নব্বই দশকের স্টেশন ছেড়ে বনলতা এক্সপ্রেসে বাংলা সিনেমার নতুন জার্নি

বাংলাদেশে বড় আকারে নস্টালজিয়া বলতে হাজির হয় নাইন্টিজ। ল্যান্ডফোন, বই পড়া, একান্নবর্তী পরিবার, মহল্লার সময়; এইসব নাইন্টিজের ক্যারেক্টারের পরই আমরা ফিকশনে সবসময় ঢুকে পড়ি সমসাময়িক যুগে। যেখানে এই উপাদানগুলো বড় আকারে অনুপস্থিত থাকে। কিন্তু, নাইন্টিজের এক্সটেনশন হিসেবে বাংলাদেশে একটা সিগ্নিফিক্যান্ট সময় কেটে গিয়েছিলো। যখন বাটন ফোনগুলো আমাদের আস্তে আস্তে প্রাইভেট লাইফে নিয়ে যাচ্ছে, প্রেমের ধারণাগুলো পালটে যাচ্ছিলো, নাইন্টিজকে টিকিয়ে রাখার সর্বশেষ প্রচেষ্টা ছিলো সামাজিক উপাদানগুলোয়। সেই সময়টা আমাদের সিনেমায় বড় পরিসরে হাজির নেই। মানে সিনেমার তো একটা সময়কে ধরার ব্যাপার আছে, তো সেই সময়টাকে ধরা যায়নি। বনলতা এক্সপ্রেস এসে আমাদেরকে সেই সময়টায় ফিরিয়ে নিয়ে গেছে এই ঈদে। নব্বই দশকের শুরুর সেই সময়টা ছিলো নাইন্টিজ কিডদের বড় হওয়ার টাইম, জেনারেশনাল ট্রাঞ্জিশনের পিরিয়ড। তাদের সেই পিরিয়ডকে নিয়ে নির্মিত বনলতা এক্সপ্রেস। এই সিনেমা এমন এক সময়ের গল্প বলে গেলো, যে সময়টায় আমরা আর ফিরতে পারব না।
প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ এর ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাস অবলম্বনে এই সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন তানিম নূর। তানিমকে আমরা এর আগে ‘উৎসব’ সিনেমায় একজন ব্যক্তিকে ঘিরে বাংলাদেশের নানা ধরনের পারিবারিক গল্প বলতে দেখি। বনলতা এক্সপ্রেস সেখানটায় এসে হাজির হয়েছে ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসের সেই বিখ্যাত ট্রেন জার্নি নিয়ে, যেখানে হুমায়ুন আহমেদ একটি চলন্ত ট্রেইনকেই পরিবার হিসেবে হাজির করিয়ে দিয়েছিলেন দর্শকদের সামনে। কিছুক্ষণে আমরা বড় আকারে চারটি ইন্ডিভিজ্যুয়াল গল্প দেখতে পাই। মন্ত্রী আবুল খায়ের খান-সুরমা দম্পতি, মওলানা আজিজ-আফিয়া দম্পতি, চিত্রা-আশহাব-সাজেদার গল্প, গণিতবিদ আব্দুর রশিদের গল্প।

তানিম নূর সেই চারজনের গল্পের সঙ্গে আরো যুক্ত করেছেন যমুনা-ফয়সালের গল্প, শাকিল-জাফর-রুবির গল্প এবং মোস্ট ইম্পর্ট্যান্টলি একটি লাশের গল্প। এক শীতের রাতে তানিম নূরের সিনেমার ট্রেন বনলতা এক্সপ্রেসে চড়ে রাজশাহী যাওয়ার জন্য রওনা হয় এই ক্যারেক্টারগুলো। সেখানে শিক্ষামন্ত্রী খায়ের ও সুরমাকে ‘প্রেসিডেন্ট সেলুন কোচ’ বা বিশেষভাবে নির্মিত রেলের কামরায় তার সদ্য বিবাহিত শ্যালিকা যমুনা ও ফয়সালের আমোদ ফুর্তির আয়োজনে ব্যস্ত। দেখতে পাই এক মধ্য বয়স্ক দম্পতি আজিজ-আফিয়াকে, যেখানে আফিয়া গর্ভবতী, যাদের রয়েছে নীতু নামে এক ছোট মেয়ে সন্তান। আমরা দেখতে পাই এডমিশন টেস্টের ক্যান্ডিডেট শাকিল-জাফর ও রুবিকে, জাফর কেবলই যাকে ভালোবাসার কথা জানাবে বলে বুয়েটে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পরও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে। গল্পে প্রৌঢ় আব্দুর রশীদকে দেখি, যিনি একাধারে চেইনস্মোকার এবং খানিকটা ড্যাম কেয়ার ক্যারেক্টার। চিত্রাকে আমরা পাই, যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করেছে পদার্থবিজ্ঞানে। আমরা নানারকম কুসংস্কারে বিশ্বাসী মা ও তার ডাক্তার ছেলে আশহাবকে দেখতে পাই। দেখতে পাই ব্যস্ত ট্রেইনের এটেন্ডিদের। ঘটনাচক্রে তাদের প্রত্যেকেরই একজনের সঙ্গে অন্যজনের দেখা হয়, পরস্পরের সঙ্গে নানা কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। তার ভেতর আমাদের সামনে ট্র্যাজেডি হিসেবে উপস্থিত খায়েরের মন্ত্রীত্ব হারানো, প্রেগন্যান্ট আফিফার প্রসব বেদনা, চিত্রার বিয়ে থেকে পালিয়ে জীবনকে খুঁজে ফেরা, ডাক্তার আশহাবের আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলা আর একজন বাবা আব্দুর রশীদের নিজের সন্তানের ইচ্ছেপূরণের গল্প। তারই মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় এই সিনেমা। সিনেমার শেষটা হয় নাটকীয়ভাবে, ট্রেন চলতে থাকে, জীবনের গতিতে।

সিনেমাটির চিত্রনাট্য নিয়ে কথা বলার আগে আমাদের আরো একবার মাথায় রাখা উচিত, হুমায়ুন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসকে অবলম্বন করলে বা তার থেকে অনুপ্রাণিত হলেও চিত্রনাট্য সরাসরি উপন্যাসকে ফলো করেনি। চিত্রনাট্যের ক্যারেক্টার আর্কগুলো কিছুক্ষণ উপন্যাস অনুপ্রাণিত হয়ে সাজানো, কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে তাদের প্রায় প্রত্যেকেই নিজস্ব ধাঁচে তৈরি। এমনকি তাদের উৎকর্ষ এবং পরিণতিও বেশ আলাদা। স্বাধীন আহমেদ ও সামিউল ভূঁইয়া চিত্রনাট্য লিখেছেন। চিত্রনাট্যর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো চমৎকার সব ডায়ালগ। কিছুক্ষণ উপন্যাসের ডায়ালগগুলোকে নির্দিষ্ট চরিত্র ধরে তারা হাজির করছেন। আবার কিছুক্ষেত্রে তারা উপন্যাসেরই সংলাপকে অন্যদের দিয়ে বলিয়েছেন। যেমন, ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসে আফিয়া সংলাপ বলছিলো আজিজকে যে “আল্লাহকে তো আপনি ডাকছেন, আমি বরং মা-বাবাকে ডাকি”- সেই একই সংলাপ সিনেমায় এসেছে তাদের মেয়ে নিতুর মুখ থেকে। নিতু চরিত্র যদিও উপন্যাসে অনুপস্থিত। উপন্যাসের সংলাপগুলো এমনিতেই চটুল, ভিজ্যুয়ালি এই সংলাপগুলোকে আরো ভিভিড এবং প্রাণবন্ত করা গেছে এমন বেশকিছু কারণে। একদিকে নতুন চরিত্র এবং নতুন প্লট তৈরি করা, অন্যদিকে চরিত্রের নামভূমিকা থাকলেও ক্যারেক্টার আর্কের ভিন্নতা, আবার কিছুক্ষেত্রে উপন্যাসের ট্র্যাজেডি এবং যবনিকাপাতকে পরিচালকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে হাজির করা এই প্রাণবন্ত ভাব তৈরি করেছে। তাতে চরিত্রগুলো আরো জীবন্ত, ঘটনাগুলো আরো সমসাময়িক আর ভিজ্যুয়ালি চার্মিং হয়ে উঠে।
যেমন উপন্যাসের অনার্স পড়ুয়া চিত্রা সিনেমায় মাস্টার্স কমপ্লিট করে ফেলেন, আবার এই মাস্টার্স কমপ্লিট না হলে সিনেমার গল্পকেও আমরা সেরকম ঘটনাপ্রবাহে পেতাম না। লিলির চিত্রার সঙ্গে মূল গল্পে বড় কনভারসেশন থাকলেও এখানে সেভাবে নেই। বরঞ্চ লিলিকে অন্য এক ক্যারেক্টার হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার চিত্রাকে টিকিট ম্যানেজ করে দেয়ার চেয়েও পালিয়ে বিয়ে করতে বেশি হেল্প করতে দেখা যায়। আবার, সাজেদা ও চিত্রার মদপান সংক্রান্ত কনভারসেশন উপন্যাসের চেয়েও স্ক্রিনে বেটার হয়েছে। অন্যদিকে, এই যে কিছুক্ষণ উপন্যাসের বাইরে গিয়ে অন্য এক ফ্রেমে গল্প বলা, তার ফ্লোজও আছে। গল্পে রশীদ সাহেবকে এস্টাবলিশ করা হয় লিলির রেলওয়ে বোর্ডের মেম্বার মামার মাধ্যমে। সিনেমায় সেটা এস্টাবলিশ হয় আশহাবের হাতে ম্যাগাজিনে রশীদ সাহেবকে নিয়ে ফিচার দেখে। কিন্তু, ফিচার আমাদেরকে বলতে পারে না রশীদ সাহেব কীভাবে এলেন কামরায়। গল্প বলতে পারে। হুমায়ুন আহমেদ নিজের ন্যারেশনে যে কমেন্টারি দিতেন চরিত্রগুলোর ওপর, ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসেও তেমনটা উপস্থিত, ক্লিশে হয়ে। কিন্তু, সেই ন্যারেশনকে আমরা পর্দায় আবার ব্যাকগ্রাউন্ডে যেমন ন্যারেটরের মাধ্যমে পাই, তা নিজেই একজন ক্যারেক্টার হিসেবে গড়ে উঠে৷ উপন্যাসে মৃত লাশটি গৌণ। কিন্তু, আমরা সিনেমায় মৃত লাশের চোখেই চরিত্রগুলোকে পর্দায় দেখতে পাই। জীবন্ত সব চরিত্র। কিছুক্ষণ উপন্যাসে লজিং মাস্টার আক্কাসকে আমরা ছাত্রদের কাছে ‘সত্যশিক্ষা’ দিতে দেখি। আক্কাস বনলতা এক্সপ্রেসে অনিল বাগচী হয়ে ওঠে। গণিতের এ মাস্টার শ্রেণীকক্ষে অংক বাদ দিয়ে ‘সত্যশিক্ষা’য় আগ্রহী। শ্রেণীকক্ষের ‘সত্যশিক্ষা’টা দায়িত্ব পালনে অবহেলাও হয়ে উঠে, লজিং মাস্টারের ‘সত্যশিক্ষা’ তেমনটা নয়। এসব পরিবর্তন এবং ইন্সপিরেশনের গল্পের ভেতরও এই সিনেমার সংলাপগুলো বারবার মন ছুঁয়ে যাবে।

চিত্রার “এই বয়সে এসে মায়ের ভালোবাসা মাত্রই বিরক্তিকর” উক্তি, রশীদের “বাবা-মা ঘুমিয়ে গেলেই বাচ্চাদের শান্তি”, নীতুর “লাল রং দেখলেই ট্রেন থামে”, আশহাবের “অতি বুদ্ধিমানরাই বিভ্রান্ত হয়” অথবা চিত্রার “আমাদের পাবলিক ট্রান্সপোর্টে প্রাইভেট দোষগুলো দেখাতে পছন্দ করি”- এমনতর উক্তিগুলো গল্পকে দারুণভাবে পিক করায়। তবে, চিত্রনাট্যের শক্তি হলো এক সিনের শেষ সংলাপের সাথে অন্য সিনের প্রথম সংলাপের একটা ক্রসওভার তৈরি করা। মুগ্ধতা থেকেই স্ক্রিপ্ট টিম এবং পরিচালকের খেয়ালের প্রতি এই লম্বা বিশ্লেষণ।
আগেই বলেছি, সিনেমাটি ডায়ালগ ড্রাইভেন। কিন্তু, তানিম নূরের সবচেয়ে বড় মুন্সীয়ানা ছিলো একটা সিনেমায় এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হাজির করে তাদের প্রত্যেককে আবার স্পেস দেয়ায়। চরিত্রগুলোকে প্রায় একইসাথেই এবং এত দ্রুততায় তিনি যে এস্টাবলিশও করে ফেলেছেন, এটা প্রশংসার দাবীদার। এই সিনেমায় গণিতবিদ আব্দুর রশীদ এর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মোশাররফ করিম। তর্ক সাপেক্ষে এটি এখন পর্যন্ত তার সেরা অভিনয়। মোশাররফ করিমের এই চরিত্রের এতবেশি আপস অ্যান্ড ডাউনস দর্শকের মন ছুঁয়ে যাবে। একটা ট্রেনের ভেতরেই মোশাররফ করিমকে গণিতবিদ, মোটিভেশনাল স্পীকার, ফিলোসফার এবং একজন দুঃখ ভারাক্রান্ত পিতাকে দেখি, প্রতিটা ক্যারেক্টারের নিজস্বতাও বেশি।
কিছুক্ষণ উপন্যাসের মূল চরিত্র চিত্রা। এই সিনেমায়ও চিত্রা এত এত গল্পের ভেতরেও বিশেষ কেউ যার ব্যাকগ্রাউন্ড পুরাঘটিত বর্তমানে চলে। সাবিলা নূর তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় কাজটি উপহার দিয়েছেন চিত্রা চরিত্রের মাধ্যমে। একদিকে তার চেহারার অভিব্যক্তি, অন্যদিকে ডায়ালগ ডেলিভারি, এই সবকিছুর ভেতরে তার চরিত্রকে নিজের করে নেয়াটা মনোমুগ্ধকর।

খায়ের-সুরমা জুটিতে কাজ করেছেন চঞ্চল চৌধুরী এবং আজমেরী হক বাঁধন। যদিও খায়ের এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন, শিক্ষামন্ত্রী; এবং সুরমা মোটেও অশিক্ষিত নন, শিক্ষিত প্রাক্তন বামপন্থী নেত্রী যিনি এলিট হতে হতে এখন দেশের সর্বোচ্চ পুঁজিবাদীদের একজন। খায়ের হিসেবে চঞ্চল চৌধুরীর অনেক বেশি কিছু দেয়ার ছিলো না সিনেমায়। তিনি তার সাবলীল অভিনয়ই করে গেছেন। বাঁধন এখানে এমন এক পরিশীলিত অভিনয় করেছেন যা চরিত্র হিসেবে সুরমাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
নাহ। কিছুক্ষণের আজিজ আর বনলতা এক্সপ্রেস এর আজিজ এক না। কিছুক্ষণের আজিজ একজন মৌলভী, কিন্তু, সিনেমার আজিজ হিসেবে শ্যামল মাওলাকে পর্দায় একজন রয়েসয়ে জীবনধারণ করা, সে সময়কার সোসাইটির এনলাইটেনমেন্টের বাইরে পড়ে যাওয়া এক মধ্যবয়সী ধর্মভীরু হিসেবে দেখি। এই আজিজ ধর্মভীরু হিসেবে বেশ রগচটার প্রভাব পর্দায় ফেলতে চান, কিন্তু ভঙ্গুর আজিজ তার থেকেও বেশি মার্ক পেয়ে উৎরে যান। তার বউ আফিয়া চরিত্রে জাকিয়া বারী মম তার সহজাত অভিনয়টাই করেছেন, কিন্তু গল্পের প্রেক্ষিতেই মমকে নিজের নামের স্বাক্ষর রাখার মতো স্পেস দেয়া যায়নি।
আশহাব চরিত্রে শরীফুল রাজ এবং তার মায়ের চরিত্রে শামীমা নাজনীনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। শামীমা নাজনীনের এই পারফরম্যান্স স্পেস এবং ভ্যারিয়েশন সবদিক থেকে তার ক্যারিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স বলা যায়। একজন প্যারানয়া পেশেন্ট আবার মমতাময়ী কিন্তু কুসংস্কারাচ্ছন্ন মা- হিসেবে শামীমা নাজনীন পুরোটা সময় দর্শককে নিজের দিকে টেনে রেখেছেন। শরীফুল রাজ তো আশহাব চরিত্রে অভিনয় করার পর এক নতুন মেসেজই যেন দিয়েছেন ইন্ডাস্ট্রিকে। তাকে যে গল্পই এনে দেয়া হোক, তিনি বাজিমাত করে দিবেন। তবে আশহাবের ছোটবেলার দৃশ্যে শামীমা নাজনীন বেশ বেখাপ্পা। তার বয়সের টোন এবং ক্যারেক্টারাইজেশনও মিলে না।

যমুনা ও ফয়সাল চরিত্রে সাবরিন আজাদ এবং আরেফিন জিলানির কথা বলতে হয়। সেই সঙ্গে এই গল্পের বিশেষ প্লট হিসেবে এডমিশন টেস্ট ক্যান্ডিডেটদের কথা স্মরণ করতে হয়। শাকিল-জাফর দুই বন্ধু এবং জাফরের পছন্দের মেয়ে রুবিকে ঘিরে আমরা এক ধরনের আরলি টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরির পোস্ট টিনেইজ নিভু নিভু প্রেম দেখি। সেদিক থেকে শাকিল চরিত্রে সিফাত রহমানকে কিছুটা বেখাপ্পা লাগলেও জাফর হিসেবে তামিম করিম চমৎকার অভিনয় করেছেন। তবে তাদের দুজনের চেয়েও রুবি চরিত্রে লাবণ্য চৌধুরী নজর কাড়বে বেশি। যদিও পরিচালক সে অর্থে এই টিনেজারদের কামরা ও তাদের চরিত্রে এডমিশন টেস্টের টেনশন ও ডেসপারেশন তুলে আনতে পারেন নি। ইঁচড়ে পাকা নীতুর চরিত্রে তৃধা পাল চমৎকার হতে গিয়েও কিছুটা একঘেয়ে হয়ে উঠে।
সিনেমার বিশেষ অংশে নাম ভূমিকায় ছিলেন নুহাশ হুমায়ূন। যিনি ব্যাকগ্রাউন্ডে ধারাভাষ্য বর্ণনা দিচ্ছিলেন ক্যারেক্টারগুলোর। কিছুক্ষণে এই ধারাভাষ্য লেখা ছিলো হুমায়ূন আহমেদের হাতে। সিনেমায় নুহাশ হুমায়ুন তার হয়ে কাজটি করলেন। যদিও, আমরা ওই লাশের পরিণতি জানতে পারলেও লাশটির শেষ মুহূর্তে নিজের পরিণতি জানার অনুভূতি জানতে পারিনি।
কিন্তু, দর্শকমনে সিনেমাটি বিশেষ অনুভূতি গেঁথে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে গানগুলো। হুমায়ূন আহমেদের পাশাপাশি আরেকজন খ্যাতিমান বাংলাদেশি এই সিনেমায় বিশেষ ট্রিবিউট পেয়েছেন। তিনি আইয়ুব বাচ্চু। একেক মুহূর্তে গানগুলোকে হাজির করেছেন যে তানিম নূরের সিনেমায় ফিউশন এখন নতুন আইডেন্টিটি হাজির করেছে। ‘চাইতে পারো’- গানের সঙ্গে ক্যারেক্টারগুলোর বোঝাপড়া তৈরি তো আছেই। সঙ্গে তিনি আইয়ুব বাচ্চুর বিখ্যাত ‘উড়াল দেবো আকাশে’তে যমুনা-ফয়সালের উদ্দাম নাচকে তিনি হাজির করেছেন আমাদের রাজনীতিবিদদের রুচিহীনতার প্রতি স্যাটায়ার হিসেবে। ফিউশন ট্যাগরের নামে তিনি দর্শককে একটা আনকম্ফোর্টেবল জায়গায় এনেছেনও বটে। তবে বিস্ময়কর হয়ে উঠে সিনেমায় অনেক লড়াইয়ের পর আফিয়ার সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আনন্দের মুহূর্তে ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ গানটার প্লেব্যাক। কেউ এর আগে কখনো হয়তো এই গান এভাবেও যে ব্যবহৃত হতে পারে ভাবেওনি।
অন্যদিকে, যখন গোটা ট্রেন প্রার্থনায় মশগুল, সে সময়ে প্লেব্যাকে চলা ‘তোমার মাঝেই স্বপ্নের শুরু…. আমার বাংলাদেশ’ আপনাকে দেশ নিয়ে এক নতুন ভাবনার উদ্রেক করবে। দিনশেষে দেশ ভালো থাকলেই তো আমরা ভালো থাকি। আর বিশেষ এক মুহূর্তে বলিউডের তুঝে দেখা তো গানের বিশেষ ট্রিবিউটও চোখে পড়ে।
সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর করেছেন জাহিদ নীরব। তিনি এই সিনেমায় একটা রিফ্রেশিং সুদিং টোন ব্যবহার করেছেন ক্যারেক্টার এস্টাবলিশ করতে। তিনি ট্র্যাজেডি, ইমোশনাল সিন, হিউমারাস মোমেন্ট বা রোমান্টিক সিন- এসবের ক্ষেত্রে তিনি ভিন্ন ভিন্ন টোনে মিউজিক হাজির করেছেন, কিন্তু প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আলাদা আলাদা সিংগেল মিউজিক ব্যবহার করেছেন। কখনো ভায়োলিন, কখনো কীবোর্ড কখনো বা সফট গিটারের টোনে জাহিদ নীরব বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন সিনেমার একটা ক্লাসি আন্তর্জাতিক অডিয়েন্স তৈরির সক্ষমতা নির্মাণে।
বরকত হোসেন পলাশ ছিলেন সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে। বেশিরভাগ দৃশ্য ছিলো ট্রেনের ভেতরে। তৈরিকৃত ট্রেনের সেটে তিনি চমৎকার এক সিনেমাটোগ্রাফি উপহার দিয়েছেন। বিশেষ করে যেহেতু প্রায়ই দৃশ্যে থার্ড পার্সনের এপেয়ারেন্স ছিলো, তিনি সেই এপিয়ারেন্সের কথাটা মাথায় রেখে যে একটা মিড ক্লোজ রেঞ্জে কনভারসেশন ধরার চেষ্টা করেছেন, কখনো কখনো মনিটর এংগেল থেকেও চেষ্টা করেছেন ক্যারেক্টারের লেয়ারগুলোকে আলাদা করার। ওভার দ্যা শোল্ডার শট আর রিভার্স এংগেলের শটগুলো দর্শককে ক্যারেক্টারওয়াইজ আলাদা স্টোরিটেলিংয়ের ভাইব তৈরি করেছে। কিন্তু স্টুডিওতে তৈরি সেট বলেই বোধহয় আমরা ট্রেন এর বাইরে দেখতে পারি না ট্রেন থেকে। প্রতিবার ট্রেনের বাইরের দুনিয়ায় যেতে হলে ট্রেনকে থামতে হচ্ছে। এই অসুবিধা না থাকলে হয়তোবা ট্রেনের জার্নিটাকে আরো বড় লেয়ারে ভাবা সম্ভব হতো। হুমায়ুন আহমেদ কিছুক্ষণের ভূমিকায় লিখেছেন “দিগন্ত ঘন কুয়াশায় ঢাকা। সেই কুয়াশা এগিয়ে আসছে। ট্রেন এমনভাবে ছুটছে যে মনে হচ্ছে কুয়াশা যেন তাকে ধরতে না পারে এটাই ট্রেনটির একমাতে বাসনা”। কিন্তু আমরা এই কুয়াশাকে পাশ কাটিয়ে চলার দৃশ্যও বুঝতে পারি না ট্রেনের ভেতর থেকে।
এই সিনেমার লাইটিং বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দুইটা সময়ের পার্থক্য তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম এলিমেন্টস লাইট। স্পেশাল/ প্রেসিডেন্সিয়াল কামরার লাইটিংটা বেশ সুদিং ছিলো। আর সাধারণ কামরাগুলোয় একই টোনের লাইট এখানে নয়নাভিরাম প্রেজেন্টেশন তৈরি করে। তবে লাশ দাফনের দৃশ্যে শীতের বৃষ্টিতে কড়া রোদের রেফারেন্স কিছুটা বিব্রতকর মনে হয়।
সিনেমার এডিট ও কালার করেছেন সালেহ সোবহান অনীম। বনলতা এক্সপ্রেসের দীর্ঘ ডিউরেশনেও দর্শকদের কাছে মনোটোনাস না হয়ে উঠার প্রধান কারণ প্রাণবন্ত এডিটিং। সিন টু সিন ক্রসওভার কিংবা পারফেক্ট মোমেন্টের কাট, থার্ড এংগেল পারসপেক্টিভে ক্যারেক্টারের পোর্ট্রেয়াল সিনেমাকে জীবন্ত করে তুলেছে। সিনেমার ক্যারেক্টার গুলো ডায়ালগ দিয়ে কথা বলে, আরো বেশি কথা বলে যখন সংলাপের চেয়েও বি রোলে তাদের মিনিংফুল এপেয়ারেন্স তৈরি হয়। অনীম সে কাজটি সুনিপুণভাবে তৈরি করেছেন। আফিয়ার জন্য প্রার্থনারত দৃশ্যে প্রত্যেকটা ক্যারেক্টারের পোর্ট্রেয়াল, কামরা টু কামরা ট্রাঞ্জিশনের ক্ষেত্রে তার যে কন্টিনিউটি তৈরি করা সেটা প্রশংসার দাবীদার। সিনেমার কালার কম্পোজিশনেও তিনি দর্শকদের চোখকেই মাথায় রেখেছেন, বনলতা এক্সপ্রেস হয়ে উঠেছে অনেক গুলো নিজ নিজ ল গল্পের ট্রু কালারনেসের প্রতীক। ‘উৎসব’র ট্রেনের দৃশ্যসহ বিভিন্ন ট্রেন জার্নির সিনেমাকে ট্রিবিউট দেয়াটাও সুন্দর।

এই সিনেমার ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট এবং আর্ট ডিরেকশন আমাদের এখান সিনেমার এক নীরব বিপ্লবের রেফারেন্স হয়ে থাকলো। বনলতা এক্সপ্রেস আমাদের সবদিক থেকেই একটি ফিল গুড সিনেমার ভাইব দেয়। খাঁটি বাংলাদেশী সিনেমার স্বাদ দেয়ার তানিম নূরের যে কমিটমেন্ট সেদিক থেকে বনলতা এক্সপ্রেসের গোটা টিম এপ্রেসিয়েশান ডিজার্ভ করে। তানিম একদিকে তার ডিরেক্টরসুলভ এক্টিভিজম করেছেন, শিক্ষামন্ত্রী এবং তার স্ত্রীর চরিত্র বাংলাদেশের লেফটিস্ট নেতাদের ক্ষমতা পেয়ে আপাদমস্তক পপুলিস্ট এবং জনবিচ্ছিন্ন নেতা হয়ে উঠার যে প্রবণতা, সেটাকে চিহ্নিত করেছেন, এমনকি চরিত্রে পরিবর্তনও করেছেন তিনি তার জন্য। আমরা ২০০৫ সালের এক বাংলাদেশের রাজনীতিকে এখানে দেখি৷ কিন্তু, রাজনীতির চরিত্র হিসেবে এখানে যে ‘গণভবন’কে দেখানো হয়েছে তা ভুল সময়ের রিপ্রেজেন্টেশন। ২০০৫ সালে গণভবন স্রেফ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ছিলো। এটা নির্মাণ দলের পলিটিক্যাল ভিউয়ের ভুল। আবার এই সিনেমার নানা সীমাবদ্ধতাকে মাথায় রেখেই বলতে হয়, সিন টু সিন ট্রাঞ্জিশনের ক্ষেত্রে যথাযথ সময়জ্ঞান মেন্টেইন করা যায়নি। বিশেষ করে যখন ওয়ান টু ওয়ান আমরা সিন ডিভিশনে যাই, তখন সিনের ফ্লো এবং কন্টিনুইটি সেভাবে ধরে তুলতে পারে না। অন্যদিকে, রশীদের মদের বোতলের ছিপি খোলার যে রাত ১টার ঘটনা তা থেকে সকালের রোদ উঁকি দেয়ার মাঝখানে যে ৫ ঘণ্টার ব্যবধান, সিনেমার গল্পানুসারে সে সময়টাকে আরো দীর্ঘ মনে হয়। অনেকবেশি দীর্ঘ। অন্তত আফিয়ার প্ল্যাজেন্টা থেকে যাওয়ার ব্লিডিং থেকে বেঁচে থাকার জন্য যে ৪৫ মিনিটের মতো সময় বেঁধে দেওয়া ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসে, সিনেমার আফিয়া তার চেয়েও অনেকবেশি সময় পেয়ে যান। তানিম নূরের সিনেমা আমাদেরকে সবসময় সোশিও-পলিটিক্যাল পাঞ্চলাইনের মধ্যে নিয়ে যায়। কিন্তু, এক সময়ে এসে এই পাঞ্চলাইনের আবেদন হয়তো ফুরাবে, তানিম নুর এই পাঞ্চলাইনগুলোকে কীভাবে সিনেমায় দেখতে চান সেটাও আমাদের জানা জরুরি। সেই জরুরাত মাথায় রেখে, ঈদের দিনে বাংলা সিনেমায় সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে আজান দেয়ার মতো সুন্দর মোমেন্ট আর চঞ্চল-মোশাররফের ওয়ান টু ওয়ান কনভারসেশনে মুগ্ধতা রেখে আমরা বনলতা এক্সপ্রেসের জার্নি শেষ করি।






