Select Page

সিস্টেমকে নাড়িয়ে দেওয়া কেন্দ্র ও পরিধির ওসি হারুন

সিস্টেমকে নাড়িয়ে দেওয়া কেন্দ্র ও পরিধির ওসি হারুন

‘মহানগর ২’ সিরিজ যেকোনো অ্যাঙ্গেল থেকে বিশ্লেষণে গেলেই লক্ষ্য হয়ে ওঠে মোশাররফ করিম বা ওসি হারুন। কেন্দ্র বলেন বা পরিধি বলেন মোশাররফ করিমই সর্বেসর্বা। সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ জানানো ওয়ান ম্যান আর্মি।

‘মহানগর ২’-কে বিশ্লেষণের জন্য প্রথম কিস্তির কথা একটু পাড়তে হবে নিয়ম রক্ষার জন্য হলেও। আগের পর্বে মোশাররফ করিম ব্যবসায়ীর ছেলে আফনান চৌধুরী বা শ্যামল মওলার কেসটি হ্যান্ডেল করার পর ডিবি পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায় জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য।

পরিচালক আশফাক নিপুণ এই গল্পকে দ্বিতীয় কিস্তিতে পুরোপুরি মোশাররফ করিম বা ওসি হারুনকেন্দ্রিক করেছেন। কেন্দ্রবিন্দুও সে-ই আবার পরিধিও সে-ই।

ওসি হারুনের সমস্ত পরিশ্রম, বুদ্ধি বা দর্শনের মৌলিক উদ্দেশ্য একটাই সিস্টেম পরিবর্তন করা এবং সেটি সিস্টেমের মধ্যে বাস করেই। সে নিজেও খুব ভালোমতো জানে যে তিনি নিজেই সেই সিস্টেমেরই একটা অংশ তাহলে কি সম্ভব এটা পারা? মোশাররফ করিম প্রথম কিস্তিতে একাই উল্টোপথে যাত্রা করেছিল যেখানে জাকিয়া বারী মম কিংবা মোস্তাফিজুর নূর ইমরানের চরিত্র দুটি তার বিপক্ষে কারণ তারা যা চাচ্ছে ওসি হারুনের সাথে সেটার দ্বৈরথ হয়ে যাচ্ছিল বিশেষ করে মোস্তাফিজুর তো শেষে মোশাররফ করিমকে ডিবিরা নিয়ে যাবার সময় বলেই দিয়েছিল-‘স্যার, এভাবে তো চলতে পারে না’ আর মোশাররফের উত্তর ছিল ‘এই খেলা এখানেই শেষ না। তোমরা যা চাইছ আমি তো সেটাই চাইছি কিন্তু অন্যপথে।’ অন্যপথের সেই চেষ্টাটাই ওসি হারুনকে বাকি চরিত্রগুলোর থেকে একাই ভিন্ন চরিত্রে পরিণত করেছে। সিস্টেম পরিবর্তন করতে পেরেছে কিনা সেটা বড় কথা নয় তবে সিস্টেমকে নাড়িয়ে দিতে সে পেরেছে।

‘মহানগর ২’-তে এসে সেই ওসি হারুনই কেন্দ্রবিন্দু যে তার বুদ্ধিমত্তায় নিজের পরিধিকেও সামলে নিয়েছে। আর এ প্রক্রিয়াটি ঘটেছে দুইটি উপায়ে :

১. ইন্টারগেশনে মোশাররফর করিমকে জেরা করা দুজনের সাথে মাইন্ড গেম খেলে ওসি হারুন বা মোশাররফ করিম। মোশাররফ তাদের সাইকোলজি বুঝে তারপর তাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়। তাদের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে মোশাররফকে যেকোনো উপায়েই হোক আটকে দেওয়া তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা সেজন্য তার অতীতকে ঘাঁটানো শুরু করে তারা আর মোশাররফ তাদেরকেও চ্যালেঞ্জ করে কারণ সে কোথায় আছে, কেন তাকে এসব জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এটা সে আগে নিশ্চিত হতে চায়। ইন্টারগেশনের দুজন যে তাকে অপরাধী ভেবেই বসে আছেন এটাই তাদের সমস্যা তাই মোশাররফ চাইলেও তার জবানবন্দিতে সত্য কথাটা বলতে পারবে না বলে জানায়। খুবই সূক্ষ্মভাবে মোশাররফ সাইকোলজির খেলা খেলে।

২. মোশাররফ করিম তার অবস্থান ক্লিয়ার করার জন্য বাইরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে। বাথরুমে গিয়ে কথা বলার মতো পরিস্থিতি তৈরি করার মতো সক্ষমতা সে দেখিয়ে দেয়। এটাও সিস্টেমকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর একটা অংশ। যেভাবে রাজনৈতিক বড় বড় নেতারা বন্দি অবস্থায়ও আয়েশী জীবনযাপন করে এবং নিজের নেটওয়ার্ক সচল রাখে ঠিক সেই বিষয়টাই ওসি হারুনের চরিত্রে মোশাররফ করিম দেখিয়ে দেয়। তাকে কেন্দ্র করে যে ইন্টারগেশন চলছে সেটিকে চ্যালেঞ্জ করতে সে তার নিজের পরিধি সামলে নেয় কারণ তার আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি প্রবল।

‘মহানগর ২’ এর ক্লাইমেক্সে মোশাররফ করিমকে গুলি করা হয়েছে এটা যারা দেখেছে তারা সবাই জানে। কিন্তু প্রথম কিস্তিতে মোশাররফ করিমকে ডিবির ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় মোস্তাফিজুর নূর ইমরানের বলা সেই সংলাপ, ‘এখন স্যারকে কীভাবে বাঁচাব?’ মনে করে দেখুন তো আবার আফনান চৌধুরীর চরিত্রে শ্যামল মওলার দ্বিতীয় কিস্তিতে বলা সেই সংলাপ, ‘ওসি হারুন কই? ওরে আমার লাগবে’, এটাও মনে করুন এমনকি শেষ দৃশ্যে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের রহস্যময় উপস্থিতিকেও যদি দেখি তাহলে এই চতুর্ভুজ খেলার সমাধান কি হয়েছে? হয়নি তো। ‘মহানগর ৩’ তো এজন্যই প্রত্যাশিত।

আপাতত ওসি হারুনের সিস্টেম ভেঙে সিস্টেম গড়ার সাধনায় মোশাররফ করিমের সোয়াগ লেভেলকেই ‘মহানগর ২’ এর সেরা প্রাপ্তি হিসেবে সুখস্মৃতি মনে করে বাড়ি যাই।


লেখক সম্পর্কে বিস্তারিত

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গত শতকে যেভাবে সমৃদ্ধ ছিল সেই সমৃদ্ধির দিকে আবারও যেতে প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখি। সেকালের সিনেমা থেকে গ্রহণ বর্জন করে আগামী দিনের চলচ্চিত্রের প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠুক। আমি প্রথমত একজন চলচ্চিত্র দর্শক তারপর সমালোচক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখি। দেশের সিনেমার সোনালি দিনের উৎকর্ষ জানাতে গবেষণামূলক কাজ করে আগামী প্রজন্মকে দেশের সিনেমাপ্রেমী করার সাধনা করে যেতে চাই।

মন্তব্য করুন