শেষ হয় ‘রকস্টার’, কিন্তু মনের ভেতর বাজতে থাকে গান
বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ঘরানার ছবিগুলোতে প্রেম, বিচ্ছেদ, অ্যাকশন, সফলতা ইত্যাদি রকমের ফর্মুলা সিনেমার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে শাকিব খানের নাম। তাই যখনই তার অভিনীত ছবি দেখা হয়, সেসময় মাথায় রাখতে হয় সেই ফর্মুলা ছবির ঘরানা, যেন ছবিটাকে বিচার করা যায় সেই মানদণ্ডে। আমিও একই রকম ফর্মুলার প্রত্যাশা নিয়েই ছবিটি দেখতে বসি স্টার সিনেপ্লেক্সের ঠান্ডা কক্ষে।
ছবিটির প্রচারের সময় থেকেই এটিকে মিউজিক্যাল ফিল্ম হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছিল। বাণিজ্যিক ছবিতে এমনিতেও অনেক গান থাকে, আর সেখানে মিউজিক্যাল ফিল্ম বলার কারণে ধরেই নিয়েছিলাম জোর করে ঠেসে দেয়া হবে আরও অনেকগুলো গান। তাছাড়া সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে মুক্তি পাওয়া আরেকটি মিউজিক্যাল ফিল্ম ‘মাইকেল’ দেখার পর আপনাআপনিই একটু তুলনা মাথায় চলে আসার কথা। তবুও ওই যে, মানদণ্ডটি নিজের মতো করে ঠিক করে তবেই ছবিটি দেখতে বসা।

ছবির প্রথম অংশে কেন্দ্রীয় চরিত্র আগুনকে একজন শিল্পী হয়ে উঠতে দেখা যায়। যিনি একটি আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড চালালেও কখনও স্টেজে পারফর্ম করে না। গান লেখার পাশাপাশি ভালো ভোকালিস্ট হওয়ার পরও আগুন (শাকিব খান) কেন লাইভ পারফর্ম করে না, তা নিয়ে কিছুটা অস্বস্তি সবারই আছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় চরিত্রের রয়েছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক অসন্তোষ। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের অবহেলা তাকে একটি চাইল্ডহুড ট্রমায় নিয়ে যায়। এসব কিছুকে ঘিরে গল্প এগোতে থাকলে হুট করেই লাভ লাইন দেখতে পায় কেন্দ্রীয় চরিত্র।
ঠিক এখানেই ছবিটি কিছুটা স্লো হয়ে যায়। অনেকটাই প্রেডিক্টেবল দৃশ্য ও শাকিব খানের চিরায়ত অভিনয়ের স্টাইল ফার্স্ট অ্যাক্টের শেষে অনেকটুকুই ঝিমিয়ে আনে। ছবিটিকেও তখন অন্য ছবিগুলোর মতোই একটি গড়পড়তা সিনেমা বলেই মনে হতে থাকে।
কিন্তু ইন্টারভালের পরই ছবিটির গতি ফিরে আসে। তখন মেদহীন রাইটিং সিনেমাটিকে নিয়ে যায় একটি দারুণ জার্নিতে। যেখানে রয়েছে এই অঞ্চলের মানুষের স্বভাবজাত মানবিক উত্থান-পতন এবং ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় বারবার হোঁচট খাওয়া। যদিও বাণিজ্যিক ছবির বড় কিছু এলিমেন্টস যেমন অ্যাকশন, টুইস্ট, হুক এসব অনুপস্থিত থাকায় ছবিটা কিছুটা অর্ডিনারি থেকে যায়।
‘রকস্টার’ তার থার্ড অ্যাক্টে গিয়ে ফের প্রাণ ফিরে পায়। এবং বেশ ভালোভাবে এগোতে থাকে। চূড়ান্ত ক্লাইমেক্সে এসে আবারও কিছুটা ম্যাড়মেড়ে হয়ে যায়। তবে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করা শাকিব খানের জীবনের উত্থান পতনের মতোই ছবিটির এই ধরনের গতির টানাপড়েন একটি ছন্দ এনে দেয়। যা ছবিটির দিকে দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে টনিকের মতো কাজ করে।

সিনেমাটিতে অবিশ্বাস্যভাবে প্রভাব রেখেছেন আহমেদ হাসান সানি। সিনেমাটিতে ব্যবহার করা প্রায় আটটি গানের প্রত্যেকটির পেছনেই ছিলেন তিনি। বেশিরভাগ গানে কণ্ঠও দিয়েছেন সানি। আহমেদ হাসান সানির অনবদ্য কণ্ঠের গান, ছবিটিকে সত্যিকার অর্থেই নিয়ে যায় একটি মিউজিক্যাল মজমায়।
ছবিটিতে নারী চরিত্র ছিল তিনটি। কেন্দ্রীয় চরিত্রের মা রোজী সিদ্দিকী। তিনি বেশ সাবলীল অভিনয় করেছেন। কম সময়ের জন্য এলেও বোল্ড অ্যাক্টিং করে প্রভাব বিস্তার করেছেন তানজিয়া জামান মিথিলা। আর অন্য চরিত্রটিতে সাবলীল ছিলেন সাবিলা নুর।
তবে ছবিটিতে একজন রকস্টারের মিউজিক্যাল জার্নিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে নিয়ে আসা হয়েছে একাধিক বাস্তব শিল্পীকে। পান্থ কানাই থেকে শুরু করে সুনিধি নায়েকের উপস্থিতি, কিছুক্ষণের জন্য ছবির সঙ্গে বাস্তবতার একটি যোগসূত্র তৈরি করে দেয় এবং মিউজিকের প্রতি আরও মনোযোগী করতে সাহায্য করে।
সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশে ফর্মুলা সিনেমার বাইরে গিয়ে এরকম কঠিন জনরা মিউজিক্যাল ফিল্ম হবে এবং সেখানে শাকিব খান অভিনয় করবে এটাই আমার কাছে বেশ অবিশ্বাস্য ঘটনা। তাই ছবিটিকে তার মানদণ্ডে বিচার করে দেখতে বসলে মোটামুটি উপভোগ্য জার্নিই মনে হয়। এবং ছবিটির শেষে গড়পড়তা বাণিজ্যিক ছবির মতোই কোন রেশ থাকে না। কিন্তু এই ছবিতে রয়ে যায় আহমেদ হাসান সানির গাওয়া গানগুলোর সুর, যা মনের ভেতর চলতে থাকে অনেকক্ষণ।






