Select Page

বনলতা সেন: কিছু সিনেমা শুধু দেখারই নয়, অনুভবেরও

বনলতা সেন: কিছু সিনেমা শুধু দেখারই নয়, অনুভবেরও

বনলতা সেন কি প্রেমের কবিতা? না তো… হাজার বছর ধরে হাঁটা এই পথিক যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জন্ম-মৃত্যুর ঘূর্ণিপাকে আটকে থাকা মানবজাতির প্রতিনিধি। শান্তির খোঁজে থাকা সে পথিক বিম্বিসার আর অশোকের মতোই প্রাচীন। তার বনলতা সেন তাই কোন সাধারণ নারী নয়, বরং বিমূর্ত শান্তির মূর্ত প্রতীক। এই দর্শনকেই উজ্জ্বল বলতে চেয়েছেন পর্দায়

Helen, thy beauty is to me
Like those Nicéan barks of yore,
That gently, o’er a perfumed sea,
The weary, way-worn wanderer bore
To his own native shore.

তিমির হননের কবি! নির্জনতার কবি!! ধূসরতার কবি!!! চিত্ররূপময়তার কবি!!!! প্রকৃতি, বিষণ্নতা, একাকীত্ব, সময়চেতনা, মৃত্যুর গন্ধ মেশানো তাঁর কাব্যভাষা এখনো এতোটাই সজীব যে মৃত্যুর প্রায় ৭২ বছর পরও আমরা তাঁকে পর্দায় খুঁজে পেতে চেয়েছি মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের পরিচালনায়।

শুরুতেই সমুদ্রতটের এক এক্সট্রিম শট দিয়ে। ফ্রেমে প্রচুর নেগেটিভ স্পেস রেখে খুব ছোট আকারে দেখা যায় সাবজেক্টকে। ঠিক যেন- ‘আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন’। ম্যাচ কাটে এরপরের শটে সমুদ্রের মাঝে আমরা বনলতা সেনকে দেখি পেছন থেকে। সমুদ্রের ঢেউয়ের মাঝে ভাসছে অসংখ্য ফুল, আবহে শঙ্খমালার পঙক্তি৷ দৃশ্যান্তরে বনলতা সেনের পিছনের দেওয়ালে ধ্যানরত বুদ্ধের ছবি দিয়ে ফোরশ্যাডোয়িং। একেকটা শট যেন একেকটা মূর্তিমান শিল্প! এলেন পো এর ‘টু হেলেন’ কবিতার আবহে নাবিলার চরিত্রায়ন দেখে প্রশ্ন জাগে, ‘আপনি হেলেন? নাকি বনলতা সেন?

আপনি পৌরাণিক নাকি ঐতিহাসিক?’ এত সুন্দর স্ট্যাটিক শট সিনেমায় পাবো তা আশা করি নি। ডার্ক টোন ব্যবহার করে সিনেমাতে আলগা মন খারাপের আবহ তৈরির চেষ্টা করেন নি পরিচালক।

‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,’

বনলতা সেন কি প্রেমের কবিতা? না তো… হাজার বছর ধরে হাঁটা এই পথিক যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জন্ম-মৃত্যুর ঘূর্ণিপাকে আটকে থাকা মানবজাতির প্রতিনিধি। শান্তির খোঁজে থাকা সে পথিক বিম্বিসার আর অশোকের মতোই প্রাচীন। তার বনলতা সেন তাই কোন সাধারণ নারী নয়, বরং বিমূর্ত শান্তির মূর্ত প্রতীক। এই দর্শনকেই উজ্জ্বল বলতে চেয়েছেন পর্দায়। জীবনানন্দের চিত্ররূপময়তা রূপ পেয়েছে এই সিনেমার শটে আর কবিতা হয়েছে সংলাপ। ছবির গল্পকে মোটামুটি দুই হাফে ভাগ করা যায়। প্রথম হাফে কবির সৃষ্টিকে ব্যবহার করে তাঁর কাব্য জগতকে নির্মাণ করা হয়েছে নন-লিনিয়ারভাবে। দ্বিতীয়ভাগে লেখকের ব্যক্তিজীবন, যা একাকিত্ব, দাম্পত্য অশান্তি আর দারিদ্র‍্যে জর্জরিত। ফেড আউট – ফেড ইনের মাধ্যমে দুটো সময়কে আলাদা করায় সিনেমা সহজবোধ্য হয়েছে। সূর্যকে ঘিরে গ্রহদের আবর্তন যেমন ধ্রুব, তেমনই সত্য শিল্পকে ঘিরে শিল্পীর পরিভ্রমণ। শিল্পের পেছনে ছুটে চলতে চলতে ক্ষয়ে যাওয়া এক নি:সঙ্গ কবির আখ্যান ‘বনলতা সেন’।

এই যাত্রায় দর্শকের বাহন ছিল জীবনানন্দে আকণ্ঠ ডুবে থাকা মহিন নামের চরিত্রটি। কে এই মহিন? তার উত্তর দিয়েছেন তো কবিই…

‘আমরা যাইনি ম’রে আজো— তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়:
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে,
প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন— এখনও ঘাসের লোভে চরে।’

জীবনানন্দ দাশের জীবন ও কর্মকেন্দ্রিক সিনেমা হলেও মহিন চরিত্রটায় সর্বোচ্চ স্ক্রিনটাইম পেয়েছে। বেশি স্কিনটাইমের পরও তার চরিত্রায়নে হুড়োহুড়ি ছিল। কিছু চরিত্র সিনেমায় অপ্রয়োজনীয় লেগেছে (যেমন: প্রিয়ন্তী উর্বীর চরিত্র)। অভিনয়ে খাইরুল বাশার বেশ ভালো করেছেন। হলে চোখ বন্ধ করে তাঁর কবিতা আওড়ানো শুনতে ভালোই লাগছিল। ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’ বললে আমি নাবিলা ছাড়া আর কারো কথা এই সময় মাথায় আনতে পারি না। অভিনয় ভালো কিন্তু ওনার সহজাত স্বতঃস্ফূর্ততা কেন জানি মিস করেছি। সোহেল মন্ডল তার অভিনয়ের মাধ্যমে চরিত্রের দাবি মিটিয়েছেন। সুমনা চরিত্রে রুপন্তী আকিদের বাংলা উচ্চারণ অবশ্য কানে লেগেছে, তাকে কোনভাবেই ত্রিশের দশকের সাথে মিলাতে পারছিলাম না। বাকিরা হয়তো উতরে যায়, কিন্তু অভিনয়ে প্রাণ বলতে সোহেল মন্ডল আর খাইরুল বাশারই।

ভিএফএক্সের কাজ এই সিনেমার দুর্বলতম দিক। পরিচালক যা ভেবেছেন তা পর্দায় ঠিকঠাক ফুটাতে পারেন নি বলেই ক্লাইম্যাক্সে কাঙ্ক্ষিত ক্যাথারসিস তৈরি হয় নি। কবির ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয় নি সিনেমায়। দ্য লাস্ট সাপার আর গ্রিক মিথলজি থেকে রেফারেন্স নিয়ে জীবনানন্দের অন্তিমক্ষণের এক্সপেরিমেন্টটাল সিনটা পর্দায় খুবই কিম্ভুত লেগেছে। শেষ দিকে কিছুটা তাড়াহুড়া, কিছুটা ডিসকন্টিউনিটি নজর এড়ায় নি। পর্দায় এম্বিবিয়েন্ট লাইট হিসেবে সূর্যের আলোর ব্যবহার বাস্তবতাকে জোরালো করেছে। রাতের দৃশ্যে প্র‍্যাকটিকাল লাইটের (মোমবাতি, লন্ঠন) যথাযথ ব্যবহার দৃশ্যের রহস্যময়তা ও দৃশ্যমানতার ভারসাম্য ঠিক রেখেছে। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর একটু লাউড। ‘এখানে কেউ নেই’ গানটি শ্রুতিমধুর ও দৃশ্যের সাথে মিশে অর্থ তৈরি করেছে।

কিছু সিনেমা শুধু দেখার জন্য না, অনুভবের জন্যও। ‘বনলতা সেন’ তেমনই একটা নির্মাণ। এককথায়, দুটো পরাবাস্তব সিনের মাঝে এক টুকরো জীবনানন্দ। কবিতার মতোই স্নিগ্ধ কিন্তু কবিতার রস সবার জন্য নয়। এই মুভি ব্যবসাসফল হবে কিনা জানি না, তবে এমন সাহিত্যনির্ভর সিনেমা নির্মাণ যেন বন্ধ হয় না। পর্দায় সৃষ্টি ও স্রষ্টা এমন মুখোমুখি হোক।


About The Author

Leave a reply