Select Page

হাওয়া: মূল আকর্ষণ চিত্রগ্রহণ ও অভিনয়

হাওয়া: মূল আকর্ষণ চিত্রগ্রহণ ও অভিনয়

সিনেমার গল্প আমার মোটেও ভালো লাগেনি, ‘হাওয়া’ দেখে অত্যন্ত আশাহত হয়েছি

স্পয়লার অ্যালার্ট: আলোচনার প্রয়োজনে লেখক রিভিউতে কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরেছেন। ছবিটি দেখা না থাকলে আপনি এড়িয়ে যেতে পারেন

প্রচন্ড পরিমাণ মুভি হাইপ চলছে ঢাকার হলগুলোতে, শেষ কবে এতো মানুষ বাংলা সিনেমা দেখার জন্যে হলে গিয়েছিল আমিও আসলে জানি না।

মেজবাউর রহমান সুমনের পরিচালনায় ‘হাওয়া’ মুক্তি পাওয়ার আগেই জনপ্রিয় হয়েছে ‘কালা কালা সাদা সাদা’ গানটি, আর সেই সাথে হাওয়া হয়ে গেছে দুই সপ্তাহের টিকিট। বাংলা সিনেমার একনিষ্ঠ ভক্ত আমি তাই মিরপুরে টিকিট না পেয়ে মতিঝিলে ১৫০ টাকা দিয়ে মধুমিতাতে সিনে্মা দেখলাম যেখানে আমার উবার ভাড়া খরচ হয়েছে ৮০০ টাকা। এটা হচ্ছে গল্পের পেছনের গল্প; আসল গল্প হচ্ছে– সিনেমার গল্প আমার মোটেও ভালো লাগেনি। আমি ‘হাওয়া’ দেখে অত্যন্ত আশাহত হয়েছি।

আমার কাছে বাংলা সিনেমা বলতে খালি ঢুশঢাশ মারপিট হবে অথবা নাচা-গানা হবে তা না। তবে গল্পের চরিত্রগুলোর উত্থান-পতন গতিবেগ থাকা চাই, সেই সাথে দরকার গল্পের বাস্তবিক সমাপ্তি। কোন পরিচালক যদি ভৌতিক অথবা রূপকথার কোন গল্প বানান সেটার মার্কেটিং সেভাবেই করা দরকার বলে মনে করি বা এটা আমার বিশ্বাস।

এ অব্দি যতোগুলো রিভিউ পড়লাম এবং ট্রেইলার দেখলাম কোথাও বোঝা যায়নি যে, হাওয়া সম্পূর্ণ রহস্যজনক রূপক যার চিত্রনাট্য সুকর্ণ শাহেদ ধীমান করেছেন। আসলে আমি একজন খুবই সাধারণ দর্শক, অতো কঠিন করে বুঝিও না। যখন ডিজিটাল অ্যাপসগুলো ভাসছে দুর্দান্ত সব ওয়েবসিরিজে, সেখানে হলে গিয়ে টিকিট কেটে আমি কেন আর একটা ওয়েব সিরিজ দেখবো! আমি পরিপূর্ণ বাংলা সিনেমা দেখতে চাই; গল্পে ঠাসা, রহস্যে ভরা, দুর্দান্ত সংলাপে থাকবে, দারুণ সব গান থাকবে। শহরে–গ্রামে, জলে–মাটিতে দৃশ্য যেখানেই হোক, শুরু ও শেষে একটা দারুণ সমন্বয় থাকবে। তাহলেই তো আমার দিনটা উশুল হতো!

সিনেমার ভালো লাগার দুটি জায়গা আমি পেয়েছি— চরিত্রায়ন ও দৃশ্যায়ন। ‘হাওয়া’য় যারা অভিনয় করেছেন তাদের একটা করে অ্যাওয়ার্ড দেওয়া উচিৎ; কেবল চঞ্চল চৌধুরী না রাজ, তুষি, নাসিরউদ্দিন, সোহেল মণ্ডল, সুমন আনোয়ার, রিজভী, রাজু এদের সবাইকে চিনতে বেশ সময় লেগেছে, মনে হয়েছে সত্যিই এরা জেলে, বহু বছর ধরে এই নৌকোতেই এদের বসবাস। মেকাপ আর্টিস্টকেও যেন পুরস্কার তালিকায় রাখা হয়, এটা আমার প্রত্যাশা। সিনেমার শুরু থেকে শেষ অব্দি ক্যামেরার যে খেলা আর রঙের যে সংমিশ্রণ দেখা যায় তা সত্যি উপভোগ্য, আপনি স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে বাধ্য।

তবে সিনেমার শেষ দৃশ্যে সাপ এসে আমার সমস্ত আকাঙ্ক্ষাকে একেবারে জলের সাথে মিশিয়ে দিয়ে গেল,আমি পুরো মুভিতে গুলতিকে একটি বাস্তব চরিত্র ধরে নিয়েছিলাম যাকে মাঝিরা জালে পেয়েছে। তাকে একবার মাছ হিসেবে আবিষ্কার করা বা সাপ হয়ে উপস্থিত হওয়াটাকে হয়তো আমার মতো নিরীহ দর্শক মেনে নিতে পারেনি, কারণ আমি তো ফ্রেমের মধ্যে পুরোপুরি ডুবে ছিলাম। কী দূর্দান্ত সব শট, চারদিকে পানি থৈ থৈ করছে, মাঝে একটা বোট ভাসছে, উপর থেকে ড্রোনে দেখতে পাচ্ছি, এক-একটা দৃশ্য এতো জীবন্ত; হলে বসে আছি মনে হয়নি, মনে হয়েছে আমি নিজেই মাঝ সমুদ্রে। এতো অধ্যাবসায় কোন পরিচালক বিগত দিনে আমার জানা মতে দেখাননি। সুমন দেখিয়েছেন; কামরুল হাসান খসরুর অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি,  গানের চিত্রায়ন সেই সাথে মুহুর্মুহু নাচ সত্যি অনবদ্য। কিন্তু সিনেমার শেষ দৃশ্যে চাঁন মাঝির ধারাবাহিক খুন করার দৃশ্য আর সমস্ত বাস্তবতাকে পেছনে ফেলে সাপের আবির্ভাব আমাকে আশাহত করেছে।

গল্পটা একটু ছোট করে বলা দরকার। চাঁন মাঝির নেতৃত্বে ‘নয়ন তারা’ নামের মাছ ধরা নৌকা ভাসে সাগরে। এই নৌকায় মোট নয়জন সদস্য। মহাজনকে না জানিয়ে চাঁন মাঝি ও তার অ্যাসিস্টেন্ট এজা মিলে নিজেদের বাড়তি আয়ের জন্য কিছু মাছ অন্যত্র বিক্রি করতে চায়। তবে ইঞ্জিন মেকানিক ইব্রাহিম তাতে বাধা দেয়। ফলে তাকে সরিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র করে চাঁন মাঝি আর এজা, যোগসাজশ করে ইব্রাহিমের সাথে থাকা নাগুর সাথেও। তবে এই ষড়যন্ত্র সফল হয় না এক রহস্যময়ী নারীর হঠাৎ জেলেদের জালে উঠে এলে। এরপর একটা করে অদ্ভূত ঘটনা ঘটতে থাকে এবং আরো অদ্ভূত ঘটনার মধ্য দিয়ে সিনেমা শেষ হয়।

‘হাওয়া’ রিলিজের সাথে সাথে নকল বলে ইতিমধ্যে অনেকেই বলেছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার একটা অভিমত; নকল যদি সেই লেবেলের পোক্ত হয় তাহলে হলে গিয়ে নকল সিনেমা দেখতেও আমি রাজি। আমি সত্যিকার অর্থে আস্ত একটা বাংলা সিনেমা দেখতে চাই। সিনেমা বলতে চরিত্রের ডিটেইল থাকতে হবে, সংলাপে সাবলীলতা ও দৃশ্যের সাথে সামঞ্জস্য গান বা নাচ থাকতে হবে।

‘হাওয়া’ হচ্ছে ইন্টেলেকচুয়ালদের সিনেমা, আমার মতো সাধারণ মানের দর্শকদের জন্যে হাওয়া বানাননি মেজবাউর রহমান সুমন। তবে যেভাবে সব টিকিট হাওয়া করে দিচ্ছে, এতে আমি যারপরনাই খুশি। কারণ এতোগুলো বছর ধরে আমাকে যারা বাংলা সিনেমা দেখার দায়ে ‘ক্ষ্যাত’ হিসেবে আ্খ্যা দিয়ে আসছে, তারাও আজ হলমুখী। বাংলা সিনেমা জিন্দাবাদ!


লেখক সম্পর্কে বিস্তারিত

পড়ার ফাঁকে যে টুকটাক লেখার অভ্যেস ছিল তা বন্ধুরা জানতো না।ক্লাশ নাইন থেকেই ছোট গল্প আর ছোট ছোট টূকরো কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম।প্রিয় কবি সৈয়দ শামসুল হক ও মহাদেব সাহা।কিন্তু ১৯৯৭ সালে প্রথম আর্টিকেল লিখলাম প্রথম আলোতে-“মেয়েদের নিজেস্ব কোন বাড়ি নেই”অনেক সাড়া পেলাম ।এরপর লিখলাম “সেনানিবাস এবং আমরা”।এখানটায় এসেই নাম বদলে হয়ে গেলাম-রোদেলা নীলা।রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গেলে নিজেকে একটু আড়ালে রাখাটা দরকার।তবে আমার সব শংকা দূর হয়ে গেল যখন দেশে এলো বাংলা ব্লগ.২০০৫ সাল থেকে কেবল রোদেলা হয়েই বিচরণ করছি সামহোয়ার ইন ব্লগ,প্রথম আলো ব্লগ,শব্দনীর ব্লগ,আমার ব্লগ ,ঘুড়ি ব্লগ এবং নক্ষত্র ব্লগে। আমার জন্ম ২৬ শে ফেব্রুয়ারী ১৯৭৭ সালে।ঢাকার মিরপুরে,এখানেই আমার বেড়ে ওঠা,তবে পৈতৃক নিবাস কালিহাতী, টাঙ্গাঈলে।অংক নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এস সি করলেও হিসেব নিকেশ কোন দিন বুঝিনি।তাই হয়তো ব্যক্তি জীবনকে ওভাবে সেই অর্থে সাজাতে পারিনি। আমার প্রকাশিত বই গুলো হচ্ছে-ফাগুনঝরা রোদ্দুর(২০১০),ভাষাচিত্র প্রকাশনী পঞ্চপত্রের উপপাদ্য(২০১২),এক রঙ্গা এক ঘুড়ি প্রকাশনী সংকলন-আলোর মিছিল ও নক্ষত্র(২০১৩ ও ২০১৪) একক গল্প গুচ্ছ-রোদ্দুরের গল্প ,দ্বৈত কবিতার বই (২০১৫),যমুনা প্রকাশনী। সামনে একটি কবিতার বই বের করার ইচ্ছে আছে যা হবে প্রবাসীদের জন্যে ইংরেজী ভাষায়।

আমাদের সুপারিশ

মন্তব্য করুন

Shares