এগিয়ে থাকলেও একই বৃত্তে পড়ে। শুধু তাই নয়, এটা বাংলাদেশ বা উপমহাদেশীয় ঘারানার সিনেমার একটা প্রটোটাইপও বটে। যেখানে সবাই কর্মফল ভোগ করে। এরপর কি জীবনের কোনো মানে থাকে না, বা জীবন কি কোনো সুযোগ দেয় না। এ নিয়তিবাদীতার আমার কাছে রায়হান রাফীর সীমাবদ্ধতা মনে হয়। তার বোধহয় মানুষ ও তার জীবনের পরিসরকে আরো বহুমুখী, ব্যাপ্ত ও সম্ভাবনার দিক থেকে দেখার সময় এসেছে। এটা বোধহয় খানিকটা আলাদা যে, রাফীর এ সিনেমার চরিত্রগুলো কর্মফল ভোগ করে বটে, তবে তা যতটা না ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, তার তুলনায় সামাজিক ব্যর্থতা। সেই প্রশ্ন যদি আরো চোখাভাবে তোলা না যায়, গল্পের গভীরতা হারায় বটে।

‘প্রেশার কুকার’কে নিজের সিনেমা জার্নির জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ একটা বাঁক মনে করছেন রাফী। কেন এমনটা মনে হলো? এ সিনেমা পাঁচটি ভাগে বিভক্ত। পরাণ, সুড়ঙ্গ, তুফান, তাণ্ডব ও কর্মফল। এর মধ্যে প্রথম চার শিরোনাম রাফীর সর্বশেষ চার হিট সিনেমার নাম থেকে নেয়া। কেন পোড়ামন, দহন বা দামাল নয়? যাই হোক, চরিত্রের নাম বিশেষ করে তুষি চরিত্রের নাম ‘রেশমা’ থেকে ‘পাখি’ হয়ে ওঠা ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমার লোভী নায়িকা ও তার পরিণতির দিক নির্দেশ করে। আবার ‘পরাণ’-এর অনন্যা এসেছে ভিন্ন ধরনের ইনোসেন্সের রূপ ধরে, যেখানে ‘পরাণ’ নারীবিদ্বেষী উপমাও পেয়েছিল। প্রশ্ন হলো, রাফী কেন নিজের সিনেমাকে আশ্রয় করে গল্প বুনলেন? এটা বোধহয় অন্য ফর্মে নিজের সৃষ্টিকে রিভিজিট করা এবং একইসঙ্গে নির্মাতা হিসেবে রাফী আসলে কী পারেন সেই চ্যালেঞ্জ নেয়া। আগেই বলেছিলাম যে, এর আগে পর্দায় তিনি যে ধরনের গল্পে সাফল্য পেয়েছেন তার চেয়ে আলাদা কিছু ‘প্রেশার কুকার’। একই সঙ্গে তা যদি ক্যারিয়ারের খতিয়ানও হয়; সেটা আমরা অ্যাপ্রিসিয়েট করি।
এর আগে রাফীর সাম্প্রতিক সাফল্য নিয়ে আমার ধারণা ছিল, চমক আর গিমিকের কাছে তিনি আত্মসমর্পন করেছেন। ‘প্রেশার কুকারে’ সেই আশঙ্কা তিনি কাটিয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে শবনম বুবলি অভিনীত চরিত্রে পুরোনো সেই ব্যাধি কিছুটা চোখে পড়ে। কারণ বাংলাদেশে গ্যাংস্টার ও পলিটিক্যাল কালচার নিয়ে এখনো যে গল্প দেখি তা মোটামুটি ভাসাভাসা ও সারবিহীন। এ সিনেমার সেই অংশগুলো আবার তা চোখে দেখিয়ে দেয়।






