মুক্তির ৫০ বছরআবহমান বাংলার গল্প কেমন হওয়া উচিত, তার নজরকাড়া নির্দেশনা পাওয়া যায় ‘নয়নমনি’তে
শিল্প আর বাণিজ্যের মধ্যে থাকা অদৃশ্য দেয়াল কি ভাঙা সম্ভব? যে চলচ্চিত্র শিল্পের দাঁড়িপাল্লায় ভারী, সেটি বাণিজ্যের ওজনে পিছিয়ে পড়ে। যে সিনেমা বাণিজ্যের মাপকাঠিতে এগিয়ে, সেটি শিল্পের মানদণ্ডে হালকা হয়ে পড়ে। এই তো মোটাদাগে এখনকার সিনেমার বাস্তবতা। আজ থেকে ৫০ বছর আগে শিল্প আর বাণিজ্যের মধ্যকার প্রাচীর গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ‘নয়নমনি’। দর্শক প্রেক্ষাগৃহে হুমড়ি খেয়ে দেখেছে সিনেমাটি। আবার সমালোচকরা একে শিল্পোত্তীর্ণ বলে রায় দিয়েছেন। মাস আর ক্লাসকে এক উঠানে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন আমজাদ হোসেন। দেখতে দেখতে সেই ঘটনার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেল। কাল্ট ক্ল্যাসিক ‘নয়নমনি’ মুক্তির ৫০ বছর পূরণ হলো আজ ২৫ জুন।

৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। কেমন হবে স্বাধীন দেশের চলচ্চিত্র? আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’র মতো শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র হলো, আবার জহিরুল হকের ‘রংবাজ’-এর মতো বাণিজ্যসফল সিনেমাও হলো। এক নদীর ধারা মিশল না আরেক নদীর ধারার সঙ্গে। প্রযোজক-পরিবেশক এ কে এম জাহাঙ্গীর খানও হয়তো জানতেন না যে এ দুই ধারার মিলন সম্ভব। তিনি আমজাদ হোসেনের কাছে গিয়েছিলেন ‘সুজনসখী’র মতো একটা সম্ভাব্য দর্শকনন্দিত গল্পের সন্ধানে। ‘সুজনসখী’ খান আতা তথা প্রমোদকারের চলচ্চিত্র হলেও এর লেখক ছিলেন আমজাদ হোসেন। ফলে জাহাঙ্গীর খানের জহুরি চোখ খুঁজে ফিরছিল এমন একজন নির্মাতা, যিনি তার পরিবেশক থেকে প্রযোজক হওয়ার যাত্রাটিকে সুগম করে তুলবেন। ‘সুজনসখী’ প্রযোজকের গোলা ভর্তি করে ফসল দিয়েছে, তেমনই একটা সফল ছবি দেবেন তার প্রডাকশন হাউজের প্রথম ছবির পরিচালক। এই চাওয়া নিয়ে আমজাদ হোসেনকে আলমগীর পিকচার্সের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো।
‘সুজনসখী’র পিছু ধরেই সিনেমার নাম রাখা হলো ‘নয়নমনি’। কিন্তু ‘সিনেমা’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ‘নিরক্ষর স্বর্গে’ নামে যে উপন্যাস থেকে ‘নয়নমনি’র চিত্রনাট্য তৈরি করা হলো, সেই উপন্যাসের মধ্যেই ছিল অমিত সম্ভাবনা। একাধারে জীবনঘনিষ্ঠ ও বাণিজ্যসফল সিনেমা হওয়ার সমস্ত রসদ ছিল এই উপন্যাসের মধ্যে। ফলে সাধারণ সুপারহিট ছবি হয়েই ‘নয়নমনি’ থেমে যায়নি; এটি একটি মাইলফলক তথা দিকনির্দেশক হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য। ‘নয়নমনি’ যেমন জনপ্রিয় হয়েছে, এই চলচ্চিত্রের গানগুলো যেমন শ্রোতাপ্রিয় হয়েছে, শহর-নগর-গ্রাম-গ্রামান্তরে যেমন সিনেমাটি বন্যার ঢলের মতো প্রবাহিত হয়েছে— তেমনি এটি আমাদের সমাজকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে এবং জনতার ভাবনার জগৎকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
‘নয়নমনি’র আগে আমজাদ হোসেন ছিলেন একজন সমাজসচেতন সাহিত্যিক। সেলুলয়েডেও তার রচনা নন্দিত হয়। ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’-এর চিত্রনাট্যকার হিসেবে তার মানবদরদি শিল্পীসত্তার পরিচয় অজানা থাকেনি। কিন্তু স্বাধীনতার আগে নির্মাতা হিসেবে তিনি পূর্ণ শক্তি নিয়ে প্রকাশিত হতে পারেননি। ‘নয়নমনি’তেই তিনি সার্থকভাবে স্বতন্ত্র শিল্পভঙ্গিমা নিয়ে উদ্ভাসিত হয়েছেন। তার সঙ্গে সঙ্গে এই সিনেমার অভিনয়শিল্পীরাও নিজেদের পূর্ণমাত্রায় প্রস্ফুটিত করেছেন। কোনো একটি চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রগুলোর শিল্পীরা প্রত্যেকে প্রতিভার বারুদচ্ছটায় বিস্ফোরিত হতে পারেন এমনভাবে, তারও নজির ‘নয়নমনি’র আগে বিরল।
খলচরিত্রে এ টি এম শাসুজ্জামান কেবল বাজারের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন অভিনেতা হিসেবেই নিজেকে হাজির করেননি, অভূতপূর্ব অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মোড়ল চরিত্রকে চিরকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চরিত্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ববিতা শুধু এই সিনেমার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেই ভূষিত হননি, সর্বকালের অন্যতম সেরা বাঙালি অভিনেত্রী হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আর ফারুকের জাতীয় পুরস্কার ছুটে গেলেও সিনেমার ইতিহাসের ট্রেনে যাত্রী হিসেবে নিজের চিরস্থায়ী আসন দখল করেছেন। সবশেষে রওশন জামিল অভিনেত্রী হিসেবে এমন এক স্তরে নিজের উত্তরণ ঘটিয়েছেন, যা অনতিক্রম্য ও দুর্লঙ্ঘনীয়। ফলে ‘নয়নমনি’ বিদ্যার্থীদের জন্য হয়েছে অভিনয়ের এক মাস্টারক্লাস। এই দিকটি ‘নয়নমনি’কে গ্রামে-গঞ্জে বছরের পর বছর প্রদর্শিত হওয়ার মতো যোগ্য, সমর্থ ও শক্তিশালী কনটেন্টে রূপান্তর করেছে।

কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে চলচ্চিত্রটি ইতিহাসে স্থায়িত্বের, অক্ষয়ের কারণ হচ্ছে এর বিষয় ও বক্তব্য। দ্রোহের সিনেমা, চেতনার সিনেমা, প্রতিবাদের সিনেমা— এ রকম নানা অভিধায় এই চলচ্চিত্রকে ভূষিত করেছেন সমালোচকরা। কেউ বলেছেন শোষণের বিরুদ্ধে সিনেমা, কেউ বলেছেন কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে মুভি, কেউ বলেছেন মৌলবাদের বিরুদ্ধে সিনেমা। মূলত আবহমান বাংলার এক চলচ্চিত্র ‘নয়নমনি’। এই ভূখণ্ডের গল্প কেমন হওয়া উচিত, নিপীড়িত-নিষ্পেষিত মানুষের অঞ্চলের নির্মাতার বয়ান কেমন হওয়া উচিত, তার একটা নজরকাড়া নির্দেশনা পাওয়া যায় ‘নয়নমনি’তে। ঝলমলে রুপালি পর্দায় কীভাবে মাটি ও মানুষের জীবনযুদ্ধ উঠে আসতে পারে, ৫০ বছর ধরে তারই এক জ্বলজ্বলে দলিল হয়ে আছে এই চলচ্চিত্র।
‘নয়নমনি’র জানা-অজানা
- মুক্তির সময় গোল বাঁধে। জনৈক প্রডাকশন ম্যানেজার এর স্বত্ব দাবি করেন। প্রযোজক জাহাঙ্গীর খানের অবশ্য তাকে বাগে আনতে বেশি সময় লাগেনি। পরে মুক্তিতে আর কোনো বাধা থাকেনি।
- এ সিনেমার জন্য প্রথমবারের মতো ১৫ মিনিটের রেডিও বিজ্ঞাপন তৈরি করা হয়। মাসাধিককাল ধরে রেডিওর বাণিজ্যিক কার্যক্রমে এর প্রচার চলে। এমন অভিনব প্রচারণা ফল দেয় বক্স অফিসে।
- নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রথমবারের মতো কোনো চলচ্চিত্র একসঙ্গে তিনটি প্রেক্ষাগৃহে (আশা, ডায়মন্ড ও গুলশান) মুক্তি পায়। বিজ্ঞাপনে এই ঘটনাকে ফলাও করে তুলে ধরা হয়। সারা দেশের প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি হীরকজয়ন্তী সপ্তাহ উদযাপন করে।
- সত্য সাহা এই সিনেমার সুরকার হলেও সুরকার আব্দুল লতিফের কাছ থেকে পাওয়া যায় চলচ্চিত্রটির জন্য উপযুক্ত ফোক গানের সন্ধান। ‘নয়নমনি’র একটি গান নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ওঠে। এটি হলো ‘কোন কিতাবে লেখা আছে গো হারাম বাজনা গান।’
- মূল উপন্যাসে নায়কের মৃত্যু হলেও সিনেমায় নায়ককে বাঁচিয়ে রাখা হয়। এজন্য আমজাদ হোসেনকে ‘আপসকামী’ বলে সমালোচনাও সইতে হয়েছে। প্রযোজক জাহাঙ্গীর খানের আবদার মানতে গিয়েই নির্মাতা হাড়িকাঠে মাথা দেন।
- ১৯৭৬ সালে তিনটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় ‘নয়নমনি’। পুরস্কার ঘোষণার পর শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার পুরস্কারপ্রাপ্ত আমজাদ হোসেন মন্তব্য করেন, ‘বিচার যথাযথ হয়নি। দেশীয় শিল্পসংস্কৃতির ব্যাপারে চক্রান্ত চলছে— এটাই বুঝতে পেরেছি।’
- চিত্রনায়ক ফারুক জাতীয় পুরস্কারের দাবিদার ছিলেন। মায়ের মৃত্যুর দৃশ্যে তার অভিব্যক্তি ঢালিউডের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অভিনয় বলে বিবেচিত। মানিকগঞ্জের নবগ্রামে কবরের দৃশ্যটি ধারণের সময় সব কলাকুশলী ও উপস্থিত গ্রামবাসী কেঁদেছিলেন।
*লেখাটি আগামীর সময়ে প্রকাশিত






