দর্শকের মুখোমুখি ‘বনলতা সেন’
এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর..
জীবনানন্দ দাশের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়েই শুরুটা করা যায়। তাঁকে একবারই পেয়েছে বাংলা সাহিত্য তাই তাঁর মর্ম উপলব্ধি করতে পারি। জীবনানন্দ বাংলা সাহিত্যে বর্তমানে সবচেয়ে চর্চিত কবি যার সুবিখ্যাত কবিতা ‘বনলতা সেন’-কে ঘিরে রহস্যের শেষ নেই। বাংলা সাহিত্যের আর কোনো কবিতা নিয়ে এত রহস্য নেই। বহুল পঠিত ও চর্চিত এ কবিতার বনলতা সেন বাস্তব নাকি কল্পনা এ আড়াল থেকেই দীর্ঘ স্টাডি শেষে নির্মিত ছবি ‘বনলতা সেন‘। নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল ছবিটি নিয়ে দর্শকের মুখোমুখি হাজির হয়েছেন বেশকিছু প্রশ্নোত্তরের শিল্পসম্মত উপস্থাপনায়।

ছবি দেখার আগে দর্শকের কি প্রস্তুত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে? প্রশ্নটা শুনে অনেকের অবাক লাগতে পারে কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রস্তুতি লাগে কারণ আপনি কবি জীবনানন্দ দাশ ও তাঁর রহস্যময় আবিষ্কার বনলতা সেন-কে কতটুকু জানেন সেটা আপনাকে সাহায্য করবে ছবিটির কূলকিনারা করার জন্য। নয়তো ছবি দেখার পর আপনার মাথায় রাজ্যের প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে পারে। এমনকি ছবিটি কেমন হয়েছে সে সম্পর্কে সঠিক প্রতিক্রিয়া দিতে বিভ্রান্ত হতে পারেন।
বনলতা সেন নিয়ে বাম্তবে কেউ ছিল কিনা তার উত্তরে কিছু কিংবদন্তি বা শোনা কথা চালু আছে সেগুলো সবার আগে দর্শকের জানা দরকার।
(১) জীবনানন্দ একবার দার্জিলিং গিয়েছিলেন। তখন দার্জিলিং গেলে নাটোর হয়ে যেতে হত। ট্রেনে করে যাবার সময় ভুবন সেন নামে এক লোকের বিধবা বোন বনলতা সেনের সাথে কবির আলাপচারিতা হয়। তারা নেমে যাবার পর কবি একা বোধ করেন। তাকে নিয়েই পরে তিনি কবিতাটি লেখেন।
(২) ভুবন সেন নিয়ে আরো একটি প্রচলিত কাহিনিতে দেখা যায় তার বাড়িতে নাটোরে আতিথেয়তা গ্রহণ করলে সেখানে তার বিধবা বোন বনলতা আপ্যায়ন করেন কবিকে। তাকে দেখে কবির মন বিষণ্ন হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে তিনি এ কবিতা লেখেন।
(৩) নাটোরে যাওয়া নিয়ে আরো একটি কাহিনিতে জানা যায় কবি একবার নাটোরের রাজবাড়িতে গেলে সেখানে এক সুন্দরীকে তার দেখাশোনার দায়িত্ব দেয়া হয়। কবি তাকে নিয়ে কবিতা লেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে মত দেয়া হয় না কিন্তু কবি তার নাম গোপন করে পরে কবিতাটি লেখেন।
(৪) নাটোরের গীতি সিনেমাহলের কাছাকাছি এক সুন্দরী রমণী থাকতেন যার নাম ছিল বনলতা সেন এমন একটা তথ্যও গবেষক আমীন আল রশীদের লেখা থেকে জানা যায়। নাটোর নিয়ে এটা সর্বশেষ জল্পনা ছিল কবির নামে।

(৫) লেখক ও গবেষক অশোক মিত্রের ‘আপিলা চাপিলা’ নামে গ্রন্থ থেকে জানা যায় জীবনানন্দের সাথে তাঁর পরিচয় ছিল। তিনি একবার কবিকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলেন বনলতা সেন বলে কেউ আছে কিনা। কবি মুচকি হেসে বলেছিলেন, সেসময় সরকারি হিসাবে রাজবন্দিদের নাম খবরের কাগজে বের হত। সেসূত্রে রাজশাহী জেলে বনলতা সেন নাম্নী নামে এক রাজবন্দির নাম তিনি জেনেছিলেন। কবিতাটি তাঁকে নিয়ে লেখা কিনা সেটা আর কবি স্পষ্ট করেননি।
(৬) ‘Marxist Indiana’ নামে একটি এনসাইক্লোপিডিয়ায় বনলতা সেন নামে এত বন্দির কথা বলা হয়েছিল যিনি জাতীয় আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। কবিতার বনলতা তিনিই কিনা সেটি বলা হয়নি সেখানে।
(৭) আকবর আলি খানের নামকরা বই ‘অন্ধকারের উৎস হতে’ বইতে নাটোরে পতিতালয় থাকার কথা উল্লেখ করা হয় যেখানে কবি গিয়েছিলেন। তাঁর এ তথ্যের বিপরীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষক আবু তাহের মজুমদার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন কারণ আকবর আলি খান উপযুক্ত প্রমাণ দিতে পারেননি।
‘বনলতা সেন’-এর বাস্তব উপস্থিতি নিয়ে যে গোলকধাঁধা এসব তথ্যের ভিত্তিতে সেটা স্পষ্ট হয়। এই তথ্যগুলোর কিছু কিছু অংশ চরিত্র হিসেবে ‘বনলতা সেন’ ছবিতে এসেছে তার সাথে যুক্ত হয়েছে কবির বাস্তব জীবনের কিছু চরিত্র যার মধ্যে স্ত্রী লাবণ্য দাশ ও কবির প্রথম প্রেম শোভনা। সব নারীর মধ্য দিয়ে বনলতা সেনকে খোঁজার চেষ্টা আবার কবির স্ত্রী লাবণ্যও বলছে ‘আমিই বনলতা’ কবির সমসাময়িক সাহিত্যিকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, মোহিতলাল মজুমদার তারাও ছবির চরিত্র হিসেবে এসেছে এবং তাঁর কবিতার সবচেয়ে কট্টর সমালোচক সজনীকান্ত দাসের কথাও এসেছে। এছাড়া ‘বনলতা সেন’ কবিতায় উল্লিখিত রাজা অশোক, বিম্বিসার, মালয় সাগর এগুলোর প্রসঙ্গ ছবিতে রয়েছে।

‘বনলতা সেন’ ছবির সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং চরিত্র হচ্ছে মহীন যে ছবির ব্যতিক্রমী স্টোরি টেলারে পরিণত হয়েছে। এই মহীন মূলত কবির বিখ্যাত পরাবাস্তববাদী কবিতা ‘ঘোড়া’ থেকে নেয়া যেখানে একটি বিখ্যাত লাইন আছে এভাবে –
“আমরা যাইনি মরে – আজও তবু দৃশ্যের জন্ম হয়
মহীনের ঘোড়াগুলি ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে।”
কবির কবিতার চরিত্রই তাঁর বায়োপিকের স্টোরি টেলার যেটি ইন্টারেস্টিং ছিল। মহীন টাইম ট্রাভেলের মাধ্যমে প্রায় শতবছর আগের জীবনানন্দের জীবনে মিশে তার কাছের মানুষদের জানার ও বোঝার চেষ্টা করে এবং তার সৃষ্ট বনলতা সেনকে খোঁজার চেষ্টা করে। এটাই ছবির কেন্দ্রীয় থিম। বনলতা সেন যেহেতু কেন্দ্রীয় চরিত্র তাই ঘুরেফিরে রেফারেন্স অনুযায়ী সে-ই বেশি এসেছে ছবিতে। পাশাপাশি কবির ব্যক্তিজীবনের অংশ হিসেবে স্ত্রী লাবণ্য দাশ ও প্রথম প্রেম হিসেবে শোভনাকে দেখানো হয়েছে প্রয়োজনীয় স্ক্রিনটাইমে।
মহীনের ভূমিকায় সোহেল মণ্ডল বাউন্ডুলে ও ভাবুক হিসেবে রহস্যজনক অভিনয় করেছে।
কেন্দ্রীয় চরিত্র বনলতা সেনের ভূমিকায় মাসুমা রহমান নাবিলা বিভিন্নভাবে উপস্থিত হয়েছে। তার গেটাপ ও অভিনয়ের ধরনে বনলতা সেনের উপস্থিতি ছিল রহস্যময় বিশেষ করে সংলাপের ধরনে। তার ন্যাচারাল অভিনয় বনলতা সেনের চরিত্রে করেছে সৌন্দর্যময়।
জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে খায়রুল বাশারের প্রধান আকর্ষণীয় দিক ছিল তাঁর ভরাট কণ্ঠস্বর। কবির কণ্ঠ কবিতার মতোই হওয়া উচিত যেন আবৃত্তি করলেও মনে হয় অনবরত কবিতা ঝরছে সংলাপে। জীবনানন্দের গড়নের সাথে বাশারের উপস্থিতি মিলে যায়।
কবির প্রথম প্রেম শোভনার চরিত্রে রূপন্তী আকিদ নিষ্পাপ চাহনি আর মৃদু হাসিমুখের সাথে সুন্দর কণ্ঠের দারুণ চরিত্র হয়ে উঠেছে। তার সংলাপের মধ্যে ছিল দারুণ মায়া।
কবির স্ত্রী লাবণ্য দাশের ভূমিকায় মায়মুনা ফেরদৌস মম মিশে গিয়েছে। সংসারজীবন যার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কবিতার থেকে সেরকম সংলাপ তার মুখে ছিল। জীবনানন্দের দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনের সাথে তার যে মতবিরোধ সেটা স্পষ্টভাবে মমর অভিনয়ে ছিল।
বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকায় শরীফ সিরাজ, কবির ‘ঝরা পালক’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের চিঠি মারফত শক্ত প্রতিক্রিয়ার ব্যাকগ্রাউন্ড ভয়েসে গাজী রাকায়েত স্বাভাবিক চরিত্র হিসেবে এসেছে। মৃত্যুশয্যায় কবির পাশে থাকা অন্যান্য চরিত্রের মধ্যে কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র, গবেষক ভূমেন্দ্র গুহ, সমালোচক সজনীকান্ত দাস সবাই ছিল কবির শেষজীবনের অংশ হিসেবে।
ছবির সিরিয়াস একটি অংশ ছিল পরিচালকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে জীবনানন্দের মৃত্যুর ব্যাখ্যা। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার রাসবিহারী এভিনিউতে জীবনানন্দ ট্রামের নিচে চাপা পড়েন এবং আটদিন পর ২২ অক্টোবর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুকে তিনি আয়োজন করে মেরে ফেলা হয়েছে বলেন। এটি সিরিয়াস নোট ছিল ছবির। তাঁর মৃত্যু কি আসলেই দুর্ঘটনা নাকি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বড় মাপের কবিকে মেরে ফেলা হয়েছে কিনা সে প্রশ্নের জন্ম দেয়। পরিচালক হিসেবে মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের এ প্রশ্ন তোলাটা ছিল ছবির গুরুত্বপূর্ণ দিক। এ অংশে তিনি কবির সমসাময়িক সাহিত্যিক ও সমালোচক যারা কবিকে সহ্য করতে পারতেন না তাদেরকে আসামী বলেও উল্লেখ করেছেন এবং তাঁরই নির্মিত একটি আলোচিত নাটক ‘যে জীবন ফড়িঙের’ তার সাথে হোমাজ সৃষ্টি করে শতবছর পরে মহীনের মাধ্যমে মামলা করতে চেয়েছেন। এ পার্টটি ছিল মারাত্মক।
ছবিতে জীবনানন্দের বিখ্যাত কিছু কবিতার ব্যবহার হয়েছে। বনলতা সেন, ঘোড়া, হায় চিল, অন্ধকার, শঙ্খমালা, আট বছর আগের একদিন, কমলালেবু। সবগুলো কবিতার ভিজুয়্যালাইজেশন ছিল। এর মধ্যে ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার আত্মহত্যা করতে যাওয়া লোকটি যে একগাছা দড়ি হাতে অশ্বত্থ গাছে ঝুলে পড়তে গিয়েছিল ইঁদুরের অস্তিত্বের সাথে মিল রেখে এর ভিজুয়্যালাইজেশন ছিল অনবদ্য। এছাড়া শুধু দৃশ্যের মাধ্যমে বোঝানো ‘হরিণেরা’ কবিতার ভিজুয়্যালও ছিল অসাধারণ। বনলতা সেন’ কবিতার সাথে এডগার অ্যালান পো-র ‘To Helen’ কবিতার মিলের প্রসঙ্গও এসেছে যদিও ‘বনলতা সেন’ অনুভূতির গভীরতায় অনেক এগিয়ে।
ছবির সিনেমাটোগ্রাফি ছিল অনবদ্য। সাহিত্যভিত্তিক ছবির অনস্ক্রিন ভিজুয়্যাল যেমন কাব্যিক, চোখের শান্তির মতো হওয়া দরকার সেটাই ছিল। গানের মধ্যে জীবনানন্দের ‘দুজন’ কবিতা থেকে গান নির্মাণ করা হয়েছে। দীর্ঘকবিতা থেকে গান করা কঠিন কাজ, গানটি অসাধারণ হয়েছে। দোলা রহমানের গায়কী গানটিতে খুব কঠিনভাবেই অসাধারণ। এছাড়া ‘এখানে কেউ ছিল না’ গানটিও অনবদ্য, বাপ্পা মজুমদারের গায়কী প্রশংসনীয়।
সমালোচনা করা যায় এমন দিক কবিতায় দর্শকভেদে আসতে পারে। যার মধ্যে মহীনকে ফিজিক্যাল রিলেশনের পরিপ্রেক্ষিতে দেখানো, পতিতা হিসেবে বনলতা সেনকে দেখানো, শোভনার সাথে জীবনানন্দের মেলামেশাকে ঘিরে কবির ব্যক্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, মৃত্যুশয্যায় শায়িত কবির সামনে কমলালেবুর ভিজুয়্যাল এবং শেষ দৃশ্যের ভিএফএক্স নিয়ে কথা উঠতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী লীলা নাগের সাথে মহীন চরিত্রের শারীরিক সম্পর্কের দিকটি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এগুলো নিয়ে দর্শকভেদে সমালোচনার অবকাশ থাকতে পারে।
মাসুদ হাসান উজ্জ্বল নিজস্ব গবেষণা ও আগ্রহের মধ্য থেকে জীবনানন্দ দাশের বায়োপিক ‘বনলতা সেন’ নির্মাণের যে সাহস করেছেন সেটাই মূলত বর্তমান সময়ের ভিত্তিতে প্রশংসনীয়। ভবিষ্যতে যারা কবিকে নিয়ে বায়োপিক নির্মাণ করতে চাইবেন তাদের জন্য এ ছবি স্ট্রং রেফারেন্স হিসেবে থাকবে।
রেটিং – ৮/১০






