Select Page

বনলতা সেন: লা শার্লেটীয় চার্ম

বনলতা সেন: লা শার্লেটীয় চার্ম

জেমিনিকে একটা অ্যাবসার্ড প্রম্পট দিয়েছিলাম, ‘বাংলাদেশে জীবনানন্দ দাশ অনুরাগীর আনুমানিক সংখ্যা ডেটা দিয়ে জাস্টিফাই কর’; সে কয়েকটা এক্সক্লুসিভ ইনসাইট দিল—

-গত দুই দশকে বাংলাদেশে কেবল ‘বনলতা সেন’ এবং ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র বিভিন্ন পাইরেটেড ও অফিশিয়াল সংস্করণ মিলিয়ে ২০ লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়েছে।

-’কুড়ি বছর পরে’, ‘আট বছর আগের একদিন’ কিংবা ‘বনলতা সেন’ কবিতার আবৃত্তিগুলোর (শিমুল মুস্তাফা, সাম্যদীপ বা অন্যান্য বাচিক শিল্পীদের কণ্ঠে) একক ভিডিও ভিউ সংখ্যা ৫০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি পর্যন্ত রয়েছে।

১৯৯০ থেকে ফেসবুক পূর্ব বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক স্যাম্পল যদি নিই, প্রতিটি জেনারেশনেই জীবনানন্দের পাঠক ছিল। অতি কনজারভেটিভ অ্যাপ্রোচেও যদি হিসাব করি, জীবনানন্দ অনুরাগী মানুষের সংখ্যা অবলীলায় ১৫ লাখ অতিক্রম করে যাবে।

প্রশ্ন হলো, এদের মধ্যে কত পারসেন্ট জানেন ‘বনলতা সেন‘ নামে একটি ফিল্ম রিলিজ হয়েছে, এবং সেটি সরকারি অনুদানে নির্মিত?

কবিতা আমি পড়িনি কোনোদিনই, তবে নিজে ইমাজিনেটিভ মানুষ হওয়াতে জীবনানন্দের কল্পনাজগতে বিশেষ আগ্রহ আছে, এবং ২০১৭ সালে তাকে রি-ইন্টারপ্রেট করে দীর্ঘ আর্টিকেল লিখেছিলাম ।

ফিল্মোপাত শুরু হোক।

‘বনলতা সেন’- কোন চিন্তাধারা থেকে দেখতে হবে তার নির্দেশিকা আছে একদম দ্বিতীয় সিকুয়েন্সেই যখন বনলতা চরিত্রে রূপদানকারীর মুখে শুনতে পাই দুটো সংলাপ—

-consciousness of time as universe

-নির্দিষ্ট সময়ের পরে ব্যক্তিমানুষের মৃত্যু হয়, মানবজাতির কি মৃত্যু হয়?

দুটো সংলাপই গভীর দার্শনিক। আর্থার কোনান ডয়েল মারা গেছেন, এই মুহূর্তে যে ছেলেটি বা মেয়েটি শার্লক হোমস পড়ছে, তার জগতে শার্লক কি জীবিত নয়?

‘বনলতা সেন’-এ আমরা যা স্ক্রিনে দেখি সেটি প্রথাগত রিয়েলিটি নয়, যে কোনো মানুষের মাথার ভেতরে ক্যামেরা প্রক্ষেপণ করলে যেসব চিন্তা-কুচিন্তা-ফ্যান্টাসি-ইরেশনালিটি আবিষ্কৃত হবে, তেমন একটা মাথাকে স্যাম্পল হিসেবে নেয়া হয়েছে। মাথার ভেতরে যেহেতু ক্রনোলজি বা ব্যাকরণ মেনে ভাবনা আবর্তিত হয় না, আমরা দর্শক হিসেবে কেবল অপেক্ষা করতে পারি নতুন কোনো বোধিয়াল মুহূর্তের।

তাহলে দর্শক কী দেখবে, কেনই বা দেখবে— অতি ক্লিশে এ প্রশ্নের কাউন্টারে আমার বক্তব্য সোজাসাপ্টা—এ দর্শকের ডেমোগ্রাফিক পরিচয় আসলে কী। 

শিক্ষা এবং চিকিৎসা বাদে জগতের সকল সার্ভিসেরই টার্গেট অডিয়েন্স সিলেক্টিভ। যে ক্রিকেট দেখে না বা জেমসের গান শোনে না, সে টিকেট কেটে এসব সার্ভিস নিবে না। ফিল্মও যে সর্বস্তরের দর্শকের জন্য নয়, এ বোধ ডিরেক্টরদের মধ্যে যত দ্রুতিতে সঞ্চারিত হবে, ফিল্মের প্রমোশন স্ট্র‍্যাটেজি এবং রেভিনিউ জেনারেশন তত বেশি কৌশলী হবে।

যে ব্যক্তি জানেও না মহীনের ঘোড়াগুলি, ঘাঁই হরিনী, শুয়োর, গুবরে পোকা, পেঁচা, সোনালি ডানার চিল, কমলালেবু প্রভৃতি উপকরণগুলো জীবনানন্দের লেখায় কতখানি প্রাসঙ্গিক, সে যদি ঘটনাক্রমে হলে ঢুকে পড়ে, সেই দুই ঘণ্টা হবে তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম ফালতু সময়। তার টাকা এবং টিকেটের প্রতি ডিরেক্টরের থাকতে হবে দায়বোধ।

পক্ষান্তরে,

জীবনানন্দ দাশ সম্বন্ধে ৭ মিনিট বক্তব্য দিতে পারবেন এবং তার বিখ্যাত কবিতাগুলোর মধ্যে ১০-১৫ টি পড়া থাকা মানুষের জন্য ‘বনলতা সেন’ দেখার অনুভূতির নাম দিতে পারি ‘লা শার্লেটীয় চার্ম’

এ চার্মকে ডিটেলিং করলে আলাপের ডাইমেনশন বাড়বে।

আমরা যখন এসএসসি পরীক্ষার্থী, কেমিস্ট্রিতে ‘লা শাতেলীয়ের নীতি’ পড়তে হত।

আমার ক্রিয়েটিভ জার্নিতে এখনো পর্যন্ত ছয়জন মিউজের সাক্ষাৎ  পেয়েছি-  পাপড়ি, অজন্তা হালদার, 41, গায়ত্রি, সপ্তমী এবং শার্লেট।

সর্বশেষজন শার্লেট আর শাতেলীয়ের উচ্চারণগতভাবে নিকটবর্তী। কেমিস্ট্রিকে যদি ক্রিয়েটিভ এনার্জি দিয়ে ব্যাখ্যা করি ‘লা শার্লেটীয় চার্ম’কে ডিফাইন করতে পারি এভাবে, ‘এমন এক জাদুকরী আকর্ষণ বা অনুপ্রেরণা, যা জীবনের সব ঝড়-ঝাপটা, মানসিক চাপ কিংবা শূন্যতার মধ্যেও ভেতরের সৃষ্টিশীলতাকে আবার একটা ব্যালেন্সে বা সাম্যাবস্থায় ফিরিয়ে আনে।’

‘লা শার্লেটীয় চার্ম’ উপভোগ করতে জীবনানন্দের দুটো কবিতার লাইনকে জরুরি মনে হয়েছে আমার—

১. আমরা যাইনি মরে আজও—তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়

  মহীনের ঘোড়াগুলি ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে

২. সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

মহীনের ঘোড়াগুলি আমার জীবনে শোনা সবচাইতে শৈল্পিক মেটাফর। জীবনানন্দ দাশের সবচেয়ে বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ ‘A Poet Apart’-এর লেখক ক্লিনটন বি সিলি এ মেটাফরকে বলেছেন মানুষের আদিম প্রবৃত্তি এবং সময়ের অন্তহীন প্রবহতা। consciousness of time as universe এর মানে দাঁড়ায় তাই মহীনের ঘোড়াগুলি।

সময় দেখতে যদি মানুষের মতো হত, কিংবা সময়ের কোনো থাকত মানবীয় নাম— এ আপাত উদ্ভট চিন্তা থেকেই ফিল্মের স্টোরিটেলিং প্যাটার্ন তৈরি হয়েছে।

আমরা ফিল্মজুড়ে মহীন নামের এক যুবককে দেখতে পাই যে আদতে সময় স্বয়ং; সময়ের এ অন্তহীন প্রবহতায় কখনো বইয়ের চরিত্র বনলতা সেন আসে, কখনোবা আসে ঐতিহাসিক চরিত্র বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লীলা নাগ, শোভনা, সজনীকান্ত, হেমেন্দ্রগুহ, এমনকি কবি জীবনানন্দ দাসও সেখানে কবি নয়, মূলত চরিত্র যারা মহীনের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে, অথবা মহীনের সূত্র ধরে স্ক্রিনে উপস্থিত হয়।

মহীন যেহেতু কেবল জীবনানন্দ নিয়ে ডিল করে না, আমরা শুরুতে মহীনকে পাই এডগার এলান পো এর ‘To Helen’ কবিতায়; সে স্তবকটুকু থেকে ফিল্মের শুরুর সিকুয়েন্স কানেক্ট করা যায়

On desperate seas long want to roam,

Thy hyacinth hair, thy classic face,

Thy Naiad airs have brought me home

To the shore that was perfumed with the bygone time…

সমুদ্রতীরে পড়ে থাকা বুনোহা্ঁস আর নাবিকে এলান পো এবং জীবনানন্দ একীভূত হন, যেভাবে হেলেন আর বনলতাকে আর আলাদা করা যায় না। ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’ আর ‘hyacinth hair’ দুয়ের মেলবন্ধন হয় পারফিউমে!

স্টোরিটেলিংয়ের এ নন-লিনিয়ার প্যাটার্নে পরিচালক বেশ কয়েকটা ইনোভেটিভ এবং সাহসী বক্তব্য ডেলিভার করেছেন অনায়াসে—

-রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দের প্রতি ঈর্ষাণ্বিত ছিলেন। মহীন জীবনানন্দকে কনভিন্স করছে- খ্যাত-অখ্যাত সবার বইকে যিনি উৎসাহিত করেন তিনি আপনাকে এভাবে ভাষা নিয়ে আক্রমণ করবেন। জীবনানন্দের মৃত্যুর মুহূর্তকে ভিজুয়ালাইজ করা হয়েছে দ্য ভিঞ্চির আঁকা বিখ্যাত ছবি ‘দ্য লাস্ট সাপার’-এর আদলে, যেখানে টেবিলের উপর রাখা মৃত্যুাপন্ন জীবনানন্দের দেহ, সাথে বাহারি খাবার, রবীন্দ্রনাথ সেখানে ভোজন করছেন। মহীন মামলা করতে গেছে খুনের, আইনজীবী বলছে ১৯৫৪ সালে যেখানে সাধারণ একটা অপমৃত্যুর মামলা পর্যন্ত হয়নি, এত বছর পরে কাকে আসামী করা হবে। মহীন শেষ করে, ‘আমি আসামীদের নাম বলছি আপনি লিখুন’। এবং এ কথাটা যেখানে শেষ হয় সেখান থেকেই রবীন্দ্রনাথ, সজনীকান্তসহ অন্যদের ভোজন দৃশ্য। সমালোচনা নিতে না পারা ভঙ্গুর ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ।

– জীবনানন্দের ইন্টিগ্রিটির সমালোচনা করেছেন। লাবণ্য গুপ্ত বলছেন, ‘চাকরি নেই জেনেও একটা মেয়েকে বিয়ে করে আনলে’!

মহীন লাবণ্য গুপ্তের সঙ্গেও কথা বলেছে, তার মতে- ‘বিপ্লবী হবার ইচ্ছা ছিল, বিয়ে হওয়াটা একটা বাধা। কিন্তু আমাকে বরিশালে তো তিনিই ভর্তি করে দিয়েছিলেন। একটু স্বচ্ছলতা কোন মেয়ে না চায়’। বনলতার মুখ দিয়েও জীবনানন্দের সমালোচনা করিয়েছেন

ক. উনি কি জানেন না শ্রাবস্তী নগরীর নারীরা রূপ-যৌবন দিয়ে গৌতম বুদ্ধের ধ্যানভঙ্গ করতে চেয়েছিলেন?

খ. কালিদাসের মেঘদূত পড়লে ‘বিদিশা’ মানে যে কামের নগরী বোঝায় তা কি বুঝতে বাকি থাকে কারো? (সংলাপটা হুবহু এরকম নয়, এসেন্স লিখলাম)

গ. দু’ দণ্ড শান্তি বলার কারণেই যুগে যুগে মানুষ আমাকে বারবনিতা ভাবলো

-জীবনানন্দের অসংখ্য কবিতা প্রকাশিত হয়েছে জয়শ্রী পত্রিকায়, যার সম্পাদক ছিলেন লীলা নাগ। মহীনের সাথে তার ইন্টেলেকচুয়ালিটি ড্রিভেন সেক্সুয়াল কানেকশন দেখানো হয়েছে। একজন আদ্যোপান্ত ঐতিহাসিক ক্যারেক্টার যৌনতায় জড়াচ্ছে প্রবহমান সময়ের অবতারের সাথে, এবং বনলতা সেনকে খুঁজতে সহায়তা করছে— ব্যাপারটা অ্যাস্থেটিকালি বিউটিফুল, তবে মহীন যে জীবনানন্দেরই একটি বিকল্প সত্তা, শেষ দৃশ্যে এটা দেখানোর মাধ্যমে লীলা নাগের সাথে জীবনানন্দের সম্পর্কের একটি সরাসরি ইন্টারপ্রেটেশন তৈরি হয়। লিনিয়ার স্টোরিটেলিং হলে এ নিয়ে নির্ঘাৎ বিতর্ক তৈরি হত। লীলা নাগের মুখ দিয়েই বলানো হয়, ‘লাবণ্য গুপ্ত কিন্তু বলেছেন আমিই বনলতা’।

এ সংলাপের পরে লাবণ্য গুপ্তের চরিত্রে কাস্টিং করা মাইমুনা মমকে লক্ষ্য করি, বিশেষত চোখ, চুল এবং গায়ের রং— এই প্রথম মনে হয়, হতেও তো পারে। অন্যদিকে বনলতা দাবি করা নাবিলার অরিজিনালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে মহীন, কারণ বনলতা হবে কিছুটা কালো, সে তো গৌঢ় বর্ণের। নাবিলা জবাব দিচ্ছে তার চোখের দিকে না তাকালে কীভাবে বুঝবে তা পাখির নীড়ের মতো কিনা। এবং পরের দিকে যখন দেখতে পাই মাইমুনা মম রূপান্তরিত হয়েছে গ্রীক মিথলোজির মেডুসাতে (যার প্রতিটি চুল বিষাক্ত সাপ এবং সে কোনো মানুষের দিকে তাকালেই পাথর হয়ে যায়। মেডুসার এ পরিণতির জন্য অবশ্য তার নিজের কোনো দায় নেই। সমুদ্রদেবতা পোসাইডন তার রূপ-যৌবনে আকৃষ্ট হয়ে দেবী অ্যাথেনার মন্দিরের ভেতরে তাকে ধর্ষণ করেছিল। পোসাইডনকে কিছু করতে না পেরে অ্যাথেনা অভিশাপ দেয় মেডুসাকে, যা অত্যন্ত আনফেয়ার), এবং জীবনানন্দের চরিত্রে রূপদানকারী খায়রুল বাসার মাঝরাত্তিরে তাকে বিছানায় রেখে কবিতা লেখার টেবিলে বসে মাস্টারবেট করছে, সে ঘুম ভেঙ্গে তাকে তিরস্কার করছে একটা চাকরিও কেন যোগাড় করতে পারলো না, এবং যদি তার নারীর ভরণপোষণের সামর্থ্যই না থাকে, সংসার কেন করেছিল— সবকিছু থেকে একটি টক্সিক এবং ফেইল্ড ম্যারিজের যে আবহ পাই তাতে লীলা নাগের সংলাপটা বাতিল হয়ে যায়।

-কবিতা লেখা নিয়ে জীবনানন্দের নিজের ভেতর হয়তবা সার্বক্ষণিক দ্বন্দ্ব কাজ করতো, সে সুইসাইডাল ছিল। মহীন তাকে একাধিকবার বলে- কবিতা লিখতে চাইলে মনে মনে আত্মরতি করুন, কিন্তু ভুলেও কবিতা লিখবেন না। বনলতা সেন কে হতে পারে তার অনেকগুলো অপশনের মধ্যে একটা হিসেবে দেখানো হয় বনলতা নামের এক বিপ্লবীকে, যে রাজশাহী জেলে বন্দী। মহীন সে বনলতার সাথে দেখা করতে পারে, বনলতা তাকে এক নারীর গল্প শোনায়। স্তন ঢেকে রাখতে কর দিতে হতো; সেই নারী কর না দিয়ে স্তন কেটে দেয়, রক্তক্ষরণে মৃত্যুবরণ করে। তার স্বামীও স্ত্রীর চিতায় সহমরণ নেয়, যা সতীদাহ প্রথায় একমাত্র পুরুষ সতীর দৃষ্টান্ত। মহীনও হতে চায় সে পুরুষ; একটু পর সেখানে জীবনানন্দ আসে, মহীন তাকে দেখা করতে দেয় না। আবার বুদ্ধ দর্শন জীবনানন্দকে কীরকম আলোড়িত করেছিল, সেটা এক্সপ্লোর করতেও বিশাখা তথা বনলতা তথা হেলেন মহীনকে ঘুরিয়ে আনে মগধরাজ অজাতশত্রুর টাইমলাইন। অজাতশত্রু পিতা বিম্বিসারকে হত্যা করে, পরবর্তীতে গভীর অনুতাপে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হয়। বনলতায় যে এতবার ‘অন্ধকার’-এর আলাপ, তার বিপরীত শব্দ ‘বোধি’; অজাতশত্রুর কাহিনী থেকে বনলতা সেনকেন্দ্রিক পৃথক ইন্টারপ্রেটেশন তৈরি হয়ে যায়।

-বেশ্যালয় নিয়ে আমাদের কনজারভেটিভ সোসাইটিতে প্রচণ্ড এগ্রেসিভ মানসিকতা কাজ করে। জীবনানন্দকে বুঝতে হলে বেশ্যালয়ের উপস্থিতি আসবেই। জীবনানন্দকে বেশ্যালয়ের সামনে দিয়ে হাঁটিয়েছেন, মহীন ঠিকই পৌঁছে গেছে বেশ্যালয়ের বিশেষ কক্ষে। এতদিন হেলেন জেনে আসা নাবিলাকে আমরা পাই বিশাখারূপে, এডগার এলান পো আর কলেরিজের সাথে জীবনানন্দের কল্পচিত্র যখন মেলানো হচ্ছিল মহীন সংশয় প্রকাশ করে, নাবিলাকে দিয়ে বলানো হয়, ইউরোপীয়রা কি বেশ্যালয়ে গমন করে না?

সমগ্র ফিল্ম অ্যানালিসিস করে এটাই বলা যায় ‘বনলতা সেন’ একজন বারবণিতা ছিলেন, এ স্কুল অব থটকেই পরিচালক অধিক কনভিন্সিং মনে করেন, তবে একই সাথে কোনো সৃষ্টিকর্মের নেপথ্য ক্যারেক্টারটা কে ছিলেন গণমানুষের এ অযাচিত কৌতূহলকে যে অপছন্দ করেন, সেটাও প্রকাশিত হয়েছে। মহীনের ঘরের পরিচারিকা মুনিয়া— যার সঙ্গে তার যৌনতার সম্পর্ক আবার পরিচারিকার থেকে টাকা ধার নেয়, তার বাসায় থাকতেও বলে দেয়— আমরা অন্তিম সিক্যুয়েন্সের কিছু মুহূর্ত আগে দেখতে পাই বেশ্যালয়ে সেও উপস্থিত, মহীনকে বলছে ‘এ ঘরে যে থাকে সে-ই বিশাখা’। অযাচিত কৌতূহলকে নালিফাই করতে বাপ্পা মজুমদারের গানটা যথার্থ সংযোজন-

‘এখানে কেউ নেই

এখানে কেউ থাকে না

কখনো ছিল না, কখনোই ছিল না

এখানে কেউ আসে না

অহেতুক খুঁজো না…’

ফিল্মে অসংখ্য ক্যারেক্টার থাকলেও আমি পিক করেছি তিনজনকে।

প্রথমত, সোহেল মন্ডল। তার সাথে গতবছর মেসেঞ্জারে কথা হয়েছিল; কোনো একটা প্রয়োজনে দেখা করতে চেয়েছিলেন, যদিও আর হয়নি দেখা। তাকে প্রথম দেখি ‘তাকদীর’ ওয়েবসিরিজে। ‘রাক্ষস’ না দেখলেও রিলস সূত্রে তার প্রেজেন্স জেনেছিলাম। সে একজন পূর্ণাঙ্গ অভিনয় প্যাকেজ, যে চরিত্রই করে দুর্দান্ত মানিয়ে যায়। বেঁচে থাকলে তিনি আরো কাজ করবেন, তবে মহীনের মতো প্রচণ্ড কনসেপচুয়াল এবং মেটাফরিকাল চরিত্র বাকিজীবনে পাবেন, আশা কম। যেটা আশা করতে পারি, কেবল টাকার নোটের সংখ্যা দিয়ে যেন ক্যারেক্টার বাছাই না করেন ভবিষ্যতের প্রজেক্টগুলোতে। দর্শকদের বড় অংশ জীবনানন্দ আর বনলতা সেন নিয়ে নিমগ্ন থাকলেও, এ ফিল্ম যে মূলত ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’- সে বোধ আসতে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার দেখতে হবে ফিল্মটা।

দ্বিতীয়ত, মাসুমা রহমান নাবিলা। হেলেনের ‘hyacinth hair’ এবং বুদ্ধিদীপ্ত চাহনিতে সে এক ডিভাইন সত্তা হয়ে উঠেছিল। গ্ল্যামার কেবলমাত্র শরীরসর্বস্ব নয়, বডি ল্যাঙ্গুয়েজও যে মোহনীয় হতে পারে, একজন ইমাজিনেটিভ এবং ক্রিয়েটিভ মানুষ হিসেবে সে Aura টা তার স্ক্রিন প্রেজেন্স থেকে পেয়েছি।

তৃতীয়ত, মাইমুনা মম। এ ফিল্মসূত্রেই তাকে প্রথম দেখলাম। তাকে একজন জন্মগত মিউজ মনে হয়েছে। সাহিত্যনির্ভর যে কোনো চরিত্রেই চমৎকারভাবে ফিট ইন করে যাবেন। তাকে ব্যবহার করার মতো স্ক্রিপ্ট এবং ডিরেক্টর আছে কিনা, মূল এবং একমাত্র কনছার্ন এটাই।

কয়েকটা গ্যাপ বা লিমিটেশনের দিকে ফিল্মোপাত করা যাক।

প্রথমত, ভাষাগত কোহেরেন্সহীনতা। ফিল্মে ৩ ধরনের ইন্টারেকশন হয়েছে—

– ক্যারেক্টার এবং ক্যারেক্টার। এখানে কাব্যিক বা বইয়ের ভাষায় কথা হতে পারে। তাই মহীন আর হেলেন বা বনলতা যখন ভারী ভারী সংলাপ দেয় খুবই চার্মিলা লাগে।

– ব্যক্তি এবং ব্যক্তি। এখানে ভারি সংলাপ লাগবে আরোপিত, এবং ঢঙ্গী। জীবনানন্দ যখন বুদ্ধদেব বা লাবণ্য গুপ্তের সঙ্গে কথা বলে, সেখানে ফ্লো রাখতে হবে ভাষার।

-ক্যারেক্টার এবং ব্যক্তি। এ আলাপের ভাষাটা অন্য দুইয়ের চাইতে সিগনিফিক্যান্টলি আলাদা হতে হবে। মাহীন যখন লীলা নাগ বা জীবনানন্দের সাথে কথা বলে, সেই ভাষাটাতে ব্যতিক্রমীতা না থাকলে ট্রানজিশনগুলো বুঝানো যায় না।

একটা কাব্যিক ফিল্মে ভাষা দিয়েই সময় এবং ব্যক্তির দূরত্ব ঘুঁচানো যেত, যা ভীষণভাবে অনুপস্থিত।

দ্বিতীয়ত, জীবনানন্দে খায়রুল বাশারের প্রেজেন্টেশন মেকি লেগেছে। জীবনানন্দ মূলত গ্লুমি-ইন্ট্রোভার্টেড-সেক্সুয়াল স্টার্ভেশন এবং ভ্যালিডেশনের আকাঙ্ক্ষায় ভোগা অতি কমপ্লেক্স ক্যারেক্টার। খায়রুল বাশারের হাঁটা চলা-ডায়লগ ডেলিভারি কোনোখানে সেই ভাইবটা পাওয়া যায়নি। অকারণে তার গাল ফুলিয়ে রাখা হয়েছে। পরিচালকের বুঝতে হবে জীবনানন্দের যারা অনুরাগী তারা লুকিংয়ের চাইতে ফিলিংয়ে অধিক মনোযোগী। বাশারকে ভুলভাবে ব্যবহার করা অবশ্যই পরিচালকের ভাবনাগত সীমাবদ্ধতা।

তৃতীয়ত, অন্তিম সিক্যুয়েন্স। Ambiguity is the beauty, সেখানে রিইন্টারপ্রেটেশনের বহু স্কোপ খোলা থাকে। মহীনকে ট্রামের নিচে ফেলার মধ্য দিয়ে অ্যাম্বিগুইটি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ঠিক আগের সিক্যুয়েন্স, যেখানে মহীন অন্ধকারের দিকে ছুটে যাচ্ছে, আমি পরিচালক হলে এই অন্ধকারটাই প্রলম্বিত করতাম, মহীন ছুটতেই থাকতো ছুটতেই থাকতো; প্রথম সিক্যুয়েন্সও গতিশীল হয়েছিল তার ছুটার মাধ্যমেই।

বনলতা সেন ফিল্মটা তবে কী?

এটা কি জীবনানন্দের বায়োপিক? নাহ, সে এখানে একজন নগণ্য ক্যারেক্টার যার মাথার ভেতরে ক্যামেরা প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।

এটা কি বনলতা সেন এর পরিচয় বিষয়ক মতবাদের সংকলন? নাহ, ক্যারেক্টার বনাম মিউজের দ্বৈরথে সে ইতিহাসের দীর্ঘ জার্নিতে অন্যান্য নারীদের সাথে একীভূত হয়ে গেছে, তার ব্যক্তিসত্তা সেখানে নিতান্তই গৌণ।

বনলতা সেন তবে কী, এটার জবাব জেমিনির হিসাবকৃত ১০ লক্ষাধিক জীবনানন্দপ্রেমীদের জন্যই থাকুক। আমার কাছে বনলতা সেন মানে

-আনঅর্থোডক্স স্টোরিটেলিং

-অতুলনীয় আর্ট ডিরেকশন

-মহীনের ঘোড়াগুলিকে রক্তমাংসের অবয়বে পরিভ্রমণ করতে দেখা

-লা শার্লেটীয় চার্ম এক্সপেরিয়েন্স করা

সাধারণত কোনো ফিল্ম একাধিকবার দেখি না। তবে সুযোগ পেলে বনলতা সেন দেখতে চাইব আরো ছয়বার!


About The Author

মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয়

লেখক ও বায়োপিক এনালিস্ট

Leave a reply