চরিত্রের ভেতরের শক্তি তুলে ধরেন ইমতিয়াজ বর্ষণ
বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল মিডিয়া অনেকটাই গ্ল্যামার, উচ্চকণ্ঠ পারফরম্যান্স আর মেকি নাটকীয়তায় আচ্ছন্ন। ঠিক সেই জায়গায় চরিত্রকে পর্দায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে বেশ আলাদা ইমতিয়াজ বর্ষণ। গ্ল্যামারনির্ভর অভিনয়ে তিনি অপটু, এমন নয়। তবে তার অভিনয়ের মূল শক্তি চরিত্রের ভেতরের মানুষটিকে তুলে ধরা।
চরিত্রের ভেতরের মানুষটিকে আবিষ্কারের এ যাত্রায় গতানুগতিক ধারার অনেক অভিনেতার তুলনায় বর্ষণের কাজের সংখ্যাও অগণিত নয়। বড় পর্দা কিংবা ওটিটি—দুই মাধ্যমেই তিনি সংযত অভিনয়ের জোরে আলাদা একটা জায়গা তৈরি করেছেন।
ইমতিয়াজ বর্ষণের পুরো নাম ইমতিয়াজ উদ্দিন সরকার বর্ষণ। জন্ম ২২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের মুরাদপুরে। তার পৈতৃক নিবাস ফটিকছড়ির ভুজপুরের আমতলী গ্রামে। কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রাম নগরীর হামজারবাগ এলাকায়। পড়াশোনা করেছেন রাহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও সরকারি কমার্স কলেজে। পরে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

শৈশবে পাড়ার নাটকের মহড়া দেখতে গিয়ে হঠাৎ মঞ্চে ওঠার সুযোগ পান বর্ষণ। সেখান থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তবে অভিনয়ের ব্যাকরণ ও তাত্ত্বিক দিকটাও তিনি ভালোভাবে শিখতে চেয়েছেন। ভর্তি হন চট্টগ্রামের ‘ফেম স্কুল অব ড্যান্স, ড্রামা অ্যান্ড মিউজিক’-এ। সেখান থেকে থিয়েটার অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স করেন।
এর পাশাপাশি দীর্ঘ সময় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘তির্যক নাট্যগোষ্ঠী’ ও ‘এভাগার্ড’ থিয়েটার দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। থিয়েটারের কঠোর নিয়ম আর মঞ্চের শৃঙ্খলা পরবর্তী সময়ে তার চরিত্র নির্মাণে বড় ভূমিকা রাখে। ২০১১ সালে পেশাদার অভিনয়শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় আসেন তিনি। এরপর দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন। বেশ কিছুদিন কাজ করেছেন ক্যামেরার পেছনেও।
২০২০ সালে মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্র অয়নের ভূমিকায় অভিনয় করেন ইমতিয়াজ বর্ষণ। অভিষেক ছবিতেই মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা আর আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশ ঘটান তিনি। চরিত্রটির কারণে সমালোচক ও সাধারণ দর্শকের নজর কাড়েন তিনি।
এখন পর্যন্ত এটিই সম্ভবত ইমতিয়াজ বর্ষণের সবচেয়ে বেশি প্রভাব তৈরি করা চরিত্র। এমন চরিত্রের সুযোগও তিনি খুব বেশি পাননি। পরবর্তী কাজগুলোয় অয়নের মতো গভীর চরিত্র তাকে খুব একটা দেয়া হয়নি। এটা ইমতিয়াজ বর্ষণের দূর্ভাগ্য নাকি বাংলাদেশের নির্মাতাদের এমন গভীর গল্পে সিনেমা নির্মাণের অপ্রতুলতা তা বলা মুশকিল। তবে কয়েক মিনিটের ক্যামিও চরিত্রেও আলাদা করে নজর কাড়তে বর্ষণের জুড়ি নেই।
ওটিটির পাশাপাশি চলচ্চিত্র ও স্বাধীন প্রজেক্টে বিভিন্ন চরিত্রে দেখা গেছে তাকে। ‘চন্দ্রাবতী কথা’য় কবি জয়ানন্দের চরিত্রে তার অভিনয় ছিল অনবদ্য। ‘ওরা ৭ জন’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সলিম কাজীর চরিত্রে। গ্রামের মসজিদের মুয়াজ্জিনের চরিত্রেও তার অভিনয় ছিল একেবারে মাটির কাছাকাছি।
সমালোচকপ্রিয় শর্টফিল্ম ‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’ ছাড়াও তার আলোচিত কাজের মধ্যে রয়েছে ওটিটির ‘নিশ্বাস’, ‘অপলাপ’ ও ‘অমীমাংসিত’, ‘সাড়ে ষোলো’ ইত্যাদি। বড় পর্দার ‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’তেও দেখা গেছে তাকে।
ওটিটিতে ইমতিয়াজ বর্ষণকে মনে রাখার মতো বেশ কয়েকটি চরিত্রে দেখা গেছে। তানিম নূর পরিচালিত জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘কাইজার’-এ সুচতুর ব্যারিস্টার মোখতার মাহমুদ জাফরি চরিত্রে তার অভিনয় ছিল বেশ সংযত ও সুসংহত। অনেক দর্শকই এই চরিত্রকে ঘিরে স্পিনঅফের দাবি জানিয়ে আসছেন।
‘গোলাম মামুন’ সিরিজে পুলিশ কর্মকর্তা রবিন এবং ‘কালপুরুষ’-এ এসআই জাহাঙ্গীরের মতো পরিচিত পুলিশি চরিত্রও করেছেন তিনি। তবে চেনা ছকের মধ্যে থেকেও চরিত্রগুলোকে নিজের মতো করে উপস্থাপন করেছেন। ‘ঊনলৌকিক’, ‘মুন্সিগিরি’ ও ‘আকা’ প্রজেক্টেও তার অভিনয় প্রশংসা কুড়িয়েছে। অমিতাভ রেজা চৌধুরীর শর্টফিল্ম ‘বন্ধু বা বন্দুকের গল্প’তে বিপ্লবী চরিত্রে বর্ষণ এর অভিনয় মনে রাখার মতো।
শুধু অভিনয়েই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি ইমতিয়াজ বর্ষণ। ‘একটি খুনের বিবরণ’ শর্টফিল্মের নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। নিজের ব্যান্ড ‘হ্যালির ধূমকেতু’র মাধ্যমে মিউজিক ট্র্যাকেও নিজের সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। ‘প্রাচ্যনাট’ সহ বিভিন্ন থিয়েটার প্রতিষ্ঠানে অভিনয় এপ্রেসিয়েশন ক্লাসও নেন তিনি।

দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমের রিভিউ এবং আন্তর্জাতিক ফিল্ম ক্রিটিকদের আলোচনায় বর্ষণের অভিনয় নিয়ে একটি বিষয় বারবার এসেছে। সেটি হলো ‘লেস ইজ মোর’ তত্ত্বের সফল প্রয়োগ।
অতিরঞ্জিত অঙ্গভঙ্গি কিংবা জোর দিয়ে সংলাপ বলার বদলে বর্ষণ নীরবতা ও ছোট ছোট এক্সপ্রেশনের মাধ্যমে চরিত্রের জটিলতা তুলে ধরেন। তার আন্ডারস্টেটেড ও স্বাভাবিক উপস্থিতি অনেক সময় আশপাশের চরিত্রগুলোকেও ছাপিয়ে যায়।
ভয়েস মডিউলেশনেও তার নিজস্বতা আছে। প্রমিত ও স্বকীয় কণ্ঠস্বরের সঙ্গে নিচু টোনে ডায়ালগ ডেলিভারি তার অভিনয়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। এতে চরিত্রের মনস্তত্ত্ব বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। তবে কখনো কখনো এই ধরন একঘেয়েও মনে হতে পারে।
গ্রে চরিত্রে বর্ষণ বেশ সাবলীল। ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক—কোনো চরিত্রকেই একপেশে করে তোলেন না। বরং বাস্তব মানুষের মতো দ্বিধান্বিত করে তোলার চেষ্টা করেন। যে কারণে ‘কাইজার’ কিংবা ‘গোলাম মামুন’-এর চরিত্রগুলোও তাই গৎবাঁধা মনে হয়নি।
বাংলাদেশের কনটেন্ট ইন্ডাস্ট্রি এখন ধীরে ধীরে গল্পনির্ভর কাজের দিকে ঝুঁকছে। সে দিক থেকে হয়তো ইমতিয়াজ বর্ষণের নিজস্বতা এবং চরিত্রকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা তাকে আগামী দিনে বাংলা ভিজ্যুয়াল কনটেন্টের গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতাদের একজন করে তুলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে তার কাজের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে এই নিজস্বতাই।






