Select Page

খুঁজে ফিরি ‘বনলতা সেন’!

খুঁজে ফিরি ‘বনলতা সেন’!

বাউন্ডুলে মহিন নিজেকে হারিয়ে খুঁজে ফেরে একজনকে—জীবনানন্দ দাশের সেই রহস্যময়ী বনলতা সেনকে, যিনি কবিকে দিয়েছিলেন দুদণ্ডের স্বস্তি। কে এই বনলতা সেন? কালের বিবর্তনে তাঁর অস্তিত্ব কি এখনও বিরাজমান? সেই উত্তর খুঁজতে হলে দেখতে হবে মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত এবং খায়রুল বাসার, মাসুমা রহমান নাবিলা ও সোহেল মন্ডল অভিনীত সিনেমা ‘বনলতা সেন’।

কবি জীবনানন্দ দাশের লেখা ‘বনলতা সেন’ মাত্র ২২ লাইনের কবিতা। এই ২২ লাইনকে প্রায় আড়াই ঘন্টার সিনেমায় রূপান্তর করার ব্যাপারটা সিনেমা মুক্তির আগেই বেশ আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। তবে নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল শুধু এই কবিতা নন, তার সিনেমার উপাদানগুলো নিয়েছেন কবির জীবনচক্র থেকেই। এখানে, নির্মাতা গল্পটি সাজিয়েছেন নন-লিনিয়ার ওয়েতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গল্পের বিচ্ছিন্ন অংশগুলো একসময় যেন একাকার হয়ে যায়। এখানে, মহিন চরিত্রটিও জীবনানন্দেরই সৃষ্টি। একদম শুরুর দৃশ্যে মহিনকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটি ভীষণ সুন্দর একটি সিক্যুয়েন্স। দৃশ্যটি যেন মনে করিয়ে দেয়—“আমরা যাইনি ম’রে আজও— তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়।” এরপর মহিন এগিয়ে চলে কবিরই দেখানো পথ ধরে। সে ভাবতে থাকে, আসলে কবি কাকে বনলতা সেন বলেছেন? তিনি কি সেই গ্রিক সুন্দরী হেলেন, যার মুখ যেন শ্রাবস্তীর কারুকার্য? নাকি কাকাতো বোন শোভনাকে ভেবেই কবি লিখেছিলেন এই কবিতা? যদিও শোভনা কখনও সরাসরি কবির ভালোবাসার আহ্বানে সাড়া দেননি। মহিনের ভাবনায় আসে কবির স্ত্রী লাবণ্য গুপ্তও, যাকে কবি কখনও কখনও মেডুসার সঙ্গে তুলনা করতেন। আবার “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা” লাইনের বিদিশাও কি হতে পারে সেই বনলতা? কিংবা কোনো এক বিপ্লবী নারী, যিনি বন্দি আছেন অন্ধকার কুঠুরিতে?

তবে আমার কাছে মনে হয়েছে, মহিন আসলে বনলতা সেন নামের কোনো নির্দিষ্ট নারীকে খুঁজছে না; সে খুঁজছে বনলতা সেনের উৎসকে। আর সেই খোঁজ করতে গিয়েই সে ঘুরে বেড়ায় জীবনানন্দের জীবনের বিভিন্ন নারী, স্মৃতি, কল্পনা ও ইতিহাসের ভেতর। ‘বনলতা সেন’ নামটি যেন কবির প্রেম, অপূর্ণতা, আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার সম্মিলিত রূপ। কাকাতো বোন, হেলেন, লাবণ্য, বিপ্লবী নারী, বনলতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা বিদিশা—প্রত্যেকের ভেতরেই বনলতা সেনের কিছু অংশ রয়েছে। কিন্তু তাদের কাউকেই এককভাবে বনলতা সেন বলা যায় না। মহিন যতই খুঁজতে থাকে, ততই সে উপলব্ধি করে—বনলতা সেন কোনো ব্যক্তি নন; তিনি এক ধরনের আশ্রয়, শান্তি, আকাঙ্ক্ষা এবং চিরন্তন নারীর প্রতীক। ঠিক যেমনটি জীবনানন্দের কবিতায় দেখা যায়। নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল এই ব্যাপারটা যেমন সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন, তেমনি ক্লাইমেক্সে গিয়ে জীবনানন্দ দাশের লেখা ‘কমলালেবু’ কবিতার উল্টো পিঠ ভীষণ বুদ্ধিদীপ্তভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন। বুঝিয়েছেন—সাহিত্যিক অমরত্ব অর্জন করলেও মানুষের ব্যক্তিগত একাকীত্ব মুছে যায় না। তাঁর ক্ষুধা, বেদনা, অপূর্ণতা রয়েই যায়।

সিনেমায় সবচেয়ে ভালো কাজ করেছেন মাসুমা রহমান নাবিলা। নাবিলা এতো সুন্দর যে তাকে তার চরিত্রগুলোতে বেশ মানিয়ে গেছে। নাবিলা অভিনয়ও করেছেন বেশ ভালো। মহিন চরিত্রে সোহেল মন্ডলও দারুণ কাজ করেছেন। মহিনের এই যাত্রা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে খায়রুল বাসারও বেশ মানিয়ে গেছেন। চরিত্রের প্রয়োজনে ওনার স্ট্রাগলটা পর্দায় ভিজিবল ছিল। বাকী—মাইমুনা মম, রুপন্তী আকিদ’সহ সকলেই নিজেদের চরিত্রে সাবলীল ছিলেন।

টেকনিক্যালি ‘বনলতা সেন’ কিছু ক্ষেত্রে মনমুগ্ধকর। সিনেমার এন্ট্রি সিক্যুয়েন্সটার কথা তো বললামই। লীলা নাগের সাথে মহিনের দেখা হওয়ার সিক্যুয়েন্স, ঘোড়া নিয়ে মহিনের এগিয়ে চলার সিক্যুয়েন্স কিংবা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পান্ডুলিপির সিক্যুয়েন্সগুলো ভীষণ সুন্দর লেগেছে। হৃদয় সরকারের সিনেমাটোগ্রাফি বেশ ভালো ছিল, কালার গ্রেডিং-ও ভালো। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ব্যাবহার পরিমিত। সিনেমায় একটিমাত্র গান আছে, সেটার প্লেসমেন্ট ভালো।

এবার নেগেটিভ দিকগুলোতে আসি। সিনেমার চিত্রনাট্য শুরু থেকেই বেশ ধীরগতিতে এগিয়ে চলে, যেটা অনেকক্ষেত্রে আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে পারে। প্রিয়ন্তি উর্বীর চরিত্রটি সিনেমায় না থাকলেও কোনো সমস্যা ছিলো না। আবার, সিনেমার কিছু কিছু জায়গা সিজিআই আরও বেটার হতে পারতো।

সবমিলিয়ে এই ছিল আমার দৃষ্টিতে ‘বনলতা সেন’। সাহিত্যপ্রেমী হয়ে থাকলে মহিনের সাথে বেরিয়ে পড়তে পারেন বনলতা সেনের খোঁজে।


Leave a reply