Select Page

শত কোটি টাকার চপেটাঘাত ‘‌দিন দ্য ডে’

শত কোটি টাকার চপেটাঘাত ‘‌দিন দ্য ডে’

ইমপ্রেস বা লাইভ টেকনোলজি বিগত দিনের সাথে আগামী ১০ বছরে সকল সিনেমার বাজেট যোগ করলেও ‘দিন দ্য ডে’র বাজেট স্পর্শ করতে পারবে না। জাজ মাল্টিমিডিয়া এখন পর্যন্ত যত সিনেমা বানিয়েছে নিজের বা অন্যের টাকায়, সব টাকা এক করলেও ‘দিন দ্য ডে’র বাজেটকে স্পর্শ করতে পারবে না …

কোনটা দিয়ে শুরু করবো তা ভেবে পাচ্ছি না। শতকোটি টাকার কথা নাকি নির্মাণ নাকি অনন্ত-বর্ষা নিয়ে চলমান তান্ডব! হেড লাইনের ব্যাখ্যা পরে দিচ্ছি।

শুরুতেই একটা প্রশ্ন তুলি। এটা আমার এই বড় লেখাটার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যারা ‘দিন দ্য ডে’ নিয়ে ট্রল করেছে, বাজে বলেছে, অযাচিত আক্রমণ করেছে তারা কি আসলে সিনেমাটি দেখেছে? নাকি ইভেন্টের ভাড়াটিয়া হিসেবে হলে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে সিনেমাটিকে নষ্ট করতে বা না দেখেই লিখেছে সিনেমটি নিয়ে! কারণ কারো লেখাতেই কিংবদন্তি কবি হেলাল হাফিজের ‘অমিমাংসিত সন্ধি’ কবিতাটি যে বাংলা এবং ইরানী ভাষায় গান হিসেবে ব্যবহার হয়েছে সেটা নিয়ে বলেনি। কিন্তু কেন! অথচ এটা তো অনেক বড় চমক, অনেক বড় ঘটনা আমাদের সিনেমার জন্য। অবশ্য আমি কিছু বিব্রতও বোধ করছি। এরা হেলাল হাফিজের নাম জানে তো!

আনন্দ সিনেমা হলে গিয়েছিলাম। একশ’র কাছাকাছি দর্শক ছিল ডিসিতে। রিয়ার স্টলেও দর্শক ছিল। শুধুমাত্র প্রজেক্টরের ব্রাইটনেস আর এসি (বা ২০টা অতিরিক্ত ফ্যান) যুক্ত হলেই ঢাকার অন্যতম সেরা হল হিসেবে ঘোষণা দেবো তাকে। যদিও গেটম্যান জানালেন শিগগিরই এগুলো ঠিক করা হবে।

৮০-৯০ দশকের সফল যৌথ প্রযোজনার পর আন্তর্জাতিক সিনেমা হিসেবে কতটা সফল ‘দিন দ্য ডে’ সে বিচারে যেতে হলে সিনেমাটির বেসিক আপনাকে জানতে হবে। এটি একটি পুলিশ (সোয়াট) অপারেশন সিনেমা। ফলে এখানে প্রেম-ভালোবাসা-গান ইত্যাদি মূখ্য তো দূরের কথা গৌন ভূমিকাও রাখার সুযোগ নেই। সিনেমাটির বড় অংশ জুড়েই চেজিং ও অ্যাকশন। অ্যাকশন ও ফাইট এই দুটো ব্যাপারকে আমি আলাদাভাবে বিচার করছি। অ্যাকশন বলতে পুরো ব্যপারটা আর ফাইট বলতে মুখোমুখি শারিরিক লড়াইটাকে আপাতত বোঝাচ্ছি।

সিনেমাটির যে চেজিং দৃশ্য তা আপনি বাংলাদেশ তো পরের কথা, ভারতের সিনেমাতেও সেভাবে পাননি এটা গ্যারাণ্টি দিচ্ছি। ফাইটিং, ক্যামেরার কাজ, এডিটিং, সাউন্ড এতটা স্মুথ আর নজরকাড়া যে, বলতেই হচ্ছে বাংলাদেশের ৪০ বছরের কোন সিনেমাতে এটা পাওয়া যায়নি। লোকেশন, অ্যারেঞ্জমেন্ট, শট টু শট এবং ফ্রেম টু ফ্রেম যে ম্যাজিক সেটাও চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি বাংলাদেশের কোন সিনেমাতে এভাবে আসেনি।

তবে উপরের কথা পুরোটাই বাংলাদেশের বাইরের শুটিংয়ের অংশের জন্য প্রযোজ্য। বাংলাদেশের যে অংশটুকু শুটিং হয়েছে সেটা একদমই খানাখন্দে ভরা দেশি সস্তা মাসালা সিনেমার মতোই। ফলে দর্শক হিসেবে উচ্ছ্বাস এবং নিরাশ দুটোই ছিল। তবে দেশের বাইরে প্রায় ৯০ শতাংশ শুটিং হওয়ায় ভাললাগাটাই বেশি।

ইরানের প্রযোজক বাংলাদেশের ফর্মুলায় সিনেমা কেন বানাতে আগ্রহী হলো বুঝতে পারছি না। ছোট-খাটো ভিলেনদের ডায়লগ টিপিক্যাল বাংলাদেশি সিনেমার ভিলেনদের মতোই ছিল। বেশ কিছু শক্তিশালী সংলাপও ছিল। পাশাপাশি কিছু অযৌক্তিক ও দুর্বল দৃশ্য ছিল। তবে পুলিশ অ্যাকশন সিনেমা হিসেবে এখন পর্যন্ত দেশের সেরা নির্মাণ বলা যায় ‘দিন দ্য ডে’কে। আর হ্যাঁ, বিদেশি আর্টিস্টদের ডাবিং কিছু জায়গায় বেশ ভালো হলেও, কিছু কিছু জায়গায় টেলিভিশনে চলা তুর্কি-ইরানি সিরিজের মতো সস্তা রোবটিক ডাবিং হয়েছে।

অনন্ত জলিলের উচিত যিনি সাউন্ডের ফাইনাল মিক্স করেছেন, তার কান বরাবর ঠাডাইয়া একটা থাবড়া মারা। কিছু কিছু জায়গায় ভয়েস লেভেল ঠিক ছিল না। এটা এজন্য বললাম যে, আমাদের দেশের সিংহভাগ সিনেমা হল, সস্তা ক্যাসেট প্লেয়ারের সাউন্ডের মতো। সব একসাথে এক লেভেলে চলে। সেখানে ডলবি বা স্টেরিও (ভুল শব্দ কইলাম কিনা কে জানে!)’র মতো দামী আয়োজন পপকর্ন হল ছাড়া অন্য কোথাও প্রযোজ্য নয়।

গানের নামে দুটো জঞ্জাল আছে সিনেমাটিতে। তবে গানের ভিজুয়্যাল দৃষ্টিনন্দন। শেষ গানটা নিয়ে বলবো গ্রেট আর্ট ডিরেকশন। কস্টিউম উত্তম। মেকআপ ঠিকঠাক। আর মাসালা সিনেমা হিসেবে দেশি আসল দর্শকদের জন্য কিছু জায়গায় অতি ব্যপারটাও রাখতে হয়েছে, টুকটাক ভুলভালও হয়ত ছিল পুলিশিং ব্যাপারে। তবে তা হিসেবে নেয়ার কিছু নাই। ছাড় দেয়া যায়। আর হ্যাঁ, কিছু জায়গায় স্থানীয় (ইরান/আফগান/তূর্কি) ভাষায় ডায়লগ (বাংলা সাবটাইটেলসহ) ছিল। আমাদের আসল দর্শকদের কথা বিবেচনা করে পুরোটাই বাংলায় ডাবিং রাখা দরকার ছিল।

একটি পরিবারের একজন বদমেজাজী হতে পারে, বোকা হতে পারে, দুষ্টু হতে পারে, উগ্রও হতে পারে। আমরা আমাদের সেই সদস্যটিকে আলাদা করে দেই না। আমরা মেনে নেই সে যেমন, তেমন হিসেবেই। শুধু খেয়াল রাখি যে, সে যেন কোন অপরাধ করে না বসে। অনন্ত-বর্ষা যেমন, তেমনটা মেনে নিয়েই তাদের সিনেমা দেখুন বা দেখা বন্ধ রাখুন। মাত্র ৭টি সিনেমা করা অনন্তকে নিয়ে ট্রল করার আগে ২০/৩০টি সিনেমা করাদের পারফরমেন্সের কথাও একটু মাথায় নিয়েন। শুধুমাত্র জাতে উঠার জন্য কাউকে নিয়ে নোংরামী করতে গিয়ে দশ দিনের মজা হয়ত পাচ্ছেন। কিন্তু তার বিপরীতে আপনার মনে যে আবর্জনা জমছে সেটার কী করবেন!

বাই দ্য ওয়ে, অনন্ত আগের চেয়ে ভালো ডায়লগ ডেলিভারি দিয়েছে। উচ্চারণ ত্রুটি ছিল না বললেই চলে। কান্নার দৃশ্যে দুজনের কেউ ফিলিংসটার জন্ম দিতে পারে নি। কারণ কান্নার আগে যে ফিলিংসটার জন্ম হবার কথা, তা চিত্রনাট্যে থাকলেও সঠিক দৃশ্যায়ন, অন্যদের ডায়লগ ডেলিভারি এবং মিউজিকের কারণে দানা বাধেনি।

এবার আসি আসল কথায়।

সিনেমাটি কোনভাবেই ১০০ কোটি টাকার সিনেমা নয়। হয়ত এটি সিনেমার স্ট্যান্টবাজি ছিল। স্ট্যান্টবাজি কখনই খারাপ কিছু নয়। তবে সিনেমাটি অবশ্যই কোটি কোটি টাকার সিনেমা। সিনেমার যে লোকেশন, অ্যারেঞ্জমেন্ট, দৃশ্যায়ন, ক্যামেরা এবং ড্রোনের কাজ, স্ট্যান্ট দৃশ্য, অ্যাকশন দৃশ্য, ফাইট এবং সবচেয়ে বড় যে ব্যপার তা হচ্ছে যে পরিমাণ শট ব্যবহার হয়েছে তা বাংলাদেশি সিনেমায় কবে কখন দেখেছেন তা খুজেঁ পাওয়া দুস্কর। ‘পরাণ’ সিনেমা নিয়ে বলেছিলাম, বাজেট কমাতে পর্যাপ্ত শট না নিয়ে বড় শটেই কাজ শেষ করেছে। এখানে ঠিক তার বিপরীত। বাজেট বেশি বলে শটের ম্যাজিক ছিল। তবু বলছি সিনেমাটি কোনভাবেই ১০০ কোটি টাকার সিনেমা নয়। কিন্তু সিনেমাটি কোটি কোটি টাকার সিনেমা। আরো সহজভাবে বলতে হলে এভাবে বলবো যে— ইমপ্রেস বা লাইভ টেকনোলজি বিগত দিনের সাথে আগামী ১০ বছরে সকল সিনেমার বাজেট যোগ করলেও ‘দিন দ্য ডে’র বাজেট স্পর্শ করতে পারবে না। জাজ মাল্টিমিডিয়া এখন পর্যন্ত যত সিনেমা বানিয়েছে নিজের বা অন্যের টাকায়, সব টাকা এক করলেও ‘দিন দ্য ডে’র বাজেটকে স্পর্শ করতে পারবে না।

দিন দ্য ডে’র বাজেট কোনভাবেই ১০০ কোটি টাকা নয়। তবে অবশ্যই শত কোটি টাকার চপেটাঘাত তাদের প্রতি, যারা সিনেমার মানুষ হয়েও সিনেমা নিয়ে বিদ্বেষ লালন করে। যারা সিনেমার দর্শক হয়েও শুধুমাত্র সস্তা বিনোদন বা ২০০ টাকার জন্য সিনেমার মানুষকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে শুধুমাত্র সিনেমার ক্ষতি করার জন্য। যারা সিনে সাংবাদিক হিসেবে রিজিক চালালেও, সিনেমার ক্ষতি করতে যাবতীয় অপ-সাংবাদিকতা করে গিয়েছে। কারণ প্রকৃত দর্শক সিনেমা নিয়ে ভালো লাগা/মন্দ লাগা নিয়ে বের হবে। সেটা জানাবেও। কিন্তু তান্ডব চালাবে না।


লেখক সম্পর্কে বিস্তারিত

নির্মাতা, লেখক ও উদ্যোক্তা

আমাদের সুপারিশ

মন্তব্য করুন

ই-বুক ডাউনলোড করুন

BMDb ebook 2017

Shares