হরর-সাইফাই-মিস্ট্রি: ঢাকাই সিনেমায় নতুন ধরনের গল্পের পসরা
হলিউড বা বৈশ্বিক সিনেমাবাজারে হরর, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার কিংবা সায়েন্স ফিকশন (সাইফাই) ঘরানার কাজগুলো বরাবরই দর্শকদের পছন্দের শীর্ষে। বিশেষ করে তরুণদের প্রেক্ষাগৃহমুখী করতে ও বাণিজ্যিক সাফল্য পেতে বিশ্বজুড়ে এই জনরাগুলোর বিকল্প নেই। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ড্রামার গণ্ডিতে আটকে থাকা ঢাকাই সিনেমা শিল্পেও এবার সেই পরিবর্তনের হাওয়া লাগতে শুরু করেছে। কেবল একই ধরনের পারিবারিক গল্পে সীমাবদ্ধ না থেকে ভিন্নমাত্রিক কনসেপ্ট নিয়ে দেশীয় কয়েকজন নির্মাতা মাঠে নেমেছেন। আন্তর্জাতিক মান, প্রযুক্তি ও নতুন ধারার গল্প বলার এই প্রতিশ্রুতি তরুণদের ওটিটির পর্দা থেকে বের করে আবার হলমুখী করার এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

অর্থহীন ব্যান্ডের বেজবাবা সুমন ও ক্রিপটিক ফেইটের শাকিব চৌধুরী প্রায় ১৪ বছর আগে দেশের বিভিন্ন পুরোনো বাড়ি, শ্মশান ও বটতলায় ঘুরে প্রচলিত অতিপ্রয়াকৃত ঘটনাগুলোর সত্যতা খুঁজতেন। ২০১১ সালের তাদের সেই আলোচিত রিয়েলিটি শো ‘ভৌতিস্ট’-এর গল্প ভাবনা থেকেই ভিত্তি পেয়েছে পরিচালক রায়হান রাফীর নতুন সিনেমা ‘আন্ধার’। শাকিব, সুমন ও আদনান আদিব খানের যৌথ গল্পে নির্মিত এই ছবিতে ‘নাদিয়া’ চরিত্রে দেখা যাবে নাজিফা তুষিকে। সঙ্গে আছেন চঞ্চল চৌধুরী, সিয়াম আহমেদ, আফসানা মিমি ও গাজী রাফায়েতের মতো তারকারা।
গাজীপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন গ্রামীণ লোকালয়ে দৃশ্যধারণ শেষে বর্তমানে ভারতে চলছে সিনেমাটির মুম্বাই-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানের ভিএফএক্স ও গ্রাফিক্স অ্যানিমেশনের কাজ। আগামী সেপ্টেম্বরে সেন্সরে জমা দিয়ে অক্টোবর দুর্গাপূজার ছুটিতে ছবিটি মুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে।
বৈচিত্রময় গল্পের তালিকায় রয়েছে সমান্তরাল জীবনের মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাসও। নির্মাতা আলভী আহমেদ তার নিজস্ব উপন্যাস অবলম্বনে সরকারি অনুদানে নির্মাণ করছেন ‘জীবন অপেরা’। সিনেমাটির মূল আকর্ষণ প্যারালাল ইউনিভার্স বা সমান্তরাল বিশ্বের ধারণা, যেখানে একজন মানুষের দুই ভিন্ন জীবনের গল্প ফুটিয়ে তোলা হবে—এক জীবনে সে ব্যর্থ প্রেমিক, অন্য জীবনে সুখী গৃহস্থ। ব্লকবাস্টার ‘পরাণ’ সিনেমার সাফল্যের পর এই সাইকোলজিক্যাল ও ডাবল-লাইফ ড্রামায় আবারও জুটি বেঁধেছেন শরিফুল রাজ ও বিদ্যা সিনহা মিম, সাথে যুক্ত হয়েছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা ও সায়েন্স ফিকশনের এই মেলবন্ধন এরই মধ্যে উপন্যাসের পাঠকদের মাঝে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
২০১৯ সালে ব্যতিক্রমধর্মী ‘ন ডরাই’ নির্মাণ করে জাতীয় পুরস্কার জেতা তানিম রহমান অংশু দীর্ঘ সাত বছর পর বিরতি ভাঙছেন বাংলাদেশের প্রথম স্পেস ড্রামা ও কসমিক রোমান্সধর্মী সিনেমা ‘লিম্বো’ দিয়ে। বলিউডের সাড়াজাগানো চলচ্চিত্র ‘লাপাতা লেডিস’-এর গল্পকার বিপ্লব গোস্বামীর চিত্রনাট্যে নির্মিত হতে যাওয়া এই প্রজেক্টটির মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর রূপালি পর্দায় ফিরছেন তাসকিন রহমান। মহাজাগতিক স্কেলে প্রেমের গল্প ফুটিয়ে তোলা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশাল এক কারিগরি চ্যালেঞ্জ হলেও, বছরের শেষের দিকে এর চিত্রগ্রহণের কাজ শুরু করে দেশীয় সিনেমায় সম্পূর্ণ নতুন এক ধারার সূচনা করতে যাচ্ছেন নির্মাতা। এটা উল্লেখ করা যেতে পারে একটু আলাদা কাজের প্রতি বরাবরই আগ্রহী অংশু। এর আগে হরর ঘরানার চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন তিনি।
এছাড়া মোহাইমিনুল ইসলাম বাপ্পীর জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হতে যাচ্ছে ‘কানাভুলা প্যারাডক্স’। এর মাধ্যমে পরিচালনায় পা রাখছেন নবীন দুই তরুণ আয়মান আসিব স্বাধীন ও সুস্ময় সরকার। তানিম নূরের প্রযোজনায় বুড়িগঙ্গা টকিজের এই প্রজেক্টে অভিনয় করছেন শরিফুল রাজ ও সাবিলা নূর। সময় ভ্রমণ বা টাইম ট্রাভেলের জটিল তত্ত্বের সঙ্গে রোমান্স ও মনস্তাত্ত্বিক রহস্যের মিশেলে তৈরি এই সিনেমাটি তরুণদের গতানুগতিক ধারার বাইরে এক বিশ্বমানের সিনেমাটিক থ্রিল উপহার দিতে চায়। আগামী বছরের জানুয়ারিতে দৃশ্যধারণ শুরু হয়ে ঈদুল আজহায় প্রেক্ষাগৃহে আসার কথা রয়েছে ছবিটির।
ধারাবাহিকতার মেলবন্ধন ও নতুন জোয়ার
ঢালিউডে সাম্প্রতিক সময়ে মিশ্র জনরায় আরও কিছু পরীক্ষামূলক কাজ ডানা মেলছে। তবে এসব কাজে দেখা গেছে দীর্ঘ বিরতি। মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত ব্লকবাস্টার ‘হাওয়া’ সিনেমাটি যেভাবে মেটাফোরিক মিস্ট্রি ও মিথোলজির মিশ্রণে তরুণদের দলে দলে হলে টেনেছিল, কিংবা অমিতাভ রেজা চৌধুরীর বহুল আলোচিত প্রজেক্ট ‘আয়নাবাজি’ ও ওয়েব অ্যারেনায় সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের যে চাহিদা তৈরি হয়েছে, তা প্রমাণ করে দর্শকেরা এখন নতুন কিছু দেখতে চান। এছাড়া মেজবাউর রহমান সুমনের সর্বশেষ সিনেমা ‘রইদ’ দর্শকদের আশাহত করেনি। প্রস্তুত করেছে আরো নতুন গল্পের জন্য। এখন ‘আন্ধার’-এর আন্তর্জাতিক ভিএফএক্স, ‘জীবন অপেরা’-র প্যারালাল ইউনিভার্স, ‘লিম্বো’র মহাকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন কিংবা ‘কানাভুলা প্যারাডক্স’-এর টাইম ট্রাভেলের মতো সাহসী কনসেপ্টগুলো যদি সঠিকভাবে পর্দায় আনা যায়, তবে দেশীয় সিনেমা শুধু আন্তর্জাতিক স্তরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে না, বরং নতুন প্রজন্মের রুচি পরিবর্তন করে তাদের আবার প্রেক্ষাগৃহমুখী করতে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
এই সিনেমাগুলোর জটিল সাইফাই বা বৈজ্ঞানিক থিমগুলোকে সহজভাবে বাংলা ভাষার দর্শকের সামনে উপস্থাপন করতে নির্মাতারা কতটা সফল হবেন বলে আপনার মনে হয়?






