দর্শকের জন্যই ‘রইদ’, তবে সময়ের একটু আগে
ঈদের দিন থেকে ‘রইদ’ নিয়ে শুনছিলাম – ‘মাথার ওপর দিয়া গেছে’, ‘রইদ না, সিনেমার নাম তাল হওয়া দরকার ছিল!’, ‘কিছুই বুঝি নাই কিন্তু এক্টিং সিনেমাটোগ্রাফি খুব সুন্দর’ -এইসব কথাবার্তা।
একটা কথা খুব বিশ্বাস করি, ‘দর্শক রুচি সেট করে দিলে সিনেমা এক জায়গায় থেমে থাকে। আর ডিরেক্টর দর্শকের রুচি সেট করলে সিনেমা তরতর করে এগোয়!’ এই যে এক ভারতেই আমরা বলিউডের মত জিরো রাইটিং ফর্মুলা ফিল্ম, কেরালার দুর্দান্ত গল্পের সিনেমা আর তামিল তেলেগুর ধুন্ধুমার মাসালা সিনেমা দেখি, তার কারণ প্রতিটির আলাদা ডিরেক্টর তাদের ইন্ডাস্ট্রির দর্শকদের এরকম ভিন্ন ফ্লেভারে অভ্যস্ত করেছেন। তাহলে বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের সিনেমা আসলে কোনটা? ইরানি বা কোরিয়ান দেখলেই যেমন বুঝে ফেলি, আমাদের সিনেমা দেখলেই কি বুঝে ফেলতে পারবে দুনিয়ার মানুষ? সেই ভাষার জায়গাটা আমরা ঠিক করতে পারছি না কেন!

‘রইদ’ এই সব প্রশ্নের পজিটিভ উত্তর নিয়ে এসেছে এক সিনেমায়। মেজবাউর রহমান সুমনকে সমসাময়িক বাকি নির্মাতাদের সাথে মিলানো। সিনেমা বোঝার আগে নির্মাতার দর্শন বুঝতে পারলে আনন্দের জন্ম হয়, ছবি বাছাই করতে সুবিধা হয়। স্পিলবার্গ আর ডেভিড ফিঞ্চারের দর্শক এক না, বেলা টার আর তারকোভস্কির দর্শক এক না, মাত্রায় ততটা না হলেও রায়হান রাফী আর মেজবাউর রহমান সুমনের দর্শকও আলাদা।
মেজবাউর রহমান সুমন, মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের মত ডিরেক্টররা ব্যবসা, হিট ফ্লপ, আইটেম গান বা ক্যামিও এসব নিয়ে একদমই মাথা ঘামায় না। তারা তাদের গল্পটা বলে, সেটা কোন প্রডিউসার টাকা দিলে বানায় আর না দিলে অন্য কাজ করে। প্রডিউসারের ইচ্ছায় তারা গল্প বলতে আসে নাই। তাহলে ‘হাওয়া’ এত ব্যবসা করলো যে?
‘হাওয়া’ ব্যবসা করার তিনটা গুরুত্বপূর্ণ এক্স ফ্যাক্টর ছিল – ‘সাদা সাদা কালা কালা গান’, চঞ্চল চৌধুরী – রাজ – তুষিদের অভিনয় আর ভাল প্রমোশন। এর বাইরে যদি বলি, উত্তাল মাঝসাগরে শুট কেমন হলো, সেটাও কৌতুহল নিয়ে মানুষ দেখতে গিয়েছিলো। ‘রইদ’-এ এগুলার একটাও নাই।

এখানে বড় কোন অভিনেতার এক্স ফ্যাক্টর নাই, দুইটা ক্যারেক্টারের বাইরে খুব বেশি ছড়ায় নাই গল্পটা, প্রমোশন অনেক কম হইছে, হিট করানোর জন্য তেমন গান নাই, মূল সিনেমায় মাত্র এক দুইটা গানের ভগ্নাংশ ছিল। মনে হলো, সুমন খুব সচেতনভাবে সিনেমাকে সবরকম বাণিজ্যিক উপাদান থেকে সরিয়ে রেখেছেন। সেসব কারণে হল থেকে বেরিয়ে ‘হাওয়া’ দেখে মজা পাওয়া কোন দর্শক যদি তাকে গালাগাল করে, আমি তাতেও অবাক হব না। নিজেদের পকেটের টাকা কেটে যারা দুই ঘণ্টার ওপরে সিটে বসে থাকবেন, তারা দুইটা কথা বললেও সই, সুমনের দর্শনের জায়গা তাতে কিছুই বদলাবে না। তাহলে সুমন ছবিটা বানিয়েছেন কার জন্য? দর্শকের জন্যই, তবে সময়ের একটু আগে। ধরেন, সহজভাষায় বলতে গেলে টাইটানিক, টার্মিনেটর দেখা দর্শককে যদি ইন্টারস্টেলার, টেনেট, ইন্সেপশন দেখার পরপরই কিছু বলতে বলা হয়, ‘কিছু বুঝি নাই’ বলতেই পারে সে।
‘রইদ’ দেখে নব্বই ভাগ দর্শক এর গল্প, এন্ডিং ও এক্সিকিউশন ভালভাবে বুঝবে না, অনেকক্ষেত্রে একেবারেই বুঝবে না। মিকেল এঞ্জেলোর পেইন্টিং ‘ক্রিয়েশন অফ এডাম’, ইভ আর লিলিথ, ইডেন গার্ডেন, বুদ্ধ ধর্মের শামশারা, এস এম সুলতানের ছবির গ্রাম কিংবা নোয়াস আর্ক সম্পর্কে জ্ঞান থাকা সবার জন্য কাম্য না, সম্ভবও না। সুমন কতটা বেলা টার, কিম কি দুক, জিম জারমুশ বা সত্যজিতের ফ্যান তা হাড়ে হাড়ে অনেকে বুঝবেন সিনেমার ফ্রেম আর গল্পের এক্সিকিউশনে। বাকি মেজরিটি দর্শক তাহলে কী দেখে বের হলেন?
সাদু বা সাধু একজন নিরীহ রাখাল। প্রত্যন্ত এক পাহাড়, খাল, সবুজেঘেরা জায়গায় সাদুকে পাঠায় তার মিয়াভাই, সঙ্গে দেয় নতুন বউ। মাছের প্রজেক্ট, গরু পালন আর বউকে নিয়ে সময় কাটে সাদুর। কিন্তু সমস্যা হলো, নামহীন সাদুর বউ মানসিক ভারসাম্যহীন, অনেক আগে একবার বিয়ে হলেও সেটা নিয়ে আলাপ করতে চায় না। নানা কাজে পাগলামি করে সাদুকেও পাগলপ্রায় করে রাখে। বউ ভারসাম্যহীন বলে সাদুর কামনাবাসনাও অব্যক্ত থেকে যায়। রাগে একদিন বউকে দূরে কোথাও রেখে আসে সাদু, ভাবে আর ফিরবে না। সাদু ক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে পার্শ্ববর্তী একটা তালগাছ থেকে পড়া তালটি বাসায় নিয়ে আসে, দেখা পায় সাদুর বউয়ের। বউ কিভাবে আসলো, তালের সাথে তার কী সম্পর্ক, সেইটা নিয়াই গল্প! গল্পের বিশ্লেষণ নিয়ে আরেকটা এক্সপ্লেইনার পোস্ট দেয়ার ইচ্ছা আছে।
পারফরম্যান্স নিয়ে বললে হলে আগে বলতে হয়, ‘রইদ’ হলো সাদু ও তার বউয়ের প্রেমেরও গল্প, তাই একটা অন্যরকম রসায়ন ডিমান্ড করছিলো চরিত্রদ্বয়। আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদ আর গাজী রাকায়েতও দুইটা চরিত্রে ভাল করেছেন। তবে নাজিফা তুষি সারপ্রাইজিং আর মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ছিলেন জাইগ্যান্টিক। দুজনেই মেথড এক্টিং করেছেন, সময় দিয়েছেন, ত্যাগ করেছেন, চরিত্রে মিশতে পেরেছেন। এদেরকে আলাদাভাবে পাল্লায় মাপতে চাই না। তবে ব্যক্তিগত জায়গা থেকে কয়েকটা অবজারভেশন থাকবে।

ইমরান তুষি থেকে বেটার পারফর্ম করেছেন। তুষি জনমত জরিপে নিশ্চিতভাবে এগিয়ে থাকবেন। তার পাগলামি, স্ক্রিন প্রেজেন্স আর আউটস্ট্যান্ডিং ডেডিকেশন তার চামড়ায়, দাঁতে, চুলে, চোখে ফুটে উঠেছে। তুষির ‘রইদ’র পারফরম্যান্স এর কাছে এখন জয়াকে লাগছে অ্যাভারেজ, তমা মির্জার মত দারুণ অ্যাক্টরকে লাগছে তারও নিচে। সমসাময়িক অনেকের থেকে কম কাজ করলেও কাজের প্লেসমেন্ট আর জান দিয়ে চরিত্র হয়ে যাবার জায়গায় তুষি নিজের ওপরও চ্যালেঞ্জ ছু্ঁড়ে দিলো। আবার কোন ছবিতে সে নিজেকে ছাড়াবে বা আদৌ ছাড়াতে পারবে কী না জানি না। এরপর তুষি যাই করুক, ‘রইদ’র পাগলির সাথে তার তুলনা হবে, হবেই।
তবে মোস্তাফিজুর নুর ইমরানকে এগিয়ে রাখবার কারণ সিনেমায় তার চরিত্রের প্লেসমেন্ট, গুরুত্ব ও ক্লাইম্যাক্সে নিয়ে যাওয়ার রাস্তায় তার ভয়াবহ পারফরম্যান্স। ইমরান ভাল অভিনেতার দর্শন তার কাজের বাছাই ও পারফরম্যান্সে আগেও প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই তাকে চঞ্চল, মোশাররফ এমনকি রাজদের জায়গাতেও ভাবতেন না, ভাবাও উচিত না। তবে ‘রইদ’র সাদু সবাইকে নাড়া দিয়ে দেবে। চঞ্চল চৌধুরী ইতিমধ্যেই সিনেমাটিকে তার লাইফের সেরা সিনেমাগুলোর জায়গায় স্থান দিয়েছেন। আমার বিশ্বাস, সাদুকেও তিনি চ্যালেঞ্জ ভাবছেন। একেবারে শেষদিকে শেষবার বউ উধাও হবার পর সাদুর ওপর যেভাবে পাগলি ভর করে কিংবা ডেভিলস স্পিরিট কাজ করে, আপনার গা গুলিয়ে দিতে বাধ্য। এমন চরিত্র আর তার প্রতি জাস্টিফিকেশন বাংলা সিনেমাতেও খুব একটা দেখা যায় নাই।
জোয়াহের মুসাব্বির আন্তর্জাতিক মানের ডিওপি, সেটা কিছুটা টের পেয়েছি গত ঈদের ‘প্রেশার কুকার’ দেখে। তবে ডিরেক্টর আর সিনেমাটোগ্রাফারের যে মেলানকোলিক ল্যান্ডস্কেপ সেইটা পুরোপুরি পেলাম ‘রইদ’-এ। ফেসকার্ডের সংযুক্ত ক্রু মেম্বারদের ডেডিকেশন ফুটে উঠেছে পর্দায়। বিশেষ করে, আর্ট ডিরেকশন ছিল সমসাময়িক সেরা। নাসিব খান আর নিজামুদ্দিন পাবেন বিশেষ ধন্যবাদ। রাশেদ শরীফ শোয়েব ‘মেঘদল’র পুরনো মেম্বার। গান ও আয়োজনে তার সেন্স অফ মিউজিক ছিল শ্রুতিমধুর, মানানসই।
রেটিং- ৮.৫/১০






