রকস্টার: ডিরেকশনহীন ডেস্টিনেশন!
গন্তব্যহীন জার্নি অথবা গন্তব্য নির্দিষ্ট কিন্তু রুট অনির্দিষ্ট— উভয়ক্ষেত্রেই রেজাল্ট আকাশসম ‘নিরর্থকতা’!
শাকিব খানের রকস্টারে মাল্টিলেয়ারড ক্যারেক্টার আছে, গভীর বোধের সংলাপ এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে উদ্দমতা আছে— তবু ‘ডিরেকশনহীন ডেস্টিনেশন’ এর ফলশ্রুতিতে ফিল্ম দেখা শেষে মনে আউড়াতে থাকি— আমাদের ডিরেক্টর এবং ফিল্ম ইনভেস্টরদের প্রায়োরিটিতে শীর্ষে থাকে স্টার কাস্টিং, সবার তলানিতে স্ক্রিপ্ট রিফাইনমেন্ট। তারা কি কনজ্যুমারকে এখনো প্রাক-ইন্টারনেট যুগের মতো ইনফরমেশনালি হ্যান্ডিক্যাপড ভাবেন যে দুটো গান, তিনটে পাঞ্চিং ডায়লগ আর নায়কের সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ার দৃশ্য দেখেই তারা আওয়াজ তুলবে- মারহাবা মারহাবা!

[ডিসক্লেইমার: স্পয়লার সংক্রান্ত রিজার্ভেশন থাকলে আমার ফিল্ম সংক্রান্ত লেখাগুলো এড়িয়ে চলতে প্রবলভাবে উৎসাহিত করছি]
দুটো ক্রিটিকাল এনকুয়ারি রাখতে পারি।
নাম্বার ১
ফিল্মের পরিচালক আজমান রুশো; এটাই তার প্রথম ফিল্ম। গুগলে তার সম্বন্ধে পাওয়া তথ্য জানাচ্ছে তিনি বিজ্ঞাপন নির্মাতা, এবং নিজেও মিউজিকের সাথে জড়িত। এরকম ব্যাকগ্রাউন্ডের একজন মানুষ কোন চিন্তাধারা থেকে ফিল্মের নাম ‘রকস্টার’ রাখলেন, বিস্ময়কর ঠেকে। ১৫ বছর আগে রণবীর কাপুরের ‘রকস্টার’ যে লেভেলটা এচিভ করেছে, ২০২৬-এ এসে একটা স্বতন্ত্র মিউজিকাল ফিল্ম নির্মাণ করতে কেন সেই টাইটেলেই ফিরে যেতে হবে, এবং প্রথম সিকুয়েন্সও সেটা থেকেই ধার নিতে হবে? জনশ্রুতি আছে, এফডিসিতে খাবার সাপ্লাই দিত বা প্রোডাকশন বয়, এমন অনেকেই পরবর্তীতে ডিরেক্টর হয়ে গেছে, কারণ তারা লাইট-ক্যামেরা-একশন বলতে জানতো। সেই পরিচালকরা হিন্দি এবং তামিল-তেলুগুর বাংলায়ন করতেন। যদি নিজস্ব ওয়ার্ল্ড ভিউ এবং সিগনেচার টোন না থাকে, ফিল্ম কেন বানাতে হবে?
নাম্বার ২
এ অ্যাঙ্গেলটি একটু অস্বস্তিদায়ক হতে পারে। গত বছর ৩১ আগস্ট প্রথম আলো অনলাইনে শাকিব খানের পারিশ্রমিক বিষয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।গ্রাফটা স্টাডি করলে কয়েকটা ফিশি ফাইন্ডিংস পাওয়া যেতে পারে
– ২০২০-২৩ টাইমলাইনে শাকিবের রিলিজ পাওয়া ফিল্মগুলো বীর, গলুই, নবাব এলএলবি, বিদ্রোহী, লিডার: আমিই বাংলাদেশ; কোনোটাই ব্যবসা করেনি। তার পুনর্জন্ম হয় ‘প্রিয়তমা’ এর মাধ্যমে। সেখানে পারিশ্রমিক ৩৫-৪৫ লক্ষ টাকা।
-পরের ফিল্ম রাজকুমারের জন্য ৬৫ লক্ষ টাকা। ‘দরদ’ এর জন্য ৭০ লাখ; ফিল্ম ফ্লপ করায় বিশাল লোকসান।
-রায়হান রাফীর ‘তুফান’ এর জন্য ৮০-৯০ লাখ। ‘বরবাদ’ এবং ‘তান্ডব’ এর ক্ষেত্রে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটির মধ্যে।
রিপোর্টের শেষাংশে আমরা জানতে পারি ‘প্রিন্স’ এবং ‘সোলজার’ এর জন্য নিচ্ছেন ২ কোটি।
অর্থাৎ ২০২৩ থেকে ২০২৬, মাত্র ৩ বছরে তার পারিশ্রমিক ৩৫ লাখ থেকে ২ কোটিতে গিয়ে ঠেকেছে।
একটা কৌতূহলোদ্দীপক কোরিলেশন শেয়ার করি, যাকে অন্তত আমার কাকতালীয় মনে হয় না।
‘বরবাদ’ ছিল মেহেদি হাসান হৃদয়ের প্রথম ফিল্ম, বাজেট ১৫ কোটি প্লাস।
‘প্রিন্স’ ৭ কোটি প্লাস, পরিচালক আবু হায়াত মাহমুদ, যা তার প্রথম ফিল্ম।
‘রকস্টার’-এর বাজেট জানি না, কিন্তু এটাও পরিচালকের প্রথম কাজ।
প্রশ্ন হলো, এসব আনকোড়া পরিচালকের পেছনে কেন বা কারা কোটি কোটি টাকা ইনভেস্ট করছেন। এই ফাঁকিবাজিটা কিন্তু নিজেই একটা ক্রাইম থ্রিলারের প্লট। শুনেছি বুদ্ধিমান মানুষেরা ‘ক’ শুনলেই বুঝতে পারি কাবিলা না কি কবিতা বলা হচ্ছে!

একটা ফ্যান্টাসি শেয়ার করতে পারি।
রকস্টারের প্রটাগনিস্টের নাম ‘আগুন’; আমরা যদি রিয়েল লাইফে তাকাই গায়ক আগুনের বাবা খান আতাউর রহমান বাংলাদেশের প্রথিতযশা একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, মা নীলুফার ইয়াসমিনও ছিলেন কন্ঠশিল্পী। সালমান শাহের জীবদ্দশায় আগুন প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, তবে সেটা কখনোই জেমস-আইয়ুব বাচ্চু বা শাফিন আহমেদ লেভেলের ছিল না, এবং রকস্টার বললে কারো দূরতম কল্পনাতেও সে আসবে না।
তবে ফিল্মের যে সেটআপ, অর্থাৎ শাকিব ওরফে আগুনের বাবা একজন বিখ্যাত মানুষ, কিছুদিন পরপর পরকীয়া স্ক্যান্ডাল আসে, মা নিজেও একজন পারফর্মিং আর্টিস্ট ছিলেন— এখান থেকে যদি কেউ চিন্তা করে বাংলাদেশে এরকম কম্বিনেশন কে কে আছে, সেক্ষেত্রে অপশন হিসেবে তিনটি নাম পেতে পারে— আগুন, প্রীতম হাসান ও এ কে রাহুল।
আগুন ছোটবেলা থেকেই একা। মা-বাবার সাথে ইমোশনাল ডিটাচমেন্ট, দাদীর সাথে এটাচমেন্ট ছিল, তাকেও পাঠিয়ে দেয়া হলো বৃদ্ধাশ্রমে। বন্ধুরাও সবাই ত্যাগ করেছে। মিরা নামের একজনের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তৈরি হলো, সেও ডিসকানেক্টেড, ৪ বছর পরে যখন পুনর্মিলন হলো, মাইলস্টোন স্কুলের ট্রাজেডি ফিরে এলো, হাসপাতালের ওপরে আছড়ে পড়লো বিমান। মিরা ফিরে এসেও গেল হারিয়ে!
একটা জায়গায় পরিচালকের স্বাতন্ত্র পেলাম।
প্রথাগত মিউজিকাল ফিল্মগুলোয় গানের প্রাধান্য থাকে। এখানে গানের চাইতে গানকে তৈরি করা ব্যক্তির শিল্পীসত্তাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, এটা খুবই প্রশংসনীয় একটি পারসপেক্টিভ।
আগুনের ক্যারেক্টারের ডিজাইন পারফেক্ট। সে বাবার ছায়ায় থাকতে চায় না, নিজের আইডেন্টিটি ক্রিয়েট করবে। ডিজেস্টার ঘটেছে এক্সিকিউশনে। স্টোরিটেলিং এতটাই অ্যামেচার, শুরুর কিছুক্ষণ পর থেকেই ফিল হতে থাকে, পরিচালক শাকিব খানকে কাস্ট করতে পেরেই যা পাওয়ার পেয়ে গেছে।
এবং যদি পলিটিকালি কারেক্টনেস বাদ দিয়ে বলি, এ ফিল্মের প্রধান ত্রুটি শাকিব স্বয়ং; সে লুকিং নিয়ে যত সময় দিয়েছে, একজন রকস্টারের ম্যানারিজম আয়ত্ত করায় মনোযোগই দেয়নি। গান পারফরমিংয়ের প্রতিটি সিকুয়েন্সেই মনে হচ্ছিল তুফান বা বরবাদের শাকিব খান দাঁড়িয়ে আছে মাইক্রোফোনের সামনে।
গত মাসে রিলিজ হয় মাইকেল জ্যাকসনের বায়োপিক, তাতে মাইকেলের চরিত্রে অভিনয় করেছে তার ভাইপো জাফর জ্যাকসন। ড্যান্সের স্টেপ বা স্টেজ পারফরম্যান্স যেভাবে করেছে, তার ডেডিকেশনের জন্যই ফিল্মটা দেখতে ইচ্ছা করে। শাকিব এতটা ক্রিটিকাল একটা চরিত্রের জন্য কোনোরকম গ্রাউন্ডওয়ার্ক করেছে, একবারও মনে হয়নি।
স্টোরিটেলিং বা স্ক্রিনপ্লে কেন এমেচার, এটা বুঝবার জন্য একটামাত্র রেফারেন্স দিই। সমগ্র ফিল্ম শেষে যদি জিজ্ঞেস করা হয় প্রটাগনিস্ট আগুন যে রকস্টার, তার প্রমাণ কী; কোনো ব্যাকস্টোরি বা সাপোর্টিভ সিক্যুয়েন্স নেই। কোন ক্যারেক্টার কখন আসছে, কখন এক্সিট নিচ্ছে, সামান্যতম বিল্ডআপও নেই, ফলে দর্শক ইমোশনালি হুকড হবে কেন জানি না। ড্রাগস নিয়ে একই টাইপ সিকুয়েন্স বারবার না দেখিয়ে স্টারডম, ক্রাইসিস এসবে ইনভেস্ট করা উচিত ছিল।

এর মধ্যেও তিনটা সিক্যুয়েন্সকে মনে রাখব
– ভিউ ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে যেরকম টক্সিসিটি বেড়েছে, মাঝেমধ্যে অনেকেরই এদের কুকুর প্রজাতি মনে হয়। আমরা শাকিবকে দেখতে পাই ভিউখোরদের দিকে কুকুর ছেড়ে দিতে, কুকুরের ধাওয়া খেয়ে তারা পড়িমরি পালায়। এ ধরনের সার্কাস্টিক সিকুয়েন্স বাংলা ফিল্মে বিরল।
– ৪ বছর পরে মিরা তথা সাবিলা নূরের দেখা পেয়েছে আগুন, তার ভোকাল কর্ডে সমস্যা, কথা বলা বন্ধ। দুজন পাশাপাশি হাঁটছে, মিরা কথা বলে মুখে, আগুন ফোনে লিখে জবাব দেয়। সিকুয়েন্সটা হাইলি রোমান্টিক। দৃশ্যায়নটা আরো অনেক বেশি স্মার্ট হতে পারত যদিও।
– অন্তিম সিক্যুয়েন্স অতি মনোহরী। আমার ইনস্টিংট বলছিল ডিরেক্টর আসলে ৪-৫ সেকেন্ডের এ সিক্যুয়েন্সটাতে এত বেশি ইনভেস্টেড ছিলেন যে, এ অব্দি পৌঁছানোর জার্নিটাতে একেবারেই মনোযোগী ছিলেন না।
দুটো সংলাপ পছন্দ হয়েছে
– শাকিব তার অনুতপ্ত বিখ্যাত বাবাকে বলছে ‘পাহাড়ের চূড়া আর খাদের কিনারা, দুয়ের মধ্যে দূরত্ব একটামাত্র ভুল পদক্ষেপ’।
– তানজিয়া মিথিলা শাকিবকে শোনাচ্ছে, ‘আমাদের জীবনে কিছু মানুষ আসেই হারিয়ে যাওয়ার জন্য, যাতে তাদের ভুলে গিয়ে আমরা ভালো থাকতে পারি’।
তবে ফান্ডামেন্টালি একটা মহাব্লান্ডার ঘটে গেছে।
মিউজিকাল ফিল্মে গানের চয়েজ হতে হবে স্পেশাল। গানগুলো খুবই ম্যাড়মেড়ে ধরনের। সুর এবং মিউজিকাল কম্পোজিশন শুনলে সন্দেহ জাগে এআই জেনারেটেড কি না। একমাত্র পান্থ কানাই ক্যামিও এপিয়ারেন্সে যে ‘পিরিতি’ গানটা গেয়েছেন, সেখানে রকিং ফ্লেভারটা পাওয়া গেছে। এ ফিল্মের বেশিরভাগ গান লিখেছেন এবং সুর করেছেন আহমেদ সানি। সলো পারফরমার হিসেবে হয়তবা চলনসই, কিন্তু রকস্টার বললে যে হাইট আসে ভাবনায় তাতে এ ফিল্মের মিউজিক ডিরেক্টর হতে পারতেন মাইলসের মানাম আহমেদ অথবা ওয়ারফেইজের টিপু। মিউজিকাল ফিল্ম, অথচ মিউজিকগুলো কুমার বিশ্বজিৎ ঘরানার; এটা ফিল্মের প্রতি ইনজাস্টিস হয়ে গেল।।
ক্যামিও এপিয়ারেন্সে মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ তানজিয়া মিথিলা; তার ভয়েস ভীষণ চার্মিলা, মডেল চরিত্রে দুর্দান্ত ফিট ইন করে গেছে।
সাবিলা নুর তান্ডবের পরে শাকিবের দ্বিতীয় ফিল্মেও উপস্থিত। শাকিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ শোনা যায়, নায়িকা নাকি তিনি সিলেক্ট করেন। যদি সত্য হয়ে থাকে, সাবিলা দুর্বল চয়েজ। সে টিভি নাটকে অপূর্বের সাথে একঘেয়ে প্যাটার্নে খুনসুটি করবে বা বড়লোকের খামখেয়ালি কন্যা চরিত্র প্লে করবে— ওটাই তার কমফোর্ট জোন। ফিল্মি চার্ম তার মধ্যে পাওয়া যায় না। বিশেষত একজন হাইলি ক্রিয়েটিভ ব্যক্তির Muse হতে যে Aura টা থাকা উচিত, তার কোনো ক্রাইটেরিয়া সে পূরণ করে, আমি অন্তত বিশ্বাস করি না।
ফলে ‘রকস্টার’ সামগ্রিকভাবে একটি প্রিম্যাচিউর এজাকুলেশন।
আমার দীর্ঘদিনের আক্ষেপ কিংবা অপেক্ষা ছিল— বাংলাদেশে কেন মিউজিকাল ফিল্ম হয় না, আমাদের মিউজিক তো অনেক বেশি বৈচিত্রময়।
কিন্তু অপেক্ষার শেষে সে মিউজিকাল প্রোডাক্টটা ডেলিভারি পেলাম, তা প্লাস্টিকের গিটার, বাচ্চাদের প্রিয় খেলনা!





