রকস্টার: চরিত্রের পেটে চিত্রনাট্য
আর নয় গ্যাংস্টার, এবার রকস্টার। মেশিন গান ছেড়ে গিটারে গান। ভায়োলেন্স ভুলে ভালোবাসা। দাঙ্গাবাজি আর ডায়লগবাজি ত্যাগ করে ‘প্রকৃত গোলাপ’ হয়ে উঠতে চাইলেন শাকিব খান। তিনি কতটা পারলেন নিজের গৎবাঁধা ইমেজ থেকে বেরুতে, তাকে কতটা বের করে আনতে পারলেন নতুন নির্মাতা আজমান রুশো, চলুন আলোচনা করি…।

বিখ্যাত ধ্রুপদী সংগীতশিল্পী তারিক আনাম খানের অবাধ্য সন্তান শাকিব খান। বাবার সংগীত ঘরানাকে অপছন্দ করেন। বাবা তারিক আনাম আর মা রোজী সেলিমের অসুখী দাম্পত্যের অস্থিরতার ভেতর বেড়ে ওঠা তার। ব্যান্ডের জন্য গান লেখেন, সুর করেন শাকিব খান। ব্যান্ডের প্রাণভোমরা হলেও স্টেজে উঠতে ভয় পান। শৈশবের একাকিত্ব তাকে পাদপ্রদীপের আলোর বিপরীতে চালিত করে, তাকে নিঃসঙ্গতার দিকে তাড়া করে। একদিন দলের ভোকালিস্ট মিছেমিছি অসুস্থ হলে বাধ্য হয়ে স্টেজে উঠতে হয় শাকিবকে। সেদিন তিনি কেবল ভয়কেই জয় করেন না, জয় করেন সাবিলা নূরকেও। আন্ডারগ্রাউন্ড কনসার্ট দেখতে আসা সাবিলা প্রেমে পড়েন শাকিবের, শিল্পীর জন্য প্রেরণা হয়ে আসেন। কিন্তু শাকিব খ্যাতির ভার বইতে পারেন না। মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন। সাবিলার সঙ্গে তার সম্পর্ক নষ্ট হয়। মারপিটের জন্য যেতে হয় আদালতে। নেশাদ্রব্য বহনের জন্য যেতে হয় জেলখানায়। জেল থেকে বেরিয়ে শাকিব জানতে পারেন সাবিলার বিয়ে হয়ে গেছে। মাদক আর সংগীতের অনন্ত নেশায় ডুবে যান শাকিব। একটা ভঙ্গুর পরিবারের অস্থির যুবক, খ্যাতির আলোয় ঝকঝকে সংগীতজীবনের উত্তাপে নিজেকে খাঁটি সোনায় পরিণত করতে পারে, নাকি ব্যক্তিজীবনের বেদনা ও প্রিয়জনের প্রত্যাখ্যান তাকে নিয়ে যায় অন্ধকারের অতলে—এই প্রশ্নেরই উত্তর ২ ঘণ্টা ২৭ মিনিটের ‘রকস্টার’।

ছবির নাম ‘রকস্টার’ হলেও একজন মিউজিশিয়ানের সংগ্রাম, প্রতিষ্ঠা, ক্যারিয়ারের টানাপোড়েন, মোটের ওপর শিল্পীর সাংগীতিক সফর নয় এটি। ‘রকস্টার’ মূলত ‘আগুন’ নামের এক যুবকের ভালোবাসার গল্প। একটা বয়সে ভালোবাসার জন্য তার ছটফটানি, তার প্রতি ভালেবাসার মানুষদের অবহলো, আবার জীবনের আরেকটা পর্যায়ে তার পেয়ে হারানোর তড়পানি, ভালোবাসার মানুষকে অবহেলা, পুরো ছবিটা ছেঁকে নিলে এটুকুই সারাৎসার। মিউজিক এ ছবিতে একটা উপলক্ষ্য। মিউজিশিয়ান আগুন নয়, ব্যক্তি আগুনই এখানে মুখ্য। মিউজিকের জন্য তার প্যাশন নয়, ভালোবাসার জন্য তার অবসেশনই ‘রকস্টার’-এর বিষয় ও উদ্দেশ্য।
আগুন চরিত্রটা সম্পর্কে বলার আগে ছবির পরিবেশ ও পটভূমি সম্পর্কে একটু বলি। একজন মিউজিশিয়ানের জীবনের গল্প বলার জন্য যে ধরনের আবহ তৈরি করা দরকার, পরিচালক আজমান রুশো সেটা তৈরি করেছেন। ওপেন কনসার্ট থেকে শুরু করে ব্যান্ডের জ্যামিং স্টুডিও পর্যন্ত— প্রডাকশন ডিজাইনের প্রত্যেকটা এলাকায় তার পুরো দখলদারিত্ব কায়েম করতে পেরেছেন। শতভাগ ফ্যাশনেবল মিউজিশিয়ান হিসেবে আগুনকে পর্দায় উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। গল্পটা আদ্যেপান্ত ঢাকার। এক দুবার থাইল্যান্ডকে বাংলাদেশ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা অসঙ্গতি হলেও চোখের জন্য ছিল আরামদায়ক!

ফিরে যাই আগুন চরিত্রের আলাপে। এটি একটি নেতিবাচক চরিত্র। সংগীত তার পেশা হলেও এতে সে সমর্পিত নয়। গান গাওয়ার জন্য তাকে মাদক নিতে হয়। নইলে সে স্টেজে উঠতে পারে না। নেশার জন্য তাকে জেল খাটতে হয়, প্রিয়জনের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে হয়। মাদকের জন্য তার ক্যারিয়ার নষ্ট হতে বসে। সংগীত তার জন্য কোনো উপশমের কাজ করে না। চরিত্র হিসেবে আগুন ভীষণ চকচকে, গ্ল্যামারাস, কিন্তু ভেতর থেকে ফাঁপা। চরিত্রটি দর্শককে কোনো ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে না। আগুনের প্রতি পরিচালকের মোহের কারণ বুঝতে সক্ষম হইনি আমি। এই চরিত্রকে দিয়ে কী বলাতে চেয়েছেন পরিচালক, কোন বক্তব্য দর্শকের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছেন, তা বুঝতে আমি ব্যর্থ হয়েছি।
আগুনের প্রতি মোহগ্রস্ত পরিচালক ছবির অন্য চরিত্রগুলোর জন্য জায়গা ছাড়েননি একদম। ছবির শুরু থেকে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত প্রত্যেকটি দৃশ্যে আগুন উপস্থিত। পরিচালক অন্ধের মতো আগুনকে অনুসরণ করেছেন। ছবির অন্য চরিত্রগুলো দর্শক দেখেছেন আগুনের দৃষ্টিকোণ থেকে। আগুনের চোখে যে মহান, দর্শকের কাছেও সে মহান। আগুনের চোখে যে মন্দ, দর্শকের চোখেও সে মন্দ। আগুনের প্রেমিকা মিরা যতক্ষণ পর্দায় থাকে, ততক্ষণ সে আগুনের সঙ্গেই থাকে। মিরা যখন আগুনের পাশে নেই, তখন সে পর্দায়ও নেই। আগুনের বন্ধু কাম ম্যানেজার ছাড়া আর কোনো চরিত্রই স্ক্রিনটাইম পায়নি।
আসি আগুন চরিত্রে শাকিব খানের পারফর্মেন্স প্রসঙ্গে। শাকিব একজন সুদর্শন পুরুষ। দেশের প্রধান নায়ক। এই রকম স্টাইলিশ, ফ্যাশনেবল, গ্ল্যামারাস তারকার চরিত্র তার জন্য খুব সহজ বাছাই। কেননা তাকে দর্শনধারী হে উঠতে হয় না, সুপুরুষ হয়ে উঠতে হয় না। তিনি একদম তৈরি আগুন চরিত্রের অবয়বের জন্য। চ্যালেঞ্জের জায়গা ছিল আগুন চরিত্রের অন্তর্গত বেদনাকে শরীর ও চেহারা দিয়ে ফুটিয়ে তোলা। ‘বরবাদ’ ছবিতে মাদকাসক্ত যুবকের চরিত্র তিনি আগেই করেছেন। ‘রকস্টার’-এ নিজের কাজের পুনরাবৃত্তি করেছেন মাত্র। প্রেমিক হিসেবে তার দহন, সন্তান হিসেবে তার অপ্রাপ্তি, মানুষ হিসেবে তার শূন্যতা—এই জায়গাগুলোতে শাকিব খান ছিলেন অনবদ্য। তার ক্যারিয়ারে উল্লেখযোগ্য অভিনয়ের ছবি হয়ে থাকবে ‘রকস্টার’।

ছবির বাকি অভিনয়শিল্পীদের জন্য ‘রকস্টার’ তেমন কিছু যোগ করতে পারেনি। সাবিলা নূর মিরা চরিত্রটিকে ডুবিয়ে দেননি বটে, আবার তেমন গভীর দাগও রেখে যেতে পারেননি। চিত্রনাট্যে মিরা চরিত্রটির ব্যপ্তি কম, বৈচিত্র্যও কম। বিন্দুর মধ্যে সিন্ধু সবাই ফুটিয়ে তুলতে পারেন না। সাবিলা নূরও না পারলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তারিক আনাম খান সবসময় যেমন করেন তেমনই করেছেন। রোজী সেলিমের চরিত্রটি আরও বিকশিত হতে পারত। একই অভিযোগ করব মিথিলা জামান সম্পর্কেও। তিনি এর আগে কখনোই বড় চরিত্রে অভিনয় করেননি। এ ছবিতেও তার তার ভূমিকা অতিসংক্ষিপ্ত। তিনি ব্যক্তিজীবনে যা অর্থাৎ মডেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এমন চরিত্রে অভিনয় করা না করা সমান। শাকিব খানের বন্ধুর চরিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যেন অর্জুনের সারথি কৃষ্ণ। ‘বরবাদ-এর জিল্লুর মতো তিনি ‘মাল’ দেন না, ‘মাল’ কেড়ে নেন!
আসলে একটি চরিত্রকে বজ্র আঁটুনি দিলে অন্য চরিত্রগুলো ফসকা গেরোয় পড়ে, চিত্রনাট্য আলগা হয়ে যায়। এখানেও তাই হয়েছে। ‘রকস্টার’ হয়েছে চরিত্রনির্ভর ছবি, চিত্রনাট্যনির্ভর হয়নি। গল্পের পরিণতি স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয়নি, আরোপিত মনে হয়েছে। চিত্রনাট্যকারকে আরো যত্নশীল হতে হত। সংলাপ রচয়িতাও কাজ চালানোর মতো সংলাপ লিখেছেন।
ছবিটির যতখানি গতি তা মূলত সংগীত ও সম্পাদনা থেকে প্রাপ্ত। গানের দৃশ্যগুলোতে সম্পাদকের কাঁচি যেভাবে চলেছে, চিত্রনাট্যকারের লেখনি যদি সেভাবে দ্বান্দ্বিক মুহূর্তগুলো লিখতে পারত, তবে একটি গতিশীল মিউজিক্যাল ড্রামা হত ‘রকস্টার’। ছবিটির গানগুলো ভাল, তবে স্থায়ী হবে কি না বলা মুশকিল।
ছবিটি চূড়ান্ত বিচারে পরিচালক আজমান রুশোর ভিজ্যুয়াল ভিশনকে তুলে ধরতে পেরেছে। ‘রকস্টার’-এর প্রত্যেকটি ফ্রেম চোখধাঁধানো। ছবিটি দেখতে খুবই ভাল হয়েছে। টেক্সটে না হোক, টেকনিকে নির্মাতা কাজ দেখিয়েছেন বটে।






