চিরকুট: বসবাসে একুশ, মননে নব্বই
‘চিরকুট‘ টাইম ট্রাভেলের ছবি। বাস করছেন একুশে কিন্তু মনে নব্বইয়ের সময়। আশির শেষদিকে এর শুরু হলেও পিকটাইম নব্বই। প্রেম ও ট্র্যাজেডির মিশ্রণে এ ছবি হয়ে উঠেছে ভালো ছবি নির্মাণের একটা প্রচেষ্টা। ট্রু ইভেন্টের ছবি যেটি ছবির শুরুতেই প্রাপ্তিস্বীকার করা হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাটির সাথে সেই সময়ের শিক্ষার্থীরা ছবির গল্পের সাথে ভালো কানেক্ট করতে পারবে বাকিদের জন্য থাকবে অনুভূতি দিয়ে ভাবা। ছবির পরিচালক মুনতাসির আকিব।
টাইভ ট্রাভেলের ছবির ক্ষেত্রে কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় মাথায় রাখতে হয়। সেই সময়টাকে সঠিকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে কিনা। একুশ শতকের সময়ে দাঁড়িয়ে আশি-নব্বইয়ের গল্প তুলে ধরা বর্তমান প্রেক্ষাপটে চ্যালেঞ্জিং কেননা আধুনিকতা আমাদের জীবনে অনেক বেশি জড়িয়ে আছে। পাছে আবার কোথাও না সেটা এসে পড়ে এ বিষয়টি খেয়াল রাখা জরুরি।

ছবির টিম এ বিষয়টি সূক্ষ্মভাবেই মেইনটেইন করেছে। ছবির নায়কের বুকখোলা শার্টের স্টাইল, গলায় ঝোলানো রুমাল কিংবা মেয়েদের সেকালের স্টাইলে চুল সাজানো। রসগোল্লার জন্য জিভে জল আসার মতো পরিবেশ তৈরি করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের দেয়ালে ঝোলানো তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছবি এগুলো বেশ সচেতনভাবে দেখানো হয়েছে। পরিচালকের এ সচেতনতা প্রশংসার দাবি রাখে।
ছবির নাম ‘চিরকুট’-এর তাৎপর্যও সময়ের বিচারে গুরুত্ব পেয়েছে। তখনকার সময়ে প্রেমের আদান-প্রদানের শুরুটা হত চিরকুট দিয়েই তারপর তা গড়াত প্রেমপত্রে। এখানেও নস্টালজিক একটা ব্যাপার রাখা হয়েছে।
ছবির অন্যতম একটি দারুণ দিক ছিল সাহিত্যের স্পর্শ। ক্যাম্পাসভিত্তিক শিল্পচর্চার সংগঠনে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’-র রিহার্সেল, বুদ্ধদেব বসুর কবিতার আবৃত্তি কিংবা চিরকুটে লেখা নিজস্ব কবিতা এগুলো ছবিটিকে সাহিত্যরসের স্বাদ দিয়েছে।
ছবির প্রধান দুই চরিত্রে শ্যামল মওলা ও নবাগত আজিজুন মীম। শ্যামল মওলা দারুণ অভিনেতাই তাকে আলাদাভাবে বলার বিশেষ কিছু নেই কিন্তু নবাগত আজিজুন মীম অবাক করে দেয়ার মতো কাজ দেখিয়েছে। তার এক্সপ্রেশন এত ন্যাচারাল যে প্রথম ছবি বলে মনেই হচ্ছিল না। এক্সপ্রেশনের পাশাপাশি ডায়লগ ডেলিভারিও প্রাণবন্ত। কবিতার আবৃত্তিও মিষ্টি লাগছিল শুনতে। ভয়েসও সুন্দর। এ ছবির অর্জনের মধ্যে আজিজুন মীম অন্যতম হয়ে থাকবে যাকে নবাগত একজন সম্ভাবনাময়ী অভিনেত্রী হিসেবে আবিষ্কার করা গেছে। নওশাবা পারফেক্ট, সুমন পাটোয়ারি, সিয়াম নাসিররা তাদের ভূমিকায় ন্যাচারাল। অন্যান্য অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে স্লো ডায়লগ ডেলিভারির জন্য কেউ কেউ পিছিয়ে ছিল।
রোমান্টিক গানের মধ্যে ‘প্রেমে গেলাম ডুবে’ খুবই চমৎকার হয়েছে। যেমন লোকেশন তেমন রোমান্সে ভরা। ক্যামেরার কাজ দেখার মতো। স্নেহাশীষ চক্রবর্তীর র্যাপ সংটির কথা, গায়কী আকর্ষণীয়। স্যাড সংটিও ভালো ছিল।
ছবির ফার্স্ট হাফ কিছুটা স্লো হলেও সেকেন্ড হাফে গতি ছিল বেশ ভালো। সেকেন্ড হাফে গল্প খুব ভালোভাবেই দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছিল এবং একের পর এক আকস্মিকতায় দর্শককে আচ্ছন্ন করা হয়েছে।
ভালো ছবি নির্মাণ কমে যাচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিতে। ছবি নির্মাণ ও মুক্তিও কমে যাচ্ছে, এই বাস্তবতায় ‘চিরকুট’ বেশ ভালো কাজ দেখানো পরিচ্ছন্ন ছবি সময় ও অনুভূতিই যার শেষকথা।
রেটিং – ৮/১০






