একান্ত মান্না
আমার একান্ত মান্না বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সবচেয়ে বেশি স্ট্রাগল করা নায়ক যাকে শীর্ষ অবস্থানে আসতে সবচেয়ে বেশি ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়েছে। অপেক্ষার প্রতি ধৈর্যহারা না হয়ে লেগে থাকার মানসিকতায় একজন মান্না অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত চলচ্চিত্রে। এই অসাধারণ গুণের মান্না আমার একান্ত মান্না।

আমার একান্ত মান্না তৃতীয়, চতুর্থ নায়ক হয়েও সিনেমাহলের পর্দায় নিজের অস্তিত্ব জানিয়ে দিয়েছিল। দর্শকের কাছে নিজেকে তুলে ধরেছিল যাতে দর্শক তাকে চেনে। ‘জারকা, পাগলী, তওবা, দুশমনি’-র মতো ছবিতে মান্নার নিজেকে চেনানোর যে চেষ্টা সেটিকে সম্মান করতেই হয়।
আমার একান্ত মান্না বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ছবিতে সবচেয়ে প্রতিবাদী, বলতে গেলে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদী চরিত্রের নায়ক। সমাজে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মান্নার রূপালি পর্দার প্রতিবাদ অসংখ্য নিরীহ, অত্যাচারিত মানুষের জন্য প্রতিবাদের প্রেরণা ছিল। গণমানুষের হয়ে প্রতিবাদী সত্তা তৈরি করে আমার একান্ত মান্না হয়েছিল গণমানুষেরই নায়ক।
আমার একান্ত মান্না একটি ‘আম্মাজান’-এর নায়ক যার অভিনয়, চরিত্র চিত্রণ অনেকের জন্যই স্বপ্নের। অত্যাচারের শিকার মায়ের কথা না বলার যে ভাষা তাকে মনের ভাষায় শুনে এক অপরাধীকে নিজ হাতে শেষ করে দেয়। বিশ বছর ধরে সন্তানের সাথে কথা না বলা কষ্টকে সমাজের অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে ঋণশোধ করে যেন। “জন্ম দিছেন আমায় /আপনার দুগ্ধ করছি পান” এই অপরিশোধ্য ঋণের কথাও বিরল অভিনয়গুণে গানে গানে বলে যায় আমার একান্ত মান্না।
আমার একান্ত মান্না ‘দাঙ্গা’-র ওসি যার স্বপ্ন ছিল সন্ত্রাসমুক্ত দেশ গড়া। দেশে লুটপাট, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অসৎ নেতার আখড়া হওয়ার প্রতিবাদে দাঁড়িয়েছিল। বিদ্রোহী কবি নজরুলের ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে আক্ষেপ করে বলেছিল-‘আরেকটা কবিতা লিখতে পারো না কবি?’ আমার একান্ত মান্না আরেকটি বিদ্রোহী কবিতা চেয়েছিল যার আগুনে সমাজের সব কালো দিকগুলো ধুয়েমুছে যেত কিন্তু তাকে হিসাব চুকাতে হয়েছে মাস্তান রাজিবের এক কোপে নিজের হাত বিসর্জন দিয়ে।
আমার একান্ত মান্না ‘যন্ত্রণা’ দিয়ে বেকার যুবকদের অপরাধ জগতে পা বাড়ানোর নিদারুণ বাস্তবতা তুলে ধরে। এ ছবির যন্ত্রণা যেন হাজারও যুবকদের স্বপ্নভঙ্গের বেদনাকে তুলে ধরে।
আমার একান্ত মান্না সমাজ পরিবর্তনের তেজ নিয়ে ‘তেজী’ হয়েছিল। অসৎ নেতাদের পাল্লায় পড়ে বিপথে গিয়েছিল তাই সেই নেতাদের সোজা ঝুলিয়ে দিয়েছিল যারা গরিব না হয়ে গরিবের নেতা হতে চেয়েছিল, ছাত্র না হয়ে ছাত্রনেতা হতে চেয়েছিল, কৃষক না হয়ে কৃষকের নেতা হতে চেয়েছিল। তেজী মান্না বেকার সমস্যার প্রতিনিধি হয়ে চিরন্তন বাস্তবতার গান গেয়েছিল যা আজও বাস্তব-“টাকা নাই রে পয়সা নাই রে/এইতো জীবন ধারা /বড় কষ্ট আছি আমরা বেকার যুবক যারা।”
আমার একান্ত মান্না ‘ত্রাস’ ছিল তাদের যারা শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। রাজনৈতিক বংশ দাবি করা রাজিব, মিজু আহমেদদের রাজনীতি সমূলে বিনাশ করতে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল বাধ্য হয়ে। শিক্ষাই শিক্ষার্থীদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত তাই মান্না গেয়েছিল-“একতা শান্তি শৃঙ্খলা/জ্ঞানের পথে এগিয়ে চলা/কাজ আমাদের লেখাপড়া/বড় হয়ে দেশ গড়া।”
আমার একান্ত মান্না ‘ধর’-এর নিদারুণ বাস্তব চরিত্র যে সমাজে ঠোকর খেতে খেতে অপরাধে জড়িয়ে যায় আর স্রষ্টার কাছে নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরে, যারা তুলে ধরতে পারে না তাদের হয়েও যেন কথা বলে। ‘লুটতরাজ’-এর মান্না আমার একান্ত মান্না যার হাতে সমাজের ত্রাসেরা সমূলে বিনাশ হয়, বিদ্রোহী কবির ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সার্থক উদাহরণ তৈরি করে। ‘শান্ত কেন মাস্তান’-এর শান্ত আমার একান্ত মান্না যে ধর্ষকের হাত উপড়ে ফেলে সমাজকে জানিয়ে দেয় ধর্ষকের শাস্তি কী হওয়া উচিত।

আমার একান্ত মান্না ‘আমি জেল থেকে বলছি’-র মান্না যার ভয়েস কন্ট্রোল বলিউডি ভাইব দেয়। স্ত্রী, বোন, মা-বাবার সাথে হওয়া অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে যাকে রুদ্ররূপ ধারণ করতে হয়।
আমার একান্ত মান্না ‘কাবুলিওয়ালা’-র মান্না যাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহে দেখতে পাই এক পিতার স্নেহের অগাধ উৎস থেকে। ‘আখরোট লিবে, বাতাম লিবে ও খকী’ বলতে বলতে যার নিজের মেয়ে কখন বড় হয়ে গেছে সে খেয়াল থাকে না।
আমার একান্ত মান্না ‘কষ্ট’-কে তুলে ধরে যা আমাদের সবার কষ্ট। স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক করে না, সন্তান আনে না কারণ বাবার মতো যদি অসাড় দেহের সন্তান জন্ম জন্ম হয়! ‘আমার অনেক কষ্ট’ সামান্য এ কথাই যেন ডুকরে কেঁদে অনেকের সাংসারিক কষ্টের কথাকে তুলে ধরে।
আমার একান্ত মান্না অপরাধ জগতের চিরন্তন পরিণতি দেখিয়ে যায় ‘রাজধানী’ ছবিতে, যে বাস্তবতা থেকে অপরাধীদের কোনো ফেরার পথ থাকে না। ‘বর্তমান’ ছবির সমাজব্যবস্থাকে বর্তমান নামেই তুলে ধরে যেখানে নিজের পায়ে দাঁড়াতে তরুণরা চেষ্টা করে কিন্তু বাস্তবতা সবসময় এক হয় না।
আমার একান্ত মান্না সমাজের জন্য সমাজের প্রয়োজনেই ‘খলনায়ক’, সমাজের প্রয়োজনেই ‘সমাজকে বদলে দাও’ বলে এবং করে দেখায়। ‘বোমা হামলা’-য় রাষ্ট্রের জরুরি কত সমস্যা ও রাজনীতির গোমর তুলে ধরে যাকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না।
আমার একান্ত মান্না ‘জীবনের গল্প’ বলা এক নায়ক যে ‘উত্তরের খেপ’-এ গিয়ে জীবনের নিদারুণ বাস্তবতায় পতিত হয়। অভিনয়ের গভীরতায় নিজেকে চিনিয়ে দেয়।
আমার একান্ত মান্না ‘বীর সৈনিক’ যে সন্তানের করা অন্যায়ও বাবা হয়ে মানতে না পেরে সন্তানের বুকে গুলি চালায়। যার কাছে দেশ আগে সন্তান পরে। দ্বৈত মান্নায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে।
আমার একান্ত মান্না সেলুলয়েডের জীবন আর মেকি সম্পর্ককে ‘সবচেয়ে স্বার্থপর ও বন্ধুহীন জগত’ বলে সাক্ষাৎকারে যাকে দর্শক শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে ও মানে। তারপর জীবনের অমোঘ সত্যকে স্মরণ করিয়ে একদিন ছেড়ে চলে যায় ‘আসবার কালে আসলাম একা’ বলে যে গানে গানে স্মরণ করিয়েছিল-“মন বলে দুনিয়াদারি ঝকমারি এক খেল/পৃথিবীটা মানুষেরই দুইদিনেরই এক জেল।” আমার একান্ত মান্না গেয়েছিল-“অনেকে বাঁচতে চায় হাজার বছর”, মান্না হাজার বছর কেন পঞ্চাশও বাঁচেনি কিন্তু অমর হয়ে গেছে কর্মে সেটাই তাঁর অর্জন।






