Select Page

শাকিব খানের আসন পোক্ত করেছে ঈদের সিনেমা

শাকিব খানের আসন পোক্ত করেছে ঈদের সিনেমা

শাকিব খানের প্রথম ছবি ১৯৯৯ সালে মুক্তি পেলেও তার নবজন্ম ঘটে ২০০৬ সালে। ‘কোটি টাকার কাবিন’, ‘চাচ্চু’, ‘পিতার আসন’, ‘দাদীমা’-এই চারটি ছবির সাফল্য তাকে এক নাম্বার নায়ক হিসেবে ঢালিউডে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর গত দুই দশকে যত ঈদ এসেছে, প্রত্যেকটি ঈদেই তার ছবি মুক্তি পেয়েছে। গত ২০ বছরে তাকে ছাড়া কোনও ঈদ সিনেমাপাড়ায় হয়নি (ব্যতিক্রম কেবল কোভিডের এক বছর)।

শূন্য দশকে ঈদে তার অভিনীত ব্যবসা সফল ছবির মধ্যে আরও রয়েছে ‘নিষ্পাপ কয়েদী’, ‘ঢাকাইয়া পোলা বরিশালের মাইয়া’, ‘তোমার জন্য মরতে পারি’, ‘কথা দাও সাথী হবে’, ‘কঠিন প্রেম’, ‘এক বুক জ্বালা’, ‘মনে প্রাণে আছ তুমি’, ‘জান আমার জান’, ‘সাহেব নামে গোলাম’, ‘আমার প্রাণের প্রিয়া’, ‘ভালোবাসা দিবি কি না বল’ ইত্যাদি।

গত দশকে শাকিব খান ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র নির্ভরযোগ্য ও চাহিদাসম্পন্ন তারকায় পরিণত হন। বিশেষত ২০০৮ সালে মান্নার মৃত্যুর পর তিনি প্রতিদ্বন্ধিতাহীন হয়ে পড়েন। প্রতি ঈদেই তার দুটি থেকে পাঁচটি পর্যন্ত ছবি মুক্তি পেতে থাকে। ২০০৯ সালে এক ঈদেই তার ৫টি ছবি মুক্তি পায়। ওই বছরের ঈদুল ফিতরে তার অভিনীত ‘সাহেব নামে গোলাম’, ‘জান আমার জান’, ‘মায়ের হাতে বেহেশতের চাবি’, ‘বলো না কবুল’, ‘ও সাথীরে’ মুক্তি পায়। এগুলোর অধিকাংশই সুপারহিট হয়ে শাকিব খানকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

তখন থেকেই ইন্ডাস্ট্রি হয়ে পড়ে একনায়কনির্ভর। অন্য তারকাদের ছবি মুক্তি পেলেও খুব একটা চলে না। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের একটি করে ছবি প্রতি ঈদেই মুক্তি পায়। কিন্তু সেসব ছবির ব্যবসা খুব একটা হয় না। সিনেমা হলগুলো জিইয়ে রাখেন একা শাকিব খান। ২০০৯ সালের ঈদে এই তারকার ছবিগুলো চলে আড়াই শতাধিক সিনেমা হলে। এ ছাড়া আড়াইশ’র বেশি সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয় তার অভিনীত বিভিন্ন পুরনো ছবি। সব মিলিয়ে সেবার ৫ শতাধিক সিনেমা হলে তার ছবি চলেছে। তখন দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল কম-বেশি ৮০০।

গত দশকে শাকিব খানের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ব্যানার প্রথারও উচ্ছেদ ঘটেছে। যে প্রযোজনা সংস্থাগুলো এই নায়ককে নিয়ে ছবি তৈরি করেছে, সেগুলোর একটি ছাড়া কেউ-ই আননন্দমেলা সিনেমা বা এসএস প্রডাকশন্সের মতো ঈদের ছবির মেজাজ বুঝে ঈদের জন্য নিয়মিত ছবি তৈরি করতে পারেনি। শুধু হার্টবিট প্রডাকশন অদ্ভুত ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়ে প্রতি বছর ঈদের ছবি বানিয়ে গেছে।

২০০৮ সালে শাকিব-অপু অভিনীত ‘মনে প্রাণে আছ তুমি’ দিয়ে নব্বই দশকের এই ব্যানারটির দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হয়। এরপর একে একে তারা শাকিব খানকে নিয়ে নির্মাণ করে ‘আমার প্রাণের প্রিয়া’, ‘খোদার পরে মা’, ‘ফুল এন্ড ফাইনাল’, ‘লাভ ম্যারেজ’, সুপার হিরো’র মতো ছবি।

আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কথা বলতে হয়, সেটা হচ্ছে জাজ মাল্টিমিডিয়া। ২০১৩ সাল থেকে এই প্রযোজনা সংস্থাটি নিয়মিত ঈদে ছবি মুক্তি দিতে উদ্যোগী হয়। প্রতিষ্ঠান হিসেবে গীতি চিত্রকথা কিংবা জ্যাম্বস প্রডাকশনের মতোই প্রভাবশালী হিসেবে তাকে দৃশ্যপটে দেখা যায়। শাকিব খান ও তার ছবির প্রযোজকদের বাইরে একমাত্র আব্দুল আজিজই নিজেকে স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হোন।

২০১৩ সালের ঈদুল ফিতরের জন্য শাকিব খানকে নিয়ে এই প্রযোজক নির্মাণ করেন ‘ভালোবাসা আজকাল’। এরপর প্রায় প্রতি ঈদে জাজ-এর ছবি মুক্তি পায়। ‘অগ্নি টু’, ‘হানিমুন’, ‘আশিকী’, ‘বাদশা দ্য ডন’, ‘রক্ত’, ‘বস টু’, ‘পোড়া মন টু’ ইত্যাদি ছবি দিয়ে গোটা দশক কর্মতৎপর থেকেছে জাজ। তাদের হাত ধরে ডিজিটাল প্রদর্শনব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ঈদের ছবি ৭০-৮০টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে শুরু করে। কোনও কোনও ছবি ১০০ সিনেমা হল ছাড়িয়ে যায়।

শাকিব খানেরও নবজন্ম দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৬ সালের ঈদে ‘শিকারী’ মুক্তির পর অন্যরকম এক শাকিব খানকে আবিষ্কার করেছে বাংলাদেশ। পরের বছর ‘নবাব’ ছবিটিও আগের ছবিটির মতো বাম্পারহিট হয়ে মুমূর্ষু ইন্ডাস্ট্রিতে অক্সিজেন সরবরাহ করেছে। তবে এই যৌথ প্রযোজনার ছবিগুলো প্রচুর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ছবিপাড়ায়। ইন্ডাস্ট্রিকে দুইভাগে ছিঁড়ে ফেলে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা। ঈদ এলেই দেশি প্রযোজকদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের দায়ে দায়ী করা হতো যৌথ সিনেমাকে। এর বিরুদ্ধে সে সময় মিটিং, মিছিল, মহাসমাবেশ সবই হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির প্রতিবাদের মুখে যৌথ প্রযোজনার নীতিমালা কঠোর করা হলে এই ধারার সিনেমা কোমায় চলে যায়।

তখন আবার দেশি ছবির প্রযোজনা সংস্থার দিকে ঝুঁকে আসেন শাকিব খান। শাপলা মিডিয়ার সঙ্গে ‘চিটাগাইঙ্গা পোয়া নোয়াখাইল্লা মাইয়া’, ‘ক্যাপ্টেন খান’, ‘বিদ্রোহী’ করেন এই নায়ক। ছবিগুলো ঈদে বড় পরিসরে মুক্তি পায়।

প্রযোজক হওয়ার পরও শাকিব খান নিজের ছবি মুক্তি দিতে ঈদকেই বেছে নেন। তার প্রযোজনার ‘হিরো দ্য সুপারস্টার’ ও ‘পাসওয়ার্ড’ ছবি দুটি ঈদেই প্রদর্শিত হয়েছে।

প্রযোজক যারাই মোটা পুঁজি নিয়ে এসেছেন তাদের ছবিই করেছেন শাকিব খান। তবে পরিচালকের বেলায় তার বাছবিচার ছিল। যৌথ প্রযোজনায় যাওয়ার আগে ঈদের ছবির জন্য তার পছন্দের পরিচালক ছিলেন এফ আই মানিক, সোহানুর রহমান সোহান, বদিউল আলম খোকন, শাহিন সুমন, এমবি মানিক, উত্তম আকাশের মতো নির্মাতারা।

আর তার নায়িকা হিসেবে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে অপু বিশ্বাসকে। দুজনে মিলে বিভিন্ন ঈদে অন্তত ডজন দুয়েক ছবি হাজির করেছেন দর্শকদের সামনে। অন্য নায়িকাদের মধ্যে সাহারা, পূর্ণিমা, এমনকি শাবনূরকেও দেখা গেছে। কলকাতার কয়েকজন নায়িকা নিয়েও তিনি হাজির হয়েছেন ঈদে। শ্রাবন্তী, শুভশ্রী, ইধিকা, মিমির নাম পাওয়া যায় এই তালিকায়।

নায়িকার পর্ব তো গেলো, এবার নায়কের আলাপ। শাকিব খানকে টক্কর দেওয়ার মতো নায়ক বলতে গেলে কেউ-ই ছিল না। অনন্ত জলিল কয়েকটা ঈদে আওয়াজ দিয়েছেন। তার অভিনীত-প্রযোজিত ‘মোস্ট ওয়েলকাম’, ‘মোস্ট ওয়েলকাম টু’, ‘নিঃস্বার্থ ভালবাসা’, ‘দিন দ্য ডে’ ঈদে মুক্তি পেয়ে একটা বিশেষ শ্রেণির দর্শককে সিনেমা হলে টানতে পেরেছে। তবে এতে শাকিব খানের সাম্রাজ্যে সামান্য চিড়ও ধরেনি। কাজী মারুফ, বাপ্পি চৌধুরী, সাইমন সাদিক, আরিফিন শুভ, কেউই শাকিব খানের ঈদের বাজারে ভাগ বসাতে পারেননি সেই অর্থে।

তবে ঈদকে একতরফা হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন একজন মাত্র অভিনেতা, তিনি আফরান নিশো। আলোচনা করা যাক শাকিব খানের তৃতীয় ইনিংস নিয়ে। এর শুরু ২০২৩ সালের ব্লকবাস্টার ‘প্রিয়তমা’ ছবি দিয়ে। সেই বছর আফরান নিশোও আসেন ঈদে। মুক্তি পায় তার প্রথম ছবি ‘সুড়ঙ্গ’। এত জমজমাট ঈদ বহু বছর দেখেনি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি।

পরের বছরটা অবশ্য আবারও শাকিবময় হয়ে যায়। এক ঈদে ‘রাজকুমার’, আরেক ঈদে ‘তুফান’। তার ধারে-কাছে আর কেউ নেই। এক ‘তুফান’ দিয়ে শাকিব খান তার ক্যারিয়ারকে কয়েক বছরের জন্য নবায়ন করে নেন। অবশ্য তার হাত ধরে ঈদ-সিনেমার ধরনেও আসে পরিবর্তন। ভায়োলেন্স-ভরপুর সিনেমাও যে ঈদে দলবেঁধে লোকে দেখতে পারে, এটা একদমই স্মৃতির বাইরে ছিল ঈদ-অভিজ্ঞদের।

গত বছর ‘বরবাদ’ দিয়ে ব্যবসার দিক থেকে নতুন রেকর্ড গড়েন শাকিব খান। ‘তাণ্ডব’ সেটাকে ছাড়িয়ে যেতে না পারলেও পুরনো সাম্রাজ্য ভালোভাবেই আঁকড়ে ধরে থাকেন শাকিব খান। ‘দাগি’ দিয়ে নিশো আর ‘জংলি’ দিয়ে সিয়াম ঈদ উৎসবে নতুন মাত্রা যোগ করেন গেল বছরের ঈদুল ফিতরে। এই তিন ছবির সঙ্গে ঈদুল আজহায় যোগ হয় ‘উৎসব’। পুরনো ঈদের অনুভূতি যেন ফিরে আসতে থাকে দর্শকদের। নব্বই দশকের মতো আবারও প্রেক্ষাগৃহে ঢল। তবে এবার সিঙ্গেল থিয়েটারে নয়, মাল্টিপ্লেক্সে সূচনা ঘটে সিনেমার নতুন দিনের।

একই সঙ্গে দেখা দেয় নতুন সংকটও। ঈদে উপর্যুপরি ব্যবসা সিনেমার বাস্তুতন্ত্র ধসিয়ে দেয়। যে সিনেমা মানে ছিল ৫২ সপ্তাহে ৫২ ছবি, সেখানে দুই ঈদে ছবি মুক্তির মহোৎসব ছাড়া পুরো ইন্ডাস্ট্রি হয়ে পড়ে রক্তশূন্য। সারা বছর সিনেমা হলে ছবি নেই। দর্শকের দেখা নেই। শুটিংয়ের খবর নেই। ঈদ ঘনিয়ে এলেই তোড়জোড়। ফিরে আসে দর্শক। ফিরে আসে ব্যবসা। ফিরে আসে ঐতিহ্য। অথচ সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে সামগ্রিকভাবে চাঙা করার কোনও উদ্যোগ নেই। না সরকারে কাছ থেকে, না সিনেমাওয়ালাদের কাছ থেকে, কোনও তরফেই বছরব্যাপী কর্মসূচি নেই। ধীরে ধীরে সিনেমা শিল্প ঈদকেন্দ্রিক এক আজব চলচ্চিত্র কারখানায় রূপান্তরিত হচ্ছে।

রায়হান রাফীর মতো বাজার কাটতি পরিচালক, আলফা আইয়ের মতো বড় ব্যানার, ঈদের ছবির জন্য তাদের উদ্যম, সব কিছুই যেন বিফলে যেতে বসেছে। চলচ্চিত্র শিল্প পড়ে গেছে ঈদের দুষ্টুচক্রে। অতিরিক্ত ওটিটি-নির্ভরতা সিনেমার গতিকে দুই ঈদের ভেতর আটকে ফেলেছে। বছরজুড়ে কর্মপরিকল্পনা না থাকায় সিনেমার চাকা যেন ঘুরতে গিয়েও ঘুরছে না। সিনেমা সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন- এই অচলাবস্থার শেষ কবে?


About The Author

মাহফুজুর রহমান

চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক

Leave a reply