রইদ— লিলিথের অভিশাপ লুপ!
চার বছর আগে মেজবাউর রহমান সুমন নির্মাণ করেছিলেন তার জীবনের প্রথম ফিল্ম; কাউন্টার মিথোলজি প্লটে। চাঁদ সওদাগর আর দেবী মনসার গল্পটাকে উল্টে দিয়েছিলেন। সে ফিল্মের নাম ‘হাওয়া’ কেন, এ নিয়ে স্টাডি করবার চেষ্টা করেছিলাম। একটা খুবই চিত্তাকর্ষক ক্লু পাই— মনসামঙ্গলে মনসার আরেকটি নাম জগদগৌরি, অর্থাৎ সৃষ্টির জীবনদাত্রী মা। হিব্রু মিথলজিতে হাওয়া বা ইভ-এর অর্থ ‘মাদার অব অল লিভিং’!
এ ক্লু সুমনের কাজকে ইন্টারপ্রেট করার ক্ষেত্রে আরো চিন্তাশীল এবং ক্রিটিকাল হতে বাধ্য করেছিল।

দীর্ঘ বিরতির পরে রিলিজ পাওয়া তার দ্বিতীয় ফিল্ম ‘রইদ’ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর লেখা চোখে পড়ছিল। মেটাফর, আর্টিস্টিক কোলাজ, গন্ধম ফল, অ্যাডাম-ঈভ প্রভৃতি।
একটা রিলস চোখে পড়লো যেখানে এক দর্শক মন্তব্য করছেন- এ ফিল্ম বুঝতে হলে নন্দনতত্ত্ব নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা থাকতে হবে।
এক ফিল্মসূত্রে রুচিশীল-রুচিহীন— বিশাল শ্রেণিবিভাজন।
প্রতিটি ক্রিয়েটিভ মাইন্ডের একটি প্যাটার্ন এবং প্রেফারেন্স থাকে, সেখান থেকেই তৈরি হয় তার সিগনেচার। হাওয়া স্টাডি করে আমার ইমপ্রেসন ছিল মেজবাউর সুমনের আগ্রহ লোকাল এবং গ্লোবাল মিথলজিতে, এবং ফিল্ম নির্মাণের সময় কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি করতে চান।
রইদের মূল চরিত্র নাজিফা তুষির যখন কোনো নাম থাকে না, সে অপ্রকৃতিস্থ তথা পাগল প্রকৃতির, আগের স্বামীকে ছেড়ে এসেছে এবং তার নতুন স্বামী রাতের অন্ধকারে ফেলে আসে দূরে কোথাও— আমার বুঝতে বাকি থাকে না সুমনের এবারের প্রজেক্টের নাম ‘লিলিথ’!
তাহলে নাম কেন ‘রইদ’?
শব্দটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে পুনরায় ক্লু পাই- সাংকেতিক যোগাযোগ। ‘ল’ এর পূর্ব বর্ণ ‘র’, ‘থ’ এর উত্তর বর্ণ ‘দ’, ই-কারের বদলে যদি ‘ই’ নিই— ‘লিলিথ’কে অনায়াসে ‘রইদ’ বানানো যায়। এ পদ্ধতিকে বলা হয় substitution Cipher, রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজারের আমল থেকেই এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ক্রিপ্টোগ্রাফার সাইমন সিং তাঁর ‘The Code Book’ বইতে লিখেছেন:
‘A substitution cipher involves replacing each letter with a different letter or symbol… The Caesar cipher is a specific type of substitution cipher where each letter is shifted a fixed number of places down or up the alphabet.’
কিন্তু লিলিথ থেকে কেন ‘রইদ’ ই হতে হলো?
‘কাউন্টার মিথোলজি’ আইডিয়াটাই দিয়ে দিচ্ছে উত্তর।
হিব্রু ভাষায় ‘লায়লা’ এবং আক্কাদীয় ভাষায় ‘লিলিতু’ শব্দের অর্থ হলো ‘রাত’ বা ‘অন্ধকার’। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে যেখানেই লিলিথের প্রসঙ্গ বা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এসেছে, সেখানেই রোদের অনুপস্থিতি বা অন্ধকারকে নির্দেশ করা হয়েছে।

‘রইদ’কে ব্যাখ্যার আগে ‘লিলিথ’-এর ব্যাকস্টোরি শেয়ার করি।
হিব্রু মিথলজি অনুযায়ী, লিলিথ অ্যাডামের প্রথম স্ত্রী— যাকে ইভ এর অনেক আগে অ্যাডামের সাথে একই সময়ে, একই মাটি দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। তাদের বসবাসস্থল ইডেন গার্ডেন। দ্রুতই তীব্র বিরোধ শুরু হয় তাদের। অ্যাডাম লিলিথের ওপর প্রভুত্ব করতে চেয়েছিলেন। বিশেষত যৌনতার সময় অ্যাডামের দাবি ছিল লিলিথকে নিচে থাকতে হবে এবং সে থাকবে ওপরে। লিলিথ তা প্রত্যাখ্যান করে। তার যুক্তি ছিল-‘আমরা দুজনেই সমান, কারণ আমাদের দুজনকেই একই মাটি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তাই আমি তোমার নিচে থাকব না’।
অ্যাডাম যখন নিজের দাবিতে অনড় থাকে, তখন লিলিথ অলৌকিক ক্ষমতায় বাতাস চিরে ইডেন গার্ডেন থেকে লোহিত সাগরের দিকে পালিয়ে যায়।
অ্যাডাম একা হয়ে ঈশ্বরের কাছে কাঁদলে, ঈশ্বর লিলিথকে ফিরিয়ে আনার জন্য সেনয়, সানসেনয় এবং সেমাঙ্গেলফ নামের তিনজন দেবদূত পাঠান। দেবদূতরা লোহিত সাগরে লিলিথকে খুঁজে পান এবং বলেন, সে যদি ফিরে না যায় তবে প্রতিদিন তার ১০০টি সন্তান মারা যাবে।
লিলিথ ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলে, ‘আমি নিজের সন্তান হারাব, কিন্তু পুরুষের দাসত্বে ফিরবো না’।
এরপর থেকে লিলিথ পিশাচে রূপান্তরিত হয়, এবং লোহিত সাগরের দানব বা পিশাচদের সাথে জিন-পরী ও রাক্ষুসে বাচ্চার জন্ম দিতে থাকে। নবজাতক শিশু ও প্রসূতি মায়েদের ক্ষতি করার শপথ নেয়।
হিব্রু টেক্সট অনুযায়ী, লিলিথ আর কখনোই অ্যাডামের কাছে স্ত্রী হিসেবে ফিরে আসেনি।
তবে, মধ্যযুগীয় ইহুদি মিথলজিতে একটি গূঢ় ও প্রতীকী মোড় আছে—যেখানে বলা হয়েছে লিলিথ অ্যাডামের কাছে ফিরেছিল; তবে স্ত্রী হিসেবে নয়, এক ছদ্মবেশী পিশাচী বা সাপের রূপ ধরে অ্যাডাম ও ইভকে ধ্বংস করতে এবং আদমের অজান্তে তার বীর্য চুরি করতে।
তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রাণীর সাথে লিলিথের তীব্র এবং অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বা আকর্ষণের প্রমাণ টেক্সটসহ পাওয়া যায়- সাপ, পেঁচা এবং সিংহ।
ব্যাকস্টোরি শেষ, ডিসপ্লেতে প্রবেশ করি।
রইদ-এর কাউন্টার এনকুয়ারিটা আসলে কী?
অ্যাডাম যেমন লিলিথের বদলে ইভকে পেল, লিলিথ যদি অ্যাডামের বদলে নতুন কাউকে চাইত, এবং পেত, কেমন হতো সে রিয়েলিটি?
এনকুয়ারিটা ইনট্রিগিং বটে!
লিলিথ তার আগের স্বামীকে পরিত্যাগ করেছে, অর্থাৎ রইদে আমরা যে সাদুকে দেখি, সেটা কোনোক্রমেই অ্যাডাম নয়, দ্বিতীয় কোনো পুরুষ। এই লিলিথ সাপ বা পেঁচা নিয়ে থাকে না, তার পরমপ্রিয় একটি ছাগল, সে মাছকে খাবার খাওয়ায়। এবং স্ক্রিনে তার এন্ট্রি নেয়া প্রথম সিক্যুয়েন্সেই শিশুদের সাথে ঝামেলা বাঁধে- কারণ তাকে পাগলী বলে ক্ষেপানো হচ্ছিল। পিশাচের মোডিফাইড ভারসন পাগলী! আমরা সামনে দেখব, এক শিশুকে পাথর মেরে সে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে, এবং নারীদের সাথে চুলোচুলি করছে।
একজন অপ্রকৃতিস্থ নারীর সাথে সংসার করবে না স্বামী, তাই লিলিথকে সে রাতের আঁধারে নামিয়ে দিয়ে আসে জঙ্গলে, এবং পরদিন যখন ফিরে আসে ঘরে, আকাশে ঝলমলে রোদ!
লিলিথের সাথে অ্যাডামের দ্বন্দ্বের রুট কজ- যৌনাচারে সুপেরিওরিটি-ইনফেরিওরিটিজনিত অমীমাংসা। আমরা এ লিলিথকেও অন্তত দুইবার দেখি সাদুকে যৌনতায় বাধা দিচ্ছে, এক সিক্যুয়েন্সে রীতিমত সাদুর সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। সেই সময়ে আমরা ফিল্মের একদম প্রথম সিক্যুয়েন্সটা স্মরণ করি- সাদু গরু-মহিষ নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে এক মহিষ উঠে পড়েছে আরেক মহিষের উপরে। এ প্রক্রিয়ায় আমরা আরো একটি সিক্যুয়েন্স দেখব যেখানে একটি খামারের মতো দেখানো হয়েছে, নানা চেহারার গাভীদের গর্ভবতী করতে তাদের উপরে চড়ে বসেছে বলিষ্ঠ ষাঁড়েরা। আমরা ক্লোজ শটে দেখি ষাঁড়ের উত্থিত লিঙ্গ!
ফলে রইদের মূল আর্গুমেন্ট অমীমাংসিত যৌনতা বিষয়ক পাওয়ার ডায়নামিক্স। ইংরেজি বা অন্য ভাষার ফিল্ম হলে এখানে ব্যর্থ সেক্সুয়াল ইন্টিমেসির সিক্যুয়েন্স থাকত অনেকগুলো। একে তো লিলিথ-অ্যাডামের মিথোলজির অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে আমাদের শোনা অনেক ঐতিহাসিক চরিত্রের সাথে মিলে যাওয়াতে প্লট হিসেবে বিপজ্জনক, তার উপর যৌনতার খোলামেলা দৃশ্যায়নে সেন্সর সার্টিফিকেট যাবে আটকে।
সুতরাং?

ফিল্ম শুরুরও আগের ক্রেডিট লাইনে ফিরে যান। লালন সাঁইয়ের কোটেশন পাবেন। এ ফিল্মে লালন এবং বাউলদের কাজটা কী।
হুম, দেহতত্ত্ব।
লালনের গানে ‘তালের ফল’ মূলত মানবদেহে সুপ্ত পরমাত্মা, ঐশ্বরিক প্রেমরস বা শুক্রর ঊর্ধ্বগমন ও সাধনতত্ত্বের একটি শক্তিশালী মেটাফর বা রূপক।
তালের ফল যখন পাকে, তখন তা গাছ থেকে নিচের দিকে ঝরে পড়ে। কিন্তু বাউল সাধনায় তালের রস বা ফলের নির্যাসকে নিচের দিকে পড়তে না দিয়ে, উল্টো পিঠের মেরুদণ্ড বা সুষুম্না নাড়ী বেয়ে মাথার দিকে তুলতে হয়। একে লালন ঘরানার সাধনায় ‘উল্টো সাধন’ বা ‘বিন্দু ধারণ’ বলা হয়।
যদি সাধারণ মানুষের মতো এই শক্তির অপচয় ঘটে (যেমন তাল ফল গাছ থেকে নিচে পড়ে নষ্ট হয়), তবে আধ্যাত্মিক মৃত্যু ঘটে। আর যদি সাধক একে ধরে রাখতে পারেন, তবেই পরমাত্মার সন্ধান মেলে।
এ সংক্রান্ত সুস্পষ্ট পঙক্তি শেয়ার করি-
‘সাঁইজির এক আড়ং বাড়ি,
তাতে একটি তালের গাছ আছেরে খাড়া হেরি।
সে তালের ফলটি ধরে ওলট-পালট,
তার নাইকো ডালপালি’।
– এখানে ‘তালের গাছ’ বলতে মানুষের মেরুদণ্ড বা সুষুম্না কাণ্ডকে বোঝানো হয়েছে, যা দেহের মাঝে সোজা হয়ে খাড়া থাকে।
তালের ফলটি ওলট-পালট হয়ে ধরার অর্থ হলো, সাধনার জগতের নিয়ম জাগতিক নিয়মের উল্টো। সাধারণ মানুষ যে শক্তি নিচের দিকে নামিয়ে দেয়, সাধককে তা ‘উল্টো কল’ বা ‘উল্টো সাধনে’র মাধ্যমে মাথায় তুলতে হয়।
-‘তার নাইকো ডালপালি’: মানবদেহের এই মূল আধ্যাত্মিক শক্তির বাহ্যিক কোনো ডালপালা বা দৃশ্যমান রূপ নেই, এটি সম্পূর্ণ অন্তরের খেলা।
রইদে তাল আর গন্ধম ফল মিলিয়ে একটি হাইব্রিড রিয়েলিটি তৈরি করা হয়েছে। লিলিথ ফিরে আসতে চায়। সে উপলক্ষ হয় তালের ফল। সে ফিরে বারেবারে সাদুকে তালের পিঠা খাওয়ায়। প্রচুর খায়, আর জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। প্রথমবার যখন তাকে রেখে আসে, তখনো গন্ধম তথা তালের কাছে যায়নি, তবে তালের রস তথা তাড়ি খেয়েছিল। তাই রেখে আসাটা পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়ে অ্যাডজাস্ট করতে না পারা কিংবা তাড়ি খাওয়ার বাই প্রোডাক্ট বলা হয়। তালের পিঠা হয়, রসও হয়।
লিলিথ ভাবে তার অভিশাপ হয়ত কেটে গেছে, তাই নিয়ম ভেঙ্গে রোদেলা দিনেই সে ফিরে আসে, এবং স্বামীকে বলে মাথা ঠিক হয়ে গেছে। অতি তালসেবনের পাপে লিলিথ প্রতিবেশীর গরু চুরি করে, শিশুর মাথা ফাটায় এবং ঘরে পুড়ে ছাই হয়, মৃত্যু ঘটে গবাদি পশুরও।
সাদু তাকে মিস করে, অত্যন্ত বাধ্যগত। সমগ্র ফিল্মে লিলিথ নানা সিক্যুয়েন্সে সাদুকে অ্যাবিউজ করেছে— কখনো শরীরে পিঁপড়া ছেড়ে দিয়ে, ঘুমে ব্যাঘাত ঘটিয়ে, স্ল্যাংয়ের মাধ্যমে। তবু সে হারানো লিলিথকে খুঁজতে বের হয় বন্ধুকে নিয়ে, একটা সিক্যুয়েন্স নেই যেখানে সে স্ত্রীর সঙ্গে বচসায় জড়িয়েছে। দাওয়াত খেতে গিয়েও সেখান থেকে নিজের ভাগের মাংসটুকু না খেয়ে বাড়িতে নিয়ে এসেছে।
তাল বা গন্ধব সাদু কারো প্ররোচনায় নয়, নিজের গরজেই খায়।
কোনোভাবে সে ইশারা পেয়েছে তাল পড়লেই ফিরে আসবে বউ। এবার তাল পায় সে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির রাতে। লিলিথের আগের স্মৃতি ঝাঁপসা হয়ে গেছে, চিনতে পারে না প্রিয় ছাগলকে। প্রথমবারের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সে পুনরায় ঘর তৈরিতে মন দেয়। এ সময়ে এক অতিলৌকিক কাহিনী হয়— সে ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, অথচ স্বামীর সাথে কখনো সহবাসই হয়নি; আগের স্বামীর সঙ্গেও যোগাযোগ নেই; কে এ সন্তানের পিতা! বীর্য চুরির সে গল্পটাকে রিইন্টারপ্রেট করে আমরা লিলিথের মধ্যে মরিয়মকে দেখি।
এখানে আরো একটা সিম্বলিক সিক্যুয়েন্স পাই— প্রচণ্ড ঝড়-ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাত, ঘরের ভেতরে নানা প্রজাতির প্রাণী, তার মধ্যে মাটিতে শুয়ে আছে লিলিথ আর সাদু, একসময় সাদুর শরীর ছোট হতে হতে লিলিথের পেটের কাছাকাছি চলে আসে, একদম মাতৃগর্ভে শিশু যেভাবে থাকে সেই শেপ নেয়!
এ অংশে একটি তাৎপর্যপূর্ণ আলাপ যুক্ত করি।
ফ্রয়েডের ম্যাডোনা-হোর কমপ্লেক্স তত্ত্বের ভিত্তি যদি বলি, নারী একই সাথে মরিয়ম এবং লিলিথ দুই সত্তাকে ধারণ করে। মনস্তত্ত্ববিদ বারবারা ব্ল্যাক কোল্টভিট তার ‘The Book of Lilith’ বইতেও এটাই বলেছেন— পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের দুটি চরম ভাগে ভাগ করেছে, যার এক প্রান্তে আছে লিলিথ (যাকে ঘৃণা করা এবং ভয় পাওয়া হয়) এবং অন্য প্রান্তে মাতা মরিয়ম (যাকে পূজা করা হয়)।
ক্যাথলিক চার্চের মধ্যযুগীয় চিত্রকলা এবং লোকবিশ্বাসে লিলিথ এবং মরিয়মের এক অদ্ভুত দৃশ্যমান যোগসূত্র পাওয়া যায়। ইহুদি গ্রন্থ জোহর অনুযায়ী, লিলিথ সাপের রূপ ধরে ইডেনে প্রবেশ করে অ্যাডাম-ইভকে প্রলুব্ধ করেছিল। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী Caravaggio-এর Madonna with the Serpent এ দেখতে পাই— মাতা মরিয়ম তার পা দিয়ে একটি সাপের মাথা থেঁতলে দিচ্ছেন।
লিলিথের সন্তান নষ্টের জন্য সাদু চেষ্টার কমতি রাখে না। কারণ তার নিখোঁজ বউ পোয়াতি হয়ে ফিরে এসেছে, এ নিয়ে সমাজে ছি ছি পড়ে গেছে। এক পর্যায়ে লিলিথ নিজেই পেটে পাথর দিয়ে আঘাত করে সন্তান হত্যার চেষ্টা করে, এবং সেটা রাত্রিতে, দিনে নয়। ফলে লিলিথ ফিরে এলেও তার অভিশাপ কাটেনি, স্বভাবও বদলায়নি!
সে পুনরায় হারিয়ে যায়, এবার নিজ থেকেই, সাদু তাকে রেখে আসেনি কোথাও!
সাদুর স্যানিটি হারাতে আরম্ভ করে। সে কৃত্রিম তাল হাতে ঘুরতে থাকে, বাউল তাকে গন্ধম পাপের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে কনফিউজড হয়ে পড়ে— আমি কি গন্ধম খাইছি নাকি?
সে মুহূর্তে জানা যায় তার ঘরের ছাগল— লিলিথের প্রিয় কুলসুম— সন্তানের জন্ম দিয়েছে। হতে পারে এটা কৃত্রিম তালের ফলাফল, যে কারণে লিলিথের প্রক্সি হয় কুলসুম নামের ছাগলটি। সাদু পরিণত হয় রাক্ষসে; দুগ্ধবতী ছাগলকে জবাই করে একাই খেয়ে ফেলে ডেকচি ভরতি মাংস; অতি বীভৎস সে দৃশ্য। সাদু খুঁজতে থাকে লিলিথকে, ক্রমাগত কুড়াতে থাকে তাল। তালের স্তুপে সে ডুবে যায়, তালগাছ প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে এবং জীবনিশক্তি নিঃশেষিত প্রায়। একদম অন্তিম দৃশ্যে আমরা লিলিথের ভয়েস শুনি, আর হাত দেখতে পাই, সে হাতে বাড়ানো— তাল!
অর্থাৎ সাদুকে সে পুরোপুরি রিক্ত করে দিচ্ছে।
সিনেমা শেষ।

এবং আমার আপত্তির শুরুও এখান থেকেই।
-লিলিথ অ্যাডামের থেকে বিচ্ছিন্ন হোক বা নিজের জন্য আনুক নতুন পুরুষ, উভয়ক্ষেত্রেই সে পিশাচই রয়ে গেল। তার নিয়তির যদি পরিবর্তনই না হয়, তবে এটা কোন পারসপেক্টিভে কাউন্টার ন্যারেটিভ হলো? হাওয়াতে মনসা ভিক্টিম চাঁদ সওদাগর ভিলেন। রইদেও কেন লিলিথকে পাগলী হতে হলো, সাদুকে প্রতিনিয়ত গন্ধম খাইয়ে তার অন্তরাত্মাকে ক্রমশ কলুষিত করলো, এবং তালসমুদ্রে ডুবিয়ে দিলো?
– যেহেতু অ্যাডামের সাথে তার কনফ্লিক্টের মূলে সেক্সুয়াল পজিশন, নতুন স্বামী যে তার প্রতি সাবমিসিভ— জিজ্ঞাসাটাও সেখানেই; যদি সেক্সুয়াল পজিশনের বিরোধ না থাকে, সেই লিলিথ আসলে কেমন হত; কারণ তখন ছেড়ে যাওয়ার বা তাকে ছেড়ে দেয়ার প্রসঙ্গই এক্সিস্ট করতো না। তবু কি লিলিথ সাদুকে গন্ধম তথা তালের পিঠাই খাওয়াতো?
-মিউজিক-অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং বা লেখালিখির মতো ব্যক্তিগত ক্রিয়েটিভ ফিল্ডগুলো শো-ম্যানশিপের। আমরা জেমসের কনসার্টে নাচি, এর সুরকার বা গীতিকার নিয়ে ভাবার দরকার পড়ে না। ফিল্ম মেকিং শো-ম্যানশিপের জায়গা নয়, এটা একটা টোটাল টিমওয়ার্ক প্যাকেজ।
রইদ দেখলে যে কোনো চিন্তাশীল মানুষ এ উপসংহারে পৌঁছাতে পারেন— এ ফিল্ম তৈরির পেছনে কাজ করেছে লেখকের প্রচন্ড নার্সিসিস্টিক ডিজঅর্ডার। বহুসংখ্যক মানুষ প্রথমবারের মতো ‘মেটাফর’ শব্দটার সাথে পরিচিত হচ্ছে, পরিচালক কাউন্টার মিথলজি কনস্ট্রাক্ট করেছে, এবং সাধারণ দর্শক যাতে সিম্বলিজম বুঝতে না পারে সেজন্য লং শটে প্রাকৃতিক দৃশ্য, শক্তিশালী ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ মিলিয়ে যে অ্যাস্থেটিকাল কম্পোজিশন তৈরি হয়েছে তাতে সমগ্র স্ক্রিনকেই মনে হচ্ছে খন্ড খন্ড পেইন্টিং— আহা সাধু সাধু, ধন্য পরিচালক ধন্য।
—এটা একজন টিনেজারকে তারিফ করলে তার পাওয়া ‘লা শার্লেটীয় চার্ম’ হতে পারে বড়জোর। কিন্তু একজন ফিল্মমেকারের জন্য মারাত্মক লেভেলের সীমাবদ্ধতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে কূপমন্ডুকতা।
এজন্যই রইদকে আমি একটি অ্যামেচার প্রজেক্ট মনে করি, যেখানে একটা সেটআপ দাঁড় করানোই বিশাল অ্যাচিভমেন্ট, যদিও ন্যারেটিভের জায়গায় অবিমিশ্র শূন্যতা। একটা ফিল্মের কোর আইডিয়াটাই যদি কনভিন্সিং না লাগে, অ্যাস্থেটিকাল বিউটি তখন নেহায়েতই ইন্টিগ্রিটিবিহীন গোঁজামিল মাত্র।
লিলিথের চরিত্রে নাজিফা তুষি মানিয়ে গেছে। ফিল্মের সবচাইতে উপভোগ্য অংশ স্ল্যাংয়ের ব্যবহার, কখনো মনেই হয়নি তুষি কোনোদিন রাজধানী শহরে পা রেখেছে।
এককালে প্রান্তিক জীবনের ফিল্ম মানেই ছিল রাইসুল ইসলাম আসাদ। পদ্মা নদীর মাঝি, দুখাই। এ ধরনের ফিল্মগুলোকে ডাকা হত ‘পোভার্টি পর্ন’; রইদ ঘরানার ফিল্মগুলোর মূল পরিবেশক সিনেপ্লেক্সগুলো, কয়টা সিঙ্গেল স্ক্রিনে এটা প্রদর্শিত হবে জানি না, ঢাকার বাইরের সাধারণ মানের হলগুলোতে দর্শক দেখবে কিনা তাও ঠিক নেই; পপকর্ন খেতে খেতে নদীতে গরু ঝাঁপানোর দৃশ্য দেখা বা গরু-ছাগল নিয়ে ডিল করা দেখাই কি অভিনয়? আমি শিওর না, এত বছর পরে মোস্তাফিজ নুর ইমরানের মাধ্যমে আবারো রাইসুল ইসলাম আসাদকে রিব্রান্ডিং করবার অবকাশ কেন তৈরি হলো?
রইদের মূল ঘাটতিটা আরো প্রকট।
একটা দুই ঘন্টার ফিল্মকে মাত্র দুটো ক্যারেক্টার দিয়ে টেনে নিতে হলে স্টোরিটেলিং টেকনিকে যে পরিমাণ মুনশিয়ানা দেখাতে হয় রইদে তার নিদারুণ ঘাটতি, কেবলমাত্র ভিজুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে ‘লেজার শো’ তৈরির প্রবণতা প্র্রকটভাবে দৃশ্যমান। মকবুল ফিদা হোসেন মাধুরি দীক্ষিতের প্রতি অবসেসনবশত একটা ফিল্ম নির্মাণ করেছিলেন- ‘গজগামিনী’। সেটাকে ফিল্ম নয়, পেইন্টিং হিসেবেই দেখেছি আমরা।
রইদকেও মধ্যরাতে কোনো একক শিল্পীর ভায়োলিন বাজানো হিসেবেই দেখা যেতে পারে, যেখানে আইডিয়া বা থিসিস মূখ্য নয়, সুর সৃষ্টিতেই আনন্দ। সেই বিষাদি ভায়োলিনে আমিও লিখে ফেলি কয়েক ’লাইন
‘রইদ উঠে না, বোধ ঘামে না,
কবিতা বাবলে বিস্রস্ত মেটাফরিকাল মিথ
পিশাচিনী রূপে তবু তুমি পোয়েটিক তাই
হায় লিলিথ হায় লিলিথ’!






