মাস্টারপিস ‘রইদ’
‘রইদ’ শূন্য থেকে শুরু করে পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত একটি মাস্টারপিস ছবির জার্নি। এ জার্নিতে দর্শক একটি অভিনব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। ছবি শেষ করে দর্শকের মনে হয় কতটুকু বোঝা গেল বা গেল না। এই বোঝা যাওয়া না যাওয়ার মধ্যবর্তী খেলায় পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন বিজয়ী হন।
মেজবাউর রহমান সুমন যে এক্সপেরিমেন্টাল হাই থটের কাজ নতুন করেছেন তা কিন্তু নয়। এটি তাঁর পুরনো মেকিং স্টাইলেরই অংশ। তিনি যখন ফিকশন তৈরি করতেন টিভির জন্য তখন সেগুলো পিওর ফিকশন ছিল। টিভি নাটকের উর্বর সময়ে তিনি যেসব কাজ দেখিয়েছেন সবগুলোই ছিল চিন্তাকে উসকে দেয়া কাজ। ‘তারপরও আঙুরলতা নন্দকে ভালোবাসে, তারপর পারুলের দিন, ফেরার পথ নেই থাকে না কোনোকালে, দক্ষিণের খোলা জানালা আলো আসে আলো ফিরে যায়, সুপারম্যান, স্মিতার সাদা জামা ও এইসব, ধূলোমেঘে জ্যোৎস্না ভ্রমণ’ এগুলো ছিল বাংলা নাটকের ক্লাসিক সময়ের কাজ। সেই পুরনো ক্লাস বজায় রেখে তিনি চলচ্চিত্রে আসেন ‘হাওয়া দিয়ে যার শুরু ও বাজিমাত হয়েছিল। নতুন ছবি ‘রইদ’ আরো পরিপূর্ণতার দিকে তাঁর যাত্রাকে এগিয়ে নিলো।

‘রইদ’ মেটাফোরিক্যাল একটি ছবি যার পরতে পরতে তীক্ষ্ম এক্সপেরিমেন্ট আছে। এগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে সূক্ষ্ম জীবনদর্শনের পাশাপাশি ছবির যে উচ্চমার্গীয় নির্মাণ তাতে করে একটি মাস্টারপিস ছবি হয়ে ওঠার সব গুণ এটি ধারণ করেছে।
পরিচালক প্রথমত ছবিটিকে যেখান থেকে শুরু করেছেন সেখানে দর্শকের কাছে মোটেও তিনি সুযোগ দেননি যে দর্শক এর শেষটাকে সহজে বুঝে যাবে। দর্শককে নাস্তানাবুদ করার একটা ক্ষমতাকে রেখেই তিনি ছবিটি নির্মাণ করেছেন। ছবিটি কীভাবে মেটাফোরিক্যাল দিকে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে তার বিশ্লেষণ ধারাবাহিকভাবে দেখা যাক :
১. ছবির নাম ‘রইদ’ যা এর চরিত্র বা গল্পের সাথে সরাসরি কানেক্টেড না। এর নামকরণ হয়েছে ছবির পরিবেশকে অন্য ধরনের একটা বিশেষত্ব দেয়ার জন্য। উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক উচ্চারণে ‘রোদ’-কে ‘রইদ’ বলা হয়। একজন কৃষকের পরিশ্রমী জীবনকে ব্যাখ্যা করতে প্রায়ই বলা হয় ‘রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে’ কাজ করার কথা। সেই রোদে পোড়া চকচক করা ঘামের শরীর নিয়ে সাদু ও সাদুর বউ সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়াই করে। এখানে ‘রইদ’ সেই প্রতিকূল পরিবেশের মেটাফোরে পরিণত হয়েছে।
২. ছবির যে পরিবেশগত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে সেখানে স্বর্গীয় একটা আবহ আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে। সেই স্বর্গ থেকেই আদম-হাওয়াকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল তাদের কর্মের ফল হিসেবে।
৩. সাদু ও সাদুর বউ মিলে মেটাফোরে আদম-হাওয়া চরিত্র হয়ে ওঠে। তাদের দাম্পত্যে গভীর প্রেমের পাশাপাশি কর্মফল অনুযায়ী শাস্তিভোগের বিষয়টিও সবার জানা। মানব-মানবীর উপাদান এখানে সাদু ও তার বউ।
৪. ধর্ম অনুযায়ী (ইসলাম, বাইবেল) বলা হয় পুরুষের পাঁজর থেকে নারীকে তৈরি করা হয়েছে অর্থাৎ আদমের শরীরের একটা অংশ হয়েছে হাওয়া। তাই ছবিতে সাদুর বউয়ের নিজস্ব কোনো নাম আমরা দর্শকরা পাই না। সে পরিচিত হয় সাদুর দ্বারা, তাকে বলা হয় ‘সাদুর বউ’ অর্থাৎ সাদুর একটা অংশ সে।

৫. যতবার সাদুর বউ হারিয়ে যায় ততবার সে ফিরে আসে অন্যভাবে। সাদু আবার একটা ভুল করে আবার বউ ফিরে আসে। এই ফিরে আসাটা সাদুর নিয়তি কারণ প্রত্যেকবার সাদুর বউ হারানোর আগে সাদু যেটা করে তা তার কর্মফল।
৬. কর্মফলের ফলাফলরূপে আসে গন্ধম ফল যা মূলত পৃথিবীতে আদম-হাওয়ার সন্তান-সন্ততি হওয়ার প্রধান কারণ। সেই গন্ধমের চিহ্ন ছবিতে হয়ে ওঠে ‘তাল’। এই ফল এ ছবিতে সাধারণ কোনো ফল নয়, এটি ছবির গল্পের এগিয়ে যাওয়ার একটা মাধ্যম।
৭. কর্মফল আসার পর সাদু নিজের পোষা প্রিয় ছাগল কুলসুমকে রান্না করে খেয়ে ফেলে এবং সেই খাওয়ার ভেতর দিয়ে তার ভেতরের যত খেদ সব বেরিয়ে যায়। চাপা প্রেম বা বিরহ যাই বলি না কেন সাদুর প্রতিক্রিয়ায় সেটা আসে।
৮. গবাদিপশুর প্রজনন দৃশ্য ছবির গুরুত্বপূর্ণ একটি মেটাফোর। দেখা যায় বেঁধে রাখা গরুর সাথে প্রজননে অংশ নিচ্ছে অন্য গরু বা ষাঁড়। সাদু ও সাদুর বউয়ের মধ্যে তেমন কোনো কিছু ঘটেছে কিনা সেই দৃশ্যের গোপন অবতারণা করা হয়।
৯. সাদুর বউয়ের প্রিয় ছাগল কুলসুমের বাচ্চা হয় কিন্তু কুলসুম বাঁচে না। কুলসুমের না বাঁচার মধ্য দিয়ে সাদুর বউয়ের রিফ্লেকশন ঘটানো হয় এবং ছাগশিশুর চিৎকার যেন মানবশিশুর পৃথিবীতে বিচরণের সূক্ষ্ম মেটাফোর।
১০. ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা যায় একের পর এক তাল পড়ছে গাছ থেকে। তালের বৃষ্টি যেন, যার মধ্যে সাদু ডুবে গেছে যেন কিন্তু হাতটা তারপরেও বাড়িয়ে দেয় আরেকটা তাল নেবার জন্য। এ দৃশ্যটি ছবির সবচেয়ে গভীর দৃশ্য। এখানে সাদুর লোভের চূড়ান্ত সীমাকে দেখানো হয় যেখানে তাল হয়ে উঠেছে শাস্তির সর্বশেষ উপকরণ।
মেটাফোরিক এই জগতের প্রেজেন্টেশনে নির্মাতা আমাদেরকে এ ছবির অদ্ভুত জগতে নিয়ে যান যেখানে ছবিটি মাস্টারপিস মেকিংকে ডিল করে। মাস্টারপিসের ইন্টারন্যাশনাল ডেফিনেশন কি বলছে দেখে নেয়া যাক-“A masterpiece is when everything works. The story, the characters, the performances — when they all click. The scary scenes actually scare you. The emotional ones sneak up on you. And the music stays in your chest long after the film ends.”
‘রইদ’-এ তো এর সবকিছুই পারফেক্ট অবস্থানে আছে। পরিচালক আমাদের এ ছবির ভিজ্যুয়াল জগতে নিয়ে যান। সেখানে মুগ্ধকর দৃশ্য ফ্রেমের পর ফ্রেমে দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে। এসএম সুলতানের পেইন্টিংয়ের মতো সৌন্দর্যময় হয়ে ওঠে ছবির ফ্রেমের পর ফ্রেম। সবুজ বৃক্ষরাজি, হাওড় নদী নৌকা, আবছা নীল অন্ধকার, শেষ বিকেলে গরুর পালে মিষ্টি রোদের ছোঁয়া, শুভ্র কাশফুলের অপরূপ সৌন্দর্য, জোছনা রাতের রোমান্টিক আবহ, বৃষ্টির অপূর্ব দৃশ্য এগুলো পেইন্টিংয়ের মতো আবহ তৈরি করেছে ছবিতে।
তারপর আসে অভিনয়। অভিনয়ে সাদুর চরিত্রে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও সাদুর বউয়ের চরিত্রে নাজিফা তুষি ইনসেইন পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছে। তাদের অভিনয় বলে যে-কোনো চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে কাজ করতে তারা প্রস্তুত। ইমরানের সরলতা, স্বাভাবিক একজন মানুষের অ্যাক্টিভিটি অন্যদিকে তুষির চপলতা, খাপছাড়া কথা, ভৌতিক আচরণ এগুলো বিস্মিত করে দেয়।
বিজিএমের ব্যবহার টপক্লাস ছবিতে। সানাইয়ের সুর যেখানে






