দম: প্রতিটি শ্বাসই গুরুত্বপূর্ণ
একজন সাধারণ এনজিও কর্মী শাহজাহান ইসলাম নূর। ভাগ্যচক্রে তিনি বন্দি হন আফগানিস্তানের তালেবানদের হাতে। নূরের বিনিময়ে দাবি করা হয় তাদের এক নেতার মুক্তি, অথচ নূর সেই নেতা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এই অনিশ্চয়তা আর বন্দিদশা থেকে মুক্তির লড়াই নিয়েই নির্মিত হয়েছে রেদোয়ান রনি পরিচালিত এবং আফরান নিশো, পূজা চেরী, চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত সিনেমা ‘দম’।

বহির্বিশ্বের অনেক সার্ভাইভাল থ্রিলারগুলোর মতো ‘দম’-এর গল্পটিও ওয়ান-লাইনার। শুরুতে কিছুটা ধীরগতিতে এগোলেও মূল প্লটে ঢোকার পর সিনেমাটি আপনাকে পর্দার সামনে আটকে রাখবে। একজন বন্দি মানুষের অসহায়ত্ব এবং তার পরিবারের মানসিক অবস্থা পরিচালক এখানে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। নূর চরিত্রের সঙ্গে দর্শকের একটি গভীর সংযোগ তৈরি করতেও সফল হয়েছেন তিনি। আর বিরতির আগ মুহুর্তে গিয়ে এই সিনেমা যেনো একদমই দম ফেলার সুযোগ দেয়না। ভীষণ এনগেজিং একটা মোমেন্ট তৈরি করতে সক্ষম হয়। যদিও সেকেন্ড হাফে প্লটে কিছুটা চেঞ্জ আসে, গল্প অন্যদিকে শিফট হয়। এ অংশে যুদ্ধের ভয়াবহতা আর ইমোশনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, তবে ক্লাইমেক্সে একটি অতিরঞ্জিত সাবপ্লট কিছুটা তাল কাটলেও শেষটা ছিল বেশ তৃপ্তিদায়ক।
অভিনয়ের জায়গায় দম একদম শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে। নূর চরিত্রে আফরান নিশো অসাধারণ। পুরো সিনেমার বড় অংশজুড়েই তিনি উপস্থিত, আর বন্দি এক মানুষের মানসিক ও শারীরিক অবস্থাকে তিনি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে আবেগঘন দৃশ্যগুলোতে তার অভিনয় দীর্ঘসময় মনে থেকে যাওয়ার মতো। রাণী চরিত্রে পূজা চেরী নিজের জায়গায় যথেষ্ট সাবলীল। তার আবেগ প্রকাশ ছিল পরিমিত ও চরিত্রের সাথে প্রাসঙ্গিক। চঞ্চল চৌধুরী কম সময় পেয়েও নিজের দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। তালেবান চরিত্রে অভিনয় করা শিল্পীরাও যথেষ্ট ভালো কাজ করেছেন। ছোট একটি ক্যামিওতে জাহিদ হাসান-এর উপস্থিতিও মন্দ লাগেনি।

সিনেমায় মোট ৪টি গান রয়েছে। বহুদিন পর কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠ শুনতে পেরে নস্টালজিক ফিল করেছি। ইমরান-পারসার কণ্ঠে “কোথায় পাবো তাহারে” আমার প্লে-লিস্টের নতুন সংযোজন। বিশেষ করে পারসার ভয়েস এতো সুইট যে ওনার প্লে-ব্যাকে নিয়মিত হওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি। “দিন যে কাটেনা” শিরোনামের গানটাও ভীষণ সোলফুল। সিনেমার শেষে ব্যবহৃত নজরুলগীতি “দুর্গম গিরি প্রান্তর” একটা এনার্জেটিক ভাইব দিয়েছে। এছাড়াও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের কাজ ঠিকঠাক লেগেছে।
টেকনিক্যালি বেশ রিচ ‘দম’। কাজাখস্তানের সিনেমাটোগ্রাফার মিখাইল সিরিয়ানভের সিনেমাটোগ্রাফি চোখে আরাম দিয়েছে। দারুণ ভিজ্যুয়ালস্ ক্যাপচার করেছেন তিনি। কালার গ্রেডিং প্রিমিয়াম ফিল দিয়েছে।
তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। সিনেমা শুরুতে মূল প্লটে ঢুকতে ১৫-২০ মিনিটের মতো সময় নেয়। এসময়ে অনেকেই বোর হয়ে যেতে পারে। আবার পুরো সিনেমাজুড়ে স্ক্রিনপ্লে স্লো-ফাস্ট মুডে ওঠানামা করাটাও দর্শক হিসেবে ধৈর্যের পরীক্ষাই বটে। বিদেশী শিল্পীদের মুখে অসংখ্য ইংরেজি ডায়লগ রয়েছে। সেগুলোর জন্য কোনো সাবটাইটেল ব্যবহার না করায় এসব ডায়লগের সময় সাবটাইটেলের অভাব আমার মতো অনেকেই বোধ করেছেন। এছাড়াও একটা সাবপ্লট হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকে টেনে আনাটা অতিরঞ্জিতই লেগেছে। সিনেমার ক্লাইমেক্সে গিয়েও এই সাবপ্লট কোনো কানেকশন তৈরি করতে পারেনি। পাশাপাশি চঞ্চল চৌধুরীর কমিক রিলিফও কোনো কাজে আসেনি।
সবমিলিয়ে—এই ছিল আমার দৃষ্টিতে ‘দম’। ছোটখাটো কিছু দুর্বলতা থাকলেও, দুর্ধর্ষ অভিনয় আর ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতার জন্য ‘দম’ সিনেমাটি আপনার সময় উসুল করবে বলেই আমার বিশ্বাস।






