রইদ: জৈষ্ঠ্য মাসের তাল!
সাদু খুবই নীরব স্বভাবের মানুষ। একটু বেশি বয়সে বিয়ে করে কমবয়সী এক নারীকে। একসময় সাদু বুঝতে পারে যে তার বউয়ের মাথায় সমস্যা আছে। এবার সাদু বউয়ের কাছ থেকে পিছু ছাড়াতে চায়। কিন্তু সাদু যতোবারই চেষ্টা করে, ঠিক ততোবারই বিফল হয়। শেষ পর্যন্ত কি সাদু সফল হবে? জানতে হলে দেখতে হবে মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত এবং মুস্তাফিজুর নূর ইমরান ও নাজিফা তুষি অভিনীত সিনেমা ‘রইদ‘।

উপরের স্টোরিলাইন দেখে গল্পটা যতো সিম্পল মনে হচ্ছে, আসলে ‘রইদ’ ঠিক ততোটা সহজ নয়। সিনেমায় এতো বেশি মেটাফোরের ইউজ করা হয়েছে যে আপনি মাথা না খাটালে পুরো ব্যাপারটা বুঝতেই পারবেন না। এই মেটাফোরগুলোর বেশিরভাগই এসেছে আব্রাহামিক তত্ত্ব থেকে। আরও একটু সহজ করে বললে পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন তার সিনেমার মেটাফোরিক উপাদানগুলো নিয়েছেন ইসলামিক ও খ্রিস্টীয় বয়ান থেকে। পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ)। বাইবেল মতে, ঈশ্বর আদমকে প্রকৃতিঘেরা গার্ডেন অফ ইডেনে থাকতে দিয়েছিলেন। আদমের সঙ্গী হিসেবে ঈশ্বর ইভ [হাওয়া (আ.)]-কে তৈরি করেছিলেন আদমেরই বাম পাঁজরের হাড় থেকে। তাদেরকে শর্ত দিয়েছিলেন যাতে তারা একটি নিষিদ্ধ গাছের ফল না খায়। তবে তারা সে শর্ত রক্ষা করতে পারেনি। শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে তারা সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে ফেলে। এতে ঈশ্বর রেগে গিয়ে তাদেরকে গার্ডেন অফ ইডেন থেকে বের করে দেয়। শাস্তিস্বরূপ ইভকে সন্তান জন্মদানের কষ্ট ভোগ করার কথাও বলা হয়।
‘রইদ’ সিনেমায় সাদু থাকে প্রকৃতিঘেরা এক বাড়িতে। তার স্ত্রীর পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়ে সে যখন পিছু ছাড়াতে চেয়েও পারে না, সেটাকে একটা মেটাফোরিক রুপ দেওয়া যায়। আবার, তাল রিলেটেড জিনিসগুলো যেনো দুজনকেই মোহে আচ্ছন্ন করে ফেলে। সাদুর বউকে দেওয়া আল্লাহ প্রদত্ত জিনিসটি দুটো মেটাফোরকে নির্দেশ করে। এক্ষেত্রে, ব্যাপারটা ঈশ্বর প্রদত্ত শাস্তি কিংবা বিবি মরিয়মের ঘটনার সাথে মেলানো যায়। এছাড়াও, নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি যে আমাদের তীব্র আকর্ষণ কাজ করে—সেটাও বেশ মেটাফোরিক ওয়েতে দেখিয়েছেন নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন। সত্যি বলতে, পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন গল্পটাকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যার বেশকিছু মেটাফোরিক ব্যাখ্যা বের করা যায়। এমন ব্রিলিয়ান্ট স্টোরিটেলিং বাংলা সিনেমায় খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়। এর আগে ‘হাওয়া’ সিনেমাতেও এমন মেটাফোরিক উপাদানের দেখা পাওয়া গেছে, ‘রইদ’ যেনো সেই ধারাকে আরো গভীর করেছে।

সিনেমায় সাদুর বউ চরিত্রে নাজিফা তুষি জাস্ট ব্রিলিয়ান্ট। তুষি চরিত্রটা এতো ভালোভাবে ক্যারি করেছেন যে তুষিকে বছরের সেরা পারফর্মার বললেও ভুল হবে না। পাশাপাশি, সাদু চরিত্রে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান দুর্দান্ত কাজ করেছেন। বাকী—আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদ, গাজী রাকায়েত নিজেদের চরিত্রে ভালো করেছেন।
টেকনিক্যালি ‘রইদ’ একটা পিওর আর্ট। সিনেমার প্রতিটি ফ্রেম সুন্দর। প্রকৃতিকে দারুণভাবে ক্যাপচার করা হয়েছে এই সিনেমায়। জহির মুসাব্বির জ্যোতির সিনেমাটোগ্রাফি চোখে বেশ আরাম দিয়েছে। কালার গ্রেডিং-ও বেশ ভালো। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ব্যাবহারও যথাযথ। সিনেমায় শুধু একটি গান ব্যবহার করা হয়েছে। সেটার প্লেসমেন্টও ভালো ছিল।

এতোকিছুর পরেও ‘রইদ’ নিয়ে সমালোচনার একটা জায়গা আছে। সেটা হলো-সিনেমার রানটাইম কম হলেও স্ক্রিনপ্লে কিছুটা স্লো।
সবমিলিয়ে এই ছিল আমার দৃষ্টিতে ‘রইদ’। এই ঈদে চিন্তাশীল কিছু দেখতে চাইলে ‘রইদ’-এ গা জুড়াতে পারেন। আর নাহলে, সিনেমা দেখে বাসায় এসে স্টাডি করতে বসে যাবেন।






