Select Page

শূন্য দশকের ঈদের সিনেমা

শূন্য দশকের ঈদের সিনেমা

২০০০ সালের প্রথম সূর্যোদয় ঢালিউডের ভাগ্যাকাশে সূচনা করে দুর্যোগের। সিনেমা শিল্পে দেখা দেয় অশ্লীলতা। ধীরে ধীরে ঢালিউড পর্নো সিনেমার আখড়া হয়ে ওঠে। সংলাপে গালিগালাজ, গানে নারীদেহের প্রদর্শনী, গল্পে সন্ত্রাস-খুন-ধর্ষণ, প্রচারণায় ইতরতা, সব মিলিয়ে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এক গভীর খাদে নিমজ্জিত হয়। তখন দর্শককে সিনেমা হলে টেনে আনাই দুষ্কর হয়ে ওঠে। বিশেষত মহিলা দর্শককে আর ছবিঘরে খুঁজে পাওয়া যায় না। ভার্সিটি পড়ুয়ারা দলবেঁধে আর সিনেমা হলে যেতে আগ্রহী নয়। ফলে প্রেক্ষাগৃহগুলো বখাটেদের স্থায়ী আড্ডা হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে অসামাজিক কাজের নিরাপদ অভয়ারণ্য।

এই সময় ব্যানার প্রথার একরকম অবসান ঘটে। যে সমস্ত প্রযোজনা সংস্থা একসময় ঈদ এলেই নতুন ছবি নিয়ে হাজির হতো, তারা সিনেমা শিল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। এর মধ্যেও কয়েকটি প্রডাকশন হাউজকে নিয়মিত ছবি বানাতে দেখা যায়। কিবরিয়া ফিল্মস, শুভ ইন্টারন্যাশনাল, বন্ধন বাণীচিত্র, সজনী ফিল্মস, পিংকি চলচ্চিত্র-এর মতো গুটিকয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানই নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে সমর্থ হয়। এর বাইরে ডিপজল ও তার ভাইয়ের প্রযোজনা সংস্থা অমিবনি কথাচিত্র ও পর্বত পিকচার্স থেকে বেশ কিছু ঈদের ছবি তৈরি হয়।

পরিচালকদের মধ্য থেকে কয়েকজনের এই সময় উত্থান ঘটে। মনতাজুর রহমান আকবর, এফ আই মানিক, বদিউল আলম খোকন এবং শাহাদাৎ হোসেন লিটনের পরিচালনায় সবচেয়ে বেশি ছবি মুক্তি পায় শূন্য দশকের ঈদগুলোতে। এফ আই মানিক বক্স অফিসে উপহার দেন ‘এ বাঁধন যাবে না ছিঁড়ে’, ‘স্বপ্নের বাসর’, ‘হৃদয়ের বন্ধন’, ‘মান্না ভাই’, ‘পিতা মাতার আমানত’-এর মতো সুপারহিট ছবি। মনতাজুর রহমান আকবর গর্বিত পরিচালক হোন ‘কুখ্যাত খুনি’, ‘গুণ্ডা নাম্বার ওয়ান’, ‘ঢাকাইয়া মাস্তান’-এর মতো সুপারহিট ছবির। ‘দানব’, ‘ধ্বংস’, ‘নিষ্পাপ কয়েদী’-এর মতো সুপারহিট ছবি বাজারে ছাড়েন বদিউল আলম খোকন। শাহাদাৎ হোসেন লিটন সংখ্যাতত্ত্বে এগিয়ে থাকলেও তার ছবি অধিকাংশই অশ্লীলতার দোষে দুষ্ট।

ঈদের কাজের দিক থেকে আরও বলতে হয় কয়েকজন পরিচালকের নাম। তাদের মধ্যে এগিয়ে থাকবেন উত্তম আকাশ ও সাফি ইকবাল। এই দুজনের পরে আসবেন মালেক আফসারী, পি এ কাজল, ইস্পাহানি আরিফ জাহান, আজাদী হাসনাত ফিরোজ এবং এনায়েত করিম ও শরিফউদ্দিন দীপু। শেষোক্ত দুজন মূলত ছিলেন অশ্লীল ছবির প্রযোজক, পরিচালক ও পৃষ্ঠপোষক।

তারকাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে শূন্য দশকের প্রধান তারকা মান্না। প্রতি ঈদেই তার একটি দুটি ছবি মুক্তি পায়। ২০০২ সালের ঈদুল ফিতরে মান্না অভিনীত ‘বোমা হামলা’, ‘আঘাত পাল্টা আঘাত’, ‘ধ্বংস’ এবং ‘ভাইয়া’—এই চারটি ছবি মুক্তি পায় একযোগে। তখন তিনি জনপ্রিয়তার মধ্যগগনে ছিলেন। তার সঙ্গে তখন তাল মিলিয়েছেন রুবেল, আমিন খান, শাকিব খানরা। জুটি হিসেবে রিয়াজ-শাবনূর একাধিক ছবি নিয়ে ঈদে হাজির হয়েছেন। মান্না-মৌসুমী, রুবেল-পপি জুটিরও চাহিদা ছিল দেখার মতোই।

শূন্য দশকের সবচেয়ে বড় ঘটনা হচ্ছে ঈদের দিন স্যাটেলাইট চ্যানেলে নতুন ছবির প্রিমিয়ার। হলবিমুখ দর্শকদের বিশাল বাজারকে ধরতে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এই সময় এগিয়ে আসে। ‘ব্যাচেলর,’ ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’, ‘রং নাম্বার’, ‘শ্যামলছায়া’, ‘লাল সবুজ’, ‘শাস্তি’, ‘মেহেরনেগার’, ‘রূপকথার গল্প’, ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’, ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’সহ আরও কিছু ছবি চ্যানেল আইতে প্রদর্শিত হয় ঈদের দিন। পরে এই ছবিগুলো বলাকাসহ গুটিকতক প্রেক্ষাগৃহে চলে।

শূন্য দশকেই দেখা মেলে মাল্টিপ্লেক্সের। স্টার সিনেপ্লেক্সের হাত ধরে সাবালক হয় ঢালিউড। কিন্তু শুরুতেই বাংলা ছবির জন্য কোনও সুখবর দিতে পারেনি মাল্টিপ্লেক্স চেইনটি। ইংরেজি ছবি আর ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রিমিয়ার করেই তার অনেক বছর কেটেছে।

সেই সময় ঈদে ছবি রিলিজের কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না। সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলো রিলিজ উন্মুক্ত করে দেয়। এর ফলে ১২-১৩টি ছবিও কোনও কোনও ঈদে রিলিজ পায়। অধিকাংশই কম বাজেটের ‘গরম মসলা’ ছবি। এগুলো রিলিজের সময় ২০ থেকে ২৫টি সিনেমা রিলিজ পেতো।

শূন্য দশকের শেষের দিকে চলচ্চিত্র শিল্পের হাওয়া ঘুরে যেতে শুরু করে। কাটপিসসর্বস্ব নির্মাতারা পিছু হটতে থাকেন। তারা সুস্থ ছবি তৈরি করে সিনেমার শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেন। মারদাঙ্গা-অ্যাকশন সিনেমা থেকে রোমান্টিক-সামাজিক সিনেমার এই পালাবদলে যে তারকার নামটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, তার নাম শাকিব খান। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা ঢালিউডের ঈদ-সিনেমার ইতিহাসে শাকিব খানের যুগ নিয়ে আলোচনা করবো।


About The Author

মাহফুজুর রহমান

চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক

Leave a reply