এফডিসির ‘এক্সট্রা’ থেকে অন্যতম চরিত্র‘মাটির ময়না’র সেটে স্যুটেড-বুটেড হয়ে আসেন করিম চাচা
চলচ্চিত্র অঙ্গনে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘করিম চাচা’ নামে। ৩০ বছরের ক্যারিয়ারে বহুবার এফডিসির আনাচে-কানাচে ঘুরেছেন একটু ভালো চরিত্রের আশায়। অধিকাংশ সময় কপালে জুটেছে ভিড়ের দৃশ্য, বস্তিবাসী, ভিক্ষুক কিংবা ভৃত্য চরিত্র—কখনো সংলাপ ছিল, কখনো ছিল না। তবুও ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর শখ ও ভালোবাসাই ছিল তাঁর মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু অবহেলা আর ভিড়ের আড়ালে ঢাকা পড়া সেই অভিনেতাকেই চিনতে পেরেছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ।

প্রথম আলোতে প্রকাশিত মনজুরুল আলমের প্রতিবেদন থেকে কানা যাচ্ছে, তারেক মাসুদের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’—এই একটি সিনেমাই করিম চাচার অভিনয়জীবনের পুরো চিত্রটা বদলে দিয়েছিল।
জীবনের বাঁক, স্ত্রীকে নিয়ে সংসার ও অভিনয়ে আগমন
১৯৩০ সালে জন্ম নেওয়া আবদুল করিম মুক্তিযুদ্ধের আগে পরিবারসহ সিলেট থেকে ঢাকার সূত্রাপুরে চলে আসেন। স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পরিবারের সবাইকে হারান। সে সময় তিনি পুরান ঢাকায় থাকতেন। স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে, ১৯৭৩ সালে গাজীপুরের কাপাসিয়ার কামড়া গ্রামে বিয়ে করেন এবং সেখানেই স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন।
আবদুল করিমের চলচ্চিত্রে আগমন ও জীবনসংগ্রামের গল্প উঠে আসে তাঁর স্ত্রী হেনা বেগমের মুখে। একটি ইউটিউব ভিডিওতে স্মৃতিচারণ করে হেনা বেগম জানান:
কর্মজীবনের শুরু: ১৯৭১ সালে ঢাকায় একটি পত্রিকা অফিসে চাকরির মাধ্যমে করিম সাহেবের কর্মজীবন শুরু হয়।
অভিনয়ের জগতে প্রবেশ: মঞ্চনাটক ও যাত্রাপালায় অভিনয়ের মাধ্যমে প্রথম অভিনয়ে হাতেখড়ি।
চলচ্চিত্রে যাত্রা: ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে কেবল শখের বশে চলচ্চিত্রে নাম লেখান। তবে অভিনয়দক্ষতা ও সততার কারণে পরিচালক, প্রযোজক ও সহশিল্পীরা তাকে খুব পছন্দ করতেন। একপর্যায়ে শখটাই তাঁর পেশা হয়ে দাঁড়ায়।
সংসার ও পারিশ্রমিক:এক্সট্রা শিল্পী হিসেবে পারিশ্রমিক পেতেন খুবই সামান্য—কখনো এক হাজার, কখনো দুই হাজার টাকা। হেনা বেগম জানান, এই স্বল্প আয় দিয়েই কোনো বাড়তি খরচ না করে তিনি সংসার চালিয়েছেন, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছেন এবং গ্রামে জমিও কিনেছেন।
কাজের প্রতি নিষ্ঠা: শুটিং থাকলে তিনি দেশের যেকোনো প্রান্তে ছুটে যেতেন। ৩–৪ দিন বা সপ্তাহ পেরিয়ে তবে বাড়ি ফিরতেন। ঢাকার আশপাশে শুটিং হলে নিজ খরচে বাসে যাতায়াত করতেন।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ‘মাটির ময়না’, ‘প্রেমের অহংকার’, ‘অধিকার চাই’, ‘সৎ মানুষ’, ‘ভুলোনা আমায়’সহ প্রায় তিন শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন তিনি।

এক স্যুটেড-বুটেড ‘নাপিত’ ও রঙিন স্মৃতি
এফডিসির আর দশটা ভিড় বাড়ানো মুখের ভিড়ে হয়তো হারিয়ে যেতে পারতেন করিম চাচা, কিন্তু ‘মাটির ময়না’র সেই নাপিতের চরিত্রটি তাঁকে ঢালিউডের ইতিহাসে চিরকালের জন্য স্মরণীয় করে রেখেছে।
দীর্ঘদিন এফডিসিতে অবহেলিত ‘এক্সট্রা’ হিসেবে কাজ করা আবদুল করিম খানকে যখন ‘মাটির ময়না’র একটি প্রধান চরিত্রে কাস্টিং করা হয়, তখন তিনি আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়েন। ছবির শুটিংয়ের দিনগুলো নিয়ে তৈরি স্মৃতিচারণামূলক ভিডিওতে পরিচালক তারেক মাসুদকে বলতে শোনা যায়, ‘এটা বেশ অদ্ভুত ব্যাপার। করিম চাচা দীর্ঘদিন ধরে এফডিসিতে এক্সট্রা চরিত্রের শিল্পী হিসেবে কাজ করেন, কিন্তু কখনোই তেমন সংলাপ বলার চরিত্র পান না। সেই করিম চাচাকে আমরা একটি প্রধান চরিত্র দিলাম। তিনি খুশিতে অভিভূত হয়ে গেলেন।’
প্রথম দিন শুটিংয়ে যুক্ত হওয়ার গল্পটিও ছিল দারুণ মিষ্টি। উচ্ছ্বাসের তোড়ে জীবনের প্রথম বড় চরিত্রে অভিনয়ের সুসংবাদ পেয়ে প্রথম দিনই তিনি মাথায় হ্যাট আর গায়ে কমপ্লিট স্যুট জড়িয়ে শুটিং ইউনিটে হাজির হয়ে যান! যদিও ছবিতে তাকে অভিনয় করতে হয়েছিল এক নাপিতের চরিত্রে।
সাউন্ড ডিজাইনার ও তারেক মাসুদের ভাই নাহিদ মাসুদ সেই স্মৃতি স্মরণ করে জানান, নাপিতের চরিত্রটি যেন নিখুঁত হয়, সে জন্য আলাদা করে একজন পেশাদার নাপিত রাখা হয়েছিল করিম চাচাকে সাহায্য করার জন্য। এত বড় আয়োজন আর মূল্যায়ন পেয়ে তিনি ভীষণ সম্মানিত বোধ করেছিলেন। ‘মাটির ময়না’র প্রধান সহকারী পরিচালক আক্তার হোসেন জানান, সেই সিনেমার শুটিংয়ের সময় করিম চাচাকে প্রতিদিন এক হাজার টাকা করে পারিশ্রমিক দেওয়া হতো।
শেষ প্রস্থান
অভিনয়ের টানে যত দূরেই হোক না কেন, কখনোই ‘না’ বলতেন না করিম চাচা। ২০০৯ সালে কক্সবাজারে একটি সিনেমার শুটিং করতে গিয়ে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা লেগে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তাঁর। ঢাকায় ফিরে শুটিং ইউনিটের পরিচালনায় হাসপাতালে ভর্তি হন। কিছুটা সুস্থ হয়ে গ্রামের বাড়ি কাপাসিয়ায় ফিরে গেলেও কদিন পর আবার মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং খাবার খাওয়া একপ্রকার বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে ২০০৯ সালের ২২ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এই গুণী শিল্পী।






