Select Page

বিচার হবে: গ্রাম-শহরের দ্বৈত সালমান শাহ

বিচার হবে: গ্রাম-শহরের দ্বৈত সালমান শাহ

সালমান শাহ-র ছবিগুলোর ভেরিয়েশন নিয়ে অনেকে মাঝে মাঝে নানা মন্তব্য করে থাকে। কারো কারো দাবি সালমান শুধু রোমান্টিক নায়ক ছিল। তারা যে তাঁর ছবিগুলো ঠিকমতো না দেখেই মন্তব্য করে সেটা পরিষ্কার। সালমান শাহ-র ক্যাপাবিলিটি সব ধরনের চরিত্রেই ছিল। ২৭ ছবিতেই বিভিন্ন ক্যারেক্টারাইজেশনের নজির খু্ব সূক্ষ্মভাবেই আছে। সেটাকে বুঝতে হলে অবজারভেশন সূক্ষ্ম হতে হবে।

এ সূত্র ধরেই ‘বিচার হবে’ ছবি নিয়ে কথা বলা যাক। শাহ আলম কিরণ পরিচালিত এ ছবিটি ১৯৯৬ সালে মুক্তি পেয়েছিল। সালমানের ভেরিয়েশন নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলে তাদের কাছে এ ছবির ভেরিয়েশন তুলে ধরতেই এ আয়োজন।

‘বিচার হবে’ ছবির সবচেয়ে বড় ভেরিয়েশন হচ্ছে একই ছবিতে গ্রাম ও শহর দুই প্রেক্ষাপটে সালমান শাহর ক্যারেক্টারাইজেশন। ছবি শুরু হয় গ্রাম থেকে তারপর গল্পের ধারাবাহিকতায় সে জার্নি শহর পর্যন্ত গড়ায়। এর মাধ্যমে যেটা দেখা যায় একই ছবিতে সালমানকে গ্রামীণ ও শহুরে দুই ভূমিকায় দুইরকম দেখার সুযোগ তৈরি হয় আর এর মাধ্যমে একজন নায়ক সালমানের পাশাপাশি একজন অভিনেতার গুণসম্পন্ন সালমান শাহ মুখ্য হয়ে ওঠে।

প্রথমে আসা যাক গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের সালমান শাহ। লুঙ্গি পরা সালমানকে এ ছবিতে দেখে মনে হবে একদম খাঁটি গাঁয়ের ছেলে। একদম ঐ ইমেজেই মিশে গেছে। বড়ভাই আসাদের ছেলের সাথে তার খুনসুটি, ভাবী ডলি জহুরকে মায়ের মতো সম্মান করা, হুমায়ুন ফরীদির বহুবিবাহের ভূত সরানোর দায়িত্ব নেয়া এগুলো সালমানের প্রাথমিক দিক ছিল ছবিতে। শাবনূরের সাথে বিয়ের সময় হুমায়ুন ফরীদির সাজানো নাটকের পর সালমানের পরিবর্তন আসতে থাকে। ততদিনে শহরে থাকা আসাদও ফরীদির ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ছোটভাই সালমানকে ভুল বোঝে। বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দেয়। ভাইকে খুঁজতে সালমান শহরে যায়।

শহুরে সালমান শাহ সম্পূর্ণ নতুন অবতারে দর্শকের সামনে আসে। কাজ করে টাকা নিতে গিয়ে কাবিলা বাহিনীর ট্যাক্সের শিকার হতে হয় সালমানকে। নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর সালমানের মুখে আসে সেই সেরা সংলাপ যা গ্রাম ও শহরের পার্থক্যকে বুঝিয়ে দেয়-“আমি বুইজা গেছি, সব বুইজা গেছি, আমি আর কাম করুম না।” শহরে অসৎ উপায়ে যে অনেককিছু করা যায় সেটা সালমান বুঝে ফেলে। তারপর নিজে মাস্তানের অবতারে আসে।

মাস্তান সালমান শাহ-র যে লুক সেই লুকে যে পরিমাণ স্টাইলিশ, ফ্যাশনেবল উপস্থিতি দেখা যায় কমার্শিয়াল ছবির কোনো নায়ককে মাস্তানের ভূমিকায় এতটা স্টাইলিশ ও ফ্যাশনেবল লাগেনি। হয়তো কেউ কেউ নিজেদের মতো হাজির হয়েছিল পর্দায় কিন্তু সালমানের মতো এতটা ফ্যাশনেবল হয়ে নয়। রাজকীয় গেটাপের মাস্তান সালমানের কাছে পরাস্ত হয়ে কাবিলা তাকে ‘ওস্তাদ’ ডাকে আর জানতে চায় কি করতে হবে। সালমান কাবিলাকে বলে-“যেভাবে ইচ্ছা টাকা কামাবি শুধু আমারে ট্যাক্স দিয়া যাবি।” শাবনূর তার গানের দল নিয়ে গুণ্ডাদের আক্রমণের শিকার হয়, তাদের ইনকামের সব টাকা তারা নিয়ে যেতে থাকে। তখন সালমানের কাছে সাহায্য চায় কিন্তু সালমান নিজেরটা নিজেকেই সাহসের সাথে মোকাবিলা করতে বলে, তখন শাবনূর তার দল নিয়ে গুণ্ডাদের শায়েস্তা করে নিজেদের টাকা আদায় করে নেয়। পরে শাবনূরের সাথে প্রেম হয় নতুন করে, ছবির শেষে গিয়ে জানতে পারে তার সাথেই তার বিয়ে হয়েছিল গ্রামে। বড়ভাই আসাদকে ষড়যন্ত্রের হাত থেকে সালমানই বাঁচায় বুদ্ধিমত্তার সাথে।

ছবির জনপ্রিয় গান ‘আমি যে তোমার কে কাছে এসে নাও জেনে নাও’ এটাতেও সালমানের স্টাইলিশ উপস্থিতি ছিল। আর জনপ্রিয় সংলাপ ছিল ‘গিট্টু ছুটছে।’

গ্রাম-শহরের ভেরিয়েশনে একই ছবিতে দুই ক্যারেক্টারাইজেশনে সালমান শাহ-র ‘বিচার হবে’ ছবি ছোট ক্যারিয়ারে বড় প্রতিভার পরিচয় রেখে যাওয়ার একটা উদাহরণ। তাই তাঁর ছবির বিষয়ে কথা বলতে হলে ঠিকমতো ছবিগুলো দেখে জেনেবুঝেই বলা উচিত। ‘বিচার হবে’ ছবি এক্ষেত্রে একটা রেফারেন্স।


About The Author

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গত শতকে যেভাবে সমৃদ্ধ ছিল সেই সমৃদ্ধির দিকে আবারও যেতে প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখি। সেকালের সিনেমা থেকে গ্রহণ বর্জন করে আগামী দিনের চলচ্চিত্রের প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠুক। আমি প্রথমত একজন চলচ্চিত্র দর্শক তারপর সমালোচক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখি। দেশের সিনেমার সোনালি দিনের উৎকর্ষ জানাতে গবেষণামূলক কাজ করে আগামী প্রজন্মকে দেশের সিনেমাপ্রেমী করার সাধনা করে যেতে চাই।

Leave a reply