কেবল ববিতাই বলতে পারেন, ‘বাংলাদেশে কোনো কেলাস নাই গো!’
সত্যজিৎ রায় ও ইবনে মিজান নির্মাণভঙ্গিতে আর চলচ্চিত্রদর্শনে দুই মেরুর দুই নির্মাতা হলেও তাদের দুজনেরই পছন্দের অভিনেত্রীর তালিকায় পাওয়া যায় ববিতার নাম। বঙ্গদেশের সমালোচক আর সিনেমার বক্স অফিস, এই দুটো বিপরীতমুখী স্রোতের সঙ্গম ঘটানো সহজ ব্যাপার নয়। ববিতা এই কাজটি অনাসায়ে করতে পেরেছেন বলেই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তার নামে আলাদা অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি যেমন জীবনঘনিষ্ঠ সিনেমায় স্বাচ্ছন্দ্যে অভিনয় করেছেন, তেমনই বিনোদনে ভরপুর সিনেমায় সুলভে বাজিমাত করেছেন। গ্ল্যামারের সঙ্গে গ্রামারের এমন বিরল মিশ্রণ ববিতার মধ্যে ঘটেছে বলেই তার নামের জয়রথ এখনও ছুটছে।

ববিতার সিনেমার হাতেখড়ি ভগ্নিপতি জহির রায়হানের হাতে। এই নির্মাতা যেমন ‘কাঁচের দেয়াল’ ও ‘কখনো আসেনি’ নির্মাণ করে সমালোচকধন্য হয়েছেন, তেমনই ‘বেহুলা’ ও ‘সঙ্গম’ তৈরি করে দর্শকধন্য হয়েছেন। তার হাতে একাধিক সুপারস্টারের জন্ম হয়েছে, আবার বাজারকাটতি একঝাঁক নির্মাতার সৃষ্টি হয়েছে। এমন একজন বিচিত্র ও ব্যতিক্রমী শিল্পী যার ক্যারিয়ারের পথ এঁকে দিয়েছেন, তার জীবন যে লক্ষ্মী আর সরস্বতীর আশীর্বাদে সিক্ত হবে, তা অনুমান করা কি খুব শক্ত?
স্বাধীনতার আগে ‘শেষ পর্যন্ত’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘পীচ ঢালা পথ’ আর ‘স্বরলিপি’ ছবিতে অভিনয় করেন ববিতা। কিন্তু তিনি উজ্বল সূর্যের নিচে প্রকৃত তারকা হয়ে জ্বলে ওঠেন স্বাধীনতার পর। জহির রায়হান যে ববিতার স্বপ্নদ্রষ্টা, সেই ববিতার জন্ম হয় যুদ্ধশেষে। গা থেকে তারকার অলঙ্কার ঝেড়ে ফেলার পরই খাঁটি সোনার মতো চকচক করে ওঠেন এই অভিনেত্রী। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটিই সুপারহিট হয়। আর মোস্তফা মেহমুদ পরিচালিত রাজ্জাক-ববিতা জুটির এই ছবিটির নাম ‘মানুষের মন’।
বক্স অফিসে নিজের পতাকা ওড়ানোর পর ওই একই বছর অভিনেত্রী হিসেবে ববিতা নিজের জাত চেনান ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ ছবিতে। সদ্য সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের কঠোর-কর্কশ বয়ানের এমন একটি ছবিতে স্টারসুলভ চরিত্র ছুড়ে ফেলে বাংলাদেশের নারী হয়ে ওঠেন ববিতা। এই ছবি থেকে পারিবারিক ওস্তাদ সুভাষ দত্তের নিদের্শনায় কাজ করা শুরু। বড় বোন সুচন্দার ‘কাগজের নৌকা’ ভেসেছিল এই মাঝিরই হালে, ছোট বোন ববিতার অভিনেত্রী হওয়ায় অভিযানের পালেও অনাগত দিনে হাওয়া দেবেন এই গুণী শিল্পী।

১৯৭৩ সাল ববিতার অভিনয়জীবনের সবচেয়ে ঘটনাবহুল বছর। বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ ঘটে ববিতার। ‘অশনি সংকেত’ তার বৃহস্পতিকে তুঙ্গে উঠিয়ে দেয়। সত্যজিতের মাস্টারক্লাসের ছাত্রী হিসেবে পাঠ নেওয়ার পর কেমন হবে একজন ঢালিউডস্টারের জীবন? তিনি কি আর চেনা পিচ ঢালা পথে ফিরে আসতে পারবেন? চেনা পিচে ছক্কা হাঁকাতে পারবেন আগের মতো? নাকি সিরিয়াস সিনেমার অভিনেত্রীর তকমায় আটকে যাবেন চিরদিনের মতো?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ববিতা দিয়ে দেন তিয়াত্তর সালেই। ওই বছর ববিতা সত্যজিৎ রায়ের বিশ্বখ্যাত ছবিটির সঙ্গে সঙ্গে অভিনয় করেন ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ এবং খান আতাউর রহমানের যুদ্ধোত্তর মাতৃভূমির হতবিহ্বল তারুণ্যের দলিল ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবিতে। আবার ওই একই বছর ববিতা অভিনয়ে করেন মোহসিন পরিচালিত ‘রাতের পর দিন’ ছবিতে। সুপারহিট ব্যবসা করে নায়ক ওয়াসীমের প্রথম সিনেমাটি। এই সাফল্যের পদ্ম দিয়ে ববিতা প্রমাণ করেন- যে রাধে সে চুলও বাঁধে।
এতদিন পর্যন্ত ববিতার যে ছবি ব্যবসা করত, সেই ছবি সমালোচকের তালি পেত না; আর যে ছবি সমালোচকের প্রশংসা পেত, সে ছবি বক্স অফিসে হৈচৈ ফেলত না। ১৯৭৪ সালে এসে একই ছবিতে দুই সম্পূরক ঘটনার সংযোগ ঘটে। মিতা পরিচালিত ‘আলোর মিছিল’ যতটা সমালোচকদের সন্তুষ্ট করে, ততটাই প্রদর্শকদের পরিতৃপ্ত করে। পর্দায় ববিতার বিয়োগান্ত পরিণতির পরও ছবিটির ব্যবসা ঠেকে থাকেনি। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের এমন সাহসী চিত্রায়ন ভবিষ্যউ প্রজন্মের জন্য যেন এক মশাল।
১৯৭৫ সালে অভিনেত্রী হিসেবে ববিতার বিস্ফোরণ ঘটে। মোহসিন পরিচালিত ‘বাদী থেকে বেগম’, আজিজুর রহমান পরিচালিত ‘অপরাধ’, শিবলী সাদিক পরিচালিত ‘জীবন নিয়ে জুয়া’ সুপারহিট হয়। মিতা পরিচালিত ‘লাঠিয়াল’ ছবিতে সদম্ভ স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হন ববিতা। কিন্তু সব ছাপিয়ে যায় প্রথমবার তার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্তি। প্রবর্তনের বছরই শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পান ববিতা। আর তার এই অর্জন আসে একটা ব্যাপক ব্যবসাসফল ছবির মধ্য দিয়ে। অডিয়েন্স আর জুরি- এই দুই পক্ষকে সমানতালে তুষ্ট করেন তিনি। অবশ্য ‘বাদী থেকে বেগম’ ছবিতে ববিতার ক্যারেক্টার আর্ক যদি কেউ বিশ্লেষণ করেন, তবে এখানে কোনো রহস্য তাকে বিচলিত করবে না।
বিস্ময়ের ঘটনা ঘটে ১৯৭৬ সালে যখন ববিতা আবারও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমনি’ ছবির জন্য তার এই অর্জন। বাংলার আবহমানকালের নিপীড়িত নারী মনি চরিত্রে তার অনবদ্য অভিনয় দেশজুড়ে তাকে আগেই জননন্দিত করেছে, নতুন করে মেলে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এখন ববিতা যেন আর্ট সিনেমা আর কমার্শিয়াল সিনেমার মিলনসেতু। তার ছবি বাজারের চাহিদা পূরণ করে, আবার শিল্পের দাবিও মেটায়। প্রযোজকদের তিনি চোখের মণি, আবার শিল্পরসিকদেরও তার ওপর সুনজর। এমন মণিকাঞ্চনযোগ কম নায়িকার ভাগ্যেই জোটে।

১৯৭৭ সাল ববিতা আরও একবার শিল্প আর বাণিজ্যের বেড়া ভেঙে দেন। সেই সঙ্গে করেন অনতিক্রম্য রেকর্ড। টানা তৃতীয়বারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার বগলদাবা করেন ববিতা। সুভাষ দত্তের ‘বসুন্ধরা’ ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের স্বীকৃতি পান তিনি। একজন শিল্পী হয়ে শিল্পীজীবনের সাফল্য ও সংকটের আবহে তৈরি সিনেমায় সৃজনশীলতার ছাপ রেখে ববিতার এই অসামান্য অর্জন। ‘বসুন্ধরা’র মতো শিল্পশোভন ছবিতে যিনি অভিনয় করেছেন, তিনি আবার ‘নিশান’-এর মতো ব্লকবাস্টার ছবিতেও পারফর্ম করেছেন। সাতাত্তরের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি ‘নিশান’ সুপারস্টার ববিতার মুকুটে যোগ করে আরও একটি পালক। আর জাতীয় পুরস্কার তাকে ঢালিউডের সিংহাসনে রাজরানির আসনে বসায়।
পরের বছরও ববিতা তার শিল্পচেতনা আর তারকাদাপট ধরে রাখেন। একদিকে তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম সেরা ছবি ‘গোলাপী এখন ট্রেন’-এ মর্মস্পর্শী অভিনয় করছেন, আরেকদিকে ‘সোহাগ’ আর ‘মিন্টু আমার নাম’-এর মতো সুপারডুপার হিট ছবি দিয়ে বক্স অফিসে আগুন ধরাচ্ছেন। শিল্পসমালোচকরা ববিতার এই দ্বৈত রূপ দেখে তাজ্জব। তিনি যেমন দুটো স্রোতকে একই মোহনায় মেশাচ্ছেন, তেমনই শিল্পসম্মত ছবি দিয়ে বাজার জয় করে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটাচ্ছেন। গোলাপী চরিত্রে তার অভিনয়কে যেভাবে ইতিাহাসে সেরার স্বীকৃতি দিতে হবে, সেভাবেই এই ছবির বাণিজ্যলক্ষ্মীর দেখা পাওয়াটাকে চিরকাল উদযাপন করতে হবে। কেননা, কেবল ববিতাই বলতে পারেন- ‘বাংলাদেশে কোনো কেলাস নাই গো!’
ববিতা ক্লাস আর মাসকে এক কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছেন বারবার। যে বছর তিনি এ জে মিন্টুর নায়িকা হয়ে ছবিঘরে উন্মাদনা সৃষ্টি করতে পারেন (প্রতিজ্ঞা), সেই একই বছর আমজাদ হোসেনের নায়িকা হয়ে (কসাই) সমালোচকদের সমীহ আদায় করে নিতে পারেন। যে বছর আমজাদ হোসেনের ‘সুন্দরী’ ছবিতে ঝলসে ওঠেন, সে বছর দেওয়ান নজরুলের ‘বারুদ’ ছবিতেও সৌন্দর্যের ঝলক দেখান।

‘লাইলী মজনু’, ‘বদনাম’, ‘চ্যালেঞ্জ’- এক বছরে এতগুলো সুপারহিট ছবি বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছেন ববিতা। চরিত্রের বৈচিত্র্যে, জনরার ভিন্নতায়, গ্ল্যামারের প্রদর্শনীতে ছবিগুলোর তুলনা নেই। এই সমস্ত বিনোদনমুখর ছবির ফাঁকেও তিনি ‘ফেরারী বসন্ত’র মতো অনন্য রকম ছবি করেছেন। যে বছর ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘তালাক’, ‘লাল মেমসাব’-এর মতো সুপারহিট ছবি নিজের ঝুলিতে পুরেছেন, সে বছরই ববিতা ‘পেনশন’-এর মতো জীবনধর্মী ছবিও করেছেন।
১৯৮৫ সালেও একই ঘটনা। ‘চোর’-এর মতো বছরের সর্বোচ্চ ব্যবসাসফল ছবিটা যেমন ববিতার দখলে, তেমনই বছরের সবচেয়ে ভাল ছবিটা- ‘দহন’ও তার মুঠোয়। সোহেল রানার বিপরীতে তিনি যেমন সাবলীল, টিভির অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদির পয়লা ছবিতেও তিনি তেমনই সহজ। ওই বছর ‘মিস লংকা’র মতো গ্ল্যামারসর্বস্ব ছবি করেছেন ববিতা, আবার বছরশেষে সাহিত্যনির্ভর ‘রামের সুমতি’ সিনেমার জন্য পেয়েছেন সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
পুরস্কার আর সফলতা- একই মুদ্রার এপিঠওপিঠ হয়ে ধরা দিয়েছে ববিতার হাতে। শিল্পের সঙ্গে বাণিজ্যের বিরোধ মিটিয়েছেন তিনি। সংযোগ ঘটিয়েছেন মূলধারার সঙ্গে বিকল্পধারার। সত্যজিতের অনঙ্গ বউ হওয়ার পরও ইবনে মিজানের লাইলী হতে তার বুক কাঁপেনি। এমন দৃঢ়চেতা অভিনেত্রী বাংলাদেশে আর কেউ আছেন কি?






