প্রেশার কুকার: এটাই পিওর ‘রায়হান রাফি’ সিনেমা!
এ সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় ও সেরা পরিচালক হলেন রায়হান রাফি। করোনা ও করোনাপূর্ববর্তী সময়ে রায়হান রাফি কম বাজেটে খুব ভালো সিনেমা বানাতেন। তবে করোনা পরবর্তী সময়ে আমরা যত সামনে এগিয়েছি রায়হান রাফি ততই বড় আয়োজনের দিকে বেশি ফোকাস দিয়েছেন। এতে করে সিনেমা কম-বেশি ভালো হতো কিন্তু কেন জানিনা তার নিজের নির্মাণের বিশেষত্বগুলো বড় ক্যানভাসে খুঁজে পাওয়া যেতো না।
‘প্রেশার কুকার’ এমন এক ধরনের সিনেমা যাকে বলতে পারেন নির্মাতা রায়হান রাফির কমফোর্ট জোনে কামব্যাক। এই ধরনের কাজ তিনি আগেও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য করেছেন। তবে এই সিনেমায় মূল আগ্রহের জায়গা ধরে রাখে এর গল্প বলার বিশেষ ধরন। না, আবারো সেই গল্প বলতে বলতে ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যাওয়া – এমন কিছু না। সিনেমাটিকে নির্মাতা রায়হান রাফি অনেকটা সিমলেসভাবে ৫টি ভাগে ভাগ করে দেখিয়েছেন। নামকরণ করেছেন তার সবশেষ সফল সিনেমাগুলোর আদলে:

১। পরাণ – The Love: এখানে আমরা রাফির ২০২২ সালের সুপারহিট সিনেমা ‘পরাণ’কে হোমাজ দিতে দেখতে পাই। পরাণে যেমন একজন অনন্যা রয়েছেন, ঠিক একইভাবে এখানেও একজন অনন্যা রয়েছেন, তারও একটা প্রেমের গল্প রয়েছে। আবার অনন্যার বাবা ওখানেও শহীদুজ্জামান সেলিম, এখানেও তাই। এভাবে থিমেটিক্যালি ও চরিত্রানুযায়ী মিল রেখে খুব সুন্দর সুচনা হয় এই চলচ্চিত্রের।
২। সুড়ঙ্গ – The Betrayal: এই অংশটি পরোক্ষভাবে রাফির ‘সুড়ঙ্গ’ (২০২৩) চলচ্চিত্রের বেঈমানির অংশটুকুর সাথে মিল রেখে সাজানো হয়েছে। এই অংশে একটি অতিথি চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় আমার বেশ ভালো লেগেছে।
৩। তুফান – The Rise: এই অংশে আমরা আমাদের গল্পের মূল চরিত্রগুলোকে ঘুরে দাঁড়াতে দেখতে পাই, যা থিমেটিক্যালি অনেকটা রাফি পরিচালিত ‘তুফান’ (২০২৪) এর সাথে মিলে। সিনেমার অন্যতম কমার্শিয়াল আপিলের জায়গা হলো এটি।

৪। তাণ্ডব – The Chaos: এ অংশে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ফজলুর রহমান বাবুর এন্ট্রি হয়। এইরকম চরিত্রে আগে আমি কখনোই ফজলুর রহমান বাবুকে দেখিনি। খুবই চতুর একজন পুলিশ অফিসারের চরিত্রে তিনি দারুণ অভিনয় করেছেন। যথারীতি এই অংশটুকু রাফির ‘তাণ্ডব’ (২০২৫) থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে লিখা। ভালো ছিল।
৫। প্রেশার কুকার – The Karma: সিনেমার উপসংহার টানা হয় এই অংশে। গুরুত্বপূর্ণ সবগুলো চরিত্র যার যার কর্ম অনুসারে কর্মফল ভোগ করে।
এনাফরমিক লেন্স দিয়ে পুরো চলচ্চিত্রটি শ্যুট করা হয়েছে। অত্যধিক ওয়াইড রেশিও চোখের জন্য যথেষ্ট আরামদায়ক ছিল, যদিও বড় থিয়েটার না হলে এই এক্সপেরিয়েন্স সবার বেলায় সেইম নাও হতে পারে। রায়হান রাফির সিনেমায় যথারীতি বড় বড় ওয়ানটেক শট দেখা যায়, এখানেও তা ছিল। বিজিএম মোটামুটি যুতসই ছিল, গানগুলো ছিল এ চলচ্চিত্রের প্রাণ। রাফির সিনেমার কিছু কমন লোকেশন (নীলাদ্রি লেক, পরিত্যক্ত স্পিনিং মিল ইত্যাদি, রং-বেরঙের লাইটিং করা নিম্নবিত্তের ঘর) এখানেও ছিল, যথারীতি দেখতে মন্দ লাগেনি। এনাফরমিক লেন্সে নীলাদ্রি লেকের সৌন্দর্য বহুগুণে বেড়ে গিয়েছিল।
সিনেমায় মূল চরিত্র ৪টি হলেও মূল ফোকাস ছিল নাজিফা তুষির ওপর, এবং তিনি তুখোড় একটা পারফরম্যান্স দিয়েছেন। একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চরিত্রটির সাথে আমরা জুড়ে থাকি। শবনম বুবলি মোটামুটি ভালো করেছেন, চরিত্রটি একটু কম গুরুত্ব পেয়েছে। এছাড়া বাকি দুই নতুন নায়িকা; মারিয়া শান্ত ও স্নিগ্ধা চৌধুরী, দুজনের মধ্যে আমার কাছে মারিয়া নামক অভিনেত্রীর কাজ বেশি ভালো লেগেছে। স্নিগ্ধা চৌধুরী একটু স্পেস কম পেয়েছেন, ডিসেন্ট পারফরম্যান্স ছিল।সাপোর্টিং রোলে ছিলেন শহীদুজ্জামান সেলিম, ফজলুর রহমান বাবু, চঞ্চল চৌধুরী, মিশা সওদাগর, গাজী রাকায়েত, আরফান মৃধা শিবলু, রিজভী রিজু সহ অনেকে। সবাই মোটামুটি ভালো করেছেন।

এবার কিছু নেতিবাচক দিক বলি। এটি একটি হাইপারলিংক ঘরানার গল্প, যেখানে একাধিক চরিত্র, ঘটনা বা টাইমলাইন আলাদা আলাদা ভাবে চলতে থাকে—কিন্তু শেষে এসে সব একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। তবে সত্যিকথা বলতে আমার কাছে শেষ পর্যন্ত পুরো গল্পটি পরিপূরকভাবে কানেক্টেড মনে হয়নি। বিশেষকরে বুবলির অংশটিতে পুরোটা সময় আমি নিজেকে ডিসকানেক্টেড ফিল করেছি। এছাড়া সিনেমার লেন্থ বেশ বড় (২ ঘণ্টা ৫২ মিনিট) এবং সেটা ভালোই অনুভুত হয়। আমি মনে করি কিছু চরিত্র কমিয়ে আনলে সিনেমাটি আরেকটু ছোট হতো এবং শক্তপোক্ত হতো।
সবমিলিয়ে এই ছিল আমার দৃষ্টিতে ‘প্রেশার কুকার’। আমি মনে করি রায়হান রাফির উচিত এই ধরনের এক্সপেরিমেন্ট বছরে অন্তত একবার করা। সেইসাথে আমাদেরও উচিত এই এক্সপেরিমেন্টগুলো সিনেমাহলে উপভোগের মাধ্যমে সাধুবাদ জানানো। এতে করে বাংলা চলচ্চিত্রের কাজের মান বাড়বে।






