Select Page

দম: হিজল তলে চিতল ফ্রাই

দম: হিজল তলে চিতল ফ্রাই

‘দম’… স্ক্রিনজুড়ে শুধু আফরান নিশো। থালাপাতি বিজয় বা চিরঞ্জিবীর ফিল্মগুলো দেখা মেন্টাল স্ট্রেন্থের বিরাট পরীক্ষা। এক ফিল্মে বিজয়ের থাকে ট্রিপল ক্যারেক্টার, হয়তবা ৭ মিনিট পাওয়া যাবে না যেখানে স্ক্রিনে সে অনুপস্থিত। ‘দম’ এর ক্ষেত্রেও অবিকল সে রেসিপি— আফরান নিশো, আফরান নিশো, আফরান নিশো, যার সিগনেচার সংলাপ- ‘আমি শাহজাহান ইসলাম নুর, মোসলমান কা বাচ্চা’!

একটা ফিল্ম বা বই যখন দেখা বা পড়া সমাপ্ত হয়, দেহ-মন হালকা লাগতে শুরু করে, ফিল হয় এতক্ষণ এক পৃথক ইউনিভার্সে বিচরণ করছিলাম, সেখান থেকে চিরায়ত টিয়েলিটিতে প্রত্যাবর্তন করলাম। রিয়েলিটি যেহেতু প্রেফারেন্সনির্ভর, সার্বজনীনতার গ্রাউন্ড থেকে ‘টিয়েলিটি’ লিখলাম।

দিন যায়, ফিল্মটা আবছা হতে থাকে। বহুবছর পরে যখন তা কথা বলার সাবজেক্ট হয়ে উঠে, আমরা আবিষ্কার করি ফিল্মটা সংক্ষিপ্ত হতে হতে মনোজগতে বেঁচে আছে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এক বা একাধিক সিকুয়েন্স হয়ে। অথবা কোনো সুনির্দিষ্ট ক্যারেক্টার, সংলাপ, ক্ষেত্রবিশেষে গান৷

[ডিসক্লেইমার: স্পয়লার সংক্রান্ত রিজার্ভেশন থাকলে আমার ফিল্ম সংক্রান্ত লেখালিখি এড়িয়ে চলতে কঠোরভাবে সতর্কতা দিয়ে রাখছি]

গত ঈদে আফরান নিশো অভিনীত ‘দাগি’ দেখেছিলাম। এবারের ঈদে যখন ফ্ল্যাশব্যাক করছি দাগীকে মনে পড়ে মাত্র দুটো পয়েন্টে—

প্রথমত, ক্যারেক্টারগুলো প্রত্যেকে যে যার পারসপেক্টিভে কারেক্ট ছিল

দ্বিতীয়ত, নির্বাক সুনেরাহ বিনতে কামালের টেক্সট লিখে কমিউনিকেশন

কোনো সংলাপ বা গান মনে পড়ে না। এ শতাব্দীর শুরুর দিকে দেখা ‘চড়ুইভাতি’ টেলিফিল্মকে যখন ২ যুগেরও অধিককাল পরে স্মরণ করি, ম্যাডাম-ছাত্রের মধ্যকার রোমান্টিক সম্পর্ক বাদে মনে পড়ে- শুটিং হয়েছিল বুয়েটে!

আমাদের অধিকাংশ ফিল্মেরই কম্পোজিশনাল দৈন্য এখানে৷ দেখার পরে স্থায়ী ইমপ্রেসন রাখার মতো উপকরণ অতি নগণ্য।

আপনাকে যদি ৩ মাস পরে জিজ্ঞেস করি ‘দম‘ থেকে দুটো ডায়লগ পিক করুন, খুব কঠিন হবে।

স্টোরিটেলিংয়ের আর্ট আমাদের ফিল্মমেকারদের লায়নাংশেরই রপ্ত করা হয়নি। তারা মেকিং বলতে সিনেমাটোগ্রাফি বুঝে, ক্যারেক্টার ডিজাইন এবং মিনিংফুল সিকুয়েন্স তথা স্ক্রিনপ্লে তে অতি আনাড়ি।

দম’কে যদি এক লাইনে প্রকাশ করি— ‘বহুমাত্রিক প্লট একপেশে স্ক্রিনপ্লের দোষে চলে গেল খরচার খাতায়।‘

প্লট বহুমাত্রিক। কারণ, এখানে ন্যাচারাল রিসোর্সসমৃদ্ধ দেশগুলোয় কলম্বাসের উত্তরসূরীদের শ্যেন দৃষ্টির রাজনীতি আছে, মাইক্রো-ক্রেডিট ব্যবসার নির্মমতা আছে, আরিফ আজাদের ‘প্যারাডক্সিকাল সাজিদ’ কিংবা লতিফুল ইসলাম শিবলীর ‘আসমান’ ঘরানার বইগুলো যে টপিকে এবং যে অডিয়েন্সের উদ্দেশে লেখা তার ফ্লেভার আছে, হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি,বাংলাদেশ-পাকিস্তানের বৈরিতার ল্যাগাসিও। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ক্ষমতাহীন মানুষের জীবনের মূল্যহীনতার স্টেরিওটাইপ আছে।

তবে সাবপ্লটগুলোকে জোড়া দিলে যে বিগার প্লট পাওয়া যায় সেখানে ফিল্মটা শ্লথ হয়ে যায়। সিকুয়েন্সগুলো রিপিটিটিভ, কোথাও কোনো টেনশন তৈরি হয় না। এমন ফ্ল্যাট স্টোরিটেলিংয়ে মেন্টালি এনগেজড হওয়া বকের পেঙ্গুইনে রূপান্তরিত হওয়ার মতোই অলীক কল্পনা।

স্ক্রিনজুড়ে শুধু আফরান নিশো। থালাপাতি বিজয় বা চিরঞ্জিবীর ফিল্মগুলো দেখা মেন্টাল স্ট্রেন্থের বিরাট পরীক্ষা। এক ফিল্মে বিজয়ের থাকে ট্রিপল ক্যারেক্টার, হয়তবা ৭ মিনিট পাওয়া যাবে না যেখানে স্ক্রিনে সে অনুপস্থিত। ‘দম’ এর ক্ষেত্রেও অবিকল সে রেসিপি— আফরান নিশো, আফরান নিশো, আফরান নিশো, যার সিগনেচার সংলাপ- ‘আমি শাহজাহান ইসলাম নুর, মোসলমান কা বাচ্চা’!

প্রথম দৃশ্য থেকেই আমরা জানি সে মরবে না, আমাদের জানাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবার মতো সিকুয়েন্স মাত্র একটি— যখন তাকে গাধার পিঠে তুলে দেয়া হয়, গাধাটি থামলেই করা হবে শিরোচ্ছেদ। সমগ্র সময় জুড়ে সে দোয়া ইউনুস পড়তে থাকে। আমরা অপেক্ষায় থাকি কোন সে দৈব ঘটনা যার বলে বেঁচে যাবে!

কিছু কিছু সিকুয়েন্স সম্ভাবনাময় ছিল, যেমন ঈদের দিনেও আফগান গ্রামে বোমা হামলা, পালানোর সুযোগ পেয়েও মৃত শিশুর প্রতি ইমোশনবশত থেকে যাওয়া, আফগান কালচার না বুঝে পরস্ত্রীর নাম ধরে ডাকা। সিকুয়েন্সগুলো নিরামিষ হয়ে গেছে অতি অ্যামেচার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের কারণে। ইমোশনালি আলোড়িত হয় তো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের শক্তিমত্তাতেই।

কয়েকটা খুবই দারুণ সিম্বলিক সিকুয়েন্স নষ্ট হয়েছে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের হাইট না মেলায়—

-নিশো যে গুহাতে বন্দী, সেখানে এসেছে এক কবুতর। কবুতরকে সে বলছে বাংলাদেশে উড়ে যেতে। কয়েক সিকুয়েন্স পরে পূজা চেরি নামাজ শেষে জানালার ধারে এক কবুতর দেখতে পায়। এতখানি ইনটেন্স একটা সিকুয়েন্স সামান্যতম হৃদপাতে ব্যর্থ হলো তো বিজিএমের দুর্বলতাতেই৷

-তালেবানদের মধ্যেও আমেরিকান গুপ্তচর আছে, ব্যাপারটা চঞ্চল চৌধুরির জন্য সারপ্রাইজিং এবং শকিং; এ সিকুয়েন্সটা যে পলিটিক্যালি কতখানি সিগনিফিক্যান্ট, বুঝবার কোনো উপায় আছে?

-এক তালেবানের বাবা পাকিস্তানী আর্মিতে কাজ করত, মুক্তিযুদ্ধে নিহত হয়েছে, ৪০ বছর ধরে সে প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত, বন্দী বাংলাদেশিকে যে কোনো মূল্যে সে হত্যা করবে। চূড়ান্ত ফাইটটাতে   বৈচিত্র আনতে বাংলাদেশি আর পাকিস্তানপন্থীকে পাহাড় থেকে পানির তলদেশে পাঠানো হলো, কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ডে কোনো রেশ নেই।

এতটাই নিথর!

সমগ্র ফিল্ম থেকে মাত্র একটা সিকুয়েন্স পিক করব যা ১৯ বছর পরেও রেলিশ করব। দৃশ্যটি হলো, যে গাধাটি নিশোকে বাঁচিয়ে দিল, সেটাকে সে পাউরুটি খাওয়াচ্ছে, জড়িয়ে ধরছে, এবং জিঘাংসামুখী সেই তালেবান যখন গাধাটিকে গুলি করে হত্যা করে, প্রথমবারের মতো নিশো প্রাণের মায়া ত্যাগ করে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, মাথায় খুন চেপে যায়। বাংলা ফিল্মে এতটা শক্তিশালী ইমপ্যাথিপূর্ণ সিকুয়েন্স বিরল।

নিশোময়তার একঘেয়েমিতে অন্য ক্যারেক্টারগুলো ছিল নিছকই শো-পিস। এর মধ্যেও পূজা চেরি ও চঞ্চল চৌধুরী চোখের এটেনশন আদায় করে নিয়েছে।

পূজা চেরিকে এবারই প্রথম দেখলাম। স্ক্রিনেটিক ফেস বলতে আমি একটা টার্ম ব্যবহার করি, যা মিন করে সে স্ক্রিনে যতটুকু সময়ই থাকুক, লাইট তার দিকে পড়বেই। বাংলা ফিল্মে এমন স্ক্রিনেটিক ফেস ছিল ববিতা, শাবানা, অলিভিয়া; পরের প্রজন্মে মৌসুমী ও শাবনুর। রোজিনা-সুচরিতা-দিতি-চম্পা-পূর্ণিমা অসংখ্য হিট ছবিতে অ্যাক্টিং করেছে, হয়তবা গুডলুকিংও, কিন্তু স্ক্রিনেটিক ফেস তাদের মনে হয়নি আমার।

পূজা চেরির বয়স এখনো কম, তবু তার মধ্যে স্ক্রিনেটিক ফেস ব্যাপারটা আছে। শরিফুল রাজের সঙ্গে তার স্ক্রিন কেমিস্ট্রি কেমন হয়, দেখবার ইচ্ছা রয়েছে। বাংলাদেশি নায়িকাদের আরেক গুরুতর সমস্যা ভয়েস থ্রোয়িং; ববিতা-দিতি-মৌসুমী-শাবনুর-পপি প্রত্যেকের ভয়েস থ্রোয়িং খুবই শ্রুতিকটু লাগতো আমার। পূজা চেরির ভোকাল এবং একসেন্ট শ্রুতিমধুর।

বৃন্দাবন দাসের নাটকগুলোর কারণে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত চঞ্চল চৌধুরীর প্রতি এলার্জি ছিল। আজকে হঠাৎ  অনুধাবন করলাম, তার চাইতে ভার্সেটাইল ক্যারেক্টার আর কোনো অভিনেতার ভাগ্যে জুটেনি, যদিও ক্যারেক্টারভেদে তার ডেলিভারির ধরনে আহামরি পার্থক্য পাই না, যেটা খুব চমৎকার পাওয়া যায় শরিফুল রাজের ক্ষেত্রে। তবু তার ভার্সেটালিটিকে অ্যাপ্রিসিয়েট করতে হবে।

পূজা চেরি এবং চঞ্চল, কোনো চরিত্রই ডিরেক্টরের কৃপা পায়নি। একজন হিন্দু আফগানিস্তানে গেছে এনজিওর কাজে, এ ক্যারেক্টারটার জীবনযাপন আরো কিছু সিকুয়েন্স পেতে পারত। একে কমিক ক্যারেক্টার বানিয়ে হল-প্লেজার তৈরি করা হয়েছে মাত্র!

আজ প্রথম আলোতে পড়লাম নুর নামের এক বাংলাদেশি তরুণ আফগানিস্তানে গিয়ে ৮০ এর অধিক দিন বন্দী ছিল, সে সত্য ঘটনা অবলম্বনেই নির্মিত হয়েছে দম। বাস্তব নুর এবং তার স্ত্রী রানি পরিচালক-প্রযোজক-নায়ক-নায়িকার সাথে সাক্ষাৎ করেছে। বাংলাদেশ-পাকিস্তান ওয়ানডে সিরিজে দম টিম মাঠে হাজির হয়েছিল। নুরকে মিডিয়ায় আনাও তেমন ধরনের পাবলিসিটি স্ট্যান্ট, যদিও তেমন ইফেক্টিভ কিছু নয়।

‘সত্য ঘটনা অবলম্বনে’ ফ্রেজিংটাই ফালতু। এসব নিয়ে হবে ডকুমেন্টারি। যখনই ফিল্ম বা সাহিত্যে রূপ দেয়া হবে সেখানে শতভাগ ডিরেক্টর’স বা রাইটার’স রিক্রিয়েশন থাকতে হবে।

 ‘সত্য ঘটনা’ টার্মটা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের মিডিওক্রিটিকে জাস্টিফাই করে মাত্র। যেমন ক্রিকেটার রশিদ খান যদি ‘দম’ দেখে তার  ফিল্মটাকে পলিটিক্যালি অফেন্সিভ মনে হবার সম্ভাবনা কেমন, এটা কিন্তু খুবই স্পর্শকাতর একটা জিজ্ঞাসা। ভারতে যে কোনো সিনেমায় ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে দেখানো হলেই বাংলাদেশে নিন্দার ঝড় উঠে, সেখানে তালেবানদের যেরকম বর্বর দেখানো হলো, সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতিসত্তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে এভাবে পোরট্রে করা যায় কিনা এ নিয়ে আর্গুমেন্ট চলতেই পারে। সত্য ঘটনা যদি হয়ও সেটা আমরা জানি নুরের বয়ানে। যখন আমি মেকার তখন নুর এবং তালেবান দু’পক্ষই আমার ক্যারেক্টার, বায়াসনেস দেখানোমাত্রই তা রূপ পায় ‘এজেন্ডা বিজ্ঞাপন’ এ!

সামগ্রিকভাবে দম সর্বোচ্চ ১১ মিনিটের এক শর্ট ফিল্ম হবার ক্যালিবারঋদ্ধ। রাতের ঢাকায় মাঝেমধ্যে ধনীর দুলালেরা লং ড্রাইভে বের হয়। গন্তব্য অজানা, শুধু চলতে থাকা, এরপর এনার্জি ফুরিয়ে এলে ফিরে আসা ঘরে। দমাদম মাসকালান্দর গাইতে গাইতে ‘দম’ও লং ড্রাইভে বেরিয়েছে, নইলে ২ ঘন্টা পাড় করা যে দুরূহ!

হায় রেদওয়ান রনি, আপনি এখনো সেই ‘চোরাবালি’ তেই পড়ে আছেন, মাঝখানে বয়ে গেছে ১৪ বছর!


About The Author

মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয়

লেখক ও বায়োপিক এনালিস্ট

Leave a reply