Select Page

‘প্রেশার কুকার’ অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরীকে নির্যাতন: খিলক্ষেত থানায় মামলা, আশিয়ান চেয়ারম্যানের অস্বীকার

‘প্রেশার কুকার’ অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরীকে নির্যাতন: খিলক্ষেত থানায় মামলা, আশিয়ান চেয়ারম্যানের অস্বীকার

বিজ্ঞাপনচিত্রের চুক্তির কথা বলে ডেকে নিয়ে ঢালিউড অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরীকে (ইসরাত জাহান) হাত-পা বেঁধে টানা দুই ঘণ্টা মধ্যযুগীয় কায়দায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আশিয়ান গ্রুপ ও আশিয়ান ল্যান্ডস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর ৩০০ ফিট সংলগ্ন আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অবস্থিত নজরুলের কার্যালয়ে।

যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্যাতনের শিকার স্নিগ্ধা চৌধুরীকে ভুলবশত ‘জেবা তাকিয়া’ নামক অন্য এক নারী ভেবে বিয়ে করার জন্য চাপ দেওয়া, তলোয়ার ও লাঠি দিয়ে আঘাত করা, গায়ে কুসুম গরম কফি ঢেলে দেওয়া এবং জোরপূর্বক নেশাজাত দ্রবণ পান করানোর দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ সময় ঘটনাচক্রে স্নিগ্ধার সঙ্গে থাকা মডেল কো-অর্ডিনেটর ইমনকেও বেধরক প্রহার করে তার পায়ের নখ উপড়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
ভুক্তভোগী অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরীর ভাষ্যমতে, এক বছরের জন্য একটি ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে মডেল হওয়ার জন্য ২০ লাখ টাকার চুক্তির প্রস্তাব দেন ইমন নামের এক কো-অর্ডিনেটর। চুক্তি চূড়ান্ত করতে গত ২৪ জুলাই (শুক্রবার) রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি ৩০০ ফিট রোডের আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান।

কক্ষে ঢোকার কিছুক্ষণ পরেই আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া হঠাৎ ক্ষেপে উঠে স্নিগ্ধাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “তোরে কত বছর ধইরা খুঁজতাছি। তুই আমার কোটি কোটি টাকা খাইছস।” স্নিগ্ধা নিজেকে তাকিয়া নন বলে নিজের পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলেও নজরুল তা গ্রাহ্য করেননি।

পরবর্তীতে তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে একটি খালি স্ট্যাম্পে সই করতে বাধ্য করা হয়। এরপর রুমের সকলকে বের করে দিয়ে স্নিগ্ধাকে বাসর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। স্নিগ্ধা অস্বীকৃতি জানালে মোটা রশি দিয়ে তার হাত ও পা বেঁধে ফেলা হয়।
নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে স্নিগ্ধা জানান, মোটা লাঠি দিয়ে তার দু’পায়ের পাতায় ১৪ বার আঘাত করা হয় এবং চুল ধরে ঘাড়ের স্পাইনাল কর্ডসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে এলোপাতাড়ি প্রহার করা হয়। এরপর নজরুলের নারী পিএস মিয়ামি তার হাত ও শরীরে কুসুম গরম কফি ঢেলে দেয় এবং নেশাজাত কফি পান করতে বাধ্য করে।

যেভাবে উদ্ধার পান স্নিগ্ধা
একপর্যায়ে নির্যাতনকারীরা তাকে ছেড়ে দিলে বা ভুল বুঝতে পারলে স্নিগ্ধা কায়দা করে দরজা খোলা পেয়ে বারান্দা দিয়ে দৌড় দেন এবং ওপর থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ে ৩০০ ফিট রোডে চলে আসেন। সেখানে একটি চলন্ত অটো থামিয়ে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন।

যুগান্তরের প্রতিবেদনা বলা হয়, ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে অনুসন্ধানী দল আশিয়ান মেডিকেল কলেজে গেলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সুড়ঙ্গ সদৃশ গোপন কক্ষ এবং টর্চার সেলের মিল পায়।

অভিযুক্ত নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বক্তব্য
নৃশংস অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া মোবাইল ফোনে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এ সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।”

পরবর্তীতে যখন ঘটনার দিন স্নিগ্ধা চৌধুরীর লোকেশন ট্র্যাকিং এবং ডিজিটাল সপ্রমাণের তথ্য তাকে জানানো হয়, তখন তিনি সুর পাল্টে বলেন, “আমি তাকে ৪ বছর আগে চিনতাম।”

এরপর ‘জেবা তাকিয়া ভেবে কেন নির্যাতন চালানো হলো’—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি এ নিয়ে কথা না বাড়িয়ে সরাসরি সাক্ষাৎ করার কথা বলে সংযোগটি কেটে দেন।

রায়হান রাফীর তীব্র প্রতিবাদ
ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের চলচ্চিত্র পরিচালক রায়হান রাফী নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লেখেন, “যেকোনো সভ্য সমাজে সহিংসতা ও নিপীড়নের কোনো স্থান নেই। স্নিগ্ধা চৌধুরীর তোলা অভিযোগগুলোর একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। আমি আশা করি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সত্য সামনে আসবে এবং বিচার সুনিশ্চিত হবে।”

স্নিগ্ধা অভিনীত ‘প্রেশার কুকার’ পরিচালনা করেছিলেন রাফী।

নির্মাতা খিজির হায়াত খান লিখেছেন, “ভূমিদস্যু হোক আর অসৎ শিল্পপতি সবার টার্গেট আগে আমাদের মিডিয়ার নারীরা। সোনার দেশে অপরাধী সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে আর ভিক্টিম দোষী। মুনিয়া থেকে স্নিগ্ধা গল্পের স্ক্রিপ্ট ঐ একটাই।”

আইনি পদক্ষেপ ও আগাম জামিন
অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরী বাদী হয়ে ২৬ জুলাই (রোববার) রাতে রাজধানীর খিলক্ষেত থানায় আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্ট সহযোগীদের বিরুদ্ধে একটি লিখিত মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি আমলে নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

জাগো নিউজের আজকের প্রতিবেদন অনুসারে, সেই মামলায় এরইমধ্যে জামিন পেয়েছেন অভিযুক্ত। এনিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলন করেন স্নিগ্ধা চৌধুরী। সেখানে তিনি জানান, তাকে বারবার হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তিনি এই ঘটনায় বিচার চেয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘টাকার কত ক্ষমতা? একটা মেয়েকে ডেকে নিয়ে এভাবে নির্যাতন করার পরও তাকে গ্রেফতার করা হলো না। বরং একজন প্রতিমন্ত্রীর আন্ডারে তার জামিন হয়ে গেছে। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর বিচার চাই। তিনি একজন বড় মনের মানুষ। তার ঘরেও আমার মতো একজন মেয়ে আছেন। আমার বিশ্বাস তিনি এই ঘটনাটা দেখবেন। আমি যেন ন্যায়বিচার পাই সেটা নিশ্চিত করবেন।’

বিচার না পেলে আত্মহত্যা করবেন জানিয়ে স্নিগ্ধা আরও বলেন, ‘আমাকে প্রতিনিয়ত মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যেখানে আমার সুষ্ঠু বিচার ও নিরাপত্তা জরুরি সেখানে উল্টো অপরাধী অগ্রিম জামিন পেয়ে যায়। কোন দেশে আছি আমরা? যদি আমার কিছু হয় বা অপমৃত্যু হয় তবে ওরা সবাই দায়ী থাকবে।’


Leave a reply

সাম্প্রতিক খবরাখবর